30/06/2016
আমি কখনোই ছাত্র হিসেবে খুব ভালো ছিলাম না। মোটামুটি, কাজ চলে টাইপের ছিলাম। পড়াশোনা কোনদিনও ভালো লাগেনি, এখনো লাগে না। মনে আছে, স্কুল জীবনের প্রথম পরীক্ষায় আমি ফেইল করেছিলাম। ড্রইং এ। আম্মু এত্তো কষ্ট পেয়েছিলেন যে আমার সাথে সেদিন দুপুরে কথাই বলেননি। ওই ছোট্টবেলার কিছুই আমার মনে নেই, কিন্তু সেইদিনের রেজাল্টের কথা মনে আছে আমার। আম্মু রেজাল্টের জন্যে আমার সাথে কথা বলেননি, এটা আমার ছোট্ট বুকটাকে চিরে ফেলেছিলো। আমার ছোট্টবেলার কোন মার্কশীট নেই। কিন্তু সেই মার্কশীটটা এখনো আছে। সেইদিনের পর থেকে আমি প্রত্যেকটা ড্রইং পরীক্ষায় হায়েস্ট মার্ক পেয়ে এসেছি। আর প্রাইমারী স্কুলে কখনো সেকেন্ড হইনি।
এস এস সি তে আমি গোল্ডেন এ+ পাইনি। আমার আব্বুম্মুর আজীবন স্বপ্ন ছিলো ছেলে চিটাগাং কলেজে পড়বে। চান্স পাইনি। উনাদের আশার আলো তখন বাগান হবে বলে বীজ বুনেছিলো মহসীন কলেজে। নাহ! মহসীনেও চান্স পাইনি। যে সিটি কলেজকে দুই চোখে দেখতে পারতাম না, ভর্তি হতে হয়েছিলো সেই সিটি কলেজেই। এখনো মনে আছে চিটাগাং কলেজ-মহসীন কলেজের সামনের রাস্তা থেকে হেঁটে হেঁটে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় এসেছিলাম সেইদিন। এত্তবড় বুক ভাঙা কষ্ট। যে এর মধ্য দিয়ে গিয়েছে সে ছাড়া আর কেউ জানে না আশাভঙ্গের কষ্টগুলো কত্ত ভারী।
এইচ এস সির পর্ব শুরু হলো। আমার নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে কখনোই আমি লজ্জা পাইনি, বরং এই পরিবারই ছিলো আমার সবচেয়ে বড় উৎসাহের জায়গা। আব্বুর মশলার দোকানের স্বল্প আয় আমার পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্যে খুব একটা অনুকূল ছিলো না, ফলে শুরু করলাম টিউশানি। টিউশানি করে করে টিচারদের কাছে বিভিন্ন সাবজেক্ট পড়ার খরচ মোটামুটি জোগাড় করতাম। বাকিগুলো আমার আব্বু দিতেন অনেক কষ্ট করে। মাঝে মাঝে টিউশানির টাকা বাঁচিয়ে গল্পের বই কিনে ডুব দেয়া। এই ছিলো সেই সময়ের অপার্থিব আনন্দ।
অবশেষে পরীক্ষা দিলাম। এবারেও গোল্ডেন এ+ পাবার যোগ্যতা ছিলো না আমার। আব্বুম্মুর আকাশ ভেঙ্গে দিলাম আরো একবার। বুয়েটেই পড়বো, তাই আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রিপারেশান নেইনি। রেজাল্ট দিলো বুয়েটেও। টিকলাম না। এক বছর আমি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়তে পারিনি। কোত্থাও না।
এরপর এক বছর ঘরে বসে থাকা। এই সমাজে টাকাই সফলতা বিচারের আসল মানদন্ড। আর টাকা নামের কাগজটা উপার্জনের জন্যে অন্যতম মূল আগ্নেয়াস্ত্র যখন সার্টিফিকেট নামক অর্থহীন শক্ত আরেকটা কাগজ, তখন কোথাও ভর্তি হতে না পারা এই আমার অবস্থা এই নোংরা সমাজে কেমন ছিলো তা বলাই বাহুল্য। দিনের পর দিন কারো সাথে কথা বলতে পারিনি। আব্বুম্মু সহজে কোথাও যেতেন না ছেলের ব্যর্থতার লজ্জায়। সবাই যে খালি জিজ্ঞেস করে, “আপনার ছেলে কোথায় ভর্তি হয়েছে?” না বোধক উত্তরে কারো করুণামাখা কন্ঠ ভেসে আসে, আর কারো হা হুতাশ, “ওতো ছোটবেলা থেকে বেশ ভালো ছেলে ছিলো, হঠাৎ এই অবস্থা কেনো?” এর কোন উত্তর হয়? এর চেয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন না হওয়াই বরং কম বিব্রতকর! কতবার যে ইচ্ছে হয়েছে আত্মহত্যা করি! কতবার মনে হয়েছে, কেনো এই বেঁচে থাকা যদি আব্বুম্মুর স্বপ্নই পূর্ণ না করতে পারলাম? কেনো এই বেঁচে থাকা যদি আমার কারণেই উনাদেরকে অবিরাম লজ্জার সম্মুখীন হতে হয়?
সমাজের প্রতি ঘেন্না নিয়ে বেড়ে ওঠা আমার সেই তখন থেকেই। ২য় বারে (২০০৮-২০০৯ সালে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। ভালো পজিশানেই টিকলাম। কোন সাবজেক্ট নিবো? আব্বুম্মুর কোন উত্তর নেই। আমার উপরে উনাদের আর কোন আশা নেই। স্বপ্ন নেই। একজন সন্তানের কাছে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হচ্ছে তার আব্বুম্মুকে খুশি করা। আমার আর সেই সুযোগ রইলো না। মাইক্রোবায়োলোজি, বায়োকেমিস্ট্রির নাম অনেক শুনেছি। যেদিন ভর্তি হতে গেলাম, সেইদিন সাবজেক্ট বাছাই করতে ঢোকার আগে শুনলাম নতুন একটা বিষয়ের নাম। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলোজি। শুনলাম একদম নতুন সাবজেক্ট। কোন ভবিষ্যত নেই। জব নেই বাংলাদেশে।
ব্যাস! ভর্তি হয়ে গেলাম এই সাবজেক্টেই। আব্বুম্মুর স্বপ্ন নেই, নিজেকে নিয়েও নিজের কোন স্বপ্ন নেই, তাহলে হোক না নতুন কিছু! কলেজে তো আর পড়ছি না। ভার্সিটিতে এরকম কিছু নিয়েই না হয় যখন যা ভালো লাগে পড়বো। নিজ আগ্রহেই ক্লাস, পড়াশোনা করতাম।
ভার্সিটিতে ওঠায় খরচ বেড়েছে। ছোট ভাইদেরও স্কুলের খরচের প্রেশার আব্বুর উপর। পাঁচটা টিউশানি করতাম ফার্স্ট ইয়ারে। সারাদিন ক্লাস করে এসে টিউশানি করে রাত ১০টায় ঘরে ঢুকে বিছানায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতাম। আব্বুম্মু তখনও প্রয়োজন ছাড়া আমার সাথে কথা বলেন না। আমিও না। এসবই ভেতরটাকে অবিরাম পোড়ায়। এই দহন বাইরের কাউকে দেখাতে নেই। দেখাতে হয় না। নিয়ম নেই। আমি ভয়াবহ সেন্টিমেন্টাল ছেলে। সুইসাইড করার ইচ্ছে সবসময়েই বুকের ভেতরে লুকোনো ছিলো। কিন্তু সবসময়ে একটা কথা মনে হতোঃ
“দেখি না শালার লাইফটাকে আরেকবার! ফেইল করলে কিই বা আর হবে? রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। ফুটপাথে ঘুমাবো। জীবনে বাঁচতে তো দুইবেলা খাবার আর একবেলা ঘুমের চেয়ে বেশি কিছু লাগে না। সেটা আমি ঠিকই জোগাড় করে নেবো। লাইফটাকে দেখে নিবো আমি। খেতা পুড়ি আমি এই সমাজের!”
যখন ভর্তি হয়েছি তখন ডিপার্টমেন্টে শুধু দুইজন স্যার পড়াতেন। ফোরকান স্যার আর মাসুদ স্যার। যখন যে পড়াটা বুঝতাম না এক দৌড়ে স্যারদের রুমে ছুটে যেতাম। কে কি ভাবলো কেয়ার করার টাইম নাই! ক্লাসমেইটদের অনেকেই এইগুলোকে আদিখ্যেতা ভাবতে পারে! ভাবুকগে! স্যাররা যদি কিছু ভাবেন? তাতে আমার কি? আমার যুদ্ধে তো আমাকেই লড়তে হবে। জানতে হলে ডিস্টার্ব করতেই হবে। অবাক করা ব্যাপার হলো, স্যারেরা খুবই খুশি হয়ে বুঝিয়ে দিতেন। সময় না পেলে বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে হেল্প করতেন। সেমিনারে পড়তাম, সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে পড়তাম। তারপরেও যথেষ্ট মনে না হলে টাকা জমিয়ে বইয়ের ফটোকপিটা কিনে ফেলতাম। ক্লাসে ইন্টারেস্টিং কোন টপিক পড়ালে শাটলের বগিতেও মাঝে মাঝে পড়ে ফেলতাম। আঁতেল ভাববে কেউ? ভাবলে আমার কচুটা হবে!
ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল চলে এলো। সাথে এলো ডেঙ্গু জ্বর। বাবারে বাবা! সে কি কাঁপুনি! লেপ-কাঁথার তলায় নিজের কাঁপুনিকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করতাম। মন ভেঙ্গে আসতো। ফার্স্ট হবো তো? ফার্স্ট যে আমাকে হতেই হবে। নইলে আব্বুম্মুর সাথে যে আর কোনদিনও কিছু নিয়ে দাঁড়ানো হবে না। তারপরেও মন ভেঙ্গে পড়তো ঠিকই। ভেঙ্গে পড়লেই হুমায়ুন আহমেদের “হোটেল গ্রাভার ইন” বইটার “ডানবার হলের জীবন” খুলে বসতাম। নাহ! সম্ভব। খুবই সম্ভব। ফার্স্ট আমাকে হতেই হবে। বোধহয় দুই-তিন মাস ধরে পরীক্ষা হয়েছিলো। ডেঙ্গু জ্বর আর পরীক্ষার চাপে বারো কেজি ওজন কমে গেলো। কঙ্কাল হয়ে ঘরে ফিরলাম হল থেকে।
হ্যাঁ, আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম ফার্স্ট ইয়ারে। আব্বুম্মুর সামনে এক গাল হাসি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছিলাম পরের চারবারের রেজাল্টেও। এস এস সি, এইচ এস সি, কোথাও না টেকার এক বছরের গ্লানি আমি মুছতে পেরেছি অবশেষে। আমি পেরেছি।
যদি আমি এস এস সির পরে ভালো কলেজে চান্স না পেয়ে সবার বকুনি, কটাক্ষ আর অপমান সইতে না পেরে সুইসাইড করতাম? একটা চিঠি লিখে, গলায় দড়ি দিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে সুইসাইডের চিন্তাটা সত্যিই বেশ রোমান্টিক, ভাবতেই অসাধারণ লাগে, তাই না? কিন্তু আব্বুম্মুকে সারাজীবন অসহ্য বেদনায় ডুবিয়ে, গ্লানি আর অপরাধবোধে তিলে তিলে মারার দুঃসাহস তোমাকে কে দিয়েছে? তোমাকে দশ মাস পেটে নিয়ে তোমার আম্মু নড়তে পারতেন না, হাঁটতে পারতেন না। অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমুতে পারতেন না। জন্মের সময় যে তীব্র কষ্ট নিজের আম্মুকে তুমি দিয়েছো তার চেয়ে শুনেছি আগুনে পুরো বার্ন হবার কষ্টও অনেক কম। এতো এতো কষ্ট যে মাকে দিয়ে দুনিয়ায় এসেছো, সেই আম্মুই তোমাকে বুকে টেনে নিয়েছেন সবচেয়ে ভালোবাসা আর পরম আদরে। জন্মানোর পরেও তুমি আম্মুর কোল ভিজানো, বিছানা বালিশ দুর্গন্ধ করার পাশাপাশি অজস্র রাত তোমার আম্মুকে ঘুমুতে দাওনি। দিনরাত ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ করে চিৎকার। উফফফফ! সহস্র রজনীরও বেশি সময় তোমার আম্মু তোমার জন্যে ঘুমাতে পারেননি। একবার চিন্তা করো। এক হাজারেরও বেশি রাত! সেই আম্মু তোমাকে সারাজীবন পিটাইলেও, বকা দিলেও তোমার হেহেহেঃ করে হাসি দেয়া ছাড়া কিচ্ছু করার নেই।
তোমার আব্বু। দিনরাত কি যে কষ্ট করেছেন তোমার জন্যে! হায়! যেদিন আব্বু হবে, সেইদিন বুঝবে। তার আগেই যেনো অনুভব করতে পারো সেই দু’আ করি। আব্বুরা ছেলেতো, তাই কষ্ট দেখাতে পারেন না। নিয়ম নেই। আব্বুদের কষ্টগুলো মানসিক। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা। এতো করেন পরিবারের জন্যে, এতো খাটেন, তবুও সবার ভেতরের এটা না পাওয়ার কষ্ট, ওটা না পাওয়ার অতৃপ্তি আব্বুদের ভেতরটা কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। সকাল রাত্রি যে মানুষটা কষ্ট করছেন তোমার হাসির জন্যে, আধা হাত সাইজের তোমাকে খাইয়ে পরিয়ে, পেলে পুষে এত্ত বড় করেছেন, তাঁর বকুনি খেতে তোমার আপত্তি কোথায়? আজীবন তোমাকে দোষ দিয়ে দিয়ে অন্যায় বকুনি দিলেও তোমার বুঝতে হবে এই বকুনি হতাশার বকুনি, অসহায়ত্বের বকুনি। এইগুলো তোমাকে খেতে হবে, হজম করতে হবে। আব্বুকে জড়িয়ে ধরতে না পারো, তাঁর সামনে অন্তত হাসতে হবে।
দুনিয়ার জীবনটা কষ্টের। দুনিয়ার জীবনটা অনেক কষ্টের। দুনিয়ার জীবনটা খুবই খুবই কষ্টের। কথাটা মাথায় গেঁথে ফেলো। এখানে শান্তি পাবে না। এইটা এক্সাম হল, জান্নাত না। এখানে তুমি একটা প্রশ্নের আন্সার দিয়েই হাসতে চাইলে কিভাবে হবে? হবে না। পুরো এক্সাম ভালোভাবে শেষ করতে হবে। ডেঙ্গু হলেও ঘাড়মোড় ভেঙ্গে পরীক্ষা দিতে হবে, টাইফয়েড হলেও আল্লাহর নাম নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে যেতে হবে। পরীক্ষা দিতেই হবে। এক একটা ধাপে সফলতা পেয়েও কোন লাভ নেই। আমি বলছি, লিখে রাখো, লাভ নেই। শান্তি পাবে না।
যার কোটি কোটি টাকা আছে সে শান্তিতে নেই। যে এস এস সি, এইচ এস সি তে গোল্ডেন এ+ পেয়েছে তার শান্তি নেই। যে অনার্স মাস্টার্সে টপ রেজাল্ট করেছে সেও শান্তিতে নেই। প্রত্যেকেই পরের ধাপ নিয়ে অশান্তিতে আছে। যে বিদেশে আছে সে দিনরাত আব্বুম্মু, আর ফ্রেন্ডদেরকে মিস করে গুমরে কাঁদে। অথচ দেশে থাকতে কাঁদতো বিদেশ যাওয়া হচ্ছে না বলে। যার পি এইচ ডি হয়ে গেছে, সে পোস্ট ডকের পেছনে দৌড়ায়। পোস্ট ডক হয়ে গেলে আরেকটা পোস্ট ডক করার ইচ্ছা আরো একটু টাকার চাহিদা তাকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। এই দৌড়ের শেষ নেই। বিশ্বাস করো। শেষ নেই। যদি দুই মুঠো খেতে পাচ্ছো বলে খুশি হয়ে ঘুম দিতে পারো, তাহলেই শান্তি। তাহলেই সুখ। যদি এই জীবনটা নিজের জন্যে না বেঁচে মানুষকে হাসাবে বলে বাঁচতে পারো, যদি স্রষ্টা যেভাবে বলেছেন সেভাবে চলতে পারো, উনাকে খুশি করার জন্যে মানুষের মতো মানুষ হতে পারো, যদি উনি তোমার উপরে খুশি হন, তাহলে সবাই তোমার উপরে খুশি হবে। তাহলে জেনো, তুমিই সফল।
সফলতার সংজ্ঞাটা মাথায় গেঁথে রেখে দাও। এই দুনিয়ায় একটার পর একটার পেছনে দৌড়ানোর নাম সফলতা নয়। এই দুনিয়ার মানুষ তোমার কাছে খালি চাইতেই থাকবে, চাইতেই থাকবে। তুমি তাদের জন্যে যতোই করো কেউই খুশি হবে না। কেউই কখনোই তোমাকে সফল বলবে না। এদের কথা তাহলে তুমি কানে তুলবে কেনো? তোমার মূল্যবান জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞা এই নোংরা সমাজের নোংরামোর পেছনে ছুটে চলা মানুষগুলো কেনো ডিফাইন করে দেবে? এরা কারা? এদের কোথায় কেনো তুমি কষ্ট পাবে? কেনো সুইসাইড করার কথা ভাববে? কেনো নিজেকে ফালতু ভাববে, ব্যর্থ মনে করবে? যে আল্লাহ তোমাকে এত্ত ভালোবেসে তৈরী করেছেন, না চাইতেই হাত, পা, মস্তিস্ক দিয়েছেন তিনি তো তোমাকে ভালোবাসেন। তিনিতো তোমাকে ব্যর্থ বলেননি কখনো। তিনি তো এখনো তোমার পরীক্ষার খাতা নিয়ে নেননি। তার মানে সময় আছে। সফল হওয়ার সময় এখনো বাকি আছে। সেই সফলতা, যার সংজ্ঞা কেবল সবচেয়ে জ্ঞানী, তোমাকে সবচেয়ে ভালোবাসে যে জন, তোমার উপরে সবচেয়ে বেশি আশা ভরসা যার, তিনিই দিতে পারেন। তিনি বলেছেনঃ
“And those whose scales are heavy [with good deeds] - it is they who are the successful.” [Sura Al-Muminoon: 102]
শুধু তাঁর কাছেই সাহায্য চাও, আর কারো কাছে না। তাঁকেই সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করো, মানুষের জন্যে ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ো। পকেটে যদি এক টাকা থাকে তবে সেই এক টাকাই হবে তোমার শক্তি। পকেটে যদি ত্রিশ টাকা থাকে তাহলে একটা গরীব মানুষের এক বেলা খাওয়ার উপায় তুমিই। হ্যাঁ। তুমিই। তুমিই যদি হার মেনে নাও সমাজের ফালতু নিয়মের কাছে তাহলে হবে? হবে না। তোমার আছে। অনেক আছে। শুধু সেটা তোমার জানতে হবে। যট্টুক ভালো লাগে পড়ো। শুধু মনে রেখো ডিগ্রী আর মার্ক্সই জীবনের শেষ কথা না। ডিগ্রী আর মার্ক্স ছাড়াও বাঁচা যায়। অনেক কিছু করা যায়। চারপাশের মানুষগুলোর জীবন বদলে দেয়া যায়। হাসির আলো ছড়ানো যায়। মানুষের কথাকে পাত্তা দিও না কক্ষনো। মানুষের কথা তোমাকে দুই বেলা ভাত খাওয়ায় না, আল্লাহ খাওয়ায়। সেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে বাঁচো। মানুষের জীবনে হাসি ফোটানোর জন্যে বাঁচো।
জীবনের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াও। তবুও যদি মন খারাপ হয়ে যায়, বুক ভার লাগে, কুরআন খুলে বসো। পড়ো। দেখো না আল্লাহ তোমাকে কি বলছেন? নিজেই জেনে দেখো আল্লাহ তোমাকে কত্ত ভালোবাসেন, সেই ভালোবাসায় এই জগতের বাহির হতে তোমার জন্যেই কথার মালা পাঠিয়েছেন। দেখবে মন ভালো হয়ে যাবে।
হাঁটো। বৃষ্টিতে ভেজো। নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে থাকো একলা। ছাদে কিংবা মাঠে শুয়ে একা একা রাতের আকাশ দেখতে শেখো। নিজের জন্যে প্রতিদিন একটু হলেও সময় রাখো। খুব খারাপ লাগলো কাঁদো। হাউমাউ করে হোক, ভেউভেউ করে হোক কাঁদো। কান্নায় লজ্জার কিছু নেই। ছেলে হলে নিজের আব্বুম্মু, ভাই-বোন কিংবা কাছের বন্ধুটাকে, মেয়ে হলে আব্বুম্মু, ভাই-বোন বা প্রিয় বান্ধবীকে সব খুলে বলে জড়িয়ে ধরে কাঁদো। কিচ্ছু হবে না।
সবাই যেভাবে বলে সেভাবে বেঁচো না। যে কাজটা করতে ভালো লাগে সেই কাজটাতে বেস্ট হও। সেটাই করো। সেটা দিয়েই হালাল কামাই করো। তা যদি দশ টাকাও হয় তবু তাতে তোমার তৃপ্তি থাকবে। আনন্দ থাকবে। টাকা কিচ্ছু না। কিচ্ছু না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে বাঁচতে পারাটা, নিজের বুকের ভেতরের হাসিটা, চারপাশের প্রিয় মানুষগুলোর হাসিই হচ্ছে সত্যিকারের অর্জন।
আমি বলছি, হাল ছেড়ো না। আর মাত্র দুই দিন বাকি। এরপরেই মরে যাবে ইন শা আল্লাহ। এই দুইটা দিন কষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে নাও, মানুষের জন্যে কাজ করে যাও দাঁতে দাঁত চেপে। জান্নাত তোমারই হবে। সফলতা তোমারই হবে।
শেষ হাসিটা আমরা একসাথে জান্নাতে বসেই হিহিহিঃ করে হাসবো ইন শা আল্লাহ। দেখো, সব পেরিয়ে আল্লাহর সাহায্য নিয়ে আমরাই জিতবো।
জিতবোই।
লেখা ঃ সাদা শার্ট