02/04/2024
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারে দেখতে হবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আলোকে ~
কবি, লেখক ও শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয়কে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা লইয়া টানাটানি করতে রাজি না।
অনেকেই করেন সেইটা, কী কারণে করেন বুঝি না!
ওনারে এইটাতে জড়িত করা ঠিক না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষ্কৃতি দিয়া বরং আমার কথা বলি।
ধরেন আমি কলকাতায় থাকি, অথচ পূর্ববঙ্গে আমাদের জমিদারি আছে।
আমি কি চাইব সেইখানকার প্রজারা আমাদের সমান হইয়া উঠুক?
না, চাইব না। রবীন্দ্রনাথ চাইলেও আমি চাইব না।
কাজেই আমি না-ই চাইতে পারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হউক। এতে দোষ নাই।
যতক্ষণ না মুখ ফুইটা এর বিরোধিতা করতেছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী আপনারা বলতে পারবেন না!
তবে আমি যে এর পক্ষে আছিলাম, সেইটাও আপনি কইতে পারবেন না। এত আগের কথা যে আপনি কিছুই কইতে পারবেন না!
২.
আবার দেখেন, যদি ঢাকার নবাবের গুষ্টি এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আছিল তাইলে তো তারা পক্ষেই আছিল। জমি দিছিল কি দেয় নাই এই আলাপ মূলত এর পক্ষে যারা আছিল না, তাদেরকে রক্ষার কাউয়া ক্যাচাল।
মূল ফোকাস দিতে হবে হইল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে কারা ছিল। তাদের জয় হউক।
৩.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লগে মিলাইয়া দেখলেই এই লইয়া ঠাকুর টানাটানির আর দরকার হয় না।
দুইটারই শুরু ১৯২১ সালে। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কয়েক মাস পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই যে একই সালে শুরু হইল এর মইধ্যে বুদ্ধিমানদের জন্যে ইশারাই কাফি রাখা আছে।
কাফি আপনারা খাইবেন না?
৪.
১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ।
১৯১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
১৯২১ সালের ১ জুলাই শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।
১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বিশ্বভারতীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
৫.
কেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ঢাকার নবাবেরা কিছু বলেন নাই আমার সেই লইয়া অনেক আক্ষেপ।
নাকি বলছিলেন? বিরোধিতা করেন নাই তো?
২/৪/২০২৪
(ছবিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়)
Bratya Raisu
প্রশ্ন হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলো এটা আপনাকে কে বলছে❓
উত্তরঃ
১. ড. নীরদ বরণ হাজরা
২. ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার
৩. শ্রী সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস,
৪. নীরদ চন্দ্র চৌধুরী
৫. সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ
৬. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
ড. নীরদ বরণ হাজরা,
❝ ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মার্চ কলিকাতার গড়ের মাঠে এক বিরাট সমাবেশ করা হয়। তখন কবির বয়স ছিল ৫১ বছর। ঠিক তার দু’দিন পূর্বে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হয়েছিল। সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, ঢাকায় ইউনিভার্সিটি হতে দেওয়া যাবে না। ঐ গুরুত্বপূর্ণ সভায় হিন্দু নেতারা উপস্থিত ছিল। নতুন রাজ্য পুনর্গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন কিনা? বা শিক্ষা বিষয়ে করণীয় কি? আলোচনার জন্য এক জনপ্রতিনিধিত্বপূর্ণ সভা হয় কলকাতার টাউন হলে। উক্ত উভয় সভার সভাপতি ছিল রবীন্দ্রনাথ। ❞
ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার,
❝ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিলো যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না হয়। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদ্রপ করে বলত মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়। ❞
শ্রী সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস,
❝ ১৯১২ সালের মার্চ মাসে কোলকাতার গড়ের মাঠে এক বিশাল মিটিং হয়। যারা কোনদিন কোন মিছিল, সমাবেশে যায় না তারাও গিয়ে মাঠ ভর্তি করে ফেলে। আমাদের মত এত ছোট মিটিং না, বিশাল ডায়াস, বিশাল মিটিং। সেই মিটিং এর সভাপতি হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিসের জন্য সেই মিটিং জানেন? ইংরেজ গর্ভমেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকায় একটা ইউনিভার্সিটি হবে তার বিরুদ্ধে। ওই মিটিংয়ে যার সভাপতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সিদ্ধান্ত হল ঢাকায় যেন ইংরেজ গর্ভমেন্ট ইউনিভার্সিটি না করে। কেন বলেন তো? ঢাকায়, পূর্ব বাংলায় তো সব মুসলমানের বাস। মুসলমান লেখাপড়া শিখলে তো কায়েদ বর্ণের মর্যাদা থাকে না, মান থাকে না, সম্মান থাকে না। মুসলমানের ছেলে ডাক্তার আবার ব্রাহ্মণের ছেলেও ডাক্তার। এটা হলে কি ব্রাহ্মণের জাত-মান থাকে? থাকে না। তাই রবীন্দ্রনাথের মত লোক, বিশ্বকবি তিনি তার প্রতিবাদ করলেন। আমি উনার কথা বেশি বলছি কারন তিনি আমাদের কাছে শ্রদ্ধেয়, অন্য কারনে শ্রদ্ধেয়। তবে যখন আমরা এই বিষয়গুলো আলোচনা করি তখন সত্যিকারের ভেতরের ব্যাপারটা পরিস্কার বোঝা যায়। তারা কত বার বলেছিলো জানেন? এই বাবুরা? ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়েছিলো যেন ঢাকাতে ইউনিভার্সিটি না হয়। এই যে মানসিকতা, মুসলমানরা যেন লেখাপড়া না শিখতে পারে, তাদের আমরা নেতা বানাচ্ছি। ❞
নীরদ চন্দ্র চৌধুরী,
❝ ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা প্রতিবাদ সভা ডাকে। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ❞
সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ,
❝ ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা প্রতিবাদ সভা ডাকে। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারণ তিনি ছিলেন জমিদার। তিনি মুসলমান প্রজাদের মনে করছেন লাইভ স্টক বা গৃহপালিত পশু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে নবশিক্ষিত মুসলমান সমাজকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের সন্তানদের শিক্ষিত হয়ে বুদ্ধিজীবী হলে চিরকাল সেবাদাস করে রাখা যাবে না। একথা চিন্তা করেই হিন্দু বুদ্ধিজীবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা সেদিন আতংকিত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী হিন্দুরা কতটা ক্ষিপ্ত হয়েছিল এর প্রমাণ পাওয়া যাবে সেকালের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, বিবৃতি ও পত্রিকার ভাষ্য থেকে।
১৯১২ সালে ১৬ই ফেব্রুয়ারী বড় লাটের সাথে বর্ধমানের স্যার রাসবিহারী ঘােষের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিমন্ডলী সাক্ষাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করার পক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তির জাল বিস্তার করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে আভ্যন্তরীণ বঙ্গ বিভাগ-এর সমার্থক, তাছাড়া পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রধানত কৃষক; তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার কোন মতেই উপকৃত হবে না।
বিপিনচন্দ্র পাল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশিক্ষিত ও কৃষক বহুল পূর্ববঙ্গের শিক্ষাদান কর্মে ব্যাপৃত থাকতে হবে; পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণের শিক্ষানীতি ও মেধার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে না। ❞
একই ধরনের তথ্য পাবেন "বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ" বইয়ের ২০১ পৃষ্ঠায়।
এর বাইরে আমার সরাসরি শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাখাওয়াৎ আনসারি ক্লাসে বহুবার ব্যাখ্যা করেছেন কেন রবীন্দ্রনাথের ঢাবি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করাটাই ঠিক ছিল। স্যার রবীন্দ্রনাথের একদম গুনমুগ্ধ ভক্ত।
তিনি বলেছিলেন, ঢাবি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের জন্য। এই চিন্তাটা সাম্প্রদায়িক। বিদ্যাচর্চার উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক হতে পারে না।
তবে রবীন্দ্রনাথ এই গ্রাউন্ড থেকে বিরোধিতা করে নাই। এই কথা কেউ কোন দিন বলেও নাই। অতিভক্তি থেকে স্যার রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের পক্ষে একটা সাফাই তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে কঠিনভাবে জাত-পাত মেনে চলা হত।
কেউ কেউ দাবি করে সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ মনোব্রত অবলম্বন করেছিলেন৷ কোন কথা বলে নাই। স্বাভাবিক যুক্তি জ্ঞান ব্যবহার করে অনুমান করা যায় এটা ভ্রান্ত দাবি। কোলকাতায় প্রবল ঢাবি বিরোধী সভা-সমাবেশ চলেছ, মাসের পর মাস। কোলকাতার সুশীল সমাজ দিস্তার করে দিস্তা কাগজ নষ্ট করে প্রবন্ধ লিখছে একের পর এক, ইংরেজ সরকারকে স্মারকলিপি দিচ্ছে কয়েকদিন পর পর। এই রকম একটা টালমাটাল অবস্থায় এইসব সুশীলদের প্রধান হোতা রবীন্দ্রনাথ চুপ ছিলেন? এটা রবীন্দ্রনাথের ক্যারেক্টারের সাথে যায়? এরা রবীন্দ্রনাথের জীবনী পড়েছে কোনদিন??
রেফারেন্স:
১। ড. নীরদ বরণ হাজরা, কলকাতা ইতিহাসের দিনলিপি, ২য় খণ্ড, ৪র্থ পর্ব।
২। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার, জীবনের স্মৃতিদ্বীপে, আবুল আসাদের ১০০ বছরের রাজনীতি থেকে উদ্ধৃত, পৃ. ৭২
৩। শ্রী সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস, ভিডিও বক্তব্য, লিংক কমেন্টে
৪। সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ, ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র- নজরুল চরিত্র, পৃ: ২৩১
৫। আবদুল মান্নান "বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ", ২০১
মির সালমান সামিল