22/03/2017
প্রথমেই বলি নটরডেম এর যত ভর্তি কোচিং আছে তার সবই ভুয়া এবং নটরডেম এর ভর্তি পরিক্ষার প্রশ্ন বাইরে দেওয়া হইয় না তাই ভুয়া প্রশ্ন দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। এবং অবশ্যই কোচিং এর ফাদে পা দিবেন না।
শুরুতেই বলে রাখি লেখাটার উদ্দেশ্য হল- যারা নটর ডেম কলেজে(বিজ্ঞান বিভাগে) ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাবে তাদের সামান্য সাহায্য করা। এই সাধারণ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে যেভাবে ব্যবসা শুরু হয়েছে সেটা বন্ধে ছোট একটা পদক্ষেপ বলতে পারেন। এই লেখা পড়ে একজন নটর ডেম কলেজে ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্র বিনা মূল্যে সম্পূর্ণ ভর্তি প্রক্রিয়া জেনে যেতে পারবেন। এই লেখাটায় থাকবে নটর ডেম কলেজের ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কে যাবতীয় প্রশ্ন এবং উত্তর।
*ঢাকার বাইরে থেকে এসে এই কলেজে পড়তে গেলে থাকা-খাওয়া নিয়ে কি সমস্যা হবে?
এই প্রশ্নটা খুব কমন প্রশ্ন। থাকার সমস্যার কথা চিন্তা করে ঢাকার বাইরের অনেকেই এই কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম তুলে না। কলেজের নিজস্ব ছাত্রাবাসে থাকা না গেলেও কলেজের পাশেই আরামবাগে অনেক ছাত্র হোস্টেল আছে। যেখানে নটর ডেম কলেজের অধিকাংশ ছাত্র থাকে। সেখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা খুবই ভাল। এসব হোস্টেল কলেজের একেবারে সাথেই বলা চলে। হোস্টেল থেকে কলেজে যেতে ২ মিনিট সময় লাগে। তাই এই ব্যাপারে চিন্তার কোন কারণ নেই।
*ভর্তি পরীক্ষা কারা দিতে পারবে?
ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার আগে নির্ধারিত একটি দিনে ফর্ম তুলতে হবে এবং তারপর সেই ফর্ম জমা দেয়ার পর জানা যাবে ভর্তি পরীক্ষা কবে হবে এবং কখন হবে। ফর্ম তোলার পর কলেজ থেকে একটি তালিকা প্রকাশ করা হবে। সেখানে যারা পরীক্ষা দিতে পারবে তাদের রোল নাম্বার দেয়া থাকবে। ২০১৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পেরেছিল যারা, তারা সকল বিষয়ে এ+ পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে ব্যাপারটায় একটু পরিবর্তন আসে। যাদের এসএসসির রেজাল্ট এ+ ছিল তাদেরকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়েছিল এবং তারা চান্সও পেয়েছিল। বিজ্ঞানের কোন বিষয়ে এবং ইংরেজিতে এ+ মিস গেলে তাদের পরীক্ষা দিতে দেয়া হয় নি। বাংলা, সমাজ, ধর্ম- এই বিষয়গুলোতে যাদের এ+ আসেনি তারা পরীক্ষা দিতে পেরেছিল গতবছর। বাংলা,সমাজ,ধর্ম- এই বিষয়গুলোতে যদি কারও এ+ না আসে তাহলে তারাও অবশ্যই ফর্ম তুলবে।
গতবছর অনেকে সব বিষয়ে এ+ পায় নি বলে ফর্ম তুলেনি। কিন্তু তারা পরীক্ষা দিলে হয়ত অনেকেই চান্স পেয়ে যেতে পারত। গতবছর অনেকেই এজন্য আফসোস করেছিল। তুমি তো আগেই জেনে গেলে। আশা করি, তোমার আফসোস করতে হবে না।
*ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম কবে দেয়া হবে? পরীক্ষা কবে হবে?
নটর ডেম কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম কবে ছাড়া হবে- সেটা এখনও কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়নি। প্রথমে ফর্ম ছাড়ার সময় জানানো হবে। তারপর ফর্ম তুলে জমা দেয়ার পর জানতে পারবে পরীক্ষার তারিখ এবং সময়। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন- ২৬ মে থেকে কলেজ ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে। অর্থাৎ ২৬ মে-এর মধ্যে জেনে যাবে কলেজ থেকে কবে ফর্ম দেয়া হবে।
*ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম কি বাবা-মা তুলতে পারবেন?
না। নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে তোমাকেই ফর্ম তুলতে হবে। কারণ ফর্ম হাতে পাবার পর সেদিনই ফর্ম পূরণ করে তোমার নিজের স্বাক্ষরসহ ফর্ম জমা দিতে হবে এবং এসময় একজন অভিভাবকের স্বাক্ষর লাগে। তাই তোমার নিজের উপস্থিতি এবং বাবা অথবা মা একজনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তবে ফর্ম পূরণের সময় বাবা-মা অথবা বড় কারও সাহায্য নিতে পারো। বন্ধুদের সাথে ফর্ম তুলে একসাথে জমা দিতে পারো। এর ফলে পরীক্ষা হলে আশেপাশে পরিচিত মুখ দেখতে পাবে। তবে পরীক্ষা হলে দেখাদেখি বা কথা বলতে পারবে না।
*২য় দিন ফর্ম তুললে কোন সমস্যা হবে কি?
ফর্ম তোলার জন্য ২ দিন সময় দেয়া হয়। প্রথম দিনে অনেক ভিড় হয় এবং ২য় দিনে তেমন ভিড় হয় না। অনেকেই প্রথম দিন খুব ভোরে লাইন ধরেন। যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসবেন তাদের জন্য ২য় দিনে ফর্ম তোলা সুবিধাজনক হবে। এতে ঢাকায় এসে থাকার জন্য আলাদা খরচ করতে হবে না। ২য় দিনে ফর্ম তুললে চান্স পাওয়া যাবে না - এই ধারনা একেবারেই ভুল। আবার সবার আগে ফর্ম তুললে চান্স নিশ্চিত এই ধারণা করে আগের দিন রাতে গেটের সামনে ঘুমানোও বোকামি হবে। তাই যারা ঢাকায় থাকো তারা প্রথম দিন খুব সকালেই চলে যাবে। আর যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসবেন তাদের জন্য ২য় দিনে ফর্ম তোলাটাই ভাল হবে।
*পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া কেমন হয়?
এই ভর্তি পরীক্ষাটার দুইটা অংশ- ১। লিখিত এবং ২। মৌখিক
লিখিত পরীক্ষার সময়কাল ৩০ মিনিট। এই ৩০ মিনিট সময়ে প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তবে দেখাদেখির চেষ্টা না করাই ভাল। লিখিত পরীক্ষা শেষ হবার পরপরই মৌখিক পরীক্ষা হবে। সেখানে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্ন করা হয়। একটা প্রশ্ন সবাইকেই করা হবে - “তুমি এই কলেজে কেন পড়তে চাও?” উত্তরে সত্য কথাটাই বলবে। উত্তরে বলতে পারো - তোমার নিজের ইচ্ছা আছে এবং সেই সাথে বাবা-মার ইচ্ছা আছে। এই কলেজটিতে কোন প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই এবং শিক্ষার মান অনেক ভাল বলে ইচ্ছাটা আরও বেশি। পরিবারে এই কলেজের কোন ছাত্র থাকলে তার নাম উল্লেখ করে দিতে পারো।
*লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন কোথা থেকে আসে?
২০১২,২০১৩,২০১৪ সালে ইংরেজি গ্রামার ১০টা, ফিজিক্সে ৫ টা এমসিকিউ, কেমিস্ট্রিতে ৫ টা এমসিকিউ এসেছিল। তবে ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে কোন কঠিন অংক ছিলনা। গণিত বিভাগ থেকে ৪ টা অংক দেয়া হয়। ২০১৫ সালে ইংরেজি গ্রামার ১০টা, ফিজিক্সে ৪টা এমসিকিউ, কেমিস্ট্রি থেকে ৪টা এমসিকিউ এবং বায়োলজি থেকে ২ টি এমসিকিউ এসেছিল। আর গণিত বিভাগ থেকে ৪টি অংক এসেছিল। তবে গণিতে সৃজনশীল প্রশ্ন করা হয় নি। প্রতি বছরের প্রশ্ন বই থেকেই আসে। গণিতের উপর জোর দিতে পারো। পরীক্ষার আগে এসএসসি পরীক্ষার আগে গণিতের উপর যেমন প্রস্তুতি নিয়েছিলে, এবারও তেমন করে প্রস্তুতি নিবে।
লিখিত পরীক্ষা কয়েক শিফটে হয়। যেমনঃ ধর, ১০টা থেকে ১১ টা এক শিফট আবার ১১ টা থেকে ১২ টায় আরেক শিফটের পরীক্ষা হবে। এভাবে বেশ কয়েকটা শিফটে পরীক্ষা নেয়া হয় এবং প্রতি শিফটে প্রশ্ন আলাদা থাকে। ২০১৫ সালে কোন কোন শিফটের প্রশ্নে ২টি সাধারণ জ্ঞান ছিল, আবার কোন কোন শিফটে সাধারণ জ্ঞান আসেনি। তবে ৪টি অংক পারার প্রতি জোর দিলেই ভাল ফলাফল আশা করতে পারো।
সাধারণত ক্যালকুলেটর নিতে দেয়া হয় না। কিন্তু গতবছর পরীক্ষার সময় ক্যালকুলেটর নিতে দেয়া হয়েছিল। তাই এবার ক্যালকুলেটর নিয়ে যেতে পারো।
*মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্ন কেমন হয়?
উপরে একবার বলে দিয়েছি একটা প্রশ্ন কমন থাকে- “কেন এই কলেজে পড়তে চাও?” আর এই প্রশ্নের উত্তরটাও বলে দিয়েছি। এর বাইরে অনেক রকম প্রশ্নই করা হয়। অনেককে তেমন কোন প্রশ্ন করা হয় না আবার অনেকের খুবই কঠিন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাই মৌখিক পরীক্ষার ব্যাপারে বলব- পজিটিভ থাকার চেষ্টা করো।
*কেমন ড্রেসআপে যেতে হবে? ফর্মাল ড্রেস কি আবশ্যিক?
ফর্মাল ড্রেসে যেতে চাইলে যেতে পারো। সেটা খুবই ভাল; কিন্তু আবশ্যিক নয়। সাধারণ গেটাপেও যেতে পারো। খুব সাধারণ বলতে শার্ট আর এক রঙের চার পকেটের প্যান্ট পড়তে পারো। তবে জিন্স না পড়াটাই ভাল। এমনও অনেকে আছে যারা পাঞ্জাবি পড়ে পরীক্ষা দিয়েও চান্স পেয়েছে। সহজ কথায়, ভদ্র এবং মার্জিতভাবে যেতে হবে। চুল,নখ ছোট রাখাতে ভুল না।
পড়ার মত জুতা না থাকলে স্যান্ডেল পড়েও যেতে পারো। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়েও চান্স পেয়েছে এমন উদাহরণও অনেক আছে। সত্যি কথা হল, স্মার্টনেস কাপড়ে থাকলেই হবে না ভেতরেও থাকতে হবে। শার্টের বুকের বোতাম লাগান না লাগানো নিয়ে অনেকের অনেক রকম প্রশ্ন থাকে। ভদ্রতা হল বুকের বোতাম লাগিয়ে যাওয়া। এ ব্যাপারে পরামর্শ থাকবে- ব্যতিক্রম হবার চেষ্টা করো না, এটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
অনেকে নিজেকে বেশি সহজ সরল সাজানোর জন্য কলারের বোতাম লাগিয়ে যায়। এটার তেমন প্রয়োজন নেই। কলারের বোতাম খুলে যাবে।
*পরীক্ষার প্রস্তুতি কিভাবে নিতে হবে?
ইতিমধ্যে তোমরা জেনে গিয়েছ আগের বছরগুলোতে কোন কোন বিষয় থেকে প্রশ্ন এসেছিল। সেই সাথে সেটাও জেনে গিয়েছ এসএসসি পরীক্ষার সময় তোমার যে পাঠ্যবই ছিল, সেখান থেকেই সকল প্রশ্ন এসেছে বিগত বছরগুলোতে। তাই বই-এর বাইরে কঠিন বিষয় আয়ত্ত করার কোন প্রয়োজন নেই। নটর ডেম কলেজের গেটের সামনে যেসব ভর্তি গাইড দেয়া হয় সেগুলোরও কোন প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে ভাল প্রস্তুতি নিতে বই-এর অংকগুলো দেখে যেতে পারো। পরীক্ষায় সবগুলো অংক পারার চেষ্টা করবে। আর অন্যান্য বিষয়, যেমনঃ ফিজিক্স,কেমিস্ট্রি, বায়োলজি- পড়তে পারো। তবে গণিত বিভাগের অংকগুলো পারার উপর জোর দিতে হবে। এক রাতের প্রিপারেশন নিতে চাইলে- শুধুমাত্র এসএসসি-র সাধারণ গণিত এবং উচ্চতর গণিত বই-এর অংকগুলোর সমাধান দেখে যেতে পারো। তবে কয়েকদিন প্রস্তুতি নেয়াটা ভালো।
পরীক্ষা খাতায় লেখার কিছু টিপস
১। পরীক্ষার প্রশ্নেই উত্তর লিখতে হবে; কোন প্রকার খাতা বা রাফশিট দেয়া হবে না। ৩০ মিনিট সময়ে সব প্রশ্নের উত্তর করাটা কঠিন কাজ, তাই ঘড়ি নিয়ে যাবে। একটি পাতায় প্রশ্ন করা হয়। প্রথম পৃষ্ঠায় থাকবে সকল প্রশ্ন আর দ্বিতীয় পৃষ্ঠা ফাঁকা থাকবে। প্রথম পৃষ্ঠায় প্রশ্নের পাশে ফাঁকাস্থানে উত্তর লিখতে হবে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইংরেজি-এর এমসিকিউ অংশের উত্তর এক শব্দে দেয়া যায়। তাই এই বিষয়গুলোর উত্তর করতে কোন সমস্যা হবে না। গণিত অংশের উত্তর করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারো।
২। গণিত অংশে বিগত বছরগুলোতে মোট ৪টি অংক দেয়া হয়েছে। প্রতি অংকের মাঝে দুই আঙ্গুলের মত ফাঁকা জায়গা পাবে। এতো ছোট জায়গায় কিভাবে উত্তর করতে হয় সেটা জানা খুব জরুরী। উপরে একবার উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয় পৃষ্ঠা খালি থাকে। এই খালি পৃষ্ঠাকে কাজে লাগাতে হবে। কারণ তোমাকে কোন রাফ কাগজ দেয়া হবে না। কৌশলটা হল- পেন্সিল আর স্কেল দিয়ে শুরুতেই সমান চারভাগ করে নিবে এই সাদা পৃষ্ঠা। এরপর এখানে ৪টি অংশে পেন্সিল দিয়ে চারটি অংক করবে। পেন্সিল দিয়ে অংকগুলো রাফ করবে, তারপর প্রথম পৃষ্ঠায় চলে যাবে। অংকটি খুব দ্রুত, ছোট করে এবং স্পষ্টভাবে সমাধান করে দিবে। ৩। পরীক্ষার শুরুতে অংক প্রশ্নগুলো দেখবে। যদি পারো অংকগুলো করে ফেলবে; না পারলে অন্য প্রশ্নগুলো উত্তর করবে। উত্তর করতে করতে অংকের সমাধান মাথায় কাজ করলে তো কেল্লাফতে। একটি অংক না পারলে সেটার পেছনে একদম সময় নষ্ট করবে না। পরের উত্তরগুলো করতে থাকবে। শেষে দেখবে তোমার সকল উত্তর করা শেষ তবে হাতে ৯-১০ মিনিট সময় আছে। তখন চিন্তা করে বাকি অংকের সমাধান করতে পারবে। ৪। উত্তরে যথাসম্ভব চেষ্টা করবে সঠিক উত্তর লিখার। অবান্তর কোন কিছু লিখে আসবে না।
৫। নটর ডেমে পড়ে এমন কোন বড় ভাইয়া থাকলে তার সাথেও কথা বলতে পারো। আর যে কোন প্রশ্নের জন্য কমেন্ট সেকশন তো খোলা আছেই।
যারা কলেজে পরীক্ষা দিবে তাদের জন্য রইল শুভকামনা।
শেষের কথা
এই কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া কিভাবে চলে সেটা শুধুমাত্র কলেজ কর্তৃপক্ষ জানেন। আমরা ছাত্র হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। নটর ডেম কলেজের ছাত্র হয়ে এই কলেজের ভর্তি নিয়ে ব্যবসা হতে দেখব আর চুপ করে মেনে নেব, এটা আসলেও অনেক কষ্টের কাজ। এখানে এমন সব কথা বলা হয়েছে- যেসব কথা কোচিং সেন্টারের হয়ে বললে কিছু টাকাপয়সা জোগাড় করা অসম্ভব কিছু ছিল না। অবশ্য অনেকে সে উপায়ে অবলম্বন করে অর্থ উপার্জন করছেনও। আশা করি, যখন সবাই বলবেন নটর ডেম কলেজে ভর্তি হতে কোচিং করতে হয় না তখন দেশে অন্তত একটা ক্ষেত্রে কোচিং নির্ভরতা কমবে। অনেকেই আছেন সত্যটা জানেন তবে নটর ডেম কলেজের ছাত্র নন বলে এই সত্যগুলো বলতে পিছপা হন। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে নটরডেমিয়ানদের। দেশকে নিয়ে পজিটিভ চিন্তা করি, সেই সাথে আসুন কিছু পজিটিভ কাজও করি। এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে অনেক মানুষের পজিটিভ কাজের জন্য পরিবর্তন আসতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
লিখতে সাহায্য করেছে - নটর ডেম কলেজের ‘১২ ব্যাচের মুসতাকিম আহমেদ সানি(ভাই), ‘১৪ ব্যাচের কামরুল হাসান সাব্বির(ভাই), ‘১৫ ব্যাচের মিফতাউল ইসলাম পান্থ(ভাই), ‘১৭ ব্যাচের সাহাবি মাহমুদ অনন্ত , ‘১৭ ব্যাচের জামিউল হক দীপ্ত।
Part 2:
শুরুটাই বলে দেয় এবার যারা এস.এস.সি পরীক্ষা দিচ্ছ শুধুমাত্র তাদের জন্যই এই পোস্টটি। তোমাদের থিওরি পরীক্ষা শেষ হয়েছে ২৮তারিখ । গত ২বছরের নিরন্তর পরিশ্রমের পর তোমরা তোমাদের জীবনের এক মূল্যবান পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছ প্রায়। তাই প্রথমে অভিনন্দন জানাই তোমাদের। আর প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা বেশ সহজেই হয়ে যাবে এরমধ্যেই। এরপর তোমাদের সামনে অনেক লম্বা এক ছুটি। এই ছুটিতে কি করব-এটা নিয়েই আসলে লেখা।
স্কুলজীবন শেষ করেছি প্রায় তিন বছর আগেই। এস.এস.সি দিয়েছি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তবুও মফস্বলে বেড়ে উঠলেও তখন থেকেই ঢাকায় পড়ার ইচ্ছা ছিল। তাই যখন ছুটি পেয়ে গেলাম,তখন আর নষ্ট করতে চাই নি। বন্ধুদের সাথে ইচ্ছামত ঘুরেছি। তবে তোমরা চাইলে কম্পিউটারের কিছু কাজ শিখে নিতে পার,আমি Microsoft word,excel,access, powerpoint র কাজ শিখেছিলাম। পরে এসব বেশ কাজে দিবে তোমাদের। আত্মীয়-স্বজনের বাসা থেকে কয়েকদিন থেকে আসতে পার। আবার বন্ধুরা মিলে বড় কোনো টু্্যরে যেতে পার। অযথা বসে থেকো না। পরে তেমন সময় পাওয়া যায় না ব্যস্ত জীবনে।
যারা বাইরে পড়তে চাও,বিশেষ করে ঢাকায় তারা কলেজ নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকো,কোথায় পড়ব,কলেজে ভর্তির জন্য আবার কোচিং করব কি না এসব। তবে মোটামুটি অনেকেরই ইচ্ছা থাকে নটরডেমে পড়ার(ছেলেদের মধ্যে)। তবু পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে অনেক কিছু নিয়ে দ্বিধার সৃষ্টি হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নটরডেম কলেজের ছাত্র হিসেবে কলেজের অনেক কিছুই তোমাদের সাথে শেয়ার করছি। এর দিকগুলো বিবেচনার দায়িত্ব একান্তই তোমাদের নিজের।
★কেনো এই কলেজে পড়ার সিদ্ধান্ত নিব???
#শিক্ষকমণ্ডলীঃ এই কলেজে পড়ে যে জিনিসটা সবচেয়ে উপলব্ধি করি তা হল মাতৃ পিতৃতুল্য স্যার ম্যামদের আন্তরিকতা ও গভীর ভালোবাসা। ৫০০ কিমি দূরে থেকেও আমি কখনো বাবা মায়ের শূন্যতা তেমন অনুভব করতাম না স্যার ম্যামের ভালোবাসায়। আমি এখানে শিখেছি প্রাইভেট না পড়েও শুধু ক্লাসেই স্যারদের সব কিছু গভীর আগ্রহ নিয়ে বুঝিয়ে দেয়ার মন মানসিকতা। আমাদের সবসময় প্রাইভেট পড়তে উনারা নিরুৎসাহিত করতেন। ক্লাস শেষে বুঝিয়ে দিতেন কারো পড়ার মাঝে ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলে। জীবন নিয়ে তাঁদের উপদেশগুলো চলার পথে অনেক মূল্যবান বাণী। কলেজের প্রতিটা ছাত্রই খুব ভাগ্যবান মনে করে তাঁদের ছাত্র হতে পেরে।
#বন্ধুঃ নটরডেম তোমাকে সারা বাংলাদেশের শ'খানেক মেধাবী বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে, যারা এসেছে প্রতিটা জেলার স্কুলগুলো থেকে। দেড় বছর যাদের সাথে থাকবে তুমি। তাদের কাছে অনেক কিছু শিখবে,জানবে। দেখবে যে,কতজনই কত বেশি কিছু জানে তোমার থেকে। বিশ্বাস কর, এই বন্ধুদের কাছে নতুন নতুন অভিনব সব জিনিস জানবে। আমাদের মাঝে এক অন্যপ্রকার ভালোবাসা কাজ করে, সবার প্রয়োজনে এগিয়ে যেতে ভালোবাসে সবাই।এটা তৈরী হয়ে যায়। যেকোন সাহায্যে তুমি তাদের পাশে পাবে । এটাই আমাদের ব্রাদারহুড
#ক্লাবঃ স্কুলে থাকার সময় তোমরা অনেকেই বিভিন্ন Co-curriculum activities এ জড়িত ছিলে। কেউ গান,কেউ বিতর্ক,কেউ লেখালেখি, কেউ বিজ্ঞান ক্লাব,কেউবা adventure বা কেউ nature study বিষয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলে। অনেক স্কুলে এসব অনুশীলনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু নটরডেম তোমাকে দেবে অফুরন্ত সুযোগ। কারণ আমাদের রয়েছে ২০টি ক্লাব। যাদের সপ্তাহে নিয়মিত ১দিন মিটিং হয়। প্রতিটি ক্লাবের নিজস্ব ম্যাগাজিন বের হয়। বাৎসরিক বিভিন্ন ফেস্ট হয় ক্লাবগুলোর। এর মাঝে জাতীয় পর্যায়ের ফেস্টে আমাদের কলেজের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। তোমার প্রতিভার সঠিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে আমাদের এই ক্লাবগুলো যেগুলো মডারেট করেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহোদয়।
#ল্যাবঃ অনেক কলেজেই নিয়মিত ল্যাব হত না, হয়ত পরীক্ষার আগে একগাদা লিখে সাইন করেই পাশ পেয়ে যেত অনেকে। কিন্তু এই সুযোগ কেউ পাবে না এই কলেজে। কেননা আমাদের নিয়মিত ল্যাব রিপোর্ট লিখতে হয়,সপ্তাহে ২দিন ল্যাব করতেই হয়,পরীক্ষার আগে সেগুলো করার উপায় নেই কারো। তোমাকে শুরুতে খারাপ মনে হবে ফিজিক্স ল্যাবের "make up", কেমিস্ট্রির "লবণের আয়ন না মেলা", ম্যাথের "repeat" বা কম্পিউটার ল্যাবের "প্যারা"। কিন্তু ২বছর পর তুমি বুঝবে যে তুমি অনেকের থেকেই অনেক এগিয়ে যা পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সহায়ক।
#পরিবেশঃ তুমি এখানে পাবে বাংলাদেশের সেরা মেধাবীদের সাথে অধ্যয়নের সুযোগ।যারা তোমাকে সব কিছুতে সাহায্য করতে চেষ্টা করবে। নটরডেম কলেজে কোন রাজনীতি, ধূমপান করা কে প্রশ্রয় দেয় না।কলেজ প্রশাসন এ ব্যাপারে সদা সতর্ক।
#খেলাধুলাঃ বিশাল এক উন্মুক্ত মাঠ রয়েছে।যারা ক্রিকেট, ফুটবল ভালোবাসো তারা যেকোন সময়েই খেলতে পারো।রয়েছে বাস্কেটবল কোর্ট। অবসর সময় কেটে যাবে তোমাদের এখানেই।
★নটরডেমিয়ানেরা তাদের ইউনিক কলেজ রোল কখনো ভুলে না।
কিছু জিনিস মাথায় রাখতে হবে তোমাদেরঃ
আমাদের নিজস্ব হোস্টেল নেই বাইরের সকলের থাকার জন্য। তোমাকে কলেজের বাইরে মেস,হোস্টেলএ থাকতে হবে। প্রথম প্রথম খুব বেশি খারাপ লাগবে। থাকার ইচ্ছা করবে না।কলেজের প্যারাও নিতে চাইবে না। মানসিকভাবে তোমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে এসবের জন্য। ভালো কিছু পেতে কষ্টের বিকল্প নেই। ২বছর পর বুয়েট , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় , ডিএমসি, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেলে চান্স পাওয়াদের মাঝে নিজের বন্ধুদের নিয়ে এক বিশাল যোগাযোগ তৈরী হবে।তাই সঠিক সিদ্ধান্ত বেশ বুঝেই নিও।
এবার আসল কথায় আসি।
#নটরডেম_ভর্তি_পরীক্ষা
তোমাদের SSC রেজাল্ট দেয়ার কিছুদিন পরেই পরীক্ষা হবে। পরীক্ষা সাধারণত পদার্থ, রসায়ন, গণিত(সাধারণ+উচ্চতর), ইংরেজি বিষয়ে হয়ে থাকে। পদার্থ, রসায়ন,ইংরেজি হয় এককথায় উত্তর বা MCQ টাইপের। গণিতে সাধারণত ৪টা ম্যাথ আসে ২টা করে। যেকোন অধ্যায় থেকেই প্রশ্ন হতে পারে। চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ম্যাথগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩০মিনিটের পরীক্ষার পর আসে ভাইভা পরীক্ষা। এখানে কিছু কমন প্রশ্ন আসেঃ কোথায় থেকে আসছ,কেন নটরডেমেই, নিজের ইচ্ছায় কিনা,থাকবা কোথায়, সিগারেট খাও কিনা। অবশ্যই সত্য কথা বলবে। এমন অনেক সময় হইসে যখন কেউ ভালো পরীক্ষা দিয়েও ভাইভা তে মিথ্যা বলার জন্য আর চান্স পায় নি(তারা নিজেরা পরে স্বীকার করসে)। তুমি যা,তাই বলবা। ভনিতা করার প্রয়োজন নাই। এটা কোন চাকুরীর ইন্টার্ভিউ না,তাই শ্যুট,টাই এসবের প্রয়োজন নাই।সাধারণ থাকার চেষ্টা করবে।(এটা নিয়ে পরে আবার লিখব)।
#প্রস্তুতিঃ ২মাস সময়ের শুরু থেকেই পড়ার প্রয়োজন নেই।চিন্তারও দরকার নেই।তুমি প্রথমদিকে ঘুরে বেড়াও,আনন্দ কর।
★★★কোচিং করার কোন প্রয়োজন নাই।
শুধু পরীক্ষার আগে ২০ দিন বই খুলে অংকগুলো দেখবা। আচ্ছা আর একটা কথা,মাঝে মাঝে বইগুলো উলটে দেখিও যেন ভুলে না যাও। যে কোন অংক আসতে পারে,তাই যে অংক কর নাই সেগুলো একবার হলেও করে দেখিও।একবার শুধু। পদার্থ, রসায়ন নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন নাই। এসব সবাই পারবে। ইংরেজি basic থেকেই আসে। পারবা সব।
যখন ফর্ম তুলতে আসবে, তখন কলেজের বাইরে কিছু গাইড বিক্রি হয়।কিনে রেখ। আইডিয়া পাবে একটু। ভয় পাবা না।
শেষ করি।
মাতামেরীর প্রাঙ্গনে তোমাদের আমন্ত্রণ।
ফেসবুকে শেয়ার করতে পার অন্য বন্ধুদের সাথে, এই পোস্ট তাদের জন্যও।
Shadman Sakib Showrov