28/05/2026
শিক্ষা বিস্তারের এ যুগের কিংবদন্তি শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের গৌরবময় ২৫ বছর
নয়ন দেওয়ানজী।।
লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির নিবিড় আলিঙ্গনে ঘেরা ফলকামুড়ি গ্রামে দীপশিখার মতো জ্বলছে এক আলোকযাত্রার নাম— শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ। সময়ের অবিরাম স্রোত পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অতিক্রম করতে যাচ্ছে গৌরবময় ২৫টি বছর। ২০০২ সালে যে স্বপ্নের বীজ মাটির গভীরে প্রোথিত হয়েছিল, ২০২৭ সালে এসে তা রূপ নিচ্ছে জ্ঞানের সুবিশাল বটবৃক্ষে, আলোকিত মানুষ গড়ার এক নির্ভরতার ঠিকানায়।এই রজতজয়ন্তী হতে যাচ্ছে একটি আদর্শের দীপ্ত অভিযাত্রা, একটি সামাজিক আন্দোলনের সফল পরিণতি এবং অসংখ্য স্বপ্নপূরণের মহোৎসবে।গৌরবময় এই মুহূর্তে ফিরে তাকালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংগ্রাম, স্বপ্ন, ত্যাগ, ভালোবাসা আর অসংখ্য মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টার ইতিহাস।
ফলকামুড়ী গ্রামের কৃতি সন্তান আবদুল হক সাহেব, যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁকে পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রমণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে জাপানে গিয়ে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন—কেন একটি জাতি উন্নত হয়, আর কেন একটি জাতি পিছিয়ে থাকে।জাপানিদের জীবনযাত্রা, শৃঙ্খলা, কর্মনিষ্ঠা, মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি তাঁকে বিস্মিত করেছিল। তিনি বুঝতে পারেন, একটি জাতির উন্নয়নের মূল শক্তি কেবল অর্থ নয়—শিক্ষা। তবে সেই শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা ও কর্মমুখী জীবনের শিক্ষা।তিনি প্রায়ই বলেন—“শিক্ষা এমন হতে হবে, যা মানুষকে শুধু পরীক্ষায় পাশ করাবে না; মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।”এই উপলব্ধিই তাঁকে বদলে দেয়। তাঁর হৃদয়ে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন—গ্রামের সাধারণ মানুষের সন্তানদের জন্য এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে থাকবে আধুনিক শিক্ষা, নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক সম্মেলন।সেই সময় আবদুল হক সাহেব শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চিন্তাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবীরা।সম্মেলনে অংশ নেন প্রখ্যাত লেখক ও দার্শনিক আহমদ ছফা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জামান, শিক্ষাবিদ ড. মাহমুদুল করিম, সাংবাদিক নাজিম উদ্দিন মোস্তানসহ আরও অনেক গুণীজন। বরুড়া উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ছাত্র প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।সেই সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি সামনে আসে—গ্রামবাংলার শিক্ষার্থীরা সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর না করলে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।সেখান থেকেই শুরু হয় এক শিক্ষা আন্দোলন।
সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী “প্রযুক্তিপীঠ” নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর শিক্ষা প্রজেক্টের অংশ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ১৫টি অনানুষ্ঠানিক স্কুল চালু করা হয়। প্রতিটি স্কুলে প্রায় ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত।কিন্তু খুব দ্রুতই উপলব্ধি হয়—একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন সম্ভব নয়।তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।সেই স্বপ্ন থেকেই ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল।
প্রতিষ্ঠানের সূচনালগ্নে যাঁরা নিরলস শ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
আমীন নার্গিস,সেন্টু রঞ্জন চক্রবর্তী,খোরশেদ আলম,বেবি আক্তার।বিশেষ করে প্রতিষ্ঠাতার সহধর্মিণী এবং বর্তমান সভাপতি আমীন নার্গিস ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণশক্তি। তাঁর মমতা, রুচিবোধ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে একটি নান্দনিক ও আদর্শ শিক্ষাঙ্গনে রূপ নেয়।
২০০২ সালে স্কুল প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অনিল চন্দ্র ঘোষ। তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।পরবর্তীতে ২০০৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন।২০০৮ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মোখলেছুর রহমান। তাঁর সময়কাল ছিল প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠানটি জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার অনুমোদন লাভ করে।শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা, ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে স্কুলটি দ্রুত সুনাম অর্জন করে।
২০১৫ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ,কুমিল্লা এবং গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অনুমোদনক্রমে প্রতিষ্ঠানটি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হয় এবং “শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ” নামে নতুন পরিচয় লাভ করে।কলেজ শাখা চালুর সময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফাহাদুল ইসলাম এবং স্পেশাল ইন্সট্রাকটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রোকেয়া বেগম।পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অধ্যক্ষের দায়িত্বে যুক্ত হন বরুড়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর বেন ইয়ামিন ভূঞা এবং লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর হারুনুর রশিদ।২০১৬ সাল থেকে অদ্যাবধি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেজাউল করিম মজুমদার। সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন কামরুন নেছা।
আজকের শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ শুধু শিক্ষার জন্য নয়, তার অনিন্দ্যসুন্দর পরিবেশের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত।সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস, সুসজ্জিত ভবন, পরিচ্ছন্ন শ্রেণিকক্ষ, ফুলে-ফলে ভরা প্রাঙ্গণ—সবকিছুতেই যেন মিশে আছে ভালোবাসা ও শিল্পবোধ।এই নান্দনিক পরিবেশ গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান প্রতিষ্ঠাতার সহধর্মিনী শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের সভাপতি আমীন নার্গিসের। নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে সাজিয়েছেন এক স্বপ্নের ক্যাম্পাসে।যে ক্যাম্পাসে কেউ প্রবেশ করলে মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়ে যায় যে কেউ।
বরুড়ার সাবেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম একবার বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বলেছিলেন—“বরুড়ায় পড়ালেখার সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে।”
অন্যদিকে বরুড়ার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার নু-এমং মারমা মং প্রতিষ্ঠানটিকে “বরুড়ার মডেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তার বক্তব্যে।
এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়।এখানে শিক্ষার্থীদের মানবিকতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও জীবনদক্ষতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, খেলাধুলা, স্কাউট, যুব রেড ক্রিসেন্ট, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, শিক্ষা সফর—সবকিছুর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
সকালের অ্যাসেম্বলি, টিফিনের আড্ডা, প্রিয় শিক্ষকের বকুনি, বন্ধুদের হাসি, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, নবীনবরণ, বিদায় অনুষ্ঠান—সবকিছু আজ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে অমলিন স্মৃতি হয়ে আছে।অনেকেই আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, কেউ বিদেশে, কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যবসায়ী—কিন্তু হৃদয়ের গভীরে এখনো জড়িয়ে আছে একটি নাম—শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ।এই প্রতিষ্ঠান তাদের শিখিয়েছে— স্বপ্ন দেখতে, মানুষ হতে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।
২৫ বছরের এই আলোকিত যাত্রা অসংখ্য স্বপ্ন, ত্যাগ আর ভালোবাসার এক জীবন্ত ইতিহাস। ।প্রতিষ্ঠাতা আবদুল হক সাহেবের স্বপ্ন, সভাপতি আমীন নার্গিসের মমতা, শিক্ষকদের ত্যাগ, শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং অভিভাবকদের ভালোবাসা মিলেই গড়ে উঠেছে আজকের এই প্রতিষ্ঠান।রজতজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রত্যাশা—শাহের বানু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের জ্ঞানের আলো আগামী দিনেও ছড়িয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।কারণ— এটি হাজারো মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি আর গর্বের নাম।
কলমে---
নয়ন দেওয়ানজী