03/06/2026
পবিত্র হজ্ব ১৪৪৭ হিজরি সালের আরাফার খুতবার বাংলা অনুবাদ
"আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার জন্য। যিনি সর্বময় ক্ষমতার মালিক, পূতপবিত্র ও নিরাপত্তা বিধায়ক। তিনি মুসলিমদের উপর তার পবিত্র ঘরের হজ ফরজ করেছেন এবং একে দ্বীন ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ বানিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই, তিনি একমাত্র মালিক ও সর্বজ্ঞানী। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল, যিনি সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। তার উপর, তার পরিবার পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম এবং তার অনুসারীদের উপর সর্বোত্তম দরুদ ও পরিপূর্ণ সালাম নাযিল হোক।
অতঃপর , হে লোক সকল! আপনারা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করুন। কেননা এর মাধ্যমে বান্দা আখেরাতে মুক্তি লাভ করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সূরা হাজের শুরুতে এরশাদ করেছেন:
*يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ * يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَىٰ وَمَا هُم بِسُكَارَىٰ وَلَٰكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ*
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিঃসন্দেহে কেয়ামতের প্রকম্পন অত্যন্ত ভয়াবহ এক ভয়ানক ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা দেখবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদানকারিণী আপন দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভধারিণী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। তুমি দেখবে মানুষকে মাতাল সদৃশ অথচ তারা মাতাল নয়, তবে আল্লাহর আজাবই অত্যন্ত কঠিন।"
আল্লাহ ভীতির অন্যতম অংশ হলো নেক আমল সম্পাদন করা এবং গুনাহ ও অসৎ কাজ বর্জনের মাধ্যমে কেয়ামতের দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
*ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّهُ يُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَأَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ * وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَّا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَن فِي الْقُبُورِ*
"এটাই এজন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনি মৃতকে জীবিত করেন। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং এ কারণে যে কেয়ামত আসবেই, এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা কবরে আছে আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই পুনরুত্থিত করবেন।"
আল্লাহ তাআলা বলেন, আর নিশ্চয়ই আখেরাতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আখেরাতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় তাওহীদ বাস্তবায়ন করা, একমাত্র আল্লাহর এবাদত করা এবং তাকে ছাড়া অন্য কারো কাছে দোয়া না করার মাধ্যমে। আর কেমন করে সে আল্লাহ ছাড়া এমন কাউকে ডাকে যে তার কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না? এটাই চরম পথভ্রষ্টতা।
*يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُ وَمَا لَا يَنفَعُهُ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيدُ * يَدْعُو لَمَن ضَرُّهُ أَقْرَبُ مِن نَّفْعِهِ ۚ لَبِئْسَ الْمَوْلَىٰ وَلَبِئْسَ الْعَشِيرُ*
"সে আল্লাহ ছাড়া এমন কাউকে ডাকে যে তার কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এটাই চরম পথভ্রষ্টতা। সে এমন কিছুকে ডাকে যার ক্ষতি তার উপকারের চেয়ে বেশি নিকটতর। কত নিকৃষ্ট এ অভিভাবক এবং কত নিকৃষ্ট সহচর!"
আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে যেন আকাশ হতে পড়লো; তারপর পাখি তাকে ছু মেরে নিয়ে গেল কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। ঈমানদারের মূল পরিচয় চিহ্ন হলো তাওহীদ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার একাত্ববাদ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
**فَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا ۗ وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ * الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَىٰ مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ**
"তোমাদের ইলাহ এক, কাজেই তারই কাছে আত্মসমর্পণ করো। আর সুসংবাদ দিন বিনয়ীদেরকে, যাদের হৃদয়ে ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদে আপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।"
এগুলোই দ্বীন ইসলামের মূল স্তম্ভ— তাওহীদ বাস্তবায়ন (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল—এই সাক্ষ্য প্রদান), সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমাদানের সিয়াম পালন করা এবং আল্লাহর পবিত্র ঘর বাইতুল্লাহর হজ করা। এর সঙ্গে রয়েছে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার উপদেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
**وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ**
"আর যে তার রবের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাতের বাগান।"
অনুরূপভাবে আল্লাহর এবাদত পালনে এবং কষ্টদায়ক তাকদীরের উপর ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
*إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ*
"নিঃসন্দেহে ধৈর্যশীলদেরকে কোন হিসাব ছাড়াই তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণরূপে দেয়া হবে।"
এর সাথে আল্লাহর নিয়ামতের শোকর আদায় করা। আল্লাহ বলেন:
*كَذَٰلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ*
"এভাবে আমি সেগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।"
আর সৃষ্টি জগতের মধ্যে আল্লাহর কিছু প্রাকৃতিক বিধান ও নিয়ম নীতি রয়েছে, বান্দার কর্তব্য হল সেগুলোর প্রতি পূর্ণ ঈমান আনা এবং তা থেকে উপকৃত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:
*إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ*
"নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করেন। তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।"
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন:
*وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ*
"আর আল্লাহ অবশ্যই ওই ব্যক্তিকে সাহায্য করেন যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশক্তিমান পরাক্রমশালী।"
এ বিষয়ে আরো রয়েছে আল্লাহ তাআলার বাণী:
*فَكَأَيِّن مِّن قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ فَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَىٰ عُرُوشِهَا وَبِئْرٍ مُّعَطَّلَةٍ وَقَصْرٍ مَّشِيدٍ*
"অতঃপর আমি বহু জনপদ ধ্বংস করেছি যেগুলোর বাসিন্দা ছিল জালেম। ফলে এসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে; অনুরূপভাবে বহু কূপ পরিত্যক্ত হয়েছে এবং অনেক সুদৃঢ় প্রাসাদও।"
আর আমি অবকাশ দিয়েছি বহু জনপদকে যখন তারা ছিল জালেম, তারপর আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি এবং আমারই কাছে প্রত্যাবর্তন স্থল। আল্লাহ তাআলা তার বন্ধু ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে হজের আহ্বান জানানোর আদেশ দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেছেন:
*وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ * لِّيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ*
"আর আপনি মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দিন; তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান সমূহে হাজির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক দিয়েছেন, তার উপর কোরবানির নির্দিষ্ট দিনগুলোতে জবেহ করাকালীন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে।"
হ্যাঁ, বাস্তবিক পক্ষেই এ বিধান দেওয়া হয়েছে যেন তারা তাদের নিজেদের কল্যাণের স্থানে উপনীত হতে পারে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। হাজীগণ হজ্জ পালনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং সওয়াবের আশায় প্রাচীন ঘর বায়তুল্লাহ ও হজ্জের পবিত্র স্থান সমূহের মহাত্ব ঘোষণা করতে করতে দূর-দূরান্তের গিরিপথ অতিক্রম করে আগমন করেছেন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
الَّذِي جَعَلْنَاهُ لِلنَّاسِ سَوَاءً الْعَاكِفُ فِيهِ وَالْبَادِ ۚ وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُّذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
"মসজিদে হারামকে আমি স্থানীয় ও বাহিরাগত সকল মানুষের জন্য সমান করেছি। আর যে ব্যক্তি সীমালংঘন করে এখানে পাপ কাজ করতে চায়, তাকে আমি যন্ত্রণাদায়ক আযাব আস্বাদন করাবো।"
তারা তাওহীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই স্থানগুলোতে উপস্থিত হচ্ছেন এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো এবাদতে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা ও শিরক বর্জন করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
*وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ*
"সে সময়কে স্মরণ করো যখন আমি ইব্রাহিমের জন্য কাবা ঘরের স্থান নির্ধারণ করে বললাম, তুমি আমার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার বানিও না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারী ও রুকু সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।"
এজন্যই কাবা ঘরের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যশীল নয় এমন সবকিছু থেকে তাকে পবিত্র করতে হবে। অতএব হজের মধ্যে পাপাচার, ঝগড়া-বিবাদ, রাজনৈতিক স্লোগান ও দলীয় আহ্বান ইত্যাদি কাজ করার কোনই সুযোগ নেই। বরং হজ হতে হবে আল্লাহ তাআলার প্রতি আনুগত্য, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আনুগত্য, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা, প্রতিজ্ঞা, চুক্তি ও অধিকার সমূহকে সম্মান জানানোর প্রকাশ ক্ষেত্র। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
*ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ*
"এটিই বিধান, আর কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র স্থান সমূহকে সম্মান করলে তার রবের নিকট তাই তার জন্য উত্তম।"
অন্যত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
**ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ**
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শন সমূহকে সম্মান করবে, তা হবে তার অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।"
এজন্য হজের মধ্যে ভাষার অমিল, রঙের পার্থক্য, দেশের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের আবরণে পারস্পরিক পরিচয়, একে অপরের সাথে অন্তরঙ্গতা, অন্যের প্রতি সাহায্যের মনোভাব এবং মুসলিমের মাঝে পারস্পরিক দায়িত্ববোধের নিদর্শন ফুটে ওঠে। যার ফলশ্রুতিতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানে উপনীত হয় এবং হাদি হিসেবে জবাইকৃত পশু হতে—মুসলিমদের মাঝে হাদি হিসেবে জবাইকৃত পশুগুলো তার ভাইদের মধ্যে বিতরণ করে, গরীব দুঃখীদের আহার করায়। পাশাপাশি তাদের আচরণে থাকে অনুগ্রহ ও সহমর্মিতা এবং তাদের কথাবার্তায় থাকে সত্যবাদিতার ছাপ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
*وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ*
"আর তোমরা মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকো।"
আরাফার এই মহান অবস্থানের বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করতে থাকেন। এটি সেই মহান স্থান, যেখানে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করেছেন:
**الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا**
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকেই মনোনীত করলাম।"
কাজেই আপনারা হেদায়েতের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করুন। তিনি যোহর ও আসর একত্রে ও কসর করে আদায় করেছেন, এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে মগ্ন ছিলেন। তারপর মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হন, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
**فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ ۖ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ وَإِن كُنتُم مِّن قَبْلِهِ لَمِنَ الضَّالِّينَ**
"অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত হতে ফিরবে, তখন মাশআরুল হারামের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করবে। আর তিনি যেভাবে তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন সেভাবেই তাকে স্মরণ করবে, বস্তুত তোমরা এর পূর্বে ছিলে পথভ্রষ্টদের অন্তর্গত।"
ঈদের দিন সকাল হওয়ার পর তিনি মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
*ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ*
"তারপর তোমরা সেখান থেকে ফিরে এসো যেখান থেকে লোকেরা ফিরে আসে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।"
এরপর তিনি জামারাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করেন, নিজের হাদি জবাই করেন এবং মাথা মুন্ডন করেন। তবে চুল ছোট করাকেও তিনি বৈধতা দিয়েছেন। তারপর তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
*ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ**
"এরপর তারা যেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং প্রাচীন ঘর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে।"
এই সময় শান্তভাবে ধীরস্থিরতা ও কোমল আচরণ বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকুন; ধাক্কাধাক্কি ও ভিড় করা থেকে দূরে থাকুন। আয়োজক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং দলভিত্তিক পরিকল্পিত চলাচলের ও নির্ধারিত পথের নিয়ম কানুন অনুসরণ করুন, যাতে সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়, ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়, মানুষের জীবন সুরক্ষিত থাকে এবং সহজভাবে হজের কার্যক্রম আঞ্জাম দেওয়া যায়। আর মিনায় অবস্থানকালে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা মুস্তাহাব। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
**فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا**
"অতঃপর যখন তোমরা তোমাদের হজ্জের কার্যাবলী সম্পন্ন করবে, তখন আল্লাহর স্মরণে মশগুল হও, যেমন তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণে মশগুল থাকতে বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ করো।"
আর তাশরিকের দিনগুলোতে হজ আদায়কারী তিনটি জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করবে; প্রত্যেক জামারায় প্রতিদিন সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। উত্তম হলো ১৩ তারিখ পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করা, তবে ১২ তারিখে চলে যাওয়াও বৈধ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
*وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَّعْدُودَاتٍ ۚ فَمَن تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ لِمَنِ اتَّقَىٰ ۗ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ**
"আর নির্ধারিত দিনগুলোতে তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো। অতঃপর যে তাড়াতাড়ি করে দুই দিনে চলে আসবে তার কোন পাপ নেই, আর যে বিলম্ব করবে তারও কোন পাপ নেই। এই বিধান তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখো নিশ্চয়ই তোমাদেরকে তার কাছেই সমবেত হতে হবে।"
মক্কা ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে হজ আদায়কারী বিদায়ী তওয়াফ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
**هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ ۚ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَٰذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ ۚ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ ۖ فَنِعْمَ الْمَوْلَىٰ وَنِعْمَ النَّصِيرُ*
"তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন, দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি। এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের দ্বীন, তিনি পূর্বে তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম আর এ কিতাবেও (রেখেছেন); যাতে রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হন এবং তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হতে পারো। অতএব তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত আদায় করো এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো। তিনি তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি!"
আল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা, বিশেষ করে হজের পবিত্র স্থানগুলোতে। কারণ এই স্থানগুলো হলো দোয়া কবুলের প্রত্যাশিত স্থান। আল্লাহ তাআলা বলেন:
*وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ*
"আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।"
তিনি আরো বলেছেন:
*وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ * أُولَٰئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِّمَّا كَسَبُوا ۚ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ*
"আর তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা বলে: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন আর জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন। এমন লোকদের জন্য তাদের উপার্জনের অংশ বরাদ্দ থাকবে, বস্তুত আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।"
হে আল্লাহ! হাজীদের দোয়া ও হজের আমল সমূহ কবুল করুন, তাদের কাজকর্ম সহজ করে দিন। তাদের কাজকর্ম সহজ করে দিন, তাদের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করুন এবং তাদেরকে নিরাপদে, কল্যাণপ্রাপ্ত হয়ে, সফলকাম হয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার তৌফিক দিন।
হে আল্লাহ! মুসলিমদের অবস্থার সংশোধন করুন, সত্যের উপর তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করুন, তাদের সকল বিষয়ের দায়িত্বভার আপনি গ্রহণ করুন এবং তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবী সার্বিক অবস্থা সুন্দর করে দিন। হে আল্লাহ ইয়া রাব্বাল আলামিন! তাদের দ্বীনি এবং দুনিয়াবী সকল অবস্থা আপনি সুন্দর করে দিন।
হে আল্লাহ! আপনি খাদিমুল হারামাইনিশ শরিফাইন বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং তার বিশ্বস্ত ক্রাউন প্রিন্স আমির মোহাম্মদ বিন সালমানকে তৌফিক দান করুন, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদেরকে উত্তম প্রতিদানে ভূষিত করুন। আল্লাহ! আপনি তাদেরকে উত্তম জাযা দান করুন, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদেরকে উত্তম প্রতিদানে ভূষিত করুন। নিশ্চয়ই তারা আপনার বান্দাদের প্রতি এহসান করেছেন, হাজীদের জন্য হজের আমলগুলো সহজে সম্পাদনের ব্যবস্থা তারা করেছেন এবং হারামাইন শরিফাইন ও তাতে আগত জিয়ারতকারীদের সেবায় উদার চিত্তে তারা ব্যয় করেছেন। ওয়া সাল্লাল্লাহু আলা সাইয়েদেনা ওয়া নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি ওয়া সাল্লামা তাসলিমান কাসিরা। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পরিবার পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
খুতবা দিয়েছেন: মদিনার মসজিদে নববীর প্রবীণ ও প্রখ্যাত ইমাম শেখ ড. আলী বিন আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি