07/04/2026
তালিবে ইলমদের তরবিয়ত পদ্ধতি
অনুলিপি হাফেজ মুফতি ইমরান হুসাইন নূর
তালিবে ইলমদের তরবিয়ত অত্যন্ত জরুরি বিষয়, কিন্তু তা হতে হবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে।
নিম্নে তরবিয়তের কিছু নিয়ম-নীতি উল্লেখ করা হলো—
ভুল ধরার পদ্ধতি
ছাত্ররা কোনো ভুল করলে— “গাধা! ভুল করছিস! লজ্জা লাগে না? লেখাপড়াতো নেই, এখানে সময় নষ্ট করতে এসেছিস, তোদের কপালে লেখাপড়া নেই”— এ ধরণের কথা কখনো বলতে নেই। এতে ছাত্রদের মন ভেঙে যায়। লেখাপড়ার আগ্রহ কমে যায়। তাই তাদেরকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে সামনে অগ্রসর করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কীভাবে ভুল শোধরাতেন? বুজুর্গানে দ্বীন কীভাবে ভুল শোধরাতেন, আমাদেরকে তা অনুসরণ করে চলতে হবে। তবেই আমাদের তরবিয়ত ফলপ্রসূ হবে।
একবার হযরত আবু হুরায়রা (রা.) মসজিদে প্রবেশ করা মাত্রই দেখেন ইমাম রুকুতে; তিনি সেখানেই নিয়ত বেঁধে রুকুতে চলে গেলেন। অতঃপর আস্তে আস্তে হেঁটে কাতারে শামিল হলেন। নামাজ শেষ করে রাসূলে আরাবি (ﷺ) বললেন: زَادَكَ اللهُ حِرْصًا "আল্লাহ তাআলা তোমার আগ্রহকে আরও বৃদ্ধি করুন” বলে তাকে উৎসাহিত করলেন। অতঃপর বললেন: لَا تَعُدْ অর্থাৎ— আগামীতে আর এমন করবে না।
এখানে তিনি এভাবে বলতে পারতেন যে, “আবু হুরায়রা! এখানে কি তুমি নামাজ পড়তে এসেছ, নাকি ব্যায়াম করতে এসেছ? বেহায়া! এখনও নামাজ শিখোনি! নামাজকে তামাশা বানিয়েছ!” কিন্তু তিনি এগুলো না বলে কত সুন্দর পদ্ধতিতে তাঁকে শোধরে দিলেন।
উক্ত হাদিস থেকে পরিষ্কারভাবে একখা বোঝা গেল যে—
ক. কেউ ভুল করলে তা শোধরাতে হবে;
খ. মন ভাঙা যাবে না, আগে উৎসাহ দিয়ে তারপর শোধরাতে হবে;
গ. যে ভুল করেছে তা শোধরানোর জন্য দোয়াও করতে হবে।
ভুল যে পর্যায়ের, সংশোধনও সে পর্যায়ের
সামান্য ভুলের জন্য আমরা অনেক সময় বাড়াবাড়ি করে ফেলি। এটা আসলে নিয়ম নয়। ভুল যে পর্যায়ের, সংশোধনও হতে হবে সে পর্যায়ের। আমার নিজের জানা— এক ছেলে কানি-ফাড়া জামা গায়ে দিয়ে ক্লাসে এসেছে। শিক্ষক তার জামার দুই কানি ধরে টেনে বগল পর্যন্ত চিরে দিলেন এবং ছাত্রকে ক্লাস থেকে বের করে দিয়ে বললেন, “গোল জামা ছাড়া ক্লাসে আসতে পারবে না।“ ছাত্রটি বেরিয়ে গেল স্কুলে ভর্তি হলো। দাড়ি কাটল। এখন এক এনজিওতে চাকরি করছে।
আরেক ছাত্রকে কানি-ফাড়া জামা পরিধান করার অপরাধে কাঁচি এনে জামার কানি কেটে দেওয়া হলো, এরপর ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হলো। ছাত্র বের হয়ে স্কুলে ভর্তি হলো, পরবর্তীতে নামাজও ছেড়ে দিয়েছে। বলুন! ছাত্রগুলো বে-লাইনে চলে গেল, এদের দায়-দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে? বিষয়গুলো তো মারাত্মক কোনো অন্যায়ও ছিল না।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তরবিয়তের ১ম স্তর: কোনো ছাত্রকে সিআইডি হিসেবে ব্যবহার না করা
দারুল উলুম করাচিতে মাঝে মাঝে ‘তাদরীবুল আসাতিজা’ বা শিক্ষক প্রশিক্ষণ নামে ১৫ দিনব্যাপী সেমিনার হতো। কোনো এক সেমিনারে বর্তমান মুফতিয়ে আজম পাকিস্তান হযরত মাওলানা মুফতি রফী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম একটি কথা বলেছেন— কোনো কোনো শিক্ষককে দেখা যায়, তালিবে ইলমকে সিআইডি হিসেবে ব্যবহার করেন। যে তুমি দেখবে, কে কী করে না করে, কে কোথায় যায় না যায়। অতঃপর আমাকে জানাবে। হযরত বললেন, এটা নিয়ম নয়। এতে করে যাকে সিআইডি রাখলাম তার জীবন শেষ হয়ে যাবে। এ ছাত্র সাধারণত মানুষ হবে না। এর বিভিন্ন কারণ আছে। যেমন—
১। তাকে ছাত্ররা ভালো দৃষ্টিতে দেখে না;
২। তাকে কেউ ভালোবাসে না;
৩। তার ওপর অনেকের মনোকষ্ট থাকে;
৪। তাকে অনেকে বদদোয়া দেয়;
৫। পরবর্তীতে তার আলোচনা প্রশংসাসম্বলিত হয় না;
৬। তাকে সিআইডি-গিরি করতে গিয়ে নিজের লেখাপড়া নষ্ট করতে হয়;
৭। অনেক সময় সে এ সুযোগকে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে;
৮। এটা নিয়ে অনেক সময় অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া সৃষ্টি হয়;
৯। এ দায়িত্ব পেয়ে সে নিজেকে অনেক বড় মনে করে, যা অহংকারের নামান্তর;
১০। ছাত্রদের চোখে ধোঁকা দেওয়ার জন্য অনেক সময় সে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে; ইত্যাদি। একজন ছাত্রের জীবন শেষ করে দিলাম তাকে সিআইডি রেখে।
তাছাড়া সে আমাকে অন্যান্য ছাত্রদের সংবাদ দেবে। সব ছাত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক একরকম থাকে না। কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, কারো সঙ্গে মন্দ সম্পর্ক; সুতরাং সম্পর্ক যার সঙ্গে খারাপ, তার বেলায় একরকম সংবাদ পৌঁছাবে আর যার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো তার বেলায় অন্যরকম সংবাদ পৌঁছাবে, এর জন্য তাকে কখনো মিথ্যা সংবাদও পৌঁছানো লাগবে। সে সত্য কথাই বলবে, কিন্তু কথার ধরণ ও ভাবভঙ্গি এমন অবলম্বন করবে যে আপনি উল্টো বুঝবেন।
তরবিয়তের ২য় স্তর: তাসামুহ
তরবিয়তের ২য় স্তর হবে তাসামুহের স্তর। দেখেও দেখিনি, শুনেও শুনিনি, বুঝেও বুঝিনি— এভাবে চলতে হবে। এক সময় সে নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, যদি তার অন্যায় এত বড় হয় যে না দেখার ভান করলে হবে না, অথবা সে বুঝে ফেলেছে যে আমার এ অন্যায়ের সংবাদ হুজুর পেয়ে গেছেন। হুজুর বুঝে ফেলেছেন আমি অপরাধ করেছি। এখন আর তাসামুহ করলে হবে না। তাহলে তার দুঃসাধ্যতা বেড়ে যাবে। এখন তার তরবিয়তের লক্ষ্যে প্রয়োজনবোধে শাস্তি দিতে হবে।
তরবিয়তের ৩য় স্তর: রাগ ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা
তরবিয়তের নিয়ম ও বেতের শাস্তি বা শারীরিক শাস্তি সম্পর্কে হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদুল মিল্লাত শাহ আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর একটি বক্তব্য “আল ইবকা” এর মধ্যে উল্লেখ আছে। হযরত বলেন, তালিবে ইলমের বে-উয়ানি, গোস্তাখি ও বেয়াদবি দেখলে মানুষ হিসেবে উস্তাদদের গোসা আসাই স্বাভাবিক, গোসা আসবেই। এমন সময় আপনি যদি একটি বেত নিয়ে বেত্রাঘাত শুরু করেন, তবে আপনিও সীমালঙ্ঘন করে ফেলবেন। কারণ, গোসা অবস্থায় মানুষ নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। সেও সীমালঙ্ঘন করেছে বেয়াদবি করে, আর আপনিও তরবিয়ত করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করে ফেললেন, তাহলে সে আর আপনার মধ্যে পার্থক্য কী রইল? তাই এখন তাকে বেত্রাঘাত করা যাবে না, এখন তাকে শাসন করা যাবে না। শাসন কখন করবেন? রাগ ঠান্ডা হলে। রাগ ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
রাগ সংবরণ পদ্ধতি
রাগ কীভাবে দমন হবে?
১। তাকে সামনে থেকে সরিয়ে দিন, তাহলে গোসা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
২। তাকে সামনে থেকে সরানো সম্ভব না হলে আপনি সরে যান।
৩। সরে গিয়েছেন তবুও ঠান্ডা হয়নি, তাহলে ঠান্ডা পানি পান করুন।
৪। ঠান্ডা পানি পান করেছেন, এরপরও ঠান্ডা হয়নি, তাহলে দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়ুন।
৫। এরপরও ঠান্ডা হয়নি, তাহলে শুয়ে পড়ুন।
৬। এরপরও ঠান্ডা হয়নি, তাহলে অজু করুন।
৭। এরপরও ঠান্ডা না হলে গোসল করুন।
৮। এরপরও ঠান্ডা না হলে وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ পড়ুন।
৯। এরপরও ঠান্ডা না হলে أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ পড়তে থাকুন।
১০। এরপরও ঠান্ডা না হলে بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّহِيمِ বেশি বেশি পড়তে থাকুন। ইনশাআল্লাহ রাগ ঠান্ডা হয়ে যাবে।
মোটকথা, রাগ ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগবে। রাগকে কাবুতে রাখাই হলো আসল বীরত্ব। নবী কারীম (ﷺ) বলেন—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ وَلَكِنَّ الشَّدِيدَ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ – (مسند امام احمد)
অর্থ: ওই ব্যক্তি প্রকৃত বীর নয়, যে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত বীর সেই, যে রাগের মুহূর্তেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
গোসা ঠান্ডা হয়েছে, তাহলে তাকে ডাকুন; তাকে ডেকেই কি একটি বেত হাতে নিয়ে বেত্রাঘাত শুরু করে দেবেন? না, এখনও সময় আসেনি, কী করতে হবে।
তরবিয়তের ৪র্থ স্তর: অন্যায়ের পরিধি পরিমাপ করা
এখন তার অন্যায়ের পরিধি মাপ দিতে হবে। অন্যায় কী পরিমাণ, সে হিসেবে তাকে কী শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, এটা মাপতে হবে। মাপ দিয়েই কি বেত্রাঘাত শুরু করবেন? না, এখনও সময় আসেনি। এখন দেখতে হবে শাস্তি না দিলে চলে কি না।
তরবিয়তের ৫ম স্তর: শাস্তি না দিলে চলে কি না তা দেখা
যদি দেখেন যে এতটুকুই যথেষ্ট, ছাত্র জানতে পেরেছে হুজুর আমার অন্যায়ের কথা জেনে গেছেন। অনেকের তরবিয়ত এর দ্বারাই হয়ে যায়। তাহলে তাকে আর অন্য কিছু করা যাবে না।
তরবিয়তের ৬ষ্ঠ স্তর: ধমক দেওয়া
যদি দেখেন যে না, শুধু এতটুকুতে তার তরবিয়ত হবে না, আরও সামনে বাড়তে হবে, তাহলে সামনে বাড়া লাগবে। কিছু ধমকিও দিতে হবে, কেউ কেউ আছে একটু ধমক দিয়ে বিদায় দিলেই হয়ে যায়, তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করা যাবে না। ধমক দিয়েই বিদায় করতে হবে। ধমক ও বদদোয়া সংমিশ্রণ হতে পারবে না। যথাসাধ্য ধমকটি দোয়ার সংমিশ্রণে হওয়া চাই।
নোয়াখালী ইসলামিয়ার প্রিন্সিপাল ছিলেন হযরত মাওলানা কাসেম সাহেব রহ.। তিনি কোনো ছাত্রের ওপর রাগ হলে জোর আওয়াজে “নেকবখত” বলে ধমক দিতেন। একদিন বলা হলো, হুজুর! এটি কোনো ধমক হলো? হুজুর জবাব দিলেন যে, আমি এখানে মানুষ গড়তে এসেছি, কারো জীবন নষ্ট করতে আসিনি। আমি বদবখত বলে গালি দিলাম, আর তাই আল্লাহপাকের দরবারে কবুল হয়ে গেল, ছাত্রের জীবন বরবাদ করে দিলাম। পক্ষান্তরে আমার নেকবখত গালি কবুল হয়ে গেলে তার জীবনের পরিবর্তন ঘটে যাবে। সুবহানাল্লাহ! কত গভীর ভাবনা!!
তরবিয়তের ৭ম স্তর: শাস্তি দেওয়া
কেউ আছে ধমকে কাজ হবে না, বেত দেয়াই লাগবে, তাহলে কি এখন বেত লাগানো শুরু করবেন? হযরত থানভী রহ. বলেন, না, এখনও সময় আসেনি, কী করতে হবে? ৭ম স্তরে আসতে হবে। আর তা হলো— এ অন্যায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কয়টি বেত লাগানো যাবে তা ঠিক করতে হবে। পাঁচ বেত, সাত বেত, না কি দশ বেত? সংখ্যা ঠিক না করে বেত লাগালে এর মধ্যে বেশ-কম হয়ে যেতে পারে। যদি পাঁচ বেত লাগানোর দরকার ছিল, আপনি ছয় বেত লাগালেন। হযরত থানভী রহ. বলেন যে, এক বেতের খেয়ানত হয়ে গেছে, হাশরের মাঠে আল্লাহ পাকের কাছে জবাব দেওয়া লাগবে।
তরবিয়তের ৮ম স্তর: বেত লাগানোর জায়গা ঠিক করা
কোন জায়গাতে বেত লাগাবেন তা ঠিক করে নেওয়া। কোন জায়গায় বেত লাগাবেন— বুকে না পিঠে, হাতে না পায়ে? কোথায়? এটা ঠিক করা ছাড়া বেত্রাঘাত করলে, এমন জায়গাতেও বেত লাগতে পারে যেখানে বেত্রাঘাত করা হারাম, যেখানে আঘাত করলে তার জীবন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন, মাথার বাম পাশের পিছনের দিকে; জায়গাটি বড় স্পর্শকাতর, কারণ এখানে ব্রেন থাকে। এ জায়গায় সামান্য আঘাত লাগলেও অনেক বেশি ব্রেন নষ্ট হয়ে যায়।
এক ছাত্র খুব জহীন বা মেধাবী ছিল। এখন আর জহীন হয়নি। মেধাহীন হয়ে গেছে। এখানে সামান্য আঘাতে তার জীবন শেষ হয়ে গেছে। অথবা আঘাতটি কানে পড়েছে, কানের পর্দা ফেটে গেছে এবং বধির হয়ে গেছে। অথবা চেহারায় পড়েছে অথচ সেখানে আঘাত করা হারাম।
হাদিসে আছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ –
অর্থাৎ— কাউকে প্রহার করার সময় মুখমণ্ডল এড়িয়ে চলো।
তাই প্রথমে জায়গা ঠিক করে নিতে হবে, কোন জায়গায় বেত লাগাবেন।
তরবিয়তের ৯ম স্তর: জোর ঠিক করা
জায়গা ঠিক করা হলো, তাহলে এবার বেত লাগানো শুরু করবেন? না, এখনও সময় আসেনি। কী করতে হবে? কী পরিমাণ জোরে লাগাবেন তা ঠিক করে নিতে হবে। ৫০ ডিগ্রি জোরে লাগাবেন? না ৬০ ডিগ্রি জোরে? জোর ঠিক করতে হবে। যদি জোর ঠিক না করে বেত লাগানো শুরু করে দেন, আর ৫০ ডিগ্রি জোরে বেত লাগানোর দরকার ছিল, লাগালেন ৬০ ডিগ্রি জোরে। দশ ডিগ্রি জোরে লাগালেন, আল্লাহ পাকের দরবারে এর জন্যে জবাবদিহি করতে হবে।
তরবিয়তের ১০ম স্তর: কেমন বেত ব্যবহার করতে হবে
যে কোনো বেত ব্যবহার করা যাবে না। বরং মাঝারি, চিকন, নরম ও স্প্রিং করে এমন বেত নির্বাচন করতে হবে।
তরবিয়তের ১১তম স্তর: ছাত্রের বয়স ঠিক করা
ছাত্রের বয়স ১০ বছরের কম হতে পারবে না। কেননা নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলে ত্রুটির জন্যেও দশ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের প্রহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাহলে অন্য ক্ষেত্রে কীভাবে অনুমতি থাকবে? তাই পিটানোর ভান ধরবেন, জোরে পিটানোর সাদৃশ্য অবলম্বন করবেন, কিন্তু বেশি ব্যথা পায় সেই পরিমাণ পিটাবেন না।
তরবিয়তের ১২তম স্তর: অন্তরের দিকে তাকানো
বেত কী পরিমাণ জোরে লাগাবেন, জোর ঠিক করে নিলেন ও ছাত্রের বয়সও ঠিক করে নিলেন, এবার বেত লাগিয়ে দিবেন? না, এখনও সময় আসেনি। এখন কী করতে হবে? অন্তরের দিকে তাকাতে হবে। আমি কেন তাকে বেত লাগাবো। যদি অন্তর এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর হুকুম পালনার্থে, দায়িত্ব আদায়ের জন্যে ও আদব-তরবিয়ত শিক্ষা দেওয়ার জন্যে আমি তাকে বেত লাগাচ্ছি। তাহলে বেত লাগানো জায়েজ হবে।
তরবিয়তের ১৩তম স্তর: বেত লাগানো
অন্তরের সাক্ষ্য পাওয়ার পর বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম বলে বেত লাগানো শুরু করবেন। এখানেও কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে—
ক. প্রহার যেন বিভিন্ন স্থানে তিন বারের বেশি না হয়;
খ. দুটি আঘাতের মাঝে এতটুকু পরিমাণ বিরতি দিতে হবে, যেন প্রথম আঘাতের ব্যথা হালকা হয়ে যায়;
গ. এ অবস্থায় ছাত্রটি যদি বলে, আর অন্যায় করবো না, তাহলে আর প্রহার করবেন না। আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করবেন এবং প্রহার বন্ধ করে দেবেন। সুবহানাল্লাহ! কী সুন্দর নীতি। এমন সুন্দর নীতি একমাত্র ইসলামই দিতে পারে।
নীতি মোতাবেক শাসনের উপকারিতা:
উল্লেখিত উসুল ও নীতি অনুযায়ী শাসন করলে কী ফায়দা হবে? হযরত থানভী রহ. বলেন—
(১) তার তরবিয়ত হবে;
(২) আপনার সওয়াব হবে;
(৩) শাসনের পাশাপাশি তার ও আপনার মাঝে মহব্বত সৃষ্টি হবে; সবচেয়ে বড় কথা হলো, এতে আল্লাহপাক খুশি হবেন।