13/01/2026
পুস্তকের মহাপ্রস্থান, গন্তব্য ভাঙ্গারি দোকান (সিজন-২, পর্ব-৬)
(ইহা কি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নহে?
জাতির বিবেক তথা সংবাদকর্মীদের প্রতি প্রশ্ন রইল।)
গত অপরাহ্নে শাহ আমানত দাখিল মাদ্রাসার চত্বরে দাঁড়াইয়া এক অদ্ভুত ‘রসায়ন’ প্রত্যক্ষ করিলাম। দেখিলাম, রাশি রাশি পুস্তক শকট বোঝাই হইতেছে।
(শকট একটি সংস্কৃত শব্দ, যার সহজ অর্থ হলো গাড়ি বা যানবাহন। বাংলা সাহিত্যের সোনালী যুগে সাধু ভাষায় গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি বা যেকোনো মালবাহী যানকে বুঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হতো)
মনে বড় আনন্দ হইল আর ভাবিলাম, তবে কি বঙ্গদেশে জ্ঞানের জোয়ার আসিল? ছাত্ররা কি তবে দিবানিশি এই সকল কিতাব মন্থন করিয়া একেকজন দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত হইয়া গিয়াছেন?
(মন্থন মানে কিতাবের ভেতরকার জ্ঞান কে তাড়াতাড়ি পড়ে আয়ত্ব করা)
নিকটে গিয়া ভ্রম সংশোধন হইল। দেখিলাম, সেই সকল রাশি রাশি পুস্তক কেবল অধরা এবং অবহেলিত নহে বরং পুস্তক সমগ্র ভাঙ্গারি-বিশারদদের ঠোঙা নির্মাণের কাঁচামাল হিসেবে প্রেরিত হইতেছে।
- দাম?
- আজ্ঞে প্রতি কেজি কুড়ি টাকা!
শকট বোঝাই হইয়া ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের অপঠিত ও অতিরিক্ত পুস্তক সমগ্র মহাপ্রস্থানে যাইতেছে। গন্তব্য জ্ঞানালয় নহে, গন্তব্য ভাঙ্গারি দোকান।
বড় চমৎকার ব্যবস্থা! সরকার বাহাদুর ভাবিতেছেন, তিনি কোমলমতি বালক-বালিকাদের মস্তকে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালাইতেছেন। অথচ মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ সেই প্রদীপের জ্বালানি শক্তি কেরোসিন গিলিয়া খাইতেছেন প্রতি কেজি কুড়ি টাকায়। এই সংবাদ সরকার বাহাদুরের দপ্তরে পৌছাইবে কিনা তাহা জানা নাই। ইবতেদায়ী ১ম শ্রেণি হইতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি বছর যে পরিমাণ চাহিদা প্রেরণ পূর্বক পুস্তক সংগ্রহ করা হইয়া থাকে তাহার ৭০% পড়িয়া থাকে পুস্তক খোয়াড়ে। খোয়াড় বলিবার কারণ হইল পুস্তক সমূহ গবাদিপশুর ন্যায় যত্রতত্র যেভাবে ফেলিয়া রাখা হয় তাহা দেখিয়া যে কারোর মনে হইবে ইহা একখানা খোয়াড়।
পুস্তক ছাপাইতে রাষ্ট্রের কোষাগার হইতে কী পরিমাণ খরচ পড়িয়াছে তাহা জানিয়া লইবার অধিকার সকলের আছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)'র বয়ান মোতাবেক ১ম থেকে ৫ম শ্রেণির বই প্রতি গড় উৎপাদন ব্যয় ৪৮-৫০ টাকা, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির ৫১-৫৩ টাকা, ৮ম শ্রেণির প্রায় ৫৬-৫৯ টাকা, দাখিল ৯ম ও ১০ম শ্রেণির প্রায় ৬৩-৬৫ টাকা।
শাহ আমানত দাখিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে শকটে বোঝাই হওয়া প্রায় ২ মণ পুস্তকের উৎপাদন ব্যয় যাহা পড়ুক না কেন, তাহা কেজি প্রতি কুড়ি টাকা বিক্রয় করিয়া ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কত বেলা আহার জুটিবে তাহা হিসাব না কষিয়া বরং কী পদ্ধতিতে প্রায় ২ মণ পুস্তক খোয়াড়ে ডেপোজিট হইল তাহা আলাপ করি। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ইবতেদায়ী ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৫ টি শ্রেণিতে ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য পুস্তক চাহিদা প্রেরিত হইয়াছিল ২৮০-৩০০ সেট। ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ২৮০-৩০০ সেট পুস্তক! তাহা উপজেলা পর্যায় হইতে অনুমোদন পায় কিভাবে? সেই সওয়ালের জওয়াবে বলিতে হয়, ওহে প্রসন্ন গোয়ালিনী, তোমার দুগ্ধে জল মেশানোর চাতুরি তো নস্যি!
(ইহার ভাবার্থ জ্ঞানীরা বুঝিয়া লইবেন, সরলমনা ব্যক্তিবর্গ বুঝিয়া লইতে না পারিলে জ্ঞানীদের স্মরণাপন্ন হইবেন)
গোয়ালিনীর দুগ্ধে জল মেশানোর নিপুণ কায়দায় সংগৃহীত অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ পুস্তক সমগ্র বছরান্তে একবার করিয়া মহাপ্রস্তানে যান। ইহাকে 'বাৎসরিক মহাপ্রস্থান' কিংবা 'ভাঙ্গারি বিলাস' নামকরণ করিলে যথোপযুক্ত মনে হইতেছে।
রাশি রাশি পুস্তক ধূলিধূসরিত হইয়া শকটে চড়িল, ইহারা কি কেবল কাগজ? না, ইহারা এই জাতির দুর্ভাগ্যের দলিল। ছাত্র না থাকিলেও চাহিদাপত্র আছে, প্রাণ না থাকিলেও দেহ আছে। আর সেই প্রাণহীন দেহের ওজন মাত্র কুড়ি টাকা কেজি!
হায় রে বঙ্গদেশ! যে তরী চলিবার কথা ছিল নৌপথে, সেই তরীর তক্তা আজ উনুন জ্বালাইবার কাষ্ঠে পরিণত হইতেছে। অতীতে কোনো সভাপতির আমলে এহেন ধৃষ্টতা বিদ্যাগুরুরা দেখাইয়াছিল কিনা তাহা সন্দিহান। বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় দায়িত্ব গ্রহন করিয়া গুরুদের সান্নিধ্যে আসিয়া আপনিও কি দীক্ষা নিয়ে নিলেন?
যদি তাই হয় তবে হে বিধাতা, তুমি শাহ আমানত দাখিল মাদ্রাসায় কবে জ্ঞানের প্রকৃত সমঝদার পাঠাইবে? নাকি এভাবেই 'বাৎসরিক মহাপ্রস্থান' কিংবা ‘ভাঙ্গারি বিলাস’ চলিতে থাকিবে?
ইহা কি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নহে?
জাতির বিবেক তথা সংবাদকর্মীদের প্রতি প্রশ্ন রইল।