03/05/2026
আবার_আসিব_ফিরে
পর্বঃ৪+৫
লেখিকাঃদিশা_মনি
প্রিয়া ও আরিফ কিছু সময়ের মধ্যেই সেখান থেকে রওনা দেয়। রায়হান পুরো সময়টা প্রিয়ার দিকে গভীর ভাবে নজর রাখে। প্রিয়া একটিবারও আর তার দিকে তাকায় নি। যা তাকে আরো রাগিয়ে দেয়।
এদিকে প্রিয়া আর অফিসে না ফিরে একেবারে নিজের বাসায় ফিরে আসে। এতদিন পর রায়হানের সাথে মুখোমুখি হওয়ায় সে বিরক্ত। অতীতের আর কোন চিহ্ন সে বয়ে নিয়ে যেতে চায় না। এরইমাঝে প্রিয়ার ফোনে একটি ইমেইল আসে যেখানে তাকে জানানো হয় কাল আবার একটি জরুরি মিটিং এ তাকে উপস্থিত থাকতে হবে যেখানে আর্য মালহোত্রা এবং সাইনিং স্টারের ডিরেক্টর রায়হানও উপস্থিত থাকবে। প্রিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
"যতই অতীতের পিছু ছড়াতে চাই না কেন, অতীত আমার থেকে পিছু হটতে চায় না। একেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেগ্যান্সি তার উপর... "
এর মাঝেই প্রিয়ার মাথায় একটা ভয় কাজ করতে থাকে যদি কোনভাবে রায়হান তার প্রেগ্যান্সির ব্যাপারে জেনে যায় তাহলে কি হবে৷ প্রিয়া ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে ভাবে,
"আমাকে যে করেই হোক এই কথাটা লুকাতেই হবে৷ ঐ নরকে আমি আর ফিরতে চাই না। তার জন্য যা করতে হয় আমি করব।"
বলেই প্রিয়া হাসফাস করতে থাকে। নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে বলে,
"এই শিশুকে এত অনিশ্চিত পরিবেশে আমি কিভাবে বড় করব? আমার মাথা একদম কাজ করছে না। কোথায় যাব আমি? কার আশ্রয়েই বা থাকব।"
প্রিয়া এসব প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পায় না।
★★
পরের দিন,
যথাসময়ে প্রিয়া অফিস মিটিং এ উপস্থিত হয়েছে। আজকে তাদের প্রজেক্টের ব্যাপারে আরো জরুরি কিছু আলোচনা আছে। প্রিয়া এই প্রজেক্টটা লিড করায় তাকে আজ অনেক ধকল নিতে হচ্ছে। আর্য মালহোত্রা ইতিমধ্যে উপস্থিত থাকলেও রায়হান এখনো আসে নি। যা প্রিয়াকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। সে তো চাচ্ছে যেন লোকটা আর না আসে কখনো। ঐ লোকের মুখোমুখিও হতে চায়না সে।
কিন্তু তার এই স্বস্তি চিরস্থায়ী হলো না। একটু পরেই রায়হান তার চিরচেনা বিদ্রুপাত্মক হাসি নিয়ে হাজির হলো। নিজের আসন দখল করেই সে বলতে লাগল,
"ট্রাফিক জ্যামের কারণে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। যদি কোন সমস্যা না হয় প্রজেক্টটা কি আবার শুরু থেকে বোঝানো যাবে?"
প্রিয়ার চেহারায় বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। এতক্ষণ ধরে তো সে বোঝালো এখন আবার শুরু করতে হবে! কিন্তু আরিফ চৌধুরী বলে উঠলেন,
"অবশ্যই, প্রিয়া তুমি আবার শুরু থেকে বুঝাও।"
অগত্যা প্রিয়াকে বাধ্য হয়ে আবার বোঝাতে হলো শুরু থেকে।
প্রিয়া আবারো স্লাইডগুলো চালু করে প্রজেক্টের বাজেট এবং লেবার কস্টের অংশটুকু বোঝাতে শুরু করল। সে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে প্রতিটি পয়েন্ট তুলে ধরছিল। কিন্তু রায়হান আজ কোমর বেঁধে এসেছে প্রিয়াকে অপদস্থ করতে। প্রিয়া একটি স্লাইড শেষ করতেই রায়হান হাত তুলে বাধা দিয়ে বলল,
"এক মিনিট! এখানে দেখা যাচ্ছে আপনারা কাঁচামাল পরিবহনের জন্য যে রুট সিলেক্ট করেছেন, তাতে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। একজন নবীন ইঞ্জিনিয়ারও বুঝবে এটা লস প্রজেক্ট। আপনি কি তবে বাজেট ঠিকমতো মেলাতে পারেন নি?"
প্রিয়া শান্ত স্বরে বলল,
"মিস্টার রায়হান ইসলাম, আপনি যদি পরবর্তী স্লাইডটা খেয়াল করেন তবে দেখবেন, এই রুটে খরচ কিছুটা বেশি হলেও সময় বাঁচবে প্রায় ৩০ শতাংশ। আর পচনশীল খাদ্য ও কেমিক্যাল পরিবহনের ক্ষেত্রে সময়ের মূল্য অর্থের চেয়েও বেশি।"
রায়হান দমে না গিয়ে আবার বলল,
"যুক্তি ভালো, কিন্তু এই যে টেকনিক্যাল মডেলে আপনারা সোলার পাওয়ার গ্রিড ব্যবহার করছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া কি সবসময় এর অনুকূলে? বর্ষাকালে এই প্রজেক্ট তো মুখ থুবড়ে পড়বে। আপনার ফাইল কি শুধু কল্পনা দিয়েই সাজানো?"
প্রিয়া এবার সরাসরি রায়হানের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"আপনার অবগতির জন্য বলছি, আমরা এখানে 'হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজ' সিস্টেম ব্যবহার করছি। মেঘলা আকাশ বা বৃষ্টির দিনে ব্যাকআপ পাওয়ার হিসেবে ন্যাশনাল গ্রিড স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে। আমি এখানে কোনো কাল্পনিক গল্প বলতে আসিনি, যথাযথ ডাটা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যালকুলেশন নিয়েই এসেছি। আপনার যদি টেকনিক্যাল টার্ম বুঝতে অসুবিধা হয়, আমি কি সহজ করে বুঝিয়ে দেব?"
প্রিয়ার এমন তুখোড় ও যৌক্তিক জবাবে রায়হান মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল। আরিফ চৌধুরী মুচকি হেসে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে গর্বের সাথে মাথা নাড়লেন। আর্য মালহোত্রাও রায়হানের দিকে ফিরে বললেন, "রায়হান, প্রিয়া যা বলছে তা একদম সলিড। আমার মনে হয় আমাদের এখন সই করার দিকে আগানো উচিত।"
রায়হান অপমানে নীল হয়ে রইল, কিন্তু প্রিয়ার অকাট্য যুক্তির সামনে কথা বলার আর কোনো পথ পেল না।
আজকের মিটিং এ আর্য মালহোত্রা ভীষণ খুশি হলেন এবং আরিফ চৌধুরীর সাথে ডিল প্রায় ফাইনাল করেই ফেললেন কিন্তু রায়হান এত সহজে হার মানতে রাজি নয়৷ তার ইগো এই মুহুর্তে এত বেড়ে গেল যে সে নিজের কোম্পানির লাভ বা ক্ষতির হিসাব না করে সরাসরি বলে দিল,
"আমি এই প্রজেক্টে ইনভেস্ট করবো না। আমার মনে হয় না, এটা আমার কোম্পানির জন্য লাভজনক হবে বলে।"
রায়হানের কথাটা যেন পুরো অফিস প্রাঙ্গনে ঝড় তুলল। আর্য মালহোত্রা অবাক স্বরে বললেন,
"এটা আপনি কি বলছেন মিস্টার ইসলাম। এরকম যুগান্তকারী একটি প্রজেক্টকে আপনার কাছে লাভজনক মনে হচ্ছে না।"
রায়হান বলে,
"আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে এতে লাভের থেকে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হবে। আমি কোন রিস্ক নিতে চাই না।"
প্রিয়া এরকম কিছুরই আশংকা করছিল। আরিফ রায়হানকে বোঝাতে চাইলেও রায়হান নিজের জেদেই অটল। সে জানায়,
"এই নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। মিস্টার মালহোত্রা, আপনি যদি এই প্রজেক্টে একান্তই অংশ নিতে চান তাহলে অন্য কোন ইনভেস্টার খুঁজে নিন। আমি এর মাঝে নেই।"
আর্য মালহোত্রা আরিফ চৌধুরীকে হতাশার সাথে বলেন,
"এত জলদি নতুন কোন ইনভেস্টার আমি জোগাড় করতে পারব না। সরি মিস্টার চৌধুরী.. এই প্রজেক্টটা নিয়ে আমরা এগোতে পারব না।"
আরিফ চিন্তিত হয়ে চেয়ারে বসে পড়ে। এই প্রজেক্ট নিয়ে সে অনেক আশাবাদী ছিল, ইতিমধ্যে অনেক খরচ করে ফেলেছে এই প্রজেক্টে। এখন এই প্রজেক্ট থমকে গেলে তার বড় লোকসানের মুখোমুখি হতে হবে। এসব ভেবেই তার শ্বাস দ্রুত হতে থাকে। প্রিয়া ব্যাপারটা বুঝতেই পেরেই দ্রুত পানির গ্লাস এগিয়ে নিয়ে যায় তার দিকে এবং তাকে নিজ হাতে পানি খাইয়ে দিয়ে বলে,
"স্যার, আপনি ঠিক আছেন তো?"
এই দৃশ্য দেখে রায়হানের রাগ মাথায় ওঠে। সে দ্রুত বেরিয়ে আসে। এদিকে প্রিয়া রায়হানকে যেতে দেখে ভাবে তাকে এবার একটা যোগ্য জবাব দিতেই হবে। এই প্রজেক্টটা তাদের কোম্পানির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রায়হানের ব্যক্তিগত আক্রোশের জন্য এই প্রজেক্ট নষ্ট হতে দিতে যাবে না।
প্রিয়াও রায়হানের পিছু পিছু চলে আসে। রায়হান নিজের গাড়িতে ওঠার আগেই প্রিয়া বলে ওঠে,
"বিজনেসের যায়গায় নিজের পারসোনাল গ্রাজেস না মেটালেই আপনার হচ্ছিল না? কেন এটা করলেন আপনি? একটা ছোট বাচ্চাও বুঝবে এই প্রজেক্টটা লোকসান নয় বরং দারুণ লাভ বয়ে আনবে।"
রায়হান এমনিতেই রেগে ছিল। প্রিয়ার এই কথা তাকে আরো রাগিয়ে দেয়৷ সে এগিয়ে এসে প্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,
"এখন তোমার মতো একটা মেয়ের থেকে আমায় বিজনেস শিখতে হবে? দেশের অন্যতম সেরা বিজনেসম্যান আমি।"
"বিজনেসটা আমিও ভালো বুঝি। আর.."
"তা তো বুঝবেই। বিজনেস না বুঝলে এই শহরে একা একটা মেয়ে হয়ে কিভাবে টিকে আছ? তা এত ভালো বিজনেস কে শেখালো তোমার ঐ আরিফ স্যার? এজন্যই বুঝি জব করতে এত উতলা হয়ে উঠছিলা। তা প্রতিদিন রাতে কত করে নাও এরকম বিজনেস করে? আমাকেও বলো, ডিভোর্স হয়েছে তো..আমারো কিছু নিডস আছে নাহয় একরাত টাকা দিয়ে পূরণ করে নেব।"
প্রিয়া এত জঘন্য কথা শুনে রাগী স্বরে বলে ওঠে,
"শাট আপ! মুখ সামলে কথা বলুন। আমি আর আপনার স্ত্রী নই যে এত জঘন্য কথা বলবেন আমায়।"
বলে সে নিজের হাতে থাকা গ্লাসের পানি ছুড়ে মারে রায়হানের দিকে।
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨
#আবার_আসিব_ফিরে
#পর্বঃ৫
#লেখিকাঃদিশা_মনি
প্রিয়া রায়হানকে হুশিয়ারি দিয়ে বলে দেয় আর কখনো প্রিয়া তো দূর অন্য কোন মেয়ের ব্যাপারেও যেন এমন জঘন্য কথা না বলে। রায়হানের সামনে আর এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকতেও তার ঘৃণা লাগছিল। আর তাই সে এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে স্থান ত্যাগ করে। এদিকে রায়হান প্রিয়ার এই ব্যবহারে রাগে কাপছিল। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলে,
"ভেবেছিলাম এই মেয়েকে আরেকটা সুযোগ দেব। কিন্তু আজকের পর কিছুতেই আর এই মেয়ে সেই সুযোগ পাবে না। আর ওকে আমি নিজের জীবনে ফেরাব না। এই নকল ডিভোর্সই ও আজীবন সত্য মানুক। আমি এবার নিজের জীবনে এগিয়ে যাব।"
বলেই রায়হান নিজের গাড়িতে উঠে বসে।
প্রিয়া বিষন্ন মনে অফিসে ফিরে এলে দেখে আরিফ চৌধুরী অফিসের কিছু সদস্যকে নিয়ে জরুরি মিটিং এ বসেছে দ্রুত নতুন বিজনেস পার্টনার খুঁজতে। প্রিয়াও দীর্ঘ শ্বাস ফেলে তার কাজে লেগে পড়ে। রায়হানের চিন্তা সে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে। অত:পর নিজের পেটে হাত বুলিয়ে বলে,
"যদি আমার সন্তান এই দুনিয়াতে আনিও তবুও তাকে আমি একা মানুষ করব। ঐ জঘন্য লোকটার কোন ছায়া পড়তে দেব না এই সন্তানের উপর। ওকে কখনো জানতেও দেব না। প্রয়োজনে, আমি সব ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব। যা করতে হয় আমি করব কিন্তু ওর সামনে কখনো নতি স্বীকার করব না।"
★★
রায়হান অফিসের সব কাজ গুটিয়ে আজ দ্রুত বাড়িতে ফিরে এলো। রোকসানা বেগম তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন। আচমকা রায়হান বাড়িতে এসে প্রথমে রান্নাঘরেই হানা দেয়। রোকসানা বেগম হঠাৎ এই সময় রায়হানকে দেখে চমকে গিয়ে বলে,
"রায়হান, তুই হঠাৎ এই সময়!"
রায়হান বলল,
"তোমাকে একটা কথা জানানোর জন্য এলাম।"
"হ্যাঁ, বল।"
"তুমি বলেছিলে না রোকেয়া খালার মেয়ে রূপার সাথে আমার বিয়ে দিতে চাও। আমি এই বিয়েতে রাজি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমি রূপাকে বিয়ে করতে চাই৷ তুমি দ্রুত সব ব্যবস্থা শুরু করে দাও।"
রায়হানের কথা শুনে রোকসানা বেগম যারপরনাই খুশি হন। তার ইচ্ছা অবশেষে পূরণ হতে চলেছে। তবে এক সপ্তাহের মাঝে বিয়ের কথাটা শুনে তিনি কিছুটা থমকেও যান। বলেন,
"এত দ্রুত কিভাবে বিয়ে হবে। কত আয়োজন করতে হবে, কত আত্মীয়-স্বজন.."
"ওত বড় আয়োজন লাগবে না৷ যাদের জানানো সম্ভব জানাও, যতদূর আয়োজন সম্ভব করো। কিন্তু বিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই হতে হবে।"
রোকসানা বেগম মনে মনে ভাবলেন,
"রায়হান যখন বিয়েতে রাজি হয়েছে তখন দেরি করে লাভ নেই। ও যা চাচ্ছে তাই হোক।"
"ঠিক আছে, তুই যা চাস তাই হবে। আমি রোকেয়ার সাথে কথা বলছি।"
তিনি দ্রুত রোকেয়া বেগমকে ফোন করেন।
এদিকে রোকেয়া বেগম তো খবরটা পেয়ে দারুণ খুশি। খবরটা পেয়েই নিজের স্বামী আব্দুল হককে ডেকে তিনি বলেন,
"ও রূপার বাপ! কই গেলে তুমি। শুনে যাও জলদি, তোমার মেয়ে রাজরাণী হবে গো।"
আব্দুল হক বলেন,
"কি হয়েছে, এমন ক্যাঙ্গারুর মতো লাফাচ্ছ কেন?"
"রায়হান আমাদের রূপাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে।"
আব্দুল হক খুব একটা খুশি হন না কথাটা শুনে। তিনি স্থানীয় এক স্কুলের শিক্ষক। নিজের মেয়েকে তিনি আরো পড়াতে চান। এত দ্রুত এক বিপত্নীক এবং বয়সে দ্বিগুণ ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিতে চান না। তাই তিনি বলেন,
"রায়হান মানে তোমার ঐ বড় বোনের ছেলে যার কিছু মাস আগেই ডিভোর্স হলো। আর এই খবর শুনে তুমি এভাবে নাচছ।"
রোকেয়া বেগম মুখ বাকিয়ে বলেন,
"তুমি চুপ থাকো। রায়হান ঢাকা শহরে কত বড় বিজনেসম্যান জানো? আর তোমার মুখে এই কথা মানায় না৷ করো তো ১২ হাজার টাকার একটা মামলি মাস্টারি চাকরি। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তোমাকে বিয়ে করে তো আমার জীবন এই টিনের ঘরে কেটে গেল। আমার মেয়ের সাথে আমি এমনটা হতে দিব না। ওকে আমি কোটিপতি ঘরে বিয়ে দেব।"
তত্মধ্যে রূপাও সেখানে চলে আসে৷ রূপাকে রোকেয়া বেগম বলেন,
"এই রূপা...তোর বিয়ের সম্মন্ধ এসেছে। রায়হান তোকে বিয়ে করতে রাজি। তুই করবি তো?"
বিয়ের কথা শুনেই রূপা খুশি হয়ে যায়। তার পড়াশোনা করতে একদম ভালো লাগে না, বাবার জোরাজুরিতে এতদূর পড়াশোনা করছে। নাহলে তো তার প্রায় সব বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। রূপা অবশ্য তার মায়ের মতো অর্থ লোভে নয়, সে বিয়ে করতে চায় নিজের একটা সংসার গড়ার লক্ষ্যে, পড়াশোনা থেকে রক্ষা পেতে৷ তাছাড়া রোকসানা বেগমও তাকে নিজের মেয়ের মতোন দেখেন। তাই রূপা রাজি হয়ে যায়।
"আমি বিয়ে করব আম্মু। আমার কোন আপত্তি নেই।"
আব্দুল হক কিছু বলতে যাবেন তার আগেই রোকেয়া বেগম বলেন,
"তুমি আর বাগড়া দিও না। নিজের ভালো পাগলেও বোঝে।"
তবুও আব্দুল হক বলেন,
"রূপা, তোর পড়াশোনা.."
"না, আব্বু। আমি আর পড়বো না। পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না। আমি বিয়ে করব।"
"বেশ তোরা মা-মেয়ে যখন রাজি তখন আমার আর কি বলার আছে। দেখ যা ভালো বুঝিস। ভবিষ্যতে যাতে আফসোস করতে না হয়।"
বলেই তিনি চলে যান। এদিকে রোকেয়া বেগম বলেন,
"ছাড় তোর বাপের কথা। আমাদের এখন থেকেই সব আয়োজন শুরু করতে হবে। এক সপ্তাহের মাঝেই বিয়ের ডেট, বুঝলি?"
রূপা মাথা নাড়ায়।
★★★
দুদিন পর,
প্রিয়া অফিস থেকে ফিরল সবে বাসায়। এরমাঝে হঠাৎ তার কলিং বেল বেজে ওঠে। প্রিয়া দরজা খুলে অবাক হয়। তার চাচা তথা রায়হানের বাবা রাসেল ইসলাম দাঁড়িয়ে। প্রিয়া কি বলবে বুঝতে পারে না। রাসেল ইসলাম বলেন,
"বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে, ভেতরে আসতে বলবে না।"
"হ্যাঁ, চাচা। আসুন।"
রাসেল ইসলাম ভেতরে এসে বসে প্রথমে প্রিয়ার খোঁজ খবর নেন। রায়হানের সাথে ডিভোর্স হলেও রাসেল ইসলাম সবসময় প্রিয়ার প্রতি যত্নশীলতা দেখিয়েছেন। তিনি এসেই প্রিয়ার খোঁজ খবর নেয়ার পর প্রিয়ার উদ্দ্যেশে বলেন,
"আমি তোমাকে দাওয়াত দিতে এসেছি।"
"কি উপলক্ষে চাচা?"
"রায়হানের বিয়ে উপলক্ষে।"
কথাটা শুনে প্রিয়া অবাক হয়ে বলে,
"উনি আবার বিয়ে করছেন।"
"হ্যাঁ।"
প্রিয়া কষ্ট পায় না তবে চমকে যায়।
"তুমি কিন্তু অবশ্যই আসবে।"
"কি বলছ এসব চাচা। আমি কিভাবে যাই৷ আমি ওর প্রাক্তন। আমি যদি ওর বিয়েতে যাই তাহলে হাজারো কথা উঠবে। লোকে মজা করবে এটা নিয়ে।"
"ওসব আমি বুঝে নেব। কিন্তু তোমার আসা চাই।"
"দু:খিত চাচা কিন্তু.."
"এটা আমার তোমার কাছে শেষ অনুরোধ। দয়া করে ফেলো না।"
প্রিয়া কি বলবে বুঝতে পারে না। প্রাক্তন স্বামীর বিয়েতে কোন মুখে যাবে৷ তাছাড়া সে আর রায়হানের মুখোমুখি হতে চায় না সেদিনের ঘটনার পর। আর সবথেকে বড় কথা যদি কোনভাবে সত্যটা সামনে আসে তাহলে কি হবে। তাই প্রিয়া বলে,
"আমি কোনভাবেই যেতে পারব না।"
রাসেল ইসলাম হাল ছাড়েন না। প্রিয়াকে নানাভাবে বোঝাতে চান কিন্তু ফলাফল শূন্য, প্রিয়া তার জেদে অটল। অবশেষে তিনি বিমর্ষ মনে উঠেন।
"বেশ, যা চাও। তবে আমি চাইব, বিয়েতে না হোক এরপর তুমি একদিন এসে তোমার বাবার সাথে দেখা করে যাও। উনি অনেক অসুস্থ।"
"ভেবে দেখব চাচা।"
রাসেল ইসলাম ফিরে যান। তবে তিনিও হার মানতে প্রস্তুন নন। রায়হান ও প্রিয়ার যে ডিভোর্স হয়নি সেটা তিনিও জানেন। কারণ তার পরামর্শেই ডিভোর্স পেপার নয় বরং তার বদল প্রিয়ার বাবা রাকিব ইসলামের যা সম্পদ ছিল সেটায় প্রিয়ার সই নিয়ে রায়হানের নামে করে নেয়া হয়েছে। প্রিয়া সেই সময় মানসিক ও শারীরিক ভাবে এতটা বিধ্বস্ত ছিল যে ব্যাপারটা খেয়াল করে নি। রাসেল ইসলাম চান না এই জালিয়াতি ধরা পড়ুক। তাই তিনি কোন নোংরা চাল চালতে প্রস্তুত হচ্ছেন।
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨