খুব যখন ছোট ছিলাম , মা সকাল বেলা যখন ঘুম
ভাঙ্গিয়ে ব্রাশ করিয়ে দিত আর
আমি বাহানা খুঁজতাম, কি বললে আজ স্কুলে মিস
দেয়া যাবে ! আর বাহানা গুলি যখন ফেইল হত তখন
কত যে কষ্ট লাগত স্কুলে যেতে ।সারাদিন শুধু
ঘড়ি দেখা আর সময় গোনা ছুটি হবার । শেষ ক্লাসের
ঘন্টা বাজাতেই বাসায় ফিরে কার্টুন দেখা ,
বিকেলে খেলতে যাওয়া , আর রাতে অনেক
কষ্টে ঘন্টাখানেক পড়ে ঘুমিয়ে পরা। এইতো ছিল
আমাদের জীবন , ভাবনাহীন-রঙ্গিন।
সেদিন দেখা হ
য়ে গেল রাবেয়া, সালমা, হারুন ,
রানাদের সাথে , এত প্রাণ-চঞ্চল , উচ্ছল কয়েকজন
শিশু , চোখে স্বপ্ন নেই কোন নতুন খেলনা গাড়ির
বা দামি পুতুলের , পরনে নেই স্যান্ডেল । একটাই
আশা , চটের ব্যাগটা কাগজে পূর্ণ করে বাসায়
গিয়ে পড়তে বসা ।
ভাবতে পারছেন, কতটা আগ্রহ থাকলে তারা স্কুল
শেষে কাগজ কুড়িয়ে বাসায় এসে আবার পড়তে বসে ?
প্রতিদিন সকালে তারা স্কুলে যায় , মা তাদের ঘুম
থেকে উঠিয়ে নাস্তা বানিয়ে দিয়ে স্কুলে পাঠায়না ,
উল্টা তারাই নিজ উৎসাহে স্কুলে আসে “অ আ”
শিখতে ।
কিন্তু শিক্ষার গুরুত্ব না বুঝে ও দারিদ্রতার
রোষানলে পড়ে অনেক পরিবার তাদের বাচ্চাদের
স্কুলে দিতে চায়না। অনেক স্কুলের পক্ষে ও
বাচ্চা গুলিকে সকল শিক্ষা উপকরণ দেয়া কঠিন
হয়ে পরে, ফলাফল বাচ্চাগুলির স্কুল ছেড়ে দেয়া। দারিদ্রতার সাথে ধুঁকতে থাকা মানুষগুলি ভাবে পড়াশোনা না করে তাদের ছেলেমেয়েগুলি কাজ করে আয় করুক। এতে সংসারে খানিকটা সচ্ছলতা আসবে। অথচ এরা বুঝতে পারে না এর ফলে তাদের ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যায়। এইসব শিশুদের মত আরো অনেক পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত শিশু আছে যারা শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত। এরা ডাস্টবিনে ময়লা কুড়ায়, কাগজ কুড়ায়, অনেকে ভিক্ষা করে। দারিদ্রতার কারণে আমাদের প্রথাগত শিক্ষাপদ্ধতিতে এরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। এইসব অসহায় পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে এগিয়ে আসে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যেগুলো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত, কোন ধরনের সরকারি বা এনজিওর সহযোগিতা ছাড়া। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল, আর্থিক অসুবিধা, ছাড়াও বিভিন্ন সমস্যার কারণে এরা এই বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খায়। ফলে এদের অনেকেই একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আটকে থাকে। আমরা এইসব পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলগুলোকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে এদের এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করবো। পাশাপশি কিভাবে এদের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা যায় এবং দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া যায় সেটা নিয়ে কাজ করবো। আমরা দেশে পথশিশুদের স্কুলগুলোকে একটা স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে এসে দেশকে নিরক্ষরতা মুক্ত করার মাধ্যমে আলোকিত একটা সমাজ গড়ে তুলতে চাই। আমরা যেসব কার্যক্রম করবো সেগুলো হলো :
>>ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পরিবারকে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে তাদের পুনরায় স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা।
>>পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলগুলোকে বিভিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া। (যেমন শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা)
>>এইসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা। যাতে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে আগ্রহী হয়।
>>শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা, শিক্ষা ও বিনোদনমূলক ভিডিও প্রদর্শন, গল্প বলা ইত্যাদির মাধ্যমে এদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ জাগানো এবং উৎসাহিত করা।
>>শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণে সহায়তা করা।
>>শিক্ষার্থীদের সামাজিক আচার -ব্যবহার শেখানো।
>>পথশিশু স্কুলে যেসব শিক্ষক ক্লাস নেয় তাদের শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন টিউটোরিয়াল ও পোস্টার প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠকে সহজভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করা। তাদের জন্য ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা।
>>এছাড়া যেসব শিশু শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত তাদের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা।
>>সর্বোপরি দেশের আনাচে কানাচে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে নিরক্ষরতামুক্ত একটি আলোকিত জাতি গড়ে তোলা।
"Education is the most powerful weapon which you can use to change the world. " নেলসন ম্যান্ডেলার এই উক্তির মতই বলা যায় শিক্ষায় পারে যেকোনো মানুষ, জাতি এবং দেশকে পরিবর্তন করতে। যেকোন জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। সবার দুয়ারে দুয়ারে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার নিমিত্তে আমাদের এই যাত্রা। আমাদের এই আলোর যাত্রায় আপনাকেও আমন্ত্রণ। আসুন সবেমিলে আমরা আলোকিত একটা সমাজ গড়ে তুলি।