24/05/2026
🌸ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মা-বাবার করণীয়:
সারা দেশে মাদরাসা ও স্কুলে পবিত্র ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হয়েছে। এই ছুটি শিশু-কিশোরদের জন্য আনন্দ, খেলাধুলা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক চমৎকার সুযোগ। শিশুদের শিক্ষা, আদব-আখলাক ও চরিত্র গঠনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব বাবা-মায়ের ওপর ন্যস্ত। তাই সামান্য পরিকল্পনা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এই স্বল্প সময়ের ছুটিকে তাদের জন্য উপকারী ও ফলপ্রসূ করে তোলা সম্ভব।
নিচে অভিভাবকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরা হলো—
১. নাজেরা কুরআন ও দোয়া শিক্ষা
গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে সন্তানদের দিয়ে পূর্ণ নাজেরা কুরআন শরীফ পড়ানো এবং প্রয়োজনীয় দোয়া মুখস্থ করানো উচিত। যারা এখনো সম্পূর্ণ কুরআন পড়া শেষ করেনি, তাদের পাঠ সম্পন্ন করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
২. সুন্দর হাতের লেখার চর্চা
সন্তানদের পরিষ্কার ও সুন্দর হাতের লেখায় অভ্যস্ত করে তুলুন। নিয়মিত অনুশীলন তাদের লেখার মান উন্নত করবে।
৩. পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত বই পড়া
পাঠ্যবই ভালোভাবে অনুশীলন করানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শিশুদের বয়স উপযোগী শিক্ষণীয় ও শিশুতোষ বই পড়ার সুযোগ করে দিলে তাদের জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশ ঘটবে। প্রয়োজনে ছুটি পড়াশোনার জন্য অল্প পরিসরে রুটিনতৈরী করা যেতে পারে।
৪. ভ্রমণ ও শিক্ষাসফর
এই ছুটিতে শিশুদের গ্রামের পরিবেশ দেখানো যেতে পারে। পাশাপাশি কোনো কারখানা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা নিকটস্থ বাঁধ (ড্যাম) পরিদর্শনের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে, যা তাদের বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়াবে।
৫. গাছ লাগানো ও পরিচর্যা
সন্তানদের দিয়ে অন্তত একটি গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করুন। এমন জায়গায় গাছ লাগানো ভালো, যেখানে তারা নিজেরাই তার পরিচর্যা করতে পারে। এতে দায়িত্ববোধ ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়।
৬. পাহাড়ি বা প্রাকৃতিক পরিবেশে ভ্রমণ
সম্ভব হলে শিশুদের নিকটবর্তী কোনো পাহাড়ি বা প্রাকৃতিক এলাকায় ঘুরতে নিয়ে যান। মনে রাখবেন, জীবনের অনেক কিছু পরে অর্জন করা যায়; কিন্তু শৈশব একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।
৭. মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সংযম
সন্তানদের ওয়াই-ফাই ও মোবাইল ব্যবহারে যথাসম্ভব সীমাবদ্ধ রাখুন। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করুন। পাশাপাশি কোনো বিষয় অনুসন্ধান করে ছোট রিপোর্ট বা উপস্থাপনা তৈরির মতো শিক্ষামূলক কাজের লক্ষ্য দিন।
৮. ঘর পরিষ্কার ও গৃহকর্মে অংশগ্রহণ
ছুটিতে শিশুদের ঘরদোর ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছানোর কাজে যুক্ত করুন। এতে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
৯. সাঁতার শেখানো
আপনার সন্তান সাঁতার না জানলে এই ছুটিতে তাকে সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করুন। এটি আনন্দের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতাও।
১০. বন্ধু নির্বাচন ও মেলামেশায় সতর্কতা
ছুটিতে আপনার সন্তান কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, এমন সঙ্গ সম্পর্কে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
১১. ছুটি শেষে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো
ছুটি শেষে কালক্ষেপণ না করে সন্তানদের নিয়মিত মাদরাসা বা স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে সচেতন থাকুন।
বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, এ সময় শিশু ও কিশোররা কুরবানির পশুর সঙ্গে সময় কাটাতে খুব আগ্রহী থাকে। পশু দেখা, খাবার দেওয়া ও তাদের সঙ্গে সময় কাটানো শিশুদের জন্য আনন্দময় অভিজ্ঞতা। তবে পশুর কাছাকাছি অবস্থানে শিশুদের তত্ত্বাবধান করা জরুরি, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। পাশাপাশি তাদের পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া এবং পশুর সঙ্গে সতর্ক আচরণের অভ্যাস শেখানো প্রয়োজন।
গরমের এই সময়ে শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি। বিশেষ করে দুপুরের রোদে বেশি সময় না থাকতে দেওয়া, পর্যাপ্ত পানি, জুস ও হালকা খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা পানিশূন্যতা ও অতিরিক্ত গরমের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে।
আসুন, একটি সুপরিকল্পিত সময়সূচির মাধ্যমে ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন ছুটিকে শিশুদের জন্য অর্থবহ, শিক্ষণীয় ও আনন্দময় করে তুলি। শিশুরা ছোট চারাগাছের মতো—সঠিক পরিচর্যা ও যত্নই তাদের সমাজের জন্য কল্যাণকর ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
মুফতি আব্দুল কাদের জিলানী রেজভী
প্রধান শিক্ষক
জামেয়া আকবরীয়া সুন্নীয়া মাদ্রাসা, নুরপুর, কুমিল্লা।
©️