16/07/2026
ঢাকার ধুলোমাখা অলিগলি, চায়ের দোকান আর ছাদের আলোগুলো তখনও নেভেনি। পুরো শহর যেন এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে জেগে আছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হাজারো তরুণের চোখ স্থির হয়ে আছে টেলিভিশনের বিশাল স্ক্রিনে। তাদের গায়ে আকাশী-সাদা ডোরাকাটা জার্সি, বুকে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম, একটি সংখ্যা— **Messi 10**।
স্ক্রিনে যখন ওই জাদুকর বাঁ পায়ে বল নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন ঢাকার এই জরাজীর্ণ গলিগুলোতে যেন এক ঐশী উন্মাদনা তৈরি হয়। "মেসি! মেসি!" চিৎকারে প্রকম্পিত হয় বাংলার আকাশ। এ দেশের মানুষ হয়তো নিজেদের দেশের ইতিহাস ভুলে যেতে পারে, কিন্তু আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের পরিসংখ্যান তাদের নখদর্পণে। ফুটবল এখানে কেবল খেলা নয়, আর লিওনেল মেসি এখানে কেবল একজন খেলোয়াড় নন; তিনি এক অলিখিত ধর্ম, এক অঘোষিত উপাস্য।
কিন্তু এই অন্ধ প্রেমের উল্লাসে মত্ত থাকা বাংলাদেশের তরুণরা কি জানে, তারা যে আকাশী-সাদা জার্সি পরে উল্লাস করছে, সেই পতাকার ছায়াতলে আজকে ভয়ঙ্কর এক দানবীয় শক্তির উত্থান ঘটেছে? তারা কি জানে, যে দেশের জয়ে তারা চোখের জল ফেলে, সেই দেশ আজ কাদের কাঁধে হাত রেখে ফিলিস্তিনিদের শিশুদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে?
# # # **দৃশ্যের পরিবর্তন: নিউইয়র্কের ঘটনা**
দৃশ্যপট বদলানো যাক। ঢাকার এই চায়ের দোকান থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে এক অভিজাত মিলনায়তন। সেখানে কোনো ফুটবলের বাঁশি বাজছে না; সেখানে চলছে বিশ্বরাজনীতির এক ভয়ঙ্কর দাবা খেলা। আর সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট—অর্থাৎ লিওনেল মেসির দেশের রাষ্ট্রপ্রধান—এমন এক ঘোষণা দিচ্ছেন, যা শুনলে যেকোনো বিবেকবান মানুষের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যাবে। শুরু হতে যাচ্ছে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক কষাঘাতের গল্প, যা প্রতিটি আকাশী-সাদা সমর্থকের আত্মসম্মানকে মাটিতে মিশিয়ে দেবে।
নিউইয়র্কের ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটি (Yeshiva University)—ইহুদিবাদী দর্শন এবং পশ্চিমা রক্ষণশীলতার অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো-ঝলমলে মঞ্চে আজ যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর উসকোখুসকো চুল আর বন্য চোখের দৃষ্টি তাঁকে আর দশজন রাষ্ট্রনেতা থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি **হাভিয়ের মিলেই (Javier Milei)**। নিজেকে "অ্যানার্কো-ক্যাপিটালিস্ট" বা কঠোর নৈরাজ্যবাদী পুঁজিবাদী হিসেবে পরিচয় দেওয়া আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট।
তাঁর সামনে বসে আছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইহুদি নেতা, রাব্বি এবং ধনকুবেররা। হাভিয়ের মিলেই যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, তখন পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে যা বললেন, তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল বোমার মতো ফাটলো:
> *"আমি গর্ববোধ করি... ইসরায়েল ও ইহুদি জনগণের প্রতি আমার সমর্থন আগের মতোই অটুট রয়েছে। এই অবস্থান থেকে আমি কোনোভাবেই সরে আসব না। আর আজ আমি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করছি।"*
>
দর্শকদের গগনবিদারি করতালিতে ফেটে পড়লো পুরো মিলনায়তন। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপ্রধান—যে দেশটিকে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ অন্ধের মতো ভালোবাসে—সেই দেশের সর্বোচ্চ নেতা আজ নিজেকে সবচেয়ে বড় ইহুদিবাদী হিসেবে গর্বভরে ঘোষণা করছেন।
যে মুহূর্তে ফিলিস্তিনের হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু, নারী ও বৃদ্ধকে ইসরায়েলি বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করছে; যে মুহূর্তে পুরো বিশ্ব ইসরায়েলের এই বর্বরতার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে; ঠিক সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট তেল আবিবের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। তিনি শুধু সমর্থন দিয়েই থামেননি, তিনি এই সমর্থনকে এক ধর্মীয় উন্মাদনার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
হাভিয়ের মিলেই শুধু নিজেকে জায়নবাদী বলেই থামেননি; তিনি এর পেছনে এক গভীর ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যাখ্যাও দাঁড় করিয়েছেন, যা শুনলে তাঁর অন্ধ আনুগত্যের মাত্রা পরিষ্কার বোঝা যায়। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমা সভ্যতার পুরো ভিত্তিটাই গড়ে উঠেছে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত এবং বাইবেলের ১০টি আদেশের ওপর। তাঁর মতে, জীবন, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো আধুনিক বিশ্বের যত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তার সবই এসেছে ওই ইহুদিবাদী দর্শন থেকে।
তাঁর কথায় এক ধরণের হিপনোটিক বা সম্মোহনী সুর ছিল। তিনি বাইবেলের "এক্সোডাস" বা মিশর থেকে ইসরায়েলিদের বেরিয়ে আসার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলিদের ওই যাত্রাতেই স্বাধীনতার মূল ধারণা লুকিয়ে আছে। এই ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোই পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশের ভিত্তি তৈরি করেছে, তাই ইসরায়েলের সাথে কোনো ধরনের আপস করার প্রশ্নই ওঠে না।
মিলেইয়ের এই কথার অর্থ কী? এর কথার অর্থ হলো—ফিলিস্তিনের মাটিতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, যত রক্তই ঝরুক না কেন, আর্জেন্টিনা সবসময় ইসরায়েলের পক্ষে থাকবে। কারণ তারা এটিকে নিছক কোনো রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখছে না; তারা এটিকে একটি পবিত্র যুদ্ধ বা "হলি ওয়ার" (Holy War) হিসেবে নিয়েছে।
কঠোর উদারতাবাদী চিন্তাবিদ হান্স হারম্যান হোপে যখন মিলেইয়ের এই উগ্র ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, তখন মিলেই তাঁকে স্রেফ তাচ্ছিল্যভরে উড়িয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানাতে তিনি গর্ববোধ করেন এবং কোনো সমালোচনাই তাঁকে টলাতে পারবে না। তিনি নিয়মিত ইহুদি ধর্মের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁদের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা নেন। এক কথায়, আর্জেন্টিনা আজ পরিণত হয়েছে ইসরায়েলের এক বিশ্বস্ত দাসে।
# # # **মেসি ও আর্জেন্টিনার সাথে বাংলাদেশের সমর্থকদের দ্বন্দ্ব**
এখন প্রশ্ন হলো—এই ভূরাজনীতির নোংরা খেলার সাথে লিওনেল মেসির কী সম্পর্ক? কেন বাংলাদেশের আকাশী-সাদা ফ্যানদের এই গল্প শুনে লজ্জিত হওয়া উচিত?
সম্পর্কটা এখানেই যে, মেসি কেবল একজন খেলোয়াড় নন; তিনি হলেন আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল কালচারাল অ্যাম্বাসেডর বা সাংস্কৃতিক দূত। যখন হাভিয়ের মিলেই নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী হিসেবে ঘোষণা করছেন, তখন লিওনেল মেসি এই রাষ্ট্রেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বাংলাদেশের যে তরুণরা শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর গাজার মজলুম মুসলমানদের জন্য চোখের জল ফেলে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, তারাই আবার শুক্রবার রাতে মেসির জয়ে আনন্দে মিষ্টি বিলায়। এর চেয়ে বড় হিপোক্রেসি বা ভণ্ডামি আর কী হতে পারে?
একটু ইতিহাসের পাতা উল্টানো যাক। লিওনেল মেসির সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক আজকের নয়। ২০১৮ সালে জেরুজালেমে আর্জেন্টিনা এবং ইসরায়েলের মধ্যে একটি প্রীতি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। সে সময় ফিলিস্তিনিদের তীব্র প্রতিবাদে ম্যাচটি বাতিল হয়। কিন্তু মেসি বা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ইসরায়েল প্রীতি তাতে একটুও কমেনি।
মেসি যখনই ইসরায়েলে যান, তখন তিনি হাসিমুখে ইহুদিদের পবিত্র দেয়াল 'ওয়েইলিং ওয়াল'-এ (Wailing Wall) গিয়ে মাথায় কিপ্পা (ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী টুপি) পরে প্রার্থনা করেন। তাঁর সেই ছবি সারা বিশ্বের ইসরায়েলি মিডিয়া গর্বভরে প্রচার করে। ইসরায়েলের ধনকুবের এবং স্পন্সরদের সাথে মেসির বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। যে ইসরায়েলি স্টার্টআপগুলো ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি করার প্রযুক্তি বানায়, তাদের অনেকের সাথেই পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে পশ্চিমা কর্পোরেট বিশ্ব—যাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর স্বয়ং লিওনেল মেসি।
আর গাজার শিশুরা যখন বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তখন এই ফুটবল দেবতার মুখ থেকে কি একটি শব্দও বের হয়েছে? ফিলিস্তিনের পক্ষে কি একটি সহানুভূতিশীল পোস্ট তিনি দিয়েছেন? না, তিনি চুপ। কারণ তিনি জানেন, তাঁর দেশের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু। তিনি জানেন, তিনি নীরব থেকে মূলত ইসরায়েলের এই বর্বরতাকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। আর আমরা, বাংলাদেশের বোকা ফ্যানরা, সেই নীরব বিশ্বাসঘাতকের ছবি বুকে ধারণ করে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।
বাংলাদেশের প্রতিটি আর্জেন্টিনা সমর্থকের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা আসলে কাদের সমর্থন করছি? আপনি যখন বাজার থেকে হাজার টাকা দিয়ে একটি আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল জার্সি কিনেন, আপনি যখন তাদের স্পন্সর করা পণ্যগুলো কিনেন, তখন সেই অর্থের একটি অংশ আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। আর সেই অর্থনীতি আজ পরিচালিত হচ্ছে এমন এক প্রেসিডেন্টের দ্বারা, যিনি নিজেকে গর্বভরে সবচেয়ে বড় ইহুদিবাদী বলে দাবি করেন।
ভাবতে পারেন, আপনি এমন একটি দেশের পতাকা আপনার বাড়ির ছাদে ওড়াচ্ছেন, যে দেশ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়েছে? যে ইসরায়েল প্রতিদিন আপনার ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের রক্ত পান করছে, আপনি সেই ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের জাতীয় দলের জয়ে উল্লাস করছেন।
আমাদের আবেগ কতটা অন্ধ হলে আমরা এই সহজ সমীকরণটা বুঝতে পারি না! আমরা বলি, "খেলাকে রাজনীতির সাথে মেশাবেন না।" কিন্তু মিলেই কি খেলাকে রাজনীতির বাইরে রেখেছেন? তিনি তো আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই এই ঘোষণা দিয়েছেন। যখন পুরো আর্জেন্টিনা ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন আপনি কীভাবে আকাশী-সাদা জার্সিকে শুধু খেলা বলে চালিয়ে দেবেন? এই দ্বিচারিতা, এই মেরুদণ্ডহীনতা আমাদের পুরো জাতিকে বিশ্বের সামনে এক হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করেছে।
ফিলিস্তিনিরা যখন দেখে যে বাংলাদেশের মানুষ তাদের জন্য কাঁদছে, আবার পরক্ষণেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র দেশ আর্জেন্টিনার জয়ে রাস্তায় নেমে নাচানাচি করছে, তখন তারা আমাদের এই সস্তা আবেগ নিয়ে কী ভাবে? মেসি হয়তো অনেক বড় ফুটবলার, তাঁর বাঁ পায়ের জাদু হয়তো মোহনীয়। কিন্তু একজন মানুষের, একটি দেশের নীতি ও মানবতার বিরুদ্ধে যখন দাঁড়ায়, তখন সেই জাদুকে বর্জন করার মতো সাহস কি আমাদের নেই? নাকি আমাদের বিবেক ওই ফুটবলার জার্সির কাছে চিরকালের জন্য বন্ধক রাখা হয়ে গেছে?
আজ যদি আপনি একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ হন, তবে আপনার বুকেও ওই আকাশী-সাদা জার্সিটা একটা জ্বলন্ত কয়লার মতো বিঁধতে বাধ্য। ভাবুন সেই দৃশ্যটার কথা—ফিলিস্তিনের কোনো এক ধূলিসাৎ হওয়া হাসপাতালের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি ৫ বছরের শিশু। তার শরীরে রক্ত, চোখে আতঙ্ক। তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি ড্রোন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আটলান্টিকের ওপারে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইহুদি রাব্বিদের সাথে শ্যাম্পেনের গ্লাস হাতে নিয়ে ইসরায়েলের বিজয় কামনা করছেন। আর সেই একই সময়ে, আপনি ঢাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার জয়ে আতশবাজি ফোটাচ্ছেন।
এই দৃশ্যপট কি আপনার বিবেককে একটুও দংশন করে না? আপনার কি একবারও মনে হয় না যে আপনি আসলে ওই ফিলিস্তিনি শিশুটির হত্যাকারীদেরই পরোক্ষভাবে উদযাপন করছেন? আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট যখন বলছেন, "পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তি হলো ইহুদি আদেশ", তখন তিনি মূলত ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছেন। তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন যে ইসরায়েলের যেকোনো কর্মকাণ্ড—তা যত বর্বরই হোক না কেন—তা বৈধ। আর লিওনেল মেসি সেই দেশের জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে এই নগ্ন রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের ফ্যানরা মেসিকে ঈশ্বর বানিয়েছে, আর সেই ঈশ্বর আজ এমন এক বেদীতে দাঁড়িয়ে আছেন যার প্রতিটি ইটে লেগে আছে ফিলিস্তিনিদের রক্ত। এই সত্যটা হজম করা হয়তো কঠিন, কিন্তু এটাই চরম বাস্তবতা।
রাত এখন ভোর হওয়ার পথে। ঢাকার সেই চায়ের দোকানের টিভিটা এখনো চলছে, কিন্তু এবার আর সেখানে ফুটবলের কোনো ম্যাচ দেখানো হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংবাদের চ্যানেলে দেখাচ্ছে নিউইয়র্কের সেই ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটির দৃশ্য। হাভিয়ের মিলেই হাসিমুখে নেতানিয়াহুর এক ঘনিষ্ঠ দূতের সাথে করমর্দন করছেন। নিচে ব্রেকিং নিউজের স্ক্রলে লেখা: *"নিজেকে সবচেয়ে বড় জায়নবাদী হিসেবে ঘোষণা করলেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট।"*
চায়ের দোকানে বসে থাকা এক তরুণ—যার গায়ে ১০ নম্বর জার্সি—সে হঠাত করেই যেন জমে গেল। তার হাতের চায়ের কাপটা কাঁপছে। টিভিতে দৃশ্যপট বদলে গেল। এবার দেখানো হচ্ছে গাজার একটি বিধ্বস্ত স্কুল, লাশের সারি, রক্ত।
তরুণটি তার নিজের বুকের দিকে তাকাল। আকাশী-সাদা জার্সির ওপর লেখা "মেসি"। তারপর হঠাত মনে হলো, এই জার্সিটার রং আর আকাশী-সাদা নেই; এটা যেন লাল হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনের শিশুদের রক্তে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে তার এই প্রিয় জার্সিটি। সে বুঝতে পারল, সে এতকাল যাকে ভালোবেসেছে, সে আসলে এমন এক রাষ্ট্রের প্রতিনিধি—যারাই এই গণহত্যার সবচেয়ে বড় সমর্থক।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার গায়ে যেন কেউ গরম সিসা ঢেলে দিয়েছে। সে তার গায়ের জার্সিটা খুলল। ধুলোমাখা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলল সেই পরম আরাধ্য বস্তুটিকে।
বিশ্বরাজনীতির দাবা বোর্ডে আজ আর কোনো কিছুই আলাদা নয়। খেলা, রাজনীতি, ধর্ম, রক্ত—সবকিছু আজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। পরাশক্তিগুলো যখন তাদের নগ্ন রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন এই সস্তা আবেগগুলোর কোনো মূল্য থাকে না। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট তাঁর চাল দিয়ে দিয়েছেন; তিনি ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে এক নতুন ভূরাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। আর লিওনেল মেসি তাঁর নীরবতার মাধ্যমে সেই ডাককেই সায় দিয়েছেন।
এখন বাংলাদেশের ফ্যানদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। তারা কি নিজেদের আত্মসম্মান, বিবেক এবং ফিলিস্তিনি ভাইদের রক্তের সাথে বেইমানি করে এই আকাশী-সাদা পতাকাকেই আঁকড়ে ধরে থাকবে, নাকি এই লজ্জার চাদর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়াবে?
সূত্র: Ntv রিপোর্ট
১১:১১ মিনিট ভিডিও থেকে নেওয়া।