04/04/2020
দেবীদ্বারের নামকরণ ও দেবীদ্বার বানান নিয়ে নিয়েকিছু কথা
=======================================
(পাঠক বন্ধুরা এই পোষ্টটি পুণ:প্রচারের একমাত্র কারন,
‘দেবীদ্বার’ এবং ‘দেবিদ্বার’ বানান সংকট নিয়ে দেবীদ্বারবাসীর নানা প্রশ্নের জবাব পরিস্কার করতেই তা করা হয়েছে।)
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার ঃ
দেবীদ্বারের নামকরণ নিয়ে নানামূখী প্রবাদ, গল্প, কল্পকাহিনী রয়েছে। আজকের প্রেক্ষাপটে নামকরনের সঠিক অবস্থানে পৌঁছা খুবই কঠিন। তবে লোকমুখে ত্রীমূখী নামকরনের যুক্তি পাওয়া গেছে।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার ভাটুরিয়ার দেবীকোটের রাজ পরিবারের মধ্যে ভাতৃকলহে পৈত্রিক রাজপরিবার ত্যাগ করে বানরাজা এ অঞ্চলে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বানরাজা দেবীকোট থেকে আসায় এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বানরাজা পরিচয়ের চেয়ে দেবীকোটের রাজা হিসাবে ব্যপক পরিচিতি লাভ করেন। কালক্রমে দেবীকোটের নাম থেকে আজকের দেবীদ্বারের নামকরণ করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে ভিন্ন কথাও রয়েছে, কারো কারো মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বৃটিশের ক্যাপ্টেন জন ডেভিড ভারতের চিতনা নামক স্থান থেকে নৌপথে গোমতী নদী দিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে দেবীদ্বারের ভিংলাবাড়ি নামক স্থানে বানরাজার সৈন্যদের সাথে ক্যাপ্টেন জন ডেভিড’র নেতৃত্বাধীন সৈন্যদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এক সময় ওই যুদ্ধের নাম জন ডেভিডের নাম জড়িয়ে “ডেভিড ওয়ার” (ডেভিডের যুদ্ধ) নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ওই যুদ্ধের নামের প্রচলন থেকে আজকের দেবীদ্বার নামের নাকরণের উৎপত্তি বলেও অনেকে দাবী করছেন।
তৃতীয় মতাদর্শীদের মতে, এ অঞ্চল এক সময় হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। হিন্দু প্রধান এলাকা হিসাবে তাদের মূর্তী পূঁজার কেন্দ্রস্থল ছিল গোমতী নদীর পাড়। দেবীদ্বার গ্রামের টুনু দত্তের বাড়িতে একটি বড় পূঁজামন্ডপ ছিল। যাকে বলা হত ‘দেবীর ঘর’, এ ঘরে নির্মান হত দেব-দেবীর মূর্তী। তৈরী মূর্তীগুলো দেশের বাহিরে ত্রীপুরায়ও সরবরাহ করা হত। তখন দেবীদ্বারের জাফরগঞ্জ এবং কোম্পানীগঞ্জ’র ব্রীজ সংলগ্নে দুটি নৌবন্দর ছিল। হিন্দুসম্প্রদায় তাদের মূর্তী-পূঁজাগুলো করতেন গোমতী পাড়ে। কারন, মূর্তী বিষর্জনের নির্ভরযোগ্য স্থান হিসাবে বেছে নেয় গোমতী নদীকে। এক সাথে ৭০-১০০টি পূঁজা মন্ডব তৈরী হতো। পূঁজা শেষে এসব মূর্তীগুলো বিষর্জন দেয়া হতো গোমতী নদীতে। একসময় এ স্থানটিকে ‘দেবীর দুয়ারে’র খেতাবে ভূষিত হলো। সেই থেকে ‘দেবীর দুয়ার ’থেকে পরবর্তীতে দেবীদুয়ার - দেবীদ্ধার। সর্বশেষ ১৯৮৪ ইং সনে দেবীদ্বারের ‘ ী’ পরিবর্তন করে ‘ ী‘র স্থলে ‘ি ’ যোগ করে আজকের দেবিদ্বার বানানের প্রচলন শুরু করা হয়।
১৯৮৪ইং সনে দেবীদ্বার রেয়াজ উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব এ.কে.এম.ফজলুল হোসেন সাম্প্রদায়ীক চেতনায় এবং হিন্দু বিদ্বেষী মনোভাবের কারনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেবীর সংস্পর্শ থেকে দেবীদ্বারকে মুক্ত করতে, দেবীদ্বারের ‘ ী’র স্থলে ‘ি ’ প্রচলন শুরু করেন। ওই নির্বাচনে প্রার্থীদের ডেকে এনে তাদের নির্বাচনী প্রচরনায় পোষ্টার, লিফলেট, ব্যানার, ভোটার স্লিপ সহ বিভিন্ন প্রচার কাজে ‘দেবীদ্বারের’ স্থলে ‘দেবিদ্বার’ লিখার নির্দেশ দেন।
সেই প্রচার থেকে ১৯৮৫-১৯৮৬ ইং সনে উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল বাশার ভ’ইয়ার মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের সভায় রেজুলেশন করে ওই নামের পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন অফিস আদালত, বিপণী কেন্দ্রের সাইনবোর্ড, দাপ্তরিক কাগজ পত্র থেকে ‘দেবীদ্বার’ নাম মুছে ফেলে ‘দেবিদ্বার’ করা হয়। বর্তমানে সেই আভিধানিক শুদ্ধ বানানটি সংবাদ কর্মীদের লেখালেখিতে প্রচলন এবং ‘দেবীদ্বার মাল্টির্পাপাস সমিতি’র সাইবোর্ডে বর্তমানে কিছু লোকের মালিকাধিন চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাক্ষী হিসেবে প্রচলিত ছিল।
সম্প্রতি কুমিল্লা জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-ইতিহাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিয়ে গবেষক মামুন সিদ্দিকীর সাথে দেবীদ্বারের নামকরনের বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বিশিষ্ট লেখক তিতাস চৌধূরীর উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, তার লিখা ১৯৮৩ইং সনে প্রকাশিত “কুল্লিা জেলার লোক সাহিত্য” বইয়ে কুল্লিার গ্রাম গঞ্জের নাম করনে লোকশ্রুতি দিয়ে দেবীদ্বারের নামকরনে উল্লেখ করেন,- “দেবীদ্বার গ্রামে জনৈকা ‘দেবীমূর্তী’ উদ্ধার প্রাপ্ত হয়েছিল এবং সেই ‘দেবী’ সকলের জন্য ‘দ্বার’ উন্মোক্ত করে দিয়েছিলেন। সেই ‘দেবীর’ উন্মোক্ত ‘দ্বার’ থেকে আজকের ‘দেবিদ্বার’ হয়েছে। দেবীদ্বারের নামকরন সম্পর্কে এরচেয়ে বেশী কিছু জানাযায়নি।
দেবীদ্বার থানা প্রতিষ্ঠা ঃ
===================================================
একসময়ের ত্রিপুরা বর্তমানে কুমিল্লা। সেই ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা ‘কমলাঙ্ক’র নামানুসারে ‘কমলাঙ্ক’, কমলাঙ্ক থেকে ‘কর্মুল্যা’, কর্মুল্যা থেকে ‘কুমিল্যা’, কুমিল্যা থেকে আজকের ‘কুমিল্লা’র নামকরন হয়েছে। আর এ কুমিল্লা জেলার সর্ববৃহৎ থানা/ উপজেলা ‘মুরাদনগর’কে বিভক্ত করে ৩২ইউনিয়নের বড়শালঘর, ইউছুফপুর, রসুলপুর, সুবিল, ফতেহাবাদ, দেবীদ্বার, এলাহাবাদ, জাফরগঞ্জ, গুনাইঘর(উঃ), গুনাইঘর(দঃ), রাজামেহারসহ ১১টি ইউনিয়ন ও চান্দিনা থানার ধামতী, সুলতানপুর, ভানী, বড়কামতা, মোহনপুরমহ ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে দেবীদ্বার থানা / উপজেলা’র সৃষ্টি হয়েছিল। কথিত আছে দেবীদ্বার থানা/ উপজেলা’র সৃষ্টি হয়েছিল ‘শালঘর’ ও ‘ধামতী’ ইউনিয়নের দাঙ্গাবাজ লোকদের দমনে। মুরাদনগরের ৩২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টি এবং চান্দিনা থানার ৫টি ইউনিয়ন আলাদা করে ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে ১৯১৭ সালের ১৫ জুলাই দেবীদ্বার থানা প্রতিষ্ঠা হয়। ওই একই সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১১২৩ নং স্মরকে গেজেট আর.এ. প্রকাশ হওয়ার পর ১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারী থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে দেবীদ্বার থানার কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ১৯৮৬সালে থানাকে উপজেলায় রুপান্তরিত করার পর ২০০২সাল থেকে ৫নং
দেবীদ্বার ইউনিয়নকে পৌরসভায় উন্নিত করার পর উক্ত উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে বর্তমানে ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা করা হয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রভাবে ‘দেবীদ্বার’ বানান কে ‘দেবিদ্বার’ করা হয়েছে। আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আবারো পূর্বের জায়গায় অর্থাৎ ‘দেবীদ্বার’ বানানে ফিরে যেতে চাই। এক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তাছাড়া দেবীদ্বারের বাহিরে সর্বত্রই দেবীদ্বারকে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে ‘দেবীদ্বার’ই লিখা হয়। এবিষয়ে দেবীদ্বার বাসীর সুচিন্তিত মতামত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইজ বুক বন্ধু ও পাঠকের মতামত আবশ্যক।
(সংগৃহিত)