কুরআনের দুআগুলো আমাকে বেশ আশ্চর্যান্বিত করে। যেন সেগুলো তাকওয়া, তাওয়াক্কুল আর ঈমানের জোয়ারে টইটম্বুর। ঠিক এমনই একটা দুআর দেখা মিলে সূরা আল-বাকারায়, যা আল্লাহর কাছে করেছিলেন আমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম।
পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে যখন তিনি কা’বার ভিত্তিপ্রস্তর পুনরায় স্থাপন করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি এই দুআটা করেন।
দুআটার ভেতরে যাওয়ার আগে আমি আপনাদের একটা দৃশ্যের সামনে দাঁড় করাতে চাই। ধরা যাক বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসকের কাছ থেকে আপনাকে একটা কাজ দেওয়া হলো। কাজটা হলো—তারা নির্মাণ করবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দালান, যা হার মানাবে বুর্জ আল-খলিফাকেও! মহা এই কাজের দায়িত্ব দুনিয়ার আর কেউ নয়, পেয়ে গেছেন আপনি!
এমন একটা কাজের মহা-দায়িত্ব যদি আপনি আজ রাতে পেয়ে যান, ভাবুন তো আপনার চারপাশে কেমন হইচই পড়ে যাবে? আপনার ফেইসবুক-ইন্সটাগ্রাম-টুইটারসহ সকল সোশ্যাল মিডিয়ায় কী অভাবনীয় কাণ্ড ঘটবে, তা কি আপনি ভাবতে পারেন? এই ঘটনা যখন আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় জানাবেন, তখন লাখ লাখ মানুষ আপনাকে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা জানাবে। রাতারাতি আপনি হয়ে যাবেন মহা-সুপারস্টার! আপনার পা তখন আর মাটিতে থাকবে না।
এমনই এক মহা-প্রজেক্টের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। প্রায়-বিলীন হয়ে যাওয়া পৃথিবীর সর্বপ্রথম গৃহ কা’বাকে পুনরায় নির্মাণের এক মহা-দায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অর্পণ করেছেন তাঁর ওপর। সেই দায়িত্বে যখন তিনি হাত লাগালেন, তখন নিজের পুত্রকে সাথে নিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে হাত তুলে বললেন :
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنۡتَ السَّمِيۡعُ الْعَلِيۡمُ ١٢٧
“হে আমাদের প্রতিপালক! (এই কাজটাকে) আপনি আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞ।”
পৃথিবীর সবচেয়ে হাই-রেইজ বিল্ডিংয়ের ভিত্তিপ্রস্তর যখন স্থাপন করতে যাবেন, তখন নিশ্চয় মুহুর্মুহু ক্যামেরার ক্লিকে বন্দী হয়ে পড়বেন আপনি। সেলফিতে, ফটোতে, ভিডিওতে দুনিয়ার সকলকে জানাতে আপনি মরিয়া হয়ে উঠবেন যে—কী বিরল সম্মানের অধিকারী আপনি হয়েছেন!
আপনি লিখবেন—‘Yes, I've done it! Hurrr re...’
পত্রিকাগুলো আপনাকে নিয়ে ফিচার ছাপবে, চ্যানেলগুলো আপনাকে নিয়ে সিরিজ-প্রোগ্রামের আয়োজন করবে। সবকিছুকে ঘিরে আপনার তখন সে কী উন্মাদনা!
কিন্তু কা’বা, যেটা দুনিয়ার সবচাইতে সম্মানিত এবং পবিত্র ইবাদাত-গৃহ, সেই গৃহের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দায়িত্ব পেয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উন্মত্ত উল্লাসে ফেটে পড়েননি। তিনি মক্কা থেকে মিশরে এসে তাঁর কওমকে জানাননি যে—‘জানো, আমি কিন্তু কা’বা গৃহ নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছি! কা’বা গৃহ কি তোমরা জানো? সেটা হলো আল্লাহর পবিত্র ঘর! দুনিয়ার বুকে নির্মিত সর্বপ্রথম ইবাদাত-গৃহ!’
এমন সম্মানের অধিকারী হয়ে তিনি মিশরে মাস-ব্যাপী মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজনে মত্ত হয়ে যাননি। তিনি দুনিয়া-ব্যাপী ঘোষণা দেননি তার অর্জনের। বরং দায়িত্বটা পেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে হাত তুলে বললেন যেন মহামহিম রব তার কাজটাকে কবুল করে নেন।
কিন্তু এখানে কবুল করার প্রশ্নটা এলো কেন? এই কাজের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই তো ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে মনোনীত করেছেন। এই দায়িত্ব আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাঁর ওপর অর্পণ করেছেন। তিনি যদি তাঁকে ‘যোগ্য’ মনে না-ই করতেন, তাহলে দায়িত্বটা তো তাঁকে দিতেন না। তবে কেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কাজটা করতে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করে, কাতর গলায় বললেন—‘আল্লাহ, আমাদের পক্ষ থেকে কাজটাকে আপনি কবুল করে নিন’?
এটাই হচ্ছে বিনয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম খুব ভালো করেই জানেন যে—আল্লাহর সাহায্য আর দয়া না থাকলে এই কাজ তিনি কোনোদিনও সমাপ্ত করতে পারবেন না। এই কাজ করার যে যোগ্যতা তাঁর মাঝে আছে, তার পুরোটাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রদত্ত। তিনি নিজ থেকে কোনোকিছুই করার ক্ষমতা রাখেন না। এবং যেহেতু তিনি মানুষ, তাই কাজটা করতে গিয়ে তাঁর ভুলত্রুটি হতে পারে। সমস্ত ত্রুটিকে, সমস্ত ভুলকে ক্ষমা করে দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন তার কাজটাকে কবুল করেন এটাই তাঁর আর্জি।
যে শাসক আপনাকে দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু দালান নির্মাণের দায়িত্ব দেন, তার সামনে গিয়ে আপনি কি এটা কখনোই বলবেন যে—‘আপনার কাজটা করতে গিয়ে আমার খানিকটা এদিক-সেদিকও হতে পারে। আপনাকে হান্ড্রেড পার্সেন্ট কাজ বুঝিয়ে দিতে পারবো—এমন কোনো কথা নেই কিন্তু।’
আপনি এভাবে বলেন না। আপনি জানেন এভাবে বলতে গেলে দুনিয়ার মানুষেরা আপনার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠাবে। তাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধবে আপনার যোগ্যতা নিয়ে। তাদের সামনে আপনাকে থাকতে হয় প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। আপনাকে বলতে হয়—‘এই টাইপ কাজ তো আমি কতো অনায়াসেই করে ফেলি। আমার অমুক প্রেজেক্ট দেখেন, তমুক প্রজেক্টের ব্যাপারে খোঁজ নেন দরকারে।’
বসের কাছে নিজের এক্সেলেন্সি প্রমাণে আপনি তখন মরিয়া হয়ে উঠবেন। কোনো কাজ শুরুর পূর্বে অথবা শুরু করতে গিয়েই যদি আপনি নিজের পক্ষ থেকে সামান্য ত্রুটির আশঙ্কাও প্রকাশ করে ফেলেন, দুনিয়ার কোনো বস-ই সেটাকে ভালোভাবে গ্রহণ করবে না।
কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে ব্যাপারটা পুরোপুরিই অন্যরকম। আপনার সমস্ত অক্ষমতা, অদক্ষতা, অপারগতা আর কেউ জানুক বা না-জানুক, আল্লাহর কাছে তা কি আদৌ কোনোভাবে গোপন থাকে? তিনি অবশ্যই জানেন যে আপনার আসলে বড়াই করার মতো কোনো যোগ্যতা নেই। আপনি যেটাকে নিজের ‘যোগ্যতা’ ভাবেন, তা আসলে আল্লাহর ‘দয়া’। তিনি দয়া করেন বলেই আপনি কাজটা ভালো পারেন।
আল্লাহর এই অনুগ্রহকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অনুভব করেছিলেন বলেই পবিত্র কা’বা ঘর নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েও তিনি অহংকারে ফেটে পড়ার বদলে বিনয়াবনত হয়েছিলেন। ওই একই দুআয় তিনি বলেছিলেন—‘নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’
বান্দার সকল কাজে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার যে নিরন্তর তদারকি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো বিষয়ই যে আল্লাহর কাছে গোপন করা যায় না, এতো বড় সম্মানের অধিকারী হওয়ার পরেও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর এই গুণের কথা ভুলে বসেননি। কোনো কাজে আপনি কতোটুকু হেলাফেলা করেন তা কেবল নয়, হেলাফেলা করার ভাবনা যখন আপনার অন্তরে উদয় হয়, ওই ভাবনাটাও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে গোপন থাকে না।
আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবী—স্বীকৃতি লাভের পর আনন্দের আতিশয্যে যেখানে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, সেখানে নবি-রাসূলগণ কী সুন্দর সংযম আর বিনয়ের দীক্ষাই না আমাদের দিয়ে গেলেন!
'কুরআন থেকে জীবনের পাঠ' বই থেকে নেওয়া টুকরো অংশ।
©আরিফ আজাদ
The Guidance
Color Your Life With Deen
04/02/2025
‘ভুলে যাওয়া’
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার এক বিশেষ নেয়ামত। তিনি যদি আমাদের এই নিয়ামত না দিতেন, বেঁচে থাকাটা যে কী ভীষণ দুঃসহ হয়ে উঠত তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
প্রিয় কোন মানুষ যখন মারা যায়, প্রথম কিছুদিন আমাদের অসম্ভব খারাপ লাগে। সারাটা দুনিয়াটাকেই কেমন রঙহীন, বিস্বাদ আর বিরক্ত লাগে কিছুদিন।
কিন্তু, সময় যত গড়ায়, আমরা আস্তে আস্তে সেই শোক আর ক্ষতটা সেরে উঠি। সময়ের সাথে সাথে প্রিয় মানুষের স্মৃতিগুলোও ধূসর হতে থাকে আমাদের মানসপটে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যদি আমাদেরকে এই ‘ভুলে যাওয়ার’ ক্ষমতাটুকুনা দিতেন, ভাবুন তো কেমন হতো আমাদের জীবনটা? একবার শুধু চিন্তা করুন, আপনার মা মারা যাওয়ার দিন যে কষ্ট আপনার অনুভূত হবে, পাঁচবছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি আপনার ঠিক একইরকম কষ্ট লাগে, আপনি কি আদৌ বেঁচে থাকতে পারবেন?
আবার, ভবিষ্যত না জানাও একরকম নিয়ামত।
ধরুন, আজ রাতে যদি কোনোভাবে আপনি জেনে যান যে, আপনার ফুটফুটে সন্তানটা আগামি বছরের ঠিক আজকের দিনটায় মারা যাবে, আপনার দ্বারা কি সম্ভব হবে আজ থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে যাওয়া? আপনি কি খেতে পারবেন ঠিক মতো? ঘুমোতে পারবেন এই ভবিষ্যত জেনে নিয়ে?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত প্রত্যেকটা বিষয় এমনই হিকমাহপূর্ণ। তিনি যখন বান্দাকে কোনোকিছু দেন না বা জানান না, সেটা বান্দার কল্যাণের জন্যেই৷ আবার, তিনি যখন বান্দাকে কোনোকিছু ভুলিয়ে দেন, সেটাও বান্দার কল্যাণের জন্যেই।‘ভুলে যাওয়া’ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার এক বিশেষ নেয়ামত। তিনি যদি আমাদের এই নিয়ামত না দিতেন, বেঁচে থাকাটা যে কী ভীষণ দুঃসহ হয়ে উঠত তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
প্রিয় কোন মানুষ যখন মারা যায়, প্রথম কিছুদিন আমাদের অসম্ভব খারাপ লাগে। সারাটা দুনিয়াটাকেই কেমন রঙহীন, বিস্বাদ আর বিরক্ত লাগে কিছুদিন।
কিন্তু, সময় যত গড়ায়, আমরা আস্তে আস্তে সেই শোক আর ক্ষতটা সেরে উঠি। সময়ের সাথে সাথে প্রিয় মানুষের স্মৃতিগুলোও ধূসর হতে থাকে আমাদের মানসপটে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যদি আমাদেরকে এই ‘ভুলে যাওয়ার’ ক্ষমতাটুকুনা দিতেন, ভাবুন তো কেমন হতো আমাদের জীবনটা? একবার শুধু চিন্তা করুন, আপনার মা মারা যাওয়ার দিন যে কষ্ট আপনার অনুভূত হবে, পাঁচবছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি আপনার ঠিক একইরকম কষ্ট লাগে, আপনি কি আদৌ বেঁচে থাকতে পারবেন?
আবার, ভবিষ্যত না জানাও একরকম নিয়ামত।
ধরুন, আজ রাতে যদি কোনোভাবে আপনি জেনে যান যে, আপনার ফুটফুটে সন্তানটা আগামি বছরের ঠিক আজকের দিনটায় মারা যাবে, আপনার দ্বারা কি সম্ভব হবে আজ থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে যাওয়া? আপনি কি খেতে পারবেন ঠিক মতো? ঘুমোতে পারবেন এই ভবিষ্যত জেনে নিয়ে?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত প্রত্যেকটা বিষয় এমনই হিকমাহপূর্ণ। তিনি যখন বান্দাকে কোনোকিছু দেন না বা জানান না, সেটা বান্দার কল্যাণের জন্যেই৷ আবার, তিনি যখন বান্দাকে কোনোকিছু ভুলিয়ে দেন, সেটাও বান্দার কল্যাণের জন্যেই।
© লেখক আরিফ আজাদ
01/02/2025
ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষক দেব চৌধুরী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) রাজধানীর দারুসসালাম শাহী মসজিদে জুমার নামাজের সময় কালেমা শাহাদাহ পাঠ করে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। দারুসসালাম মসজিদের খতিব আবদুল হাই মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ তাকে শাহাদাহ পাঠ করান।
শাহাদাহ পাঠের পর মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। অনেকে তাকে আলিঙ্গন করেন এবং উপহার হিসেবে ফুল ও পোশাক দেন। দেব চৌধুরী বলেন, "আমি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় আজ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছি। আমি আরবি পড়তে পারি না, তবে আমার ঘরে কোরআনের বাংলা অনূদিত তিনটি কপি রয়েছে।"
গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে ফোন করা হলে তিনি জানান, "জি, আলহামদুলিল্লাহ, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।"
ক্রিকেটার শাহরিয়ার নাফিস তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেবকে ইসলামে স্বাগত জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, "আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন। আল্লাহ আপনার পথচলা সহজ করে দিন। আল্লাহ আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন। আমিন।"
দেব চৌধুরী সবশেষ অলরাউন্ডার নামের একটি ক্রীড়া বিষয়ক অনলাইন পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবে তার সরব উপস্থিতি রয়েছে।
#আলহামদুলিল্লাহ
25/01/2025
#ইসলামের মূল্যবোধ
17/01/2025
#আলহামদুলিল্লাহ দীর্ঘ ১৫ মাস পর গাজায় যুদ্ধবিরতি!
মুক্তবাতাসে আগামীর যুদ্ধারা.....
16/01/2025
আসসালামু আলাইকুম।
উপদেশ
বিদ্যায় ত্রুটি জাতির ধ্বংস - ১
আল্লাহ বলেন, وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا ‘হে নবী! আপনি বলুন, হে আমার প্রতিপালক! আমার বিদ্যা বেশী করে দাও’ (ত্বা-হা ১১৪)। অত্র আয়াত প্রমাণ করে বিদ্যা আল্লাহর নিকট চাইতে হবে। তিনি আরো বলেন,فَاعْلَمْ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ ‘অতঃপর আপনি জেনে নিন যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই এবং আপনার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন’ (মুহাম্মাদ ১৯)। আল্লাহকে কিছু বলতে হলে প্রথমে বিদ্যা অর্জন করতে হবে। তিনি অন্যত্র বলেন, الرَّحْمَنُ، عَلَّمَ الْقُرْآنَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ، عَلَّمَهُ الْبَيَانَ ‘রহমান। তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সবকিছুর বিবরণ শিক্ষা দিয়েছেন’ (রহমান ১-৪)। অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন, فَاسْأَلُوْا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لاَ تَعْلَمُوْنَ ‘তোমরা জ্ঞানী মানুষের নিকটে জিজ্ঞেস কর যদি তোমাদের জানা না থাকে’ (আম্বিয়া ৭)। তিনি আরো বলেন, اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ، اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ، الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ، عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ‘পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন জমাট বাধা রক্তপিন্ড হতে। আপনি পড়ুন, আপনার প্রতিপালনক সম্মানিত। যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষ যা জানত না’ (আলাক্ব ১-৫)। অন্যত্র তিনি বলেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ ‘হে নবী! আপনি বলুন, অন্ধব্যক্তি ও চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর না কেন?’ (আন‘আম ৫০)। অত্র আয়াত প্রমাণ করে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিদ্যায় আল্লাহর পরিচয় দিয়ে আরম্ভ হয়েছে। এ আয়াতে বিদ্বানকে চক্ষু ওয়ালার সাথে এবং অশিক্ষিত মানুষকে অন্ধ ব্যক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُو الْأَلْبَابِ ‘হে নবী! আপনি বলুন, যারা জ্ঞানী আর যারা জ্ঞানী নয় তারা কি সমান? নিশ্চয়ই জ্ঞানী মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে’ (যুমার ৯)। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيْرُ، وَلاَ الظُّلُمَاتُ وَلاَ النُّوْرُ، وَلاَ الظِّلُّ وَلاَ الْحَرُوْرُ، وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلاَ الْأَمْوَاتُ ‘অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান হতে পারে না। অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে না। ছায়া ও রোদ সমান হতে পারে না। আর জীবিত ও মৃত সমান হতে পারে না’ (ফাতির ১৯-২২)। অত্র আয়াতে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত মানুষের মাঝে চারটি পার্থক্য দেখানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلاَّ الْعَالِمُوْنَ ‘সেসব দৃষ্টান্তগুলি আমি মানুষের জন্য পেশ করেছি। যারা জ্ঞানী একমাত্র তারাই ঐসব দৃষ্টান্ত জানবে ও বুঝবে’ (আনকাবূত ৪৩)। অন্যত্র তিনি আরো বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা আলেম তারাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী বড় ক্ষমাশীল’ (ফাতির ২৮)।
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَضْلُ الْعِلْمِ خَيْرٌ مِنْ فَضْلِ الْعِبَادَةِ وَخَيْرُ دِيْنِكُمُ الْوَرَعُ.
হুযায়ফ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ইলমের মর্যাদা ইবাদতের মর্যাদার চেয়ে অনেক বেশী। আর তোমাদের উত্তম দ্বীন হল পরহেযগারিতা’ (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১০০)।
عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَسَّالِ الْمَرَادِي رضي الله عنه قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ متكىء على برد له أحمر فَقُلْتُ لَهُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنِّيْ جِئْتُ أَطْلُبُ الْعِلْمَ فَقَالَ مَرْحَبًا بِطَالِبِ الْعِلْمِ إِنَّ طَالِبَ الْعِلْمِ تحفه الملائكة بأجنحتها ثم يركب بعضهم بعضا حتى يبلغوا السماء الدنيا من محبتهم لما يطلب.
ছাফওয়ান ইবনু আসসাল (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আসলাম, তখন তিনি লাল চাদর গায়ে দিয়ে হেলান দিয়ে মসজিদে বসে ছিলেন। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি ইলম অর্জন করতে এসেছি। তিনি বললেন, ইলম অর্জনকারীর জন্য স্বাগতম। নিশ্চয়ই ইলম অর্জনকারীকে ফেরেশতাগণ তাদের ডানা দ্বারা ঘিরে থাকেন। অতঃপর তারা পরস্পর ঘিরে আকাশের দিকে যেতে থাকে। এমনকি ইলম অর্জনকারীর ভালবাসায় তারা প্রথম আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়’ (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১০৫)।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَقُولُ الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلاَّ ذِكْرَ اللهِ وَمَا وَالاَهُ وَعَالِمًا وَمُتَعَلِّمًا.
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘পৃথিবী অভিশপ্ত। আর এতে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত। তবে আল্লাহর যিকির এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির করে তারা অভিশপ্ত নয়। আর আলেম ও যারা ইলম অর্জন করে তারা অভিশপ্ত নয়’ (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১১৪)।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً وَحَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنْ النَّارِ-
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমার পক্ষ হতে মানুষকে পৌঁছাতে থাক, যদিও একটি আয়াত হয়। বানী ইসরাঈলের নিকট হতে শুনা কথা বলতে পার, এতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে প্রস্ত্তত করে নেয়’ (বুখারী, মিশকাত হা/১৮৮)।
عَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّيْنِ وَإِنَّمَا أَنَا قَاسِمٌ وَاللهُ يُعْطِي-
মু‘আবিয়া (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দ্বীনের সুষ্ঠু জ্ঞান দান করেন। আর আমি নিছক বণ্টনকারী এবং দান করেন আল্লাহই’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯০)।
عَنِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ حَسَدَ إِلاَّ فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٍ آتَاهُ اللهُ مَالاً فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ الْحِكْمَة فَهُوَ يقْضِيْ بهَا وَيُعَلِّمُهَا-
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘দুই ব্যক্তি ব্যতীত কেউ ঈর্ষার পাত্র নয়। প্রথম ব্যক্তি যাকে আল্লাহ ধন দান করেছেন এবং সাথে সাথে তাকে তা সত্যের পথে বা সৎকাজে ব্যয় করার প্রবল মনোবলও দান করেছেন এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা‘আলা হিকমত দান করেছেন আর সে তাকে কাজে লাগায় এবং (লোকদের) শিক্ষা দেয়’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ,মিশকাত হা/১৯২)।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةِ، إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ-
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল (ও তার ছওয়াব) বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমল (এগুলির ছওয়াব বন্ধ হয় না), (১) ছাদাক্বায়ে জারিয়া, (২) ইলম-যার দ্বারা (লোকের) উপকার সাধিত হয় এবং (৩) সুসন্তান- যে তার জন্য দো‘আ করে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৩)।
আদর্শ মুসলিম পরিবার
জ্ঞান ও অনুভূতির সম্পর্ক
একথা সর্বজন স্বীকৃত যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো শেষ নেই। প্রতিদিন নিত্য নতুন জ্ঞান বিজ্ঞানের আবিষ্কার, উন্নতি অগ্রগতি আর অগ্রযাত্রা চলছে। পৃথিবীর মানুষ আজীবন জ্ঞান বিজ্ঞানের পিছনে লেগেই আছে, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের অনুসন্ধান চলছেই। এজন্যই বলা হয় ‘জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানের অনুসন্ধান করতে হবে’। কিন্তু মানুষের আবেগ অনুভূতি ও বিবেকের রয়েছে একটি সীমারেখা ও পরিধি। মানুষের বয়সের স্তর অনুযায়ী তার আবেগ-অনুভূতি ও বিবেক হয়ে থাকে। এ জন্য মানুষের আবেগ অনুভূতি আর বিবেকটাই জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং তা‘লীম-তরবিয়তের মূলভিত্তি হয়ে থাকে। এমনকি তার আখলাক-চরিত্র, আকিদা-বিশ্বাস ও মূল্যবোধ নির্ভর করে তার বিবেক ও আবেগ অনুভূতির ওপর। এজন্য জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও বিবেকের সাথে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিশুদের তা‘লীম-তরবিয়ত ও শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে এ বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এমনকি কুরআন শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে এ বিষয়ের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শিশুদের বয়সের স্তর অনুযায়ী এবং তাদের আত্মিক ও মানসিক যোগ্যতা-নুযায়ী তা‘লীম- তরবিয়ত ও শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্যই বলা হয় ‘স্থান ও কাল অনুযায়ী বক্তব্য হয়ে থাকে’।
মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও বিবেকের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পর্ককে বাস্তব একটি উদাহরণের সাথে ব্যাখ্যা করতে পারি যে, কীভাবে মানুষের অনুভূতির ওপর তার অর্জিত বা তার ওপর পতিত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষা প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, আমাদের সমাজের ধর্মীয় জ্ঞান-প্রদানের অবস্থা বা পদ্ধতি হচ্ছে শিশুদেরকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার সময় প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমেই তাকে কুরআনের ৩০তম পারাকে এলোমেলো ও অপরকল্পিতভাবে শিখতে দেওয়া হয়। তারা মনে করে ৩০তম পারার সূরাগুলো ছোট ছোট হওয়ার কারণে সহজেই শিশুরা মুখস্ত ও আত্মস্থ করতে পারবে। অথচ তারা অন্য দিকটি খেয়াল করে নি যে, শিশুর আবেগ-অনুভূতি ও বিবেক কতটুকু হয়েছে, সে ভালোভাবে কথাই বলতে পারছে না। আর কুরআনের ৩০তম পারার অধিকাংশ সূরা ইলমে গায়েব ও আকীদা সংক্রান্ত মক্কী সূরা, সেগুলো কীভাবে শিশুরা তার ক্ষুদ্র বিবেক দিয়ে অনুধাবন করতে পারবে। এজন্য শিশুদেরকে তার বিবেক অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতিতে পবিত্র কুরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করতে হবে।
পবিত্র কুরআনের ৩০তম পারার মক্কী সূরাগুলোতে অধিকাংশ আয়াতেই কাফির, মুশরিক, সীমা লঙ্ঘনকারী হঠকারী ও আল্লাহ রাসূল ও কুরআন তথা অদৃশ্য জ্ঞানের অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের অস্বীকার ও হঠকারিতার ইহকালীন পরিণাম আল্লাহর ‘আযাব, গযব ও শাস্তি এবং পরকালীন ভয়াবহ পরিণাম জাহান্নামের কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অত্যন্ত সাবলীল ও অলংকৃত ভাষার মাধ্যমে তাদের হঠকারিতা আর সীমালঙ্ঘনের প্রতি ধমক ও ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে। যেগুলো একজন বিবেকবান ব্যক্তির জন্যও সহজসাধ্য নয়। প্রাপ্ত বয়স্কদেরকে শিক্ষা প্রদানের প্রয়োজন, তাদের সামনে কাফির মুশরিক ও সীমালঙ্ঘনকারীদের পরিণাম তুলে ধরার প্রয়োজন। যাতে তারা সে বিষয়গুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করে সেখানে গভীর চিন্তা, ধ্যান-ধারণা ও গবেষণা করতে পারে। নিজেকে এ ভয়াবহ পরিণাম আল্লাহর ‘আযাব, গযব ও শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে। নিজেদের কল্যাণের পথ বেছে নিতে পারে।
কিন্তু যদি কুরআনের বর্ণিত কাফির মুশরিক ও সীমালঙ্ঘন কাফেরদের অবস্থা, তাদের শাস্তি, আযাব ও গযব এবং তাদের সম্পর্কে ভয়-ভীতি ও আতঙ্কের বক্তব্যটি ছোট শিশুদের অনুধাবন তো দূরের কথা, যে ভালোভাবে কথা বলতে পারছে না, সে কীভাবে কুরআনের এ বক্তব্যটি অনুধাবন করতে পারবে, কীভাবে আল্লাহর এ ডাকে সাড়া দিবে। বরং তার সামনে এ বক্তব্যটি তুলে ধরলে বা শিক্ষা দিলে শিশুর হৃদয়ে ভয়-ভীতি আর ত্রাসের সঞ্চার হবে। তার আত্মিক ও মানসিক অনুভূতি হ্রাস পাবে। তার বিবেক বুদ্ধি, বীরত্ব ও সাহসিকতা ধ্বংস হয়ে যাবে। তার ভেতরে চেতনা ও উদ্ভাবনী শক্তি জন্মাবে না। তার পুরো জীবনটাই ভীতির সন্মুখীন হয়ে যাবে। সে না পারবে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করতে, না পারবে স্বয়ং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে। না পারবে পরকালে মুক্তির জন্য পুঁজি সংগ্রহ করতে, অথচ আল্লাহ মুমিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন জান্নাতে যাওয়ার জন্য। যদিও সে চুরি করে, ব্যভিচার করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، دَخَلَ الْجَنَّةَ " قَالَ: قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: " وَإِنْ زَنَى، وَإِنْ سَرَقَ " قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى، وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: " وَإِنْ زَنَى، وَإِنْ سَرَقَ " قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى، وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: " وَإِنْ زَنَى، وَإِنْ سَرَقَ عَلَى رَغْمِ أَنْفِ أَبِي الدَّرْدَاءِ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিল, তার সাথে কাউকে শরীক করল না, সে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। আবূ দারদা বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, যদি চুরি করে এবং যদি সে ব্যভিচার করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, যদিও সে চুরি করে, যদিও সে ব্যভিচার করে। আমি আবারও বললাম, যদিও সে চুরি করে, যদিও সে ব্যভিচার করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদিও সে চুরি করে, যদিও সে ব্যভিচার করে। আমি আবার বললাম, যদিও সে চুরি করে, যদিও সে ব্যভিচার করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদিও সে চুরি করে যদিও সে ব্যভিচার করে। যদিও আবূ দারদার তা অপছন্দ”।[1] কারণ, আল্লাহ তার বান্দার আমলসমূহ সামগ্রিকভাবে বিচার করবেন। শুধুমাত্র পাপের বিচারই করবেন না, বরং পাপ-পুণ্য উভয়ের হিসাব নিবেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কুরআনে বলেন,
﴿إِنَّ ٱلۡحَسَنَٰتِ يُذۡهِبۡنَ ٱلسَّئَِّاتِۚ ذَٰلِكَ ذِكۡرَىٰ لِلذَّٰكِرِينَ ١١٤﴾ [هود: ١١٤]
“পূণ্যকাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়, যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটা এক মহা স্মারক”। [সূরা হূদ, আয়াত: ১১৪]
হতে পারে অমুক মানুষেরই তার পাপ কর্ম পুণ্য কাজের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে, সে শাস্তি ভোগ করবে। হতে পারে অনেক মানুষেরই পুণ্য কাজ পাপ কর্মের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। সে জান্নাতে শান্তিতে বসবাস করবে। এজন্য শিশুদেরকে শিশু বয়সে কুরআনের এ ধরনের ভীতিমূলক বক্তব্য ও তা‘লীম-তরবিয়ত প্রদান তার দায়িত্ব-অনুভূতি হ্রাস করে পাপ কাজের প্রতি ধাবিত করে ফেলতে পারে। এজন্য শিশুদেরকে এ ধরনের ভীতিমূলক নেতিবাচক বক্তব্য শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদেরকে কাফির মুশরিক আর সীমালঙ্ঘনকারীদের ‘আযাব-গযব আর শাস্তির কথা এবং তাদের সম্পর্কে ধমক ও ভীতির কথা শোনানোর প্রয়োজন নেই, বরং তাদের বয়সের স্তর ও বিবেক-অনুভূতি অনুযায়ী তা‘লীম-তরবিয়ত প্রদান ও ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে।
সুতরাং বাবা-মা অভিভাবক ও মুরব্বীদের উচিৎ ও কর্তব্য হচ্ছে যে, তাদের সন্তান-সন্ততিদের তা‘লীম-তরবিয়ত ও জ্ঞান শিক্ষার ব্যাপারে আল-কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাসূলের আদর্শ ও দিক নির্দেশনাকে অনুসরণ করতে হবে। সে মূলনীতি ও দিক নির্দেশনার আলোকে তাদের সন্তানদের বয়সের স্তর ও বিবেক-অনুভূতি অনুযায়ী জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করতে হবে। এ হিসেবে শিশুদের সামনে ধর্ম ও আল কুরআনের সেসব অংশ ও আয়াত শিখাতে হবে, যেসব আয়াত ও অংশ তাদের অনুভূতি ও বিবেক সমর্থন করতে পারে, অনুধাবন করতে পারে। তাদের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আল্লাহ ও তার রাসূলের ঈমান, বিশ্বাস এবং ইসলাম ও রাসূলের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে, সেসব আয়াত প্রথমে তাদেরকে শিখাতে হবে। তারপর যখন শিশু তার বয়সের দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছে যাবে, মোটামুটি ভালোমন্দ পার্থক্য করতে পারবে, তখন তাকে ভালো কাজের আদেশ, খারাপ কাজের নিষেধ এবং সাধারণ ছোটখাটো পাপ করা যেমন মিথ্যা বলা, অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার করা ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা ও ভালো কাজের অনুপ্রেরণা দানকারী আয়াত ও সূরাসমূহ শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তার হৃদয়ে কোনো ভয়ভীতির সঞ্চার না হয়ে ভালো কাজের প্রতি নিজেকে অভ্যস্ত করতে পারে। তারপর যখন বয়সের তৃতীয় স্তরে পৌঁছাবে, তখন তাকে বড় বড় পাপ কাজ ও অশালীন আচার ব্যবহার থেকে বিরত রাখা, নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কীয় আয়াত এবং কোনো কারণে ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে মা প্রার্থনা, তাওবা-ইস্তেগফার ও আল্লাহর রহমত কামনামূলক আয়াতগুলো শিক্ষা দিতে হবে; যাতে তার মধ্যে কোনো সন্ত্রাসমূলক প্রভাব বিস্তার না হয় এবং তার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হতে পারে। তারপর যখন শিশু প্রাপ্ত বয়সে পরিণত হবে, তখন তার সামনে তার দায়িত্ব-কর্তব্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কীয় আয়াত এবং দায়িত্ব অনুভূতিতে ফাঁকি দিলে বা যথাযথভাবে আদায় না করলে তার পরিণতি ও আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি ‘আযাব গযব ইত্যাদি সম্পর্কীয় আয়াত ও সূরাগুলো শিক্ষা দিতে হবে; যাতে একটি শিশু সার্বিক দিক দিয়ে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সচেতনতামূলক মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠতে পারে। যেমনি-ভাবে গড়ে তুলেছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবিদেরকে তথা গোটা আরব জাতিকে। তারা তাদের নিজেদেরকে গঠন করে তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও যোগ্যতা দিয়ে যথাযথভাবে বীরত্বের সাথে দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছিলেন।
শিশুদের তা‘লীম-তরবিয়ত, শিক্ষা-দীক্ষা, সভ্যতা-সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক একটি বিষয়, যার মাধ্যমে শিশুদেরকে সঠিক ইমান আকিদা, আখলাক-চরিত্র, ধর্ম-বিশ্বাস এবং আত্মিক-মানসিক ও জৈবিক বিকাশ সাধন করা যায়। এজন্য শিশুদের আত্মিক ও মানসিক বিকাশ এবং তা‘লীম-তরবিয়ত ও জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ সর্বক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোমল ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী তাদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে। তাহলেই তাদের থেকে ভয়ভীতি, ত্রাসসহ সকল প্রকার নেতিবাচক প্রভাব দূরীভূত হয়ে সম্মান-মর্যাদা, বীরত্ব, ইতিবাচক প্রভাব ও কোমল মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠবে এবং সমাজের দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করবে।
এজন্য আমাদেরকে অবশ্যই শিশুদের তা‘লীম-তরবিয়তের ক্ষেত্রে তাদের বিবেক অনুভূতির সাথে জ্ঞানের সম্পর্ককে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে। এমনকি কুরআন শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সে বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখা। তার বয়সের স্তর অনুযায়ী এবং আত্মিক ও মানসিক যোগ্যতা ও বিবেক অনুপাতে প্রথমে আল্লাহ ও তার রাসূলের ভালোবাসা, দেশ-জাতির মহব্বত, ইমান-বিশ্বাস, আকিদা সম্পর্কীয় আয়াত ও সুরাগুলো শিক্ষা দেওয়া। তারপর তাকে উত্তম আমল-আখলাক, ভালো-মন্দ ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। তারপর তাকে তার ওপর অর্পিত দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে এবং দায়িত্ব কর্তব্য অনাদায়ে তাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি, গযব সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শনমূলক আয়াত ও সূরাগুলো শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে একটি শিশু তার আত্মিক ও মানসিক যে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব এবং ভয়ভীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে নিজেকে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন সঠিক মুমিন মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। দেশ জাতি ও মুসলিম উম্মাহ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে।
এভাবে যদি প্রতিটি বিষয়ে তা‘লীম-তরবিয়ত, সভ্যতা-সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান-সহ সবকিছুই শিশুদের বয়সের স্তর অনুযায়ী এবং তাদের বিবেক-বুদ্ধি-অনুভূতি শক্তি অনুযায়ী প্রদান করা হয় তাহলে প্রতিটি শিশু আত্মিক ও মানসিকসহ সার্বিক বিষয়ে ইতিবাচক যোগ্যতা ও প্রভাব নিয়ে বেড়ে উঠবে। এটিই হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত শিশু শিক্ষা ও তা‘লীম-তরবিয়তের মূল ভিত্তি ও লক্ষ্য। সে বিষয়টি আমাদেরকে ভালো ও গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। শিশু-শিক্ষা তথা আমাদের তা‘লীম-তরবিয়তের কারিকুলাম ও সিলেবাস দেশ-জাতি, গোত্র-বংশ নির্বিশেষে সকলের জন্য বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে নারী-পুরুষ, জাতি-গোষ্ঠী উত্তম, অধম ইত্যাদির কোনো ভেদাভেদ নেই, সকলেই ভাই ভাই একই আদমের সন্তান, সকলেই মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের সৈনিক।
এজন্য মুসলিম উম্মাহ ও সকল জাতি গোষ্ঠীর অভিভাবক, মুরুব্বী, চিন্তাবিদ গবেষক, শিক্ষক, সংস্কারক ও পরিশোধকদের ব্যক্তিগতভাবে ও যৌথভাবে এবং সংগঠন ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিশু বিষয়ক তা‘লীম-তরবিয়ত ও শিক্ষা-দীক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুসলিম উম্মাহ ও জাতির শিশুদের আত্মিক মানসিক ও মৌলিক বিকাশ ঘটিয়ে তাদের শক্তিশালী করে মুসলিম উম্মাহ ও জাতির ভিত্তি মজবুত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সর্ব মহলে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
তেমনিভাবে মুসলিম উম্মাহ ও জাতির মুরুব্বী চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিবিদ, সংস্কারক, সংস্কারক ও চিন্তাবিদদেরকে সাধারণ শিক্ষক, সাধারণ প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা-মক্তব ও পরিবারকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের জন্য সঠিক ঈমান আকিদা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, আমল-আখলাক ইত্যাদি বিষয়ে বই পুস্তক প্রকাশসহ আদব-শিষ্টাচারের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সঠিকভাবে ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। একজন ব্যক্তিকে যখন সঠিক ঈমান আকিদা-আখলাক-চরিত্র ও সভ্যতা-সংস্কৃতির মাধ্যমে সংশোধন করা যাবে, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসহ গোটা সমাজ এমনিতেই সংশোধন হয়ে যাবে। ইসলামের ভিত্তি মজবুত হয়ে যাবে। সকলেই তখন সঠিক ইসলামী মূল্যবোধ, মূলনীতির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিবে।এমনকি তখন মানুষের কথার সাথে কাজের মিল থাকবে। তাদের চিন্তা-চেতনার সাথে বাস্তবতার সম্পর্ক থাকবে। সকলেই একযোগে সাহায্য সহযোগিতা আর পরামর্শ-ভিত্তিক সামাজিক কাজ শুরু করে দেবে। তখনই বলিষ্ঠ, যোগ্যতাসম্পন্ন, সম্মানিত মুমিন মুসলিম নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে। আল্লাহ আমাদের এক সাথে কাজ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
[1] মুসনাদে ইমাম আহমদ, হাদীস নং ২৭৪৯১
Al-Baqarah 2:4
وَٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِٱلْءَاخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
And who believe in what has been revealed to you, [O Muhammad], and what was revealed before you, and of the Hereafter they are certain [in faith].
আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে, [১] আর যারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী। [২]
[১] এখানে মুত্তাকীদের এমন আরও কতিপয় গুণাবলীর বর্ণনা রয়েছে, যাতে ঈমান বিল গায়েব এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসের প্রসঙ্গটা আরও একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মুমিন ও মুত্তাকী দুই শ্রেণীর লোক বিদ্যমান ছিলেন, এক শ্রেণী তারা যারা প্রথমে মুশরিক ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অন্য শ্রেণী হলেন যারা প্রথমে আহ্লে-কিতাব ইয়াহুদী-নাসারা ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। পূর্ববতী আয়াতে প্রথম শ্রেণীর বর্ণনা ছিল। এ আয়াতে দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাই এ আয়াতে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে পূর্ববতী আসমানী কিতাবসমূহে বিশ্বাস করার কথাও বলা হয়েছে। হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী এ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কোন না কোন আসমানী কিতাবের অনুসারী ছিলেন, তারা দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী হবেন। [দেখুন, বুখারী: ৩০১১, মুসলিম: ১৫৪]
প্রথমতঃ কুরআনের প্রতি ঈমান এবং আমলের জন্য, দ্বিতীয়তঃ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে ঈমান আনার জন্য। তবে পার্থক্য এই যে, সেগুলো সম্পর্কে বিশ্বাসের বিষয় হবে, কুরআনের পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলা যেসব কিতাব নাযিল করেছেন, সেগুলো সত্য ও হক এবং সে যুগে এর উপর আমল করা ওয়াজিব ছিল। আর এ যুগে কুরআন নাযিল হবার পর যেহেতু অন্যান্য আসমানী কিতাবের হুকুম-আহ্কাম এবং পূর্ববতী শরীআতসমূহ মনসুখ হয়ে গেছে, তাই এখন আমল একমাত্র কুরআনের আদেশানুযায়ীই করতে হবে। [ইবনে কাসীর থেকে সংক্ষেপিত]
[২] এ আয়াতে মুত্তাকীগণের আরেকটি গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাস বা দৃঢ় প্রত্যয় রাখে। যেসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা অপরিহার্য সেগুলোর মধ্যে এ বিষয়টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ঈমান অনুযায়ী আমল করার প্রকৃত প্রেরণা এখান থেকেই সৃষ্টি হয়। ইসলামী বিশ্বাসগুলোর মধ্যে আখেরাতের প্রতি ঈমান আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস, যা দুনিয়ার রূপই পাল্টে দিয়েছে। এ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়েই ওহীর অনুসারীগণ প্রথমে নৈতিকতা ও কর্মে এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিগত, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যন্ত দুনিয়ার অন্যান্য সকল জাতির মোকাবেলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হতে সমর্থ হয়েছে। পরন্তু তাওহীদ ও রিসালাতের ন্যায় এ আকীদাও সমস্ত নবী-রাসূলের শিক্ষা ও সর্বপ্রকার ধর্ম-বিশ্বাসের মধ্যেই সর্বসম্মত বিশ্বাসরূপে চলে আসছে। যেসব লোক জীবন ও এর ভোগ-বিলাসকেই জীবনের চরম লক্ষ্য বলে গণ্য করে, জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে যে তিক্ত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সে তিক্ততাকেই সর্বাপেক্ষা কষ্ট বলে মনে করে, আখেরাতের জীবন, সেখানকার হিসাব-নিকাশ, শাস্তি ও পুরস্কার প্রভৃতি সম্পর্কে যাদের এতটুকুও আস্থা নেই, তারা যখন সত্য-মিথ্যা কিংবা হালাল-হারামের মধ্যে পার্থক্য করাকে তাদের জীবনের সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যের পথে বাধারূপে দেখতে পায়, তখন সামান্য একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে সকল মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে এতটুকুও কুণ্ঠাবোধ করে না, এমতাবস্থায় এ সমস্ত লোককে যে কোন দুস্কর্ম থেকে বিরত রাখার মত আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যা কিছু অন্যায়, অসুন্দর বা অসামাজিক জীবনের শান্তি-শৃংখলার পক্ষে ক্ষতিকর, সেসব অনাচার কার্যকরভাবে উৎখাত করার কোন শক্তি কোন আইনেরও নেই, এ কথা পরীক্ষিত সত্য। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কোন দুরাচারের চরিত্রশুদ্ধি ঘটানোও সম্ভব হয় না। অপরাধ যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, আইনের শাস্তি সাধারণত তাদের দাঁত-সওয়া হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আর তাদের মধ্যে শাস্তিকে যারা ভয় করে, তাদের সে ভয়ের আওতাও শুধুমাত্র ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যকটুকুতে ধরা পড়ার ভয় বিদ্যমান। কিন্তু গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে যেখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে না, সেরূপ পরিবেশে এ সমস্ত লোকের পক্ষেও যে কোন গৰ্হিত কাজে লিপ্ত হওয়ার পথে কোন বাধাই থাকে না। প্রকারান্তরে আখেরাতের প্রতি ঈমানই এমন এক কার্যকর নিয়ন্ত্রণবিধি, যা মানুষকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বত্রই যে কোন গৰ্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকারভাবে বিরত রাখে। তার অন্তরে এমন এক প্রত্যয়ের অম্লান শিখা অবিরাম সমুজ্জ্বল করে দেয় যে, আমি প্রকাশ্যেই থাকি আর গভীর নির্জনেই থাকি, রাজপথে থাকি কিংবা কোন বদ্ধঘরে লুকিয়েই থাকি, মুখে বা ভাব-ভঙ্গিতে প্রকাশ করি আর নাই করি, আমার সকল আচরণ, আমার সকল অভিব্যক্তি, এমনকি অন্তরে লুক্বায়িত প্রতিটি আকাংখা পর্যন্ত এক মহাসত্তার সামনে রয়েছে। তাঁর সদাজাগ্রত দৃষ্টির সামনে কোন কিছুই আড়াল করার সাধ্য আমার নেই। আমার সংগে রয়েছে এমনসব প্রহরী, যারা আমার প্রতিটি আচরণ এবং অভিব্যক্তি প্রতিমুহুর্তেই লিপিবদ্ধ করছেন।
উপরোক্ত বিশ্বাসের মাধ্যমেই প্রাথমিক যুগে এমন মহোত্তম চরিত্রের অগণিত লোক সৃষ্টি হয়েছিলেন, যাদের চাল-চলন এবং আচার-আচরণ দেখেই মানুষ ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়ত। এখন লক্ষণীয় আর একটি বিষয় হচ্ছে, আয়াতের শেষে (يُؤمِنُوْنَ) শব্দ ব্যবহার না করে (يُوْقِنُوْنَ) ব্যবহার করা হয়েছে। ইয়াক্বীন অর্থ দৃঢ় প্রত্যয়। যার দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আখেরাতের প্রতি এমন দৃঢ় প্রত্যয় রাখতে হবে, যে প্রত্যয় স্বচক্ষে দেখা কোন বস্তু সম্পর্কেই হতে পারে। এ দৃঢ় প্রত্যয়ের গুরুত্ব নির্ধারণে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সবর হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক, আর ইয়াকীন হচ্ছে পূর্ণ ঈমান” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৪৬]
মুত্তাকীদের এই গুণ আখেরাতে আল্লাহ্ তা'আলার সম্মুখে উপস্থিতি এবং হিসাবনিকাশ, প্রতিদান এবং সবকিছুরই একটি পরিপূর্ণ নকশা তার সামনে দৃশ্যমান করে রাখবে। যে ব্যক্তি অন্যের হক নষ্ট করার জন্য মিথ্যা মামলা করে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ্র আদেশের বিপরীত পথে হারাম ধন-দৌলত উপার্জন করে এবং দুনিয়ার হীন উদ্দেশ্য সফল করার জন্য শরীআত বিরোধী কাজ করে, সে ব্যক্তি আখেরাতে বিশ্বাসী হয়ে, প্রকাশ্যে ঈমানের কথা যদি স্বীকার করে এবং শরী’আতের বিচারে তাকে মুমিনও বলা হয়, কিন্তু কুরআন যে ইয়াকীনের কথা ঘোষণা করেছে, এমন লোকের মধ্যে সে ইয়াকীন থাকতে পারে না। আর সে কুরআনী ইয়াকীনই মানবজীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে। আর এর পরিণামেই মুত্তাকীগণকে হেদায়াত এবং সফলতার সে পুরস্কার দেয়া হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে, তারাই সরল-সঠিক পথের পথিক, যা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে দান করা হয়েছে আর তারাই সম্পূর্ণ সফলকাম হয়েছে।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Cox’s Bazar District
Cox's Bazar