21/11/2025
আমাদের প্রিয় উসতায সাইফুল ইসলাম। গতকাল (১৯ নভেম্বর ২০২৫) তার উপর হওয়া নির্মম নির্যাতনের বিষয়ে ফেসবুক লাইভে কথা বলেছেন। লাইভ ভিডিও থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা তার উপর চালানো জুলুমের একটি মোটামুটি বর্ণনা নিম্নরূপ:
গতকাল (১৯ নভেম্বর ২০২৫) মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে কোনো ধরনের অনুমতি বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই ১০-১২ জন সেনাসদস্য তার ঘরের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। প্রবেশের সাথে সাথে তারা ঘরের সবকিছু এলোমেলো করে তছনছ করে ফেলে। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য তার পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে বেধড়ক মারধর শুরু করে। তাকে উপুড় করে ফেলে বুট দিয়ে পায়ে আঘাত করে, লাথি, কিল, ঘুষি—অবিরাম আঘাত করতে থাকে। চিৎকার বন্ধ করার জন্য তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরা হয়। কয়েক দফায় নির্মমভাবে পেটানো হয়।
এরপর তাকে বসানোর পর চুল ধরে মুখে বারবার থাপ্পড় দেওয়া হয়। চুল টেনে ধরে বারবার আঘাত করা হয় এবং তাকে শেষ করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। আত্মরক্ষার্থে হাত তুলতে গেলে "হাতটাই ভেঙে ফেলব" বলে হুমকি দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর আবার তাকে উপুড় করে শুইয়ে নিতম্ব ও পায়ের পাতায় সজোরে আঘাত করা হয়।
তারা তার ভাইকে ফোন করে গালাগালি করে, বাবাকেও ফোনে গালি দেয় এবং "জানোয়ার" বলে সম্বোধন করে। বাবা-মাকে তুলে অশ্লীল গালি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জোর করে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয় এবং স্ক্রিপ্টেড লেখা পড়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়।
নির্যাতনের ফলে তার কোমরে তীব্র ব্যথা হয়েছে; তিনি সিজদা করতে পারছেন না এবং গত ২৪ ঘণ্টা ধরে কোমর ধরে কষ্টে হাঁটতে হচ্ছে। সেনাসদস্যরা তার গাড়ির কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে আরও ক্ষতির হুমকি দিয়ে গেছে।
আইনী লঙ্ঘনসমূহঃ
এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা নিম্নলিখিত আইন ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন করেছেন:
১. অনুমতি ছাড়া বাসায় প্রবেশ: বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩-এর লঙ্ঘন, যা ব্যক্তির গৃহ, যোগাযোগ ও ব্যক্তিজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
.
২. বিনা ওয়ারেন্টে প্রবেশ ও তল্লাশি: ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC)-এর লঙ্ঘন। CrPC অনুসারে, বাড়িতে প্রবেশ ও তল্লাশির জন্য সাধারণত ওয়ারেন্ট প্রয়োজন, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া।
৩. শারীরিক নির্যাতন: দণ্ডবিধি (Penal Code)-এর লঙ্ঘন। এতে আঘাত, গুরুতর আঘাত, ইচ্ছাকৃত ক্ষতিকর আচরণ, হুমকি, অপমান, অবৈধ বলপ্রয়োগ—সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ (ধারা ৩২৩, ৩২৫, ৩৪১, ৫০৬ ইত্যাদি)। বুট দিয়ে পায়ে আঘাত, উপুড় করে পেটানো, মুখ চেপে ধরা—এগুলো স্পষ্ট অপরাধ।
৪.জোর করে মুচলেকা বা স্বীকারোক্তি নেওয়া: Evidence Act 1872-এর লঙ্ঘন। জোর, বলপ্রয়োগ বা হুমকির মাধ্যমে নেওয়া স্বীকারোক্তি অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য (ধারা ২৪-২৬)। এটি "coerced confession" হিসেবে পরিচিত।
৫.পরিবারকে গালিগালাজ ও মানহানি: দণ্ডবিধির লঙ্ঘন। পরিবারের সদস্যদের ফোন করে অপমান, অশ্লীল ভাষা এবং মানসিক নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৬.ব্যক্তিগত সম্পদ (লাইসেন্স, কাগজপত্র) বাজেয়াপ্ত করা: অবৈধ আটকানো। আইনগত ভিত্তি বা কেস ছাড়া ব্যক্তিগত নথিপত্র নিয়ে যাওয়া জোর করে জিনিসপত্র দখলের সমতুল্য।
৭. হুমকি দেওয়া: দণ্ডবিধির ধারা ৫০৩-এর লঙ্ঘন। ভবিষ্যতে ক্ষতির হুমকি একটি ফৌজদারি অপরাধ।
৮. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন: বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোতে সই করেছে, যেমন Convention Against Torture (CAT) এবং International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর অধীনে শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা হরণ নিষিদ্ধ।
উদ্বেগজনক প্রশ্নসমূহ
একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে আমাদের কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন:
১. বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কি আইনের উর্ধ্বে? যদি না হয়, তাহলে কোন আইন বলে একজন সিভিলিয়ানের সাথে এতগুলো আইন লঙ্ঘন করে এমন অমানবিক আচরণ করা হলো?
২. সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোন ক্ষমতাবলে একজন সিভিলিয়ানের ঘরে ডাকাতের মতো হানা দিল? যদি ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারের অধীনে এটি করা হয়ে থাকে, তাহলে তাদের আচরণের সাথে বিধিবদ্ধ আইনের কোনো মিল কেন পাওয়া যাচ্ছে না?
৩. বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এভাবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে হাসিনা আমলের সাথে বর্তমান সরকারের কোনো পরিবর্তন কোথায়?
এছাড়া, আরও অশনি সংকেত হলো যে, সাইফুল ইসলামের উপর চালানো এই জোরজবরদস্তির খবর সর্বপ্রথম প্রকাশ করে কথিত সাংবাদিক নাজমুস সাকিব, যিনি একজন ব্ল্যাকমেলার সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। তার কাজ মানুষের ব্যক্তিগত ফুটেজ এবং কল রেকর্ড সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেল করা। গতকাল রাত ৯:০৯ মিনিটে তিনি একটি ফেইসবুক পোস্ট দিয়ে সেনাবাহিনীর অপারেশনের সাথে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেন। তার পোস্টের ভাষা ছিল: "ওর নাম সাইফুল ইসলাম সাগর, বাবার নাম মুরাদ মিয়া, বাড়ি শ্রীপুর। আজকে কিছুক্ষণ আগে ওকে 'চুদলিংপং' করা হয়েছে। জানতে পারলাম একটু পর নিজের ফেসবুক লাইভে এসে মাফ চাইবে এই বলদ।"
সাইফুল ইসলামের সাথে যত রকম অমানবিকতা দেখানো হয়েছে, তার সবকিছু নাজমুস সাকিব 'চুদলিংপং' শব্দ দিয়ে ব্রাভো ভাষাতে প্রকাশ করে। প্রশ্ন উঠছে: আমেরিকায় বসবাসকারী এই ব্ল্যাকমেইলার সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর কীভাবে জানলেন? সেনাবাহিনী কি এই ব্ল্যাকমেইলার দ্বারা চালিত হয়, নাকি তাদের অপারেশনে এই ব্ল্যাকমেলারের সাহায্য নেওয়া হয়েছে? যদি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার বৈধতা কী?
দাবি ও আবেদন
এই ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান আইনমন্ত্রী জনাব Dr. Asif Nazrul এর কাছে আমরা এর উত্তর চাইছি, যেহেতু তিনি আইন মন্ত্রণালয় পরিচালনা করছেন। এছাড়া, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা Chief Adviser GOB -এর নিকট আকুতি যে, জনাব সাইফুল ইসলামকে নিরাপত্তা প্রদান করুন। আপনি সম্প্রতি বলেছেন, "ক্ষমতার অবস্থান যাই হোক, আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়"। তাই এই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা নিরাপত্তা চাই—রাষ্ট্রীয় বাহিনী হোক বা পলাতক হাসিনার সন্ত্রাসী বাহিনী হোক।
আমরা মনে করি, সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিপথগামী সদস্য যেভাবে একজন মানুষকে টর্চার করেছে, সে বিষয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি কমিশন গঠন করুন, যাতে সম্পূর্ণ বিষয়টি বেরিয়ে আসে। এবং ভিক্টিমকে এ বিষয়ে পূর্ণ সহায়তা প্রদান করুন। ভিক্টিম যদি কোন অন্যায় কাজ করে থাকে তাহলে সে ব্যাপারে আদালতের দ্বারস্ত হতে রাজি আছে। কিন্ত আইনের লঙ্ঘন করে এরকম কোন জুলুম থেকে সে রাষ্ট্রের আশ্রয় কামনা করছে।
20/11/2025
03/05/2025
06/11/2024