19/03/2026
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সম্প্রতি সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সরকারি স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া।
শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, করোনাকালে চালু হওয়া লটারি পদ্ধতি বাতিল করে আবারও পূর্বের ন্যায় ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা মতামত তৈরি হলেও, কুমিল্লা জিলা স্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িতরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। এটি একটি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক পদক্ষেপ।
তবে অনেক অভিভাবকের মনে দ্বিধা রয়েছে—কেন আবার পরীক্ষা? লটারি তো সহজ ছিল। এই লেখা তাদের জন্যই, যারা ভর্তি পরীক্ষার গুরুত্ব বুঝতে চান, যারা আমাদের প্রিয় কুমিল্লা জিলা স্কুলের গৌরবময় ইতিহাস ফিরিয়ে আনতে চান।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু ফিরে যেতে হয়—আমাদের অভিজ্ঞতায়, আমাদের স্মৃতিতে।
“কুমিল্লা জিলা স্কুল”—এই নামটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি একটি আবেগ, একটি ইতিহাস, একটি পরিচয়। ১৮৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি শুধু কুমিল্লার নয়, বরং বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একসময় এই স্কুলে ভর্তি হওয়া ছিল হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। মাত্র ২৪০টি আসনের বিপরীতে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ত। সেই প্রতিযোগিতা, সেই প্রস্তুতি, সেই অপেক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়াটি ছিল শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ভর্তি পরীক্ষার দিনটি ছিল এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। শীতের সকালে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা, শিক্ষার্থীদের নীরব চাপ, আর ফলাফল প্রকাশের পর আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি—এসবই ছিল একটি বাস্তব, মানবিক এবং শিক্ষামূলক প্রক্রিয়ার অংশ। এই পুরো অভিজ্ঞতা একটি শিশুকে শুধু পরীক্ষায় বসার জন্য প্রস্তুত করত না; বরং তাকে শেখাত লক্ষ্য স্থির করা, পরিশ্রম করা, অপেক্ষা করা এবং ফলাফল মেনে নেওয়া।
করোনা পরিস্থিতিতে লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে। সেই সময়ের বাস্তবতায় এটি ছিল কার্যকর এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর একটি উপায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই পদ্ধতি চালু থাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধীরে ধীরে অনুপস্থিত হয়ে যায়—শিক্ষার্থীর মেধা ও প্রস্তুতির মূল্যায়ন।
লটারি পদ্ধতি সকলকে সমান সুযোগ দেয়—এটি তার বড় শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না: কে কতটা প্রস্তুত, কে শেখার জন্য কতটা আগ্রহী, এবং কে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে? শিক্ষা ব্যবস্থায় সুযোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এখানেই ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. ভর্তি পরীক্ষা কোনো শিশুর ওপর চাপ সৃষ্টির একটি উপায় নয়—বরং এটি একটি সুসংগঠিত ও সীমিত পরিসরের মূল্যায়ন, যা একজন শিক্ষার্থীর শেখার ভিত্তি ও প্রস্তুতি বোঝার সুযোগ দেয়। সঠিকভাবে পরিকল্পিত হলে এই পরীক্ষা শিশুদের জন্য ভীতিকর নয়; বরং একটি লক্ষ্য নির্ধারণের প্রাথমিক ধাপ হয়ে ওঠে। একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস, স্বচ্ছ প্রশ্নপদ্ধতি এবং বয়সোপযোগী মূল্যায়নের মাধ্যমে এটি সহজেই একটি শিশুবান্ধব প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
২. ভর্তি পরীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করে। যখন একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে সকল শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হয়, তখন সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্যতা পায়। এতে করে অনিশ্চয়তা কমে, এবং অভিভাবকদের মধ্যেও একটি আস্থার জায়গা তৈরি হয়।
৩. একই সাথে ভর্তি পরীক্ষা একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে। এই প্রতিযোগিতা কাউকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য নয়; বরং নিজেকে উন্নত করার একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। একটি শিশু যখন বুঝতে পারে যে তার পরিশ্রমের একটি মূল্য আছে, তখন তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সে শেখে—সফলতা শুধু ভাগ্যের উপর নির্ভর করে না, বরং প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে।
৪. এছাড়া, কাছাকাছি একাডেমিক মানের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হলে একটি সক্রিয় শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠে। এতে করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়ের মধ্যেই একটি ইতিবাচক উদ্দীপনা কাজ করে। ক্লাসরুমে অংশগ্রহণ বাড়ে, শেখার গতি উন্নত হয় এবং সামগ্রিক শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়।
৫. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভর্তি পরীক্ষা একটি শিশুকে খুব ছোট বয়স থেকেই বাস্তব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়: জীবনে প্রতিটি অর্জনের পেছনে প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এটি কোনো কঠোরতা নয়, বরং একটি বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয়।
৬. পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালের আগে যেসব স্কুল ভর্তি পরীক্ষা নিত, সেসব স্কুলের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল লটারির স্কুলগুলোর তুলনায় গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভালো ছিল।শুধু ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা যায়। বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাইকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের গুণাবলী ও লক্ষ্যভিত্তিক আচরণ বেশি দেখা যায়। কারণ তারা জানে যে, তারা একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হয়েছে, তাদের মেধার স্বীকৃতি পেয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষা কারও সুযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়; বরং সবার জন্য একই মাপকাঠিতে নিজেকে প্রমাণ করার একটি সুযোগ।
ভর্তি পরীক্ষা ফিরে আসুক। ফিরে আসুক সেই দিনগুলো আবারো।
সকল কিছুর উত্তর নিম্নোক্ত ছবিটি।
- লিখা: কুমিল্লা জিলা স্কুল কমিউনিটি