22/08/2026
ঈদে মিলাদুন্নবি: মু’মিন বান্দার করণীয়
ড. মোঃ মোশাররাফ হোসাইন
পর্ব-২
দুই. জন্ম বৎসর
ইমাম তিরমিযির একটি বর্ণনা থেকে রাসুলুল্লাহ স. এর জন্ম বৎসর সম্পর্কে জানা যায়। সাহাবি কায়স ইবন মাখরাম (রা.) বলেন,
وُلِدْتُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الْفِيلِ. وَسَأَلَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ قُبَاثَ بْنَ أَشْيَمَ أَخَا بَنِي يَعْمَرَ بْنِ لَيْثٍ أَأَنْتَ أَكْبَرُ أَمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَكْبَرُ مِنِّي وَأَنَا أَقْدَمُ مِنْهُ فِي الْمِيلادِ وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الْفِيلِ.
কায়স ইবন মাখরামা রা. বলেন, আমি ও রাসুলুল্লাহ স. দুজনেই হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছি। উসমান ইবন আফফান রা. কুবাস ইবন আশইয়ামকে প্রশ্ন করেন: আপনি বড় না রাসুলুল্লাহ স. বড়? তিনি উত্তরে বলেন, রাসুলুল্লাহ স. আমার থেকে বড়, আর আমি তাঁর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছি। রাসুলুল্লাহ স. হাতির বছর জন্মগ্রহণ করেন। (সুনান তিরমিযি, হাদিস নং ৩৯৪৭)
হাতির বছর বলতে যে বছর আবরাহা হাতির বহর নিয়ে কাবা ঘর ধ্বংসের জন্য মক্কা আক্রমণ করেছিল সে বছরকে বুঝানো হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে হাতির বছরটি ছিল ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ। (আকরাম যিয়া আল্-উমারি, আস সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস-সহিহা, ৪র্থ সংস্করণ (মদিনা মুনাওয়ারা, মাকতাবাতুল উলুম ওয়াল হিকাম, ১৯৯৩), পৃ. ৯৬-৯৮; মাহদি রেজকুল্লাহ আহমদ, আস্-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ (সৌদি আরব, রিয়াদ, বাদশাহ ফয়সল কেন্দ্র), পৃ. ১০৯-১১০।)
তিন, জন্মমাস ও জন্মতারিখ
রাসুলুল্লাহ স. এর জন্মমাস ও জন্মতারিখ সম্বন্ধে হাদিস থেকে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। সাহাবাগণও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কোন কথা বলেন নাই। রাসুল স. এর সময় ও সাহাবাগণের যুগে কিংবা তাদের পরবর্তী তাবেঈগণের যুগেও এ ব্যাপারে কোন চিন্তা ও গবেষণা ছিল না। মূলত তারা এ বিষয়টি নিয়ে কোন চিন্তা করেন নাই মাথা ঘামান নাই। এর পরবর্তীতে এসে আলেম ও ঐতিহাসিকগণের পক্ষ থেকে অনেকগুলো মতামত পাওয়া যায়। যেমন:
১। মাস ও তারিখ অজ্ঞাত। জানা সম্ভব নয়। সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এটুকুই যথেষ্ট। এরচেয়ে বেশি কিছু বলা ও তালাশ করা অবান্তর ও অনুচিত।
২। তিনি রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখ জন্মগ্রহণ করেছেন। হিজরি দ্বিতীয় শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক ও মাগাযি প্রণেতা মুহাদ্দিস আবু মা’শার নাজীহ ইবন আবদুর রহমান আস্-সিন্দী (১৭০হি.) এমতটি গ্রহণ করেছেন।
৩। রবিউল আউয়াল মাসের ৮ তারিখ নবি স. জন্মগ্রহণ করেছেন। আল্লামা কাসতালানি ও যারকানি এমতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রথম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নসববিদ ঐতিহাসিক তাবেঈ মুহাম্মদ ইবন জুবাইর ইবন মুতঈম (১০০ হি.) এমতটিকে প্রধান্য দিয়েছেন। স্পেনের মুহাদ্দিস আল্লামা ইউসুফ ইবন আবদুল্লাহ ইবন আবদুল বার বলেছেন, ঐতিহাসিকগণ এমতটিকে সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন। মিলাদের উপর প্রথম গ্রন্থ রচনাকারী আল্লামা আবুল খাত্তাব ইবন দেহিয়া ঈদে মিলাদুন্নবির উপর লিখিত “আত্-তাবির ফি মাওলিদিল বাশির ওয়ান নাযির” গ্রন্থে এমতটি উল্লেখ করেছে।
৪। ইবন সাদ তার বিখ্যাত “আত্-তাবাকাত আল্-কুবরা” গ্রন্থে শুধু দুটি মত উল্লেখ করেছেন, রবিউল আউয়াল মাসের ০২ তারিখ ও ১০ তারিখ। (ইবন সাদ, আত্-তাবাকাত আল্-কুবরা, প্রথম খ- (বৈরুত: দারু এহইয়াউত তুরাস আল্-আরাবি), পৃ. ৪৭।)
৫। নবি স. ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন। এই মতটি গ্রহণ করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবন ইসহাক। (ইবন হিসাম, আস্-সিরাহ আন্-নাবাবিয়্যাহ, ১ম খ-, ১ম সংস্করণ (মিশর, কায়রো: দারুর রাইয়ান, ১৯৭৮), পৃ. ১৮৩।) তবে অনেক ঐতিহাসিক তার এ মতের সমালোচনা করেছেন। কেনন, তিনি এ মতের পক্ষে কোন সূত্র উল্লেখ করেন নাই।
৬। কেই কেউ বলেছেন ১৭ই রবিউল আউয়াল, আবার কেউ কেউ বলেছেন ২২শে রবিউল আউয়াল তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
৭। তিনি মুহাররাম মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ বলেছেন, সফর মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ বলেন রবিউস সানি মাসে, কেউ কেউ বলেন রজব মাসে, কেউ কেউ বলেন রমজান মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন।
অতএব ইতিহাস পর্যালোচনায় যেটা প্রতীয়মান হয়, রাসুলুল্লাহ স. এর জন্মতারিখ ও মাস নিয়ে সুস্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ কোনভাবেই জানা সম্ভব নয় যে নবি স. কোন মাসের ঠিক কোন তারিখে তিনি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন। যারা মতামত ব্যক্ত করেছেন তারাও বিভিন্ন ধারণার উপর বলেছেন।
জন্মের সময় প্রকাশিত কিছু অলৌকিক ঘটনা:
ইবন সাদ এর বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ স. এর মা বলেছেন, যখন মুহাম্মাদ জন্মগ্রহণ করেন তখন দেহ থেকে একটি নুর বের হল, সেই নুর দ্বারা শামদেশের মহল উজ্জ্বল হয়ে গেল। ইমাম আহমাদ হযরত এরবায ইবন সারিয়া থেকে কাছাকাছি ধরণের বর্ণান উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা ঈমাদের কোন বিষয় নয়।
কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, নবুয়তের পটভূমি হিসেবে নবি স. এর জন্মের সময় কেসরার রাজ প্রাসাদের চৌদ্দটি পিলার ধ্বসে পড়েছিল। অগ্নি উপাসকদের অগ্নিকু- নিভে গিয়েছিল। বহিরার গীর্জা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মোহাম্মদ গাযযালী এ বর্ণনা সমর্থন করেননি।
দুধ মায়ের ঘরে আগমণ:
নবি স. এর দুধ মায়ের নাম: হালিমা বিনতে আবু জুয়াইব। তিনি হালিমাতুস সাদিয়া নামেই বেশি পরিচিত।
তার স্বামী: হারেস ইবন আবদুল ওযযা। ডাক নাম আবু কাবশা। স্বামী স্ত্রী উভয়েই বনু সাদ গোত্রের লোক ছিলেন।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে, হালিমা নিজের স্বামীকে নিয়ে তার গোত্রের সাতে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হন যাতে তারা একটি পালক পুত্র নিতে পারেন। এটি ছিল দুর্ভিক্ষের বছর। অনেক লম্বা ইতিহাস। অবশেষে তারা মা আমিনা থেকে শিশু নবি মুহাম্মদ স. কে পালন নিয়ে নিলেন। নবি স. কে কোলে নেয়ার পর থেকে হালিমা নিজের চারদিকে এতএত বরকত দেখতে পেলেন যা কোন দিন কল্পনাও করেননি। হালিমাতুস সাদিয়ার পরিবার আল্লাহর রহমত ও বরকতে ভরপুর ছিল। এজন্য হালিমা দুধ পান শেষ হলেও মাতা আমেনাকে অনুরোধ করে আবার নিয়ে আসেন। সিনা চাকের ঘটনার পর তারা ভয় পেয়ে যান এবং মুহাম্মদ স. কে মায়ের নিকট ফেরত দেন।
চলবে.....