.কয়েক দিন আগের কথা। বাংলাদেশ আর ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ। একসঙ্গে খেলা দেখার জন্য গেলাম বন্ধুর বাসায়। খেলা দেখতে বসেছি, এমন সময় চলে গেল বিদ্যুৎ! খেলার মাত্র দুই ওভার গেছে তখন, মেজাজটা গেল চরম বিগড়ে! কী করব ভাবছিলাম, খেলার আপডেট তো পেতে হবে। বন্ধু বলল, ‘মোবাইল ফোনে রেডিওটা অন কর, অ্যাটলিস্ট ধারাভাষ্য শোনা যাবে।’ যেমন ভাবা তেমন কাজ, মোবাইল ফোনে রেডিও অন করে দুই বন্ধু ধারাভাষ্য শুনতে লাগলাম।রেডিও অন করেই শুনলাম ধারাভাষ্যকার বলছেন, ‘বোলার বল নিয়ে দৌড়ে আসছেন, ব্যাটসম্যান ব্যাট চালিয়েছেন, ছয় হওয়ার সম্ভাবনা...কিন্তু না, বল ড্রপ খেয়ে সীমানার বাইরে! একটা দারুণ টক-ঝাল-মিষ্টি চার।’তারপর বেজে উঠল জিঙ্গেল, ‘মন চাটনি, খাইলেই সুখ!’বন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে রইল অবাক দৃষ্টিতে। যা হোক এরপরের বলে আবার ধারাভাষ্যকার বলতে শুরু করলেন, ‘বোলার হাঁটি হাঁটি পা পা করে বল নিয়ে এগিয়ে আসছেন, ব্যাটসম্যান ব্যাট দিয়ে আলতো টোকা দিলেন, একটি রান...না! ব্যাটসম্যানদের অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় একটি জবা লিপ জেল দুই রান।’আবার জিঙ্গেল, ‘জবা লিপ জেল, ঠোঁটে ঠোঁটে কথা হয়।’এবার আমি বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইলাম অবাক হয়ে। আবার ধারাভাষ্যকার শুরু করলেন, ‘বোলার আসছেন দৌড়ে, পুরো যেন চ্যাম্পিয়ন গাড়ির টায়ারের মতো বেগে! বল করলেন এবং ব্যাটসম্যান হাঁকিয়ে ব্যাট চালালেন, কিছু হওয়ার সম্ভাবনা...কিন্তু না! একদম শিউলি ওয়াশিং পাউডার ক্লিন বোল্ড।’ আবারও জিঙ্গেল, ‘শিউলি ফুলের সুবাসে, শিউলি ওয়াশিং পাউডার, মিটিয়ে দেবে আপনার কাপড়ের ফরসা হওয়ার আবদার।’এবার আর কেউ অবাক হলাম না। ধারাভাষ্যে মনোযোগ দিলাম, ‘যাঁরা বাংলাদেশের খেলা দেখে হতাশ, তাঁরা খেয়ে নিতে পারেন লায়ন এনার্জি ড্রিংক। লায়ন এনার্জি ড্রিংক, হতাশা কেটে যাবে নিমেষেই!’হতাশ হব কী করে, হাসতে হাসতে আমাদের গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। শুরু হলো পরের বল, ‘বোলার এবার আগের চেয়েও তীব্র গতিতে বল করলেন। ব্যাটসম্যান ব্যাট চালালেন জোরে এবং একটি মিসেস ট্যাংগো ছক্কা! বল একদম মাঠের বাইরে। মিসেস ট্যাংগো, একবার খাইলে বারবার খেতে হয়।’ধারাভাষ্যকার এখানেই ক্ষান্ত নন, ‘বাংলাদেশের খেলা দেখে খুশি হলে করিয়ে নিন খুশি লাইফ ইনস্যুরেন্স। খুশি লাইফ ইনস্যুরেন্স, বেঁচে থাকুন, খুশি থাকুন।’বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘দোস্ত, এরা কী খেয়ে খেলার ধারাভাষ্য দিচ্ছে?’ ভাবছিলাম উত্তরে কী বলব, এমন সময় বিদ্যুৎ চলে এল। আবার টিভি ছাড়তে যাব, তখন বন্ধু বলল, ‘না দোস্ত, থাক, টিভি ছাড়ার দরকার নেই। রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনেই যা বিনোদন পাচ্ছি আর খেলা দেখার দরকার নেই। বরং এদের কথাবার্তাই শুনি।’
Educationboard.
Education is best. www.educationboardresult.gov.bd
Admin:
দুপাশজোড়া হলুদ সরষেখেত, মাঝখান দিয়ে সরু আলপথ। ওই পথ ধরে নদীর দিকে বেড়াতে চলেছে অভি আর অনিক। সরষে ফুলের মিষ্টি-ঝাঁজালো গন্ধে দুজনেরই মন-প্রাণ ভরে যাচ্ছে।অনিক আগে বাস-ট্রেনে বসে সরষেখেত দেখলেও এই প্রথম সে জানল কী মিষ্টি বুকভরা গন্ধ আছে এই ফুলে। শীতের বিকেলে সে বন-পাহাড়ে বেড়ায় বটে, সরষের চাষ খাগড়াছড়িতে নেই। অভির জন্ম ওখানেই। বাবা কাঠ ব্যবসায়ী। দাদাও তা-ই ছিলেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই কাঠ ব্যবসায়ী পরিবার। সুন্দর বাড়ি আছে খাগড়াছড়ি শহরে। চাচারাও সব ওখানে। আট বছর আগে একবার বেড়াতে এসেছিল বাগেরহাটের এই নানাবাড়িতে। তারপর এই আসা। বয়স এখন এগারো বছর।অভি হলো আপন মামাতো ভাই। সমবয়সী। খাতিরটা তাই জমেছে দারুণ। এদিকের গ্রামগুলো খুব সুন্দর। অভির সঙ্গে মাঠ-বাগানে ঘুরতে অনিকের দারুণ লাগছে।আজ বিকেলে চলেছে ছোট নদীটার দিকে। নদীর নাম ময়ূর নদী। অনিক দেখবে। ডিঙিতে চড়ে ঘুরে বেড়াবে। পাহাড়ি নদীতে তো ডিঙিতে চড়ে সুখ নেই।সামনের দিক থেকে ছাগলের পাল নিয়ে এক বালিকা আসছে। অভি বলল, ‘অনিক, ওই মেয়েটার নাম পরি। আমাদের গ্রামেই বাড়ি। ও প্রজাপতিদের ডেকে আনতে পারে মন্ত্রবলে, প্রজাপতিরা উড়ে এসে ওর শরীর-মাথা ঢেকে ফেলে। ও প্রতি হাটবারে ফকিরহাটে গিয়ে প্রজাপতি-বালিকা সাজে। অনেকেই দু-দশ টাকা দেয় মুগ্ধ হয়ে।’অনিক দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, ‘বলিস কী! মন্ত্র পড়ে ডেকে আনে প্রজাপতি!’‘তবে আর বলছি কী! একটা-দুটো নাকি! শত শত রং-বেরঙের প্রজাপতি। ওকে একেবারে ছেয়ে ফেলে।’অনিকের মাথায় চট করে এসে যায় আমিন কাকুর কথা। বছরে ছয়বার উনি খাগড়াছড়িতে যান প্রজাপতির সন্ধানে। ছবি তোলেন। অনিকের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। অনিককে নিয়েও বন-পাহাড়ে ঘোরেন। অনিককেও পেয়ে বসেছে প্রজাপতির নেশা।মেয়েটি এসে পড়েছে। হাতে দু-আঁটি সরষে শাক। অভি বলল, ‘পরিরে! এই হলো আমার ফুপাতো ভাই। তুই কী তোর প্রজাপতির খেলাটা দেখাবি ওকে!’ছিপছিপে শরীরের শ্যামল বর্ণের মেয়েটি তাকাল অনিকের দিকে; বলল, ‘দ্যাখাপোনা কেন? তয় টাকা লাগবে ১০০।’‘১০০ কেন, বেশি দেব।’ বলল অনিক, ‘তুমি কি প্রজাপতি খেলার মন্ত্রটা শিখিয়ে দেবে? তাহলে তোমাকে আমি দু-পাঁচ হাজার টাকা দিতেও রাজি।’পরি মাথা দোলাল। বলল, ‘এই মন্তর কাউরে শেখানো ওস্তাদের নিষেধ আছে।’অভি বলল, ‘ঠিক আছে। তা খেলাটা কি এখন দেখাবি?’পরি হাসল সুন্দর করে। বলল, ‘বেলা পইড়ে আসতিছে। শীতি কাঁপতিছি। বাড়ি যাইয়ে গরুর জন্যি কুটো কাটতি হবে। কাল সকালে তোমরা এইখানে আইসো। ছাগল চরাব এহানে। তখন দেখাব।’পরদিন সকালে হাজির অভি ও অনিক। অনিকের হাতে ক্যামেরা। পরি বসে রোদ পোহাচ্ছে। কাঁপছে শীতে। পরনে পাতলা একটা ফ্রক। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক। দুচোখভরা যেন দুঃখ ওর।উঠে দাঁড়াল পরি। হাসল সুন্দর করে। মাথার আলুথালু চুল ঠিকঠাক করে ছড়িয়ে ছিল পিঠের ওপরে। ফ্রকটা টানাটানি করল। পাঁচ পাক ঘুরল চোখ মুছে। ঊর্ধ্বমুখী লাফ দিল তিনটা। তারপরে সূর্যমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে শুরু করল।সময় বেশি লাগল না। চারদিক থেকে আসতে শুরু করল প্রজাপতি। বসছে পরির ঘাড়-মাথা-ফ্রকে। লাল-সাদা-হলুদ-কালো প্রজাপতিরা আসছে তো আসছেই। দেখতে না দেখতে পরির আপাদমস্তক ঢাকা পড়ল। কাকতাড়ুয়ার মতো দুহাত মেলে স্থির দাঁড়ানো সে। অনিন্দ্যসুন্দর স্বর্গীয় সৌন্দর্য যেন পরিকে ঢেকে ফেলেছে। অনিক তো যেন বোবাই হয়ে গেছে। মৌমাছি-মানবের ছবি সে দেখেছে সংবাদপত্রে। এই প্রথম দেখল প্রজাপতি-মানবীকে। অলৌকিক বর্ণিল পোশাক যেন পরেছে পরি।মিনিট ১৫ পরে ঝরাপাতার মতো খসে পড়ল একে একে সব কটি প্রজাপতি। পরি এক লাফে ডিঙিয়ে এল প্রজাপতির স্তূপ। অনিক বলল, ‘মারা গেছে!’পরি হেসে বলল, ‘আনন্দে ওরা হুঁশ হারাইছে। ১০ মিনিট পরে সব কটিই উইড়ে চলে যাবে।’১০ মিনিট তিনজনে একেবারে চুপ। তারপরে সব কটি প্রজাপতি একসঙ্গে নড়ল, পাখা মেলল। বর্ণিল রঙে ওরা আকাশ ঢেকে দিয়ে উড়ে চলল চারদিকেই। অনিক পরির ঘাড়ে হাত রেখে বলল, ‘পরি! এই মন্ত্র শিখতে চাই আমি!’পরি হেসে বলল, ‘তা তো সম্ভব না।’অনিক বলল, ‘এখানে কত রকম প্রজাপতি এসেছিল?’‘২১৬ রকম।’‘কী করে সম্ভব এটা!’পরি হাসল সুন্দর করে। সে হাসিতে রহস্যমাখা। অনিকের মাথা আর কাজ করছে না।
কই, কেউ তো আসে না।’ মন খারাপ করে বলল তিথি। বলতে গিয়ে ওর চেহারাটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।‘আরে আসবে আসবে, অপেক্ষা কর।’ সাদিয়া তিথিকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করে।ওরা দুই বন্ধু একটা গল্পের দুটো চরিত্র। মলাটবন্দী বইয়ের ভেতর ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল, কেউ যদি ওদের গল্পটা পড়ে! কী মজার একটা গল্প ওদের! মলাটটাও রঙিন। অথচ কেউ একটু হাতে নিয়েও দেখছে না। পাঠকদের অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। বইমেলায় থরে থরে সাজানো বইয়ের মধ্যে তিথি-সাদিয়ার গল্পের বইটা চাপা পড়ে গেছে একটা ভোটকা বইয়ের নিচে।তিথি একবার বইয়ের ভেতর থেকে মাথা বের করে বলতে চেষ্টা করেছিল, ‘এই যে বই বিক্রেতা ভাই, আমাদের একটু ওপরের দিকে রাখেন। নইলে পাঠক দেখবে কীভাবে?’ সাদিয়া টেনে তিথিকে ভেতরে নিয়ে গেছে। সাদিয়া সব সময় তিথিকে শাসনে রাখে। তার দাবি, সে তিথির চেয়ে ‘৬ পৃষ্ঠা’ বড়! গল্পে সাদিয়ার কথা এসেছে ৪ নম্বর পৃষ্ঠায়, আর তিথির নাম ১০ নম্বর পৃষ্ঠায়। কিন্তু তাতে কী? গল্পে তো দুজন বন্ধু, সমবয়সী। তবু সাদিয়া মুরব্বি ভাব দেখানোর সুযোগ ছাড়ে না।এমন সময় একটা ছোট্ট ছেলে বইয়ের দোকানটার দিকে এগিয়ে আসে। মোটা বইটা সরিয়ে তিথি-সাদিয়ার বইয়ের মলাটটা মন দিয়ে দেখে।উত্তেজনায় তিথির বুক ঢিপ ঢিপ করে। ‘সাদ্দু! দ্যাখ দ্যাখ, একজন খুদে পাঠক! মনে হচ্ছে আমাদের ও নেবে!’খুদে পাঠকের নাম নাজিফ। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আম্মু, আমি এই বইটা নেব।’‘হুররেএএএ!’ বইয়ের ভেতর থেকে চিৎকার করে ওঠে গল্পের দুই চরিত্র তিথি আর সাদিয়া। ওদের চিৎকার কেউ শুনতে পায় না।
শ্যামল আর কমল দুই বন্ধু।তারা একই ক্লাসে পড়ে।নামের মিলের কারণে তাদের বন্ধুত্ব হয়েছে। আরও বন্ধুত্ব হয়েছে আরেকটা বৈশিষ্ট্যের কারণে। ক্লাসে তারা সবচেয়ে দুষ্টু। দুজনই সমান দুষ্টু। সুতরাং দুষ্টুতে দুষ্টুতে বন্ধুত্ব।কিন্তু কিছু সমস্যা আছে তাদের। শুধু তাদের নয়, ক্লাসের সবার। আবার শুধু ক্লাসের নয়, গোটা স্কুলের সব ছাত্রছাত্রীর। কথা হচ্ছে, তারা দুষ্টু বলে সমস্যাগুলোর কথা তারা অন্যদের বলে ফেলে, সমস্যাগুলো নিয়ে তারা বেশি ভাবে। সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে বেড়ায়। সমাধান না পেয়ে প্রায়ই স্কুল পালায়।কী তাদের সমস্যা?তাদের পড়ার চাপ বেশি। পড়ার চাপে পড়ে তারা খেলাধুলা করার সময় পায় না।তাদের বইয়ের ভার বেশি। বইয়ের ভারে পড়ে তাদের ঘাড়-পিঠ ব্যথা হয়ে যায়।এসব চাপ আর ভারের ফাঁকফোকরে কিংবা শুক্রবারে একটুখানি সময় যদিও বা তারা পায় খেলাধুলার জন্য, কিন্তু খেলবে কোথায় গিয়ে? বাসা থেকে বের হলেই রাস্তা। কোনো মাঠ খুঁজে পায় না তারা। তাই বাসায় বসে বসে ডোরেমন আর টম অ্যান্ড জেরি দেখে, মোবাইলে গেম খেলে। পড়তে পড়তে আর কার্টুন দেখতে দেখতে আর গেম খেলতে খেলতে তাদের চোখ ব্যথা করে, মাথা ব্যথা করে। তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়।তারা এসব থেকে মুক্তি চায়। মাকে বলে। বাবাকে বলে। মাকে বলে, মা, বেড়াতে নিয়ে চলো। বাবাকে বলে, বাবা, দাদুবাড়ি নিয়ে চলো। ওখানে অনেক মাঠ, অনেক গাছ। ওখানে দারুণ মজা। কিন্তু মা নেয় না। বাবাও নেয় না। তাদের সময় নেই।মন খারাপ করে শ্যামল আর কমল স্কুল পালায়। হাঁটতে বের হয়, খেলতে বের হয় ফুটপাতে আর পার্কে। নানান মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। ছোট, বড়। সবাইকে তাদের স্কুল পালানোর কারণ বলে, সমস্যার কথা বলে। চিনেবাদামওয়ালাকে বলে, হকারকে বলে, টোকাইকে বলে, হাঁটতে আসা দাদুদেরও বলে। সবাই শোনে মন দিয়ে। কিন্তু কেউ সমাধান দিতে পারে না।কিন্তু একদিন।সেদিন স্কুল পালানোর পর তাদের দেখা হয়ে যায় এক জাদুকরের সঙ্গে। সব শুনে জাদুকর বলেন, ‘তোমাদের এত চাপে, এত ভারে রাখা তো ভারী অন্যায়।’ জাদুকর শ্যামল-কমলের পিঠ থেকে স্কুলব্যাগ খুলে নিয়ে বলেন, ‘আমি তোমাদের এই ভার কমিয়ে দেব।’শ্যামল-কমল হাততালি দিয়ে ওঠে।জাদুকর বলেন, ‘আমি তোমাদের খেলার জায়গা করে দেব।’শ্যামল বলে, ‘মজা হবে।’কমল বলে, ‘মজা হবে।’‘তার আগে তোমরা আমার কাছে বুদ্ধির পরীক্ষা দাও।’ বলেন জাদুকর।‘কী বুদ্ধি?’‘দুজন দুটো অবাক করা সত্যি কথা বলো।’শ্যামল ভাবে। কমলও ভাবে।ভাবনা শেষে শ্যামল বলে, ‘আজ সকালে আমি এক সাগর পানি খেয়েছি।’ভাবনা শেষে কমল বলে, ‘আমার দাদু আকাশে বাস করে।’জাদুকর বলেন, ‘ভারী অবাক ব্যাপার তো! বুঝিয়ে বলো।’শ্যামল বলে, ‘আমি যে গ্লাসে পানি খাই, সেটার নাম রেখেছি সাগর।’কমল বলে, ‘আমার দাদু যে ঘরটায় থাকে, তার নাম আকাশ।’জাদুকর মুগ্ধ হন শুনে। বলেন, ‘তোমাদের অনেক বুদ্ধি। শুধু স্কুল পালানোর বুদ্ধিটা ঠিক নয়।’শ্যামল বলে, ‘আর পালাব না।’কমল বলে, ‘আর পালাব না।’জাদুকর বলেন, ‘এখন বাড়ি ফিরে যাও। কাল থেকে নিয়মিত স্কুলে যাবে। আমি তোমাদের ভার কমিয়ে দেব। চাপ কমিয়ে দেব। তোমরা যাতে খেলতে পারো, বেড়াতে পারো, সে ব্যবস্থাও করে দেব।’শ্যামল-কমল বাড়ি ফিরে গেল।জাদুকর সেদিনই অবাক জাদুর বলে সব স্কুলে পড়ালেখার চাপ কমিয়ে দিলেন। সিটি করপোরেশন আর পৌরসভার মেয়রদের মনে ইচ্ছা তৈরি করে দিলেন—বাচ্চাদের জন্য মাঠ আর পার্ক গড়ে তুলতে হবে। আর সব মা-বাবার মাঝে বোধ জাগিয়ে দিলেন—সময় পেলেই সন্তানদের যেন পার্কে নিয়ে যান। যেন নিয়ে যান দাদুবাড়ি, নানুবাড়ি।তারপর।শ্যামল-কমল আর তার বন্ধুরা, শুধু বন্ধুরা নয়, স্কুলের সব শিক্ষার্থী মজা করে স্কুলে যায়। খেলতে যায় মজা করে। মাঠে। বেড়াতে যায় মজা করে। পার্কে। আর যায় মজা করে দাদুবাড়ি কিংবা নানুবাড়ি।
ঘটনাটা একদম রূপকথার মতো! বলছি শোনো।আইরিস গ্রেস থাকে যুক্তরাজ্যে। সে তার বয়সী অন্য ছেলে মেয়েদের চেয়ে একটু আলাদা। দুলে দুলে ছড়া বলে না, চিৎকার করে গান গায় না, এমনকি ক্ষুধা লাগলে ‘আম্মুউউউ! জলদি খেতে দাও’-ও বলে না। ভোরবেলা পাখি কেমন কিচিরমিচির করে, বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে গেলে হাঁটার সময় কেমন থপ থপ শব্দ হয়, বন্ধুরা হঠাৎ পেছন থেকে ‘ভোঁ’ বলে চিৎকার করলে কেমন পিলে চমকে যায়—এসব কিছুই সে জানত না। শুধু কথা বলতে আর শুনতেই যে ওর একটু সমস্যা হয়, তা নয়। মা অ্যারাবেলা কার্টার-জনসন ও বাবা পি জের সঙ্গেও সে ঠিকমতো মিশতে পারত না।.সারা দিন কাটত বাসায়। মেয়েটা কারও কথা বোঝে না, তার কথা কাউকে বোঝাতেও পারে না। তাই আইরিস কান্না করত, জেদ করত।ওর বয়স যখন চার, তখন ঘটল একটা আজব ঘটনা। এক সন্ধ্যায় একটা ছোট্ট বিড়ালছানা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন আইরিসের মা। ওমা! বিড়ালটা দিব্যি সোজা সোফার ওপর আইরিসের পাশে গিয়ে বসল। দুজন এমনভাবে মিশে গেল, যেন দুই পুরোনো বন্ধুর অনেক দিন পর দেখা হয়েছে! অ্যারাবেলা বিড়ালটার নাম রাখলেন টুলা।আইরিসকে নিয়ে লেখা বইএরপর থেকেই একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করল আইরিস গ্রেস। যে মেয়েটা কারও সঙ্গে কথা বলত না, টুলার সঙ্গে সে ভাব বিনিময় করতে শুরু করল। বিড়ালটাও যেন তার সব কথা বোঝে! আইরিস যখন বলে, ‘সিট ক্যাট’, টুলা লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসে পড়ে! এভাবে দুই বন্ধু একে অপরকে দেখে রাখতে শুরু করল।আর আইরিস শুরু করল ছবি আঁকা। কী অদ্ভুত সুন্দর সব ছবি যে সে আঁকে! এখন বয়স ছয়। এরই মধ্যে তার অনেকগুলো ছবি অনেক দাম দিয়ে কিনে নিয়েছেন বিশ্বের নামীদামি শিল্প সংগ্রাহকেরা। কয়েক দিন আগে হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলিও যখন আইরিসের আঁকা একটা ছবি কিনে নিলেন, তখন তো সারা বিশ্বে হইহই রইরই পড়ে গেল! ছয় বছর বয়সেই আইরিস হয়ে গেছে বিরাট আঁকিয়ে! বিখ্যাত শিল্পীকে ছবি আঁকার সময় সঙ্গ দেয় কে জানো? কে আবার? টুলা! আইরিস ছবি আঁকার সময় টুলা পাশে সমঝদারের মতো বসে থাকে।আইরিস গ্রেসের নামে একটা ওয়েবসাইট আছে। ওর নামে বই বের হয়েছে। সারা বিশ্বে পৌঁছে গেছে তার খ্যাতি। রং আর তুলি হাতে একের পর এক ছবি এঁকে মেয়েটা বলছে, ‘যারা অন্য রকম, তারাই অনন্য!’
ফাতিমার চার বছর হলো। কত কথা যে ও বলে। দুষ্টুমিতেও কম না। সারাক্ষণ ছোটাছুটি, হুড়োহুড়ি চলছে। কখনো টগবগে গরম পানির দিকে পা পাড়ায়। কখনো কাঁচি এনে নিজের চুল কাটে। শুধু তা-ই নয়, জামাকাপড়ও কেটে কুচি কুচি করে ফেলে। এসব দুষ্টুমি থামানোর একটাই উপায়, তা হলো বাঁশের কঞ্চি। কঞ্চি দেখালে চুপসে যায়।এই কঞ্চিটা আমি বানিয়ে এনেছি গ্রামের বাড়ি থেকে। কচি বাঁশের ডগা দিয়ে তৈরি চিকন কঞ্চি। একটু লাগালেই হলো। তবে ফাতিমাকে এটা দিয়ে শুধু ভয় দেখাই। কখনোই মারিনি। দুষ্টুমি করলে বালিশের ওপর, বিছানার ওপর, টেবিলের ওপর, চেয়ারের ওপর জোরে জোরে আঘাত করি। সপাং সপাং আওয়াজ হয়। তাতেই কাজ হয়ে যায়। দুষ্টুমি বন্ধ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে ফাতিমা।এই কঞ্চি নিয়ে ফাতিমার আব্বার সঙ্গে আমার প্রায়ই ঝগড়া হয়। তার কথা হলো, কঞ্চি দিয়ে ভয় দেখানোর কী হলো? বুঝিয়ে বললেই তো হয়। আমার মুখের কথায় যে কোনো কাজ হয় না—এ কথা ফাতিমার আব্বাকে আমি বোঝাতে পারি না। আর বুঝবেই বা কেন? সেই সকালে অফিসে যায়, আসে রাতে। ততক্ষণে ফাতিমা ঘুমে বিভোর। মেয়েটাও কম না। ছুটির দিনে বাবা বাড়িতে থাকলে তো হয়েছেই। তখন আমি হয়ে যাই শত্রু। বাবা যা বলে তাই শোনে। বাবার সব কথা তার মেনে নেওয়া চাই। এ কারণেই হয়েতো মেয়ের দুষ্টুমির কথা বাবা বিশ্বাসই করতে চায় না। ও যে কেন আমার কথা শোনে না, বুঝি না।এক সকালে ফাতিমার বাবা কঞ্চিটা ফেলে দিয়ে আমাকে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘এই কঞ্চি যেন আর না দেখি।’ফাতিমা যেন সব বুঝতে পারল। মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।এরপর মেয়েটা আরও বেপরোয়া আরও দুরন্ত হয়ে উঠল। অসহ্য হয়ে আমি ফেলে দেওয়া কঞ্চিটা কুড়িয়ে আনলাম। ভাগ্যিস, হারায়নি। কঞ্চি দেখামাত্রই সব ঠান্ডা। ওর বাবা যেন না দেখে, সে জন্য তোশকের নিচে লুকিয়ে রাখলাম। আর ফাতিমাকে বললাম, ‘একটা ভূত এসে এটা দিয়ে গেছে।’ ও খুবই ভয় পেল।বেশ চলছিল।সেদিন রান্নাঘরে কাজ করছিলাম। ফাতিমা বেডরুমে বসে কার্টুন দেখছিল। হঠাৎ কেমন যেন শব্দ এল। ভাবলাম টেলিভিশন থেকে। শব্দটা ক্রমশ বাড়তে লাগল। সঙ্গে ফাতিমার উঁচু গলাও শোনা যাচ্ছিল। কী কী যেন বলছে ও। দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, ফাতিমা সেই কঞ্চিটা দিয়ে টেলিভিশনের ওপর, ড্রেসিং টেবিলের ওপর, আমার মোবাইল ফোনের ওপর, বিছানার ওপর... সমানে আঘাত করছে। আর বলছে, ‘মশা! তুই যদি আবার আমাকে কামড় দিবি, তোকে মেরে হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে ফেলব, খুব দুষ্ট হয়েছিস না?’ গা দিয়ে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে, চোখ দুটো লাল টকটকে। আমাকে দেখে নাক-মুখ দিয়ে বলতে লাগল, ‘মশাটা আমায় দুবার কামড় দিয়েছে। তাই ওকে...।’ আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম আর ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম টেলিভিশনের গ্লাস, ড্রেসিং টেবিলের আয়না আর মোবাইল ফোনের দিকে। সব ভেঙে চৌচির।ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘আর তোকে বকব না, মা।’
ঘাট
সবুজ ওয়াহিদ | ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ আমি মরিয়া হইব শ্রীনন্দের নন্দন/ তোমারে বানাব আধা...’গানের সুরে মাথা তুলতেই হলো। কণ্ঠটা অপূর্ব সুরেলা! ফেরিঘাটে এসে বাস দাঁড়িয়েছে প্রায় ঘণ্টা খানেক হলো। কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল অনেকটা সময়। গাড়ির লাইন পড়ে গেছে তাই। বিভিন্ন ধরনের ফেরিওয়ালা আর ভিক্ষুক একের পর এক আসছে-যাচ্ছে। প্রত্যেকেরই বিপণন কৌশল ভিন্ন। মাফ চাইতে চাইতে ক্লান্ত হয়ে অ্যাটাক দেওয়ার পরিকল্পনায় ডুবে ছিলাম। কিন্তু এই লোকটা মাথা তুলতে বাধ্য করল। মনে মনে বললাম, এ এখানে কেন? একেই তো খুঁজছে বাংলাদেশ!মধ্যবয়স্ক লোকটার মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফ, চুল উষ্কখুষ্ক আর চোখ দুটি শান্ত, স্থির; হাতের কবজিতে পরানো সাদা ছড়িটিই এই স্থিরতার কারণ। দুই হাতে একটাও আঙুল নেই তার। সে গান গাইতে গাইতে বাসের পেছনে গেল আবার ফিরে এসে নেমেও গেল বাস থেকে। ভিক্ষা সে কারও কাছে চাইল না এবং পেলও না কিছু শুধু আমারটা ছাড়া। সুরে বন্দী হয়ে চলতে লাগলাম লোকটার পিছু পিছু—এ গাড়ি থেকে ও গাড়িতে।গান গেয়ে লোকটার আয়-রোজগার কিছু হচ্ছে না দেখলাম। সে গাড়িতে ওঠে, গান শুনিয়ে আবার নেমে আসে। আমি চলি তার পেছন পেছন। লক্ষ করলাম, একটা মেয়েও এই লোকটাকে অনুসরণ করছে। মেয়েটাও ভিক্ষুক, তার পায়ে সমস্যা আছে। প্রথমে ভেবেছিলাম সে এই গায়ক লোকটার কিছু হয় বোধ হয়। ঘটনা জানার জন্য মেয়েটার সঙ্গে কথা বললাম। জানলাম গায়ক তার কিছু হয় না। সেও সুরে মজেছে। তাই নিজের কাজে ফাঁকি দিয়ে চলেছে তার পিছু পিছু। এ কারণে অবশ্য বাবার কাছে বকা কম শুনতে হয়নি আজ তাকে। গায়ক নাকি এই ঘাট এলাকায় নতুন। এখানকার হালচাল এখনো বুঝে উঠতে না পারায় থলি ঠনঠন। মেয়েটা আমার দেওয়া পাঁচ টাকার নোটটা নিতে নিতে বলল, হে একটা বেবইদ্যা।বেবইদ্যা গায়ক ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে চলল। আমরা চললাম তার পেছনে—হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা অবস্থা একদম। মেয়েটা আমাকে বলল, স্যার, মানুষটার মইদ্যে একটা মায়া আছে, না?গায়কের কণ্ঠে আসলেই দরদ আছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি দরদ মেয়েটার চোখে দেখতে পেলাম তার জন্য। ঘাটে ফেরি এসে লাগায় গাড়ি এগোতে শুরু করেছে। একটা ১০০ টাকার নোট মেয়েটার হাতে দিয়ে গায়ককে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে গাড়ির দিকে ছুটলাম। গাড়ির সিটে বসে জানালা দিয়ে দেখি, মেয়েটা টাকা নিজের ঝুলিতে ভরে উল্টো দিকে হাঁটছে। নিজের বোকামিতে ভীষণ রাগ হলো।হঠাৎ দেখলাম, মেয়েটা ঘুরে গায়কের দিকে যাচ্ছে। সে একবার তাকাল আমার গাড়িটার দিকে। বুঝলাম, লোভের বিপরীতে থাকা মায়া মানুষটার দিকে টানতে শুরু করেছে তাকে।
তুমি কাছে নাইতবু স্বপ্ন সাজাইতুমি কাছে এলেপ্রাণ ফিরে পাই।ঝুমুর ঝুমুরসন্ধ্যা দুপুরমনের মাঝেবাজাও নূপুর।তোমার ঠোঁটেগোলাপ ফোটেতোমার হাসিহৃদয় লুটে।
অপরিচিতা
নূর সালাম খান | ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ঢাকা থেকে অনেক আগেই নেত্রকোনার কেন্দুয়া বাসস্ট্যান্ডে এসে বাসটি থেমেছে। কিন্তু বৃষ্টি থামেনি। ছাতাওয়ালারা এতক্ষণে নিজ গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। ছাতাহীনরা বাসের সিটের কোলে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। কারও ঘুমঘুম ভাব। রানীক্ষেত রোগযুক্ত মুরগির মতো ঝিমোচ্ছে। আমি ছাতাহীনদের দলে। তবে ঘুমোচ্ছি না। ৩০ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে কীভাবে তাড়াইলের জাওয়ার যাব, তা-ই ভাবছি। নাহ্। বৃষ্টি থামার অপেক্ষা আর সহ্য হচ্ছে না। প্যান্টের পা দুখানা কলার খোসা ছোলার মতো করে হাঁটুর ওপরে ওঠালাম।ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে হেঁটে চললাম চিরাং মোড়ের দিকে। ফাঁকা রাস্তা। সুনসান নীরবতা। যেন কারফিউ জারি হয়েছে। রাস্তার দুপাশের কয়েকটা দোকানের অর্ধেক শাটার টানা। বন্ধ দোকানগুলোর বারান্দায় বেওয়ারিশ কুকুর মাথা গুঁজে শুয়ে আছে।রাস্তার দুধারে রিকশা আর সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো। হঠাৎ শাঁ শাঁ আওয়াজে একটা প্রাইভেটকার হেডলাইট জ্বালিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে চলে গেল। আলোর ঝলকানি সইতে না পেরে চোখ বন্ধ করলাম। ‘আরে নূর ভাই যে... ঘন বৃষ্টির এ সন্ধ্যায় কোত্থেকে এসেছেন?’ ঘুরে তাকালাম। দেখলাম রঙিন ছাতা মাথায় এক অপরিচিতা।আমাকে বৃষ্টিভেজা দেখে খুব হাসছে। হাসিটা চমত্কার। তাই লজ্জার মুণ্ডু কেটে একপলক আপাদমস্তক দেখে নিলাম। অপরিচিতার শসাবিচি দাঁতগুলো দুধের মতো সাদা। যুক্ত ভ্রুযুগল। ঘন কালো দিঘল চুলগুলো খোঁপা করা। কাজল কালো চোখের ঢলঢল চাহনিতে তীব্র মায়া মেশানো। রূপসী যে আমার অপরিচিত তা বলতে ইচ্ছে করছে না।হৃদয়ে অন্য রকম অনুভূতি হলো। বাধ্য হয়ে বলতে হলো, ‘এক্সকিউজ মি, আপনি অপরিচিতা।’‘আমি আপনাকে চিনি, আরে-রে-রে, বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছেন তো। আসুন’, বলে হাত ধরে টেনে আমাকে ছাতার নিচে নিয়ে গেল। ছোট্ট এক ছাতারাশ্রয়ে দুজনার পথচলা। গা ঘেঁষে চলছি বিধায় ইতস্ততবোধ করছি। মুচকি হেসে হঠাৎ বলল, ‘নূর ভাই, আপনি যে এত লাজুক তা জানতাম না।’ ওর মুখে কথার খই ফুটছে। চলতে চলতে চিরাং মোড়ে এলাম। তখন একটা সিএনজিচালিত আটোরিকশা এল। অপরিচিতা বলল, ‘আব্বু এসেছে, এই নেন আপনার ছাতা, আবার দেখা হবে, টা-টা’। বলে চলে গেল। তবে কী যেন নিয়ে গেল। রেখে গেল ছাতা।
জোছনার ফুল
রয়েল পাল | ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ আজ শহরে চাঁদ উঠেছে। আজ আর ছাদে যাব না।গালগল্পে ঘরে বসেই সাজাব বসন্ত।আজ আর ছাদে গিয়ে কাজ নেই, বরং চার দেয়ালে রং করি সোনালি সময়।স্মৃতির স্নিগ্ধ বকুল। রোদ্দুর। স্বপ্নগুলো, ভালোবাসাগুলো।সে কোন ফাল্গুনে আড়চোখে তাকিয়ে ছিলে।অবোধ আমার হৃদয়ে তোলপাড়। ভালোবাসার প্রথম ভাগ। তোমার কথার আতশবাজি। চিঠি। জ্যামিতি বক্স। উড়ু উড়ু মন।কী হয়েছিল? আমার আলুথালু প্রেম। দিন নেই রাত নেই তোমার কথা মনে পড়ছে। রবীন্দ্রসংগীতে ডুবে থাকছি যখন-তখন। সকাল-বিকাল সারা দিন তোমার কথা ভাবছি। যেন আমার কোনো অজ্ঞাত রোগ। যেন তুমি ছাড়া কেউ নেই কোথাও। তুমি সবকিছু সমস্ত।ক্লাসরুমের বারান্দায় প্রথম দেখা।আমি বললাম, ‘এই যে শোনো, নাম কী যেন?’তুমি বললে, ‘স্কুলে নতুন। দশম শ্রেণি। অঙ্কে কাঁচা।’আমি বললাম, ‘অঙ্ক বুঝি। উপপাদ্য। সহজ-সরল সমীকরণ।’তুমি বললে, ‘বাহ্। আমাকে একটু দেখিয়ে দিয়ো।’তোমাকে সমীকরণ বোঝাতে গিয়ে আমি ভুলে গেলাম পড়ার টেবিল। দুপুরের ঘুম।বিকেলবেলায় তোমার পাড়ায় আমার নিত্য আসা-যাওয়া। যদি তুমি জানালায় এসে দাঁড়াও, যদি তুমি চোখের মাপে আকাশ দেখো।তখন তোমার জানালায় না আসাগুলো অপেক্ষার কবিতা। মন-খারাপরা বিছানায় এপাশ-ওপাশ।আজকাল কত কিছু ভুলে যাই। সেই সব কবিতা, মন-খারাপ ভুলি না। সেই হাওয়া, তোমার বারান্দা, রেলিং, পাড়ার গলি, হলুদ দুপুর—নিখুঁত মনে আছে।মনে আছে আমি একটু রাগ করলেই তোমার চোখ কাজলদিঘি।তোমার অভিমান, আমার সবকিছু ওলট-পালট।আমাদের দুচোখভরা স্বপ্ন ছিল। ভাঙা পৃথিবী সাজানোর স্বপ্ন। ছবির মতো ঘর। যে ঘরে ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমা আসে। ফোটে জোছনার ফুল। দেয়ালে ঝোলে উত্তাল সমুদ্র, পাহাড়, নীল আকাশ, গাঙচিল।আমাদের সমুদ্রে যাওয়া হয়নি কখনো। ভাবছি এবার সমুদ্রে যাব। কিছু পাহাড়ে ছবি তুলব, কিছু গাঙচিল, আকাশ। তারপর সমুদ্র, আকাশ, গাঙচিল আর পাহাড়দের সাথে নিয়ে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরব।আজ শহরে চাঁদ উঠেছে।আজ বিছানায় জোছনার ফুল ফুটেছে।আজ ছাদে গিয়ে কাজ নেই
দেখা-অদেখা হুমায়ূন আহমেদ
ইকবাল হোসাইন চৌধুরী | ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ পরনে চেক লুঙ্গি। পায়ে চপ্পল। গায়ে জড়িয়েছেন চাদর। শীতের মিষ্টি রোদ খেলা করছে চারপাশে। ছাদে শুকোতে দেওয়া রংবেরঙের কাপড়চোপড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তাঁর মুখ। হুমায়ূন আহমেদ! অথবা কোনো এক বইমেলার মৌসুম। হাওয়াই শার্ট গায়ে তিনি হেঁটে চলেছেন হনহনিয়ে। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। ভাবুক দৃষ্টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে চেনা হুমায়ূন! অথবা বিশাল দাবার ছকের ওপরে আনমনা শুয়ে আছেন তিনি। না, এসব দৃশ্য আর সত্যি হবে না কোনো দিন। আর হবে না বলেই নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায় বন্দী এসব আপাত সাধারণ দৃশ্য অসাধারণ হয়ে ওঠে। প্রয়াত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সদ্য প্রকাশিত ছবির অ্যালবাম অনন্ত জীবন যদি। বইমেলায় সশরীরে হুমায়ূন আহমেদ নেই। কিন্তু অন্যপ্রকাশের এই বইয়ের পুরোটাজুড়ে তিনি হাজির নানারূপে। কখনো দখিন হাওয়ার বাসভবনে। কখনো নুহাশপল্লীর অবসরে। কখনো লেখার মুহূর্তে, কখনো পরিবার-পরিজনের মাঝে। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এই ছবির অ্যালবাম তৈরির কাজটি নাসির আলী মামুন শুরু করেছিলেন ২০০৫ সালে। অ্যালবামের কাজ শুরুর অভিজ্ঞতা তিনি বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন এভাবে, ‘অবিলম্বে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নুহাশপল্লীতে যাওয়ার সুযোগ হয়। তাঁর প্রচণ্ড ভালো লাগার জায়গাটিতে সেদিন প্রচুর ছবি তুলে মনে হয়, তিনি আগামী দিনগুলোয় অনেক সময় দেবেন...।’ আলোকচিত্রীর এই আশা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সত্যি হয়নি। আগ্রহ থাকার পরও শত ব্যস্ততায় হুমায়ূন আহমেদ যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি ক্যামেরার সামনে। সেই আক্ষেপ আছে আলোকচিত্রীর কথায়, ‘ছবির বইকে ছবির মতো সরব হতে হয়। এটি যেন ছোটগল্পের মতো ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। আলোকচিত্রীর অপূর্ণতা থাকবে। কিন্তু তবুও এসব ছবি ‘অমূল্য’ হয়ে থাকবে সব সময়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যেমন ছবির এই অ্যালবাম নিয়ে বলেছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এতে প্রকাশিত হয়েছে যথার্থভাবে। বইটি ইতিহাসের দলিল হিসেবে মূল্যবান।’
রেদোয়ান আহমেদ | ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ‘কই, কেউ তো আসে না।’ মন খারাপ করে বলল তিথি। বলতে গিয়ে ওর চেহারাটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।‘আরে আসবে আসবে, অপেক্ষা কর।’ সাদিয়া তিথিকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করে।ওরা দুই বন্ধু একটা গল্পের দুটো চরিত্র। মলাটবন্দী বইয়ের ভেতর ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল, কেউ যদি ওদের গল্পটা পড়ে! কী মজার একটা গল্প ওদের! মলাটটাও রঙিন। অথচ কেউ একটু হাতে নিয়েও দেখছে না। পাঠকদের অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। বইমেলায় থরে থরে সাজানো বইয়ের মধ্যে তিথি-সাদিয়ার গল্পের বইটা চাপা পড়ে গেছে একটা ভোটকা বইয়ের নিচে।তিথি একবার বইয়ের ভেতর থেকে মাথা বের করে বলতে চেষ্টা করেছিল, ‘এই যে বই বিক্রেতা ভাই, আমাদের একটু ওপরের দিকে রাখেন। নইলে পাঠক দেখবে কীভাবে?’ সাদিয়া টেনে তিথিকে ভেতরে নিয়ে গেছে। সাদিয়া সব সময় তিথিকে শাসনে রাখে। তার দাবি, সে তিথির চেয়ে ‘৬ পৃষ্ঠা’ বড়! গল্পে সাদিয়ার কথা এসেছে ৪ নম্বর পৃষ্ঠায়, আর তিথির নাম ১০ নম্বর পৃষ্ঠায়। কিন্তু তাতে কী? গল্পে তো দুজন বন্ধু, সমবয়সী। তবু সাদিয়া মুরব্বি ভাব দেখানোর সুযোগ ছাড়ে না।এমন সময় একটা ছোট্ট ছেলে বইয়ের দোকানটার দিকে এগিয়ে আসে। মোটা বইটা সরিয়ে তিথি-সাদিয়ার বইয়ের মলাটটা মন দিয়ে দেখে।উত্তেজনায় তিথির বুক ঢিপ ঢিপ করে। ‘সাদ্দু! দ্যাখ দ্যাখ, একজন খুদে পাঠক! মনে হচ্ছে আমাদের ও নেবে!’খুদে পাঠকের নাম নাজিফ। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আম্মু, আমি এই বইটা নেব।’‘হুররেএএএ!’ বইয়ের ভেতর থেকে চিৎকার করে ওঠে গল্পের দুই চরিত্র তিথি আর সাদিয়া। ওদের চিৎকার কেউ শুনতে পায় না।
অপেক্ষা
রেদোয়ান আহমেদ | ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ‘কই, কেউ তো আসে না।’ মন খারাপ করে বলল তিথি। বলতে গিয়ে ওর চেহারাটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।‘আরে আসবে আসবে, অপেক্ষা কর।’ সাদিয়া তিথিকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করে।ওরা দুই বন্ধু একটা গল্পের দুটো চরিত্র। মলাটবন্দী বইয়ের ভেতর ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল, কেউ যদি ওদের গল্পটা পড়ে! কী মজার একটা গল্প ওদের! মলাটটাও রঙিন। অথচ কেউ একটু হাতে নিয়েও দেখছে না। পাঠকদের অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। বইমেলায় থরে থরে সাজানো বইয়ের মধ্যে তিথি-সাদিয়ার গল্পের বইটা চাপা পড়ে গেছে একটা ভোটকা বইয়ের নিচে।তিথি একবার বইয়ের ভেতর থেকে মাথা বের করে বলতে চেষ্টা করেছিল, ‘এই যে বই বিক্রেতা ভাই, আমাদের একটু ওপরের দিকে রাখেন। নইলে পাঠক দেখবে কীভাবে?’ সাদিয়া টেনে তিথিকে ভেতরে নিয়ে গেছে। সাদিয়া সব সময় তিথিকে শাসনে রাখে। তার দাবি, সে তিথির চেয়ে ‘৬ পৃষ্ঠা’ বড়! গল্পে সাদিয়ার কথা এসেছে ৪ নম্বর পৃষ্ঠায়, আর তিথির নাম ১০ নম্বর পৃষ্ঠায়। কিন্তু তাতে কী? গল্পে তো দুজন বন্ধু, সমবয়সী। তবু সাদিয়া মুরব্বি ভাব দেখানোর সুযোগ ছাড়ে না।এমন সময় একটা ছোট্ট ছেলে বইয়ের দোকানটার দিকে এগিয়ে আসে। মোটা বইটা সরিয়ে তিথি-সাদিয়ার বইয়ের মলাটটা মন দিয়ে দেখে।উত্তেজনায় তিথির বুক ঢিপ ঢিপ করে। ‘সাদ্দু! দ্যাখ দ্যাখ, একজন খুদে পাঠক! মনে হচ্ছে আমাদের ও নেবে!’খুদে পাঠকের নাম নাজিফ। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আম্মু, আমি এই বইটা নেব।’‘হুররেএএএ!’ বইয়ের ভেতর থেকে চিৎকার করে ওঠে গল্পের দুই চরিত্র তিথি আর সাদিয়া। ওদের চিৎকার কেউ শুনতে পায় না।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Address
Cumilla