03/07/2023
বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি প্রসিদ্ধ নামের ভুল ব্যবহার..............................................................
মুহাম্মাদ / আহমাদ
مُحَمَّدٌ > মুহাম্মাদ > Muhammad
اَحْمَدْ > আহমাদ > Ahmad
প্রথমত নাম এ দুটি কুরআনিক শব্দ। ‘মুহাম্মাদ’ শব্দ পবিত্র কুরআনে চার জায়গায় এসেছে। এ নামটি আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আসলী বা মূল নাম। আর যত বানানবিভ্রাট বুঝি এই ‘মুহাম্মাদ’ আর ‘আহমাদ’ নামেই। হায়! বানানবিভ্রাট সৃষ্টির জন্য জাতি আর কোনো নাম খুঁজে পেল না। যার যেমন ইচ্ছা সে তেমনি লিখছেন। বাংলায় ‘মুহাম্মাদ’ বানানের বিভিন্ন রূপ প্রচলিত পাওয়া যায়। যেমন
মোঃ / মো. / মোহাঃ / মুহাঃ / মোহাম্মদ / মুহাম্মদ। তদ্রূপ ইংরেজি বানানে Md / Md. / Mohd / Mohammed / Muhammed / Mohammad ইত্যাদি।
‘আহমাদ’ শব্দের বানানও তথৈবচ। অথচ এটিও কুরআনিক শব্দ এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গুণবাচক নাম। মুহাম্মাদ নামের তুলনায় এ নামের বানানে বেশি স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ করা যায়। যেমন- আহমেদ, আহম্মেদ, আহাম্মদ, আহাম্মেদ। তদ্রূপ ইংরেজি বানানেও Ahmed/Ahmmed/Ahammad/ Ahammed ইত্যাদি অজ্ঞতার কারণে কেউ লিখলে তা শোধরানোর চেষ্টা করা দরকার। কিন্তু জেনে শুনে লিখলে তাকে বারণ করবে কে? আহমাদ ‘ম’-এর সাথে আ-কার যুক্ত করে উচ্চারণই শুদ্ধ উচ্চারণ। তবে আহমদ উচ্চারণও দীর্ঘদিন শুদ্ধের কাছাকাছি হিসেবেই ধর্তব্য হচ্ছে। কিন্তু আহমেদ, আহম্মেদ, আহাম্মদ লেখার কোনো অবকাশ নেই।
মোঃ / মোহাঃ / মুহাঃ / মো: -এগুলো আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘মুহাম্মাদ’ নামের ভিন্ন ভিন্ন সংক্ষেপ; যা আমাদের দেশে প্রচলিত। ‘মুহাম্মাদ’ একটি স্বতন্ত্র নাম। কারো নাম যদি মুহাম্মাদ হয়, তা হলে তা পূর্ণই লিখতে হবে, সংক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের দেশে মুসলমানদের মূল নামের শুরুতে ‘মুহাম্মাদ’ লেখার প্রচলন বহু আগে থেকেই রয়েছে। একসময় ব্রিটিশ ভারতে অমুসলিম হিন্দুরা তাদের নামের শুরুতে ‘শ্রী শ্রী’ লিখত। তাদের দেখাদেখি কিংবা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলমানরাও নামের শুরুতে ‘শ্রী’ ব্যবহার করতেন। পুরাতন দলীলপত্র তা-ই প্রমাণ করে। এটা ছিল সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।
এজন্য হিন্দুয়ানি প্রভাব থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য উলামায়ে কিরাম তার মুকাবিলায় নামের শুরুতে নবীজির নাম লেখার প্রথা চালু করেন। যেন মুসলিম-অমুসলিম নামে পার্থক্য হয়ে যায়।
নামের শুরুতে নবীর নাম য্ক্তু করার শরীআতে কোনো বিধান নেই। কিন্তু এটি ছিল ভারতীয় মুসলমানদের আত্মমর্যাদাবোধের দাবি এবং আত্মপরিচয় তুলে ধরার প্রচেষ্টা। সেইসঙ্গে তা ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মুহাব্বত ও ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে সে প্রেক্ষাপট যেহেতু নেই, সেহেতু নামের শুরুতে মুহাম্মাদ লেখার সেই তাৎপর্য আর বাকী নেই। কিন্তু অন্য একটি কারণে ‘মুহাম্মাদ’ যুক্ত করার গুরুত্ব এখনও রয়ে গেছে। তা হলো- বর্তমানে অনেক মুসলমানই ইসলামী সংস্কৃতির পরিচায়ক আরবী-ফারসী শব্দে নবজাতকের নাম না রেখে বাংলা-ইংরেজি শব্দে নামকরণ করতে শুরু করেছে। ক্রমশ সেই প্রবণতা বেড়েই চলছে। যে কারণে এ শিশুর মুসলিমপরিচিতি চাপা পড়ে যাচ্ছে। কাজেই এজাতীয় নামধারীদের জন্য নামের শুরুতে ‘মুহাম্মাদ’ যুক্ত করা অথবা শেষে আহমাদ যুক্ত করার অনেক গুরুত্ব রয়েছে, যেন তার মুসলিমপরিচিতি নামের মধ্যেও ফুটে ওঠে। যেমন- মুহাম্মাদ সুমন, অথবা ‘সুমন আহমাদ’।
কিন্তু কথা হলো, নামের শুরুতে যে ‘মুহাম্মাদ’ লেখা হবে, তার লিখনরীতি কী হবে? বর্তমানে ‘মুহাম্মাদ’ নামের অনেক বানানরীতি প্রচলিত রয়েছে। ব্যাকরণ মতে যেমন এসব লিখনরীতি শুদ্ধ নয়, তেমনি শাস্ত্রমতেও এই সংক্ষেপণ সিদ্ধ নয়। কারণ, প্রথমত- ভাষারীতিতে কোনো শব্দকে সংক্ষেপ করে তার পরিবর্তে বিসর্গ (ঃ) কিংবা কোলন (:) লেখার কোনো নিয়ম নেই। দ্বিতীয়ত, সম্মানার্থে ও বরকতের জন্য যে নাম যুক্ত করা হয়েছে, সংক্ষেপ করা দ্বারা তার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়। অথচ নিজের নাম ঠিকই বহাল রেখেছে। এজন্য নামের শুরুতে ‘মুহাম্মাদ’ লিখলে তার পূর্ণঅংশ লিখুন, সংক্ষেপে নয়। আর পূর্বোক্ত ভুলপদ্ধতিতে তথা- মোঃ / মোহাঃ / মুহাঃ / মো: তো নয়ই।
অনুরূপভাবে ইংরেজি নামের আদ্যংশের Muhammad শব্দকে সংক্ষিপ্ত করে Md. না লেখা চাই। এ প্রবণতা কেবল বাংলাদেশে। বিশ্বের আর কোথাও এ নামকে সংক্ষেপ করার রেওয়াজ প্রচলিত নয়। একারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘মুহাম্মাদ’ নামের অংশবিশেষ মো./MD. নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কারণ MD দ্বারা আরেকটি অর্থ বোঝায়। MD-এর পূর্ণরূপ হলো Managing Director (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) কাজেই এ বিষয়ে আরেকটু সচেতন হওয়া উচিত।
তদ্রূপ মুহাম্মাদ শব্দের বানানে ‘মুহাম্মেদ’ কিংবা ‘মোহাম্মদ’ও কখনো লিখবেন না। এটি ইংরেজদের Mohammed বানান থেকে এসেছে। ইংরেজরা ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্য ভাষার শব্দকে বানানবিকৃতি ঘটায়, যদিও তারা শুদ্ধ বানান লিখতে পারে। যেমন তারা ‘উসমানী সাম্রাজ্য’কে ‘অটোমান সাম্রাজ্য’, ‘মক্কা’কে ‘মেক্কা, ‘আহমাদ’কে ‘আহমেদ’ লিখে থাকে। এজাতীয় বানানে অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না।
আর এটাও জেনে রাখা দরকার, আরবী কার-চিহ্ন পেশ-এর প্রতিরূপ হিসেবে বাংলায় ও-কার (ে া) এবং ইংরেজিতে ‘O’ ব্যবহার হবে না; বরং বাংলায় উ-কার ( ু) ইংরেজিতে ‘U’ হবে।
তা ছাড়া নামের অংশ হিসেবে একই নামে ‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আহমাদ’ একত্র না করা চাই। যেমন- মুহাম্মাদ আহমাদ, মুহাম্মাদ হুসাইন আহমাদ। এখানে ‘মুহাম্মাদ’ বাদ দিয়ে শুধু ‘হুসাইন আহমাদ’ ব্যবহার করা অথবা ‘আহমাদ’ বাদ দিয়ে ‘মুহাম্মাদ হুসাইন’ ব্যবহার করাই শ্রেয়।
©শুদ্ধচর্চা