09/04/2026
মানুষের তৈরি একমাত্র অবজেক্ট, ভয়েজার-১ এখন পর্যন্ত পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া সবথেকে দূরের বস্তু। ভয়েজার-১ এত দূরে চলে গেছে যে, আলোর গতিতে (মানে এক সেকেন্ডে প্রায় এক লাখ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে) ছুটে গেলেও ভয়েজারের নাগাল পেতে এক দিনের বেশি সময় লাগবে।
নিঃসীম অন্ধকারে, নিস্তব্ধ অজানা পথে এগিয়ে চলেছে ভয়েজার। যেতে যেতে ফুরিয়ে যাচ্ছে সে। ফুরিয়ে যেতে যেতে আমাদের দিয়ে যাচ্ছে ইন্টারস্টেলার স্পেস সম্বন্ধে চমকপ্রদ সব তথ্য। যদি কখনো, আজ হতে বহুকোটি বছর পরের প্রজন্মের কাছে এই পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে, যদি কখনো পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও পাড়ি দিতে হয় মানবজাতিকে, তবে এই ভয়েজার হবে মানুষের পথপ্রদর্শক।
এই নিঃসীম অন্ধকারের পথে সম্পূর্ণ একা চলতে চলতে ভয়েজার-১ একবার অকেজো হয়ে পড়েছিল। তখন আমাদের ছেড়ে যাওয়া যান্ত্রিক এই বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য ২০২৪ সালে বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকেই প্রায় ২৪ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে থাকা ভয়েজারকে হ্যাক করে মেরামত করে ফেলেছিল।
শুনে অবাক হবেন যে, ভয়েজার তখন এতটাই দূরে ছিল যে, তাকে মেরামত করার সময় পৃথিবীতে বসে কম্পিউটারে একটা ক্লিক করে বসে থাকতে হত এক দিন। এরপর সেই কমান্ড ভয়েজারে গিয়ে পৌঁছত, ভয়েজারের রেস্পন্স পেতে আবার অপেক্ষা করতে হত আরও একদিন।
ভাবুন একবার, পৃথিবীর সবথেকে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করেও এই অপেক্ষা! ভয়েজার-১ আসলে আমাদের কল্পনার থেকেও বেশি দূরে।
ভয়েজার দূরে চলে যাচ্ছে। আমাদের থেকে দূরে, বহুদূরে। ভয়েজারের শক্তি ফুরিয়ে আসছে। একদিন এভাবে শক্তি শেষ হতে হতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে ভয়েজার। অকেজো হয়ে পড়বে সে। আমাদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তার।
বিজ্ঞানীরা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত যে, ভয়েজার কখনো অন্য কোনো গ্রহ, নক্ষত্র বা উপগ্রহে আছড়ে পড়বে না। অকেজো ভয়েজার-১ অসীমের পানে অসীম সময় ধরে ছুটে চলতে থাকবে।
পৃথিবী থেকে পাঠানোর সময় ভয়েজার-১ এ মানুষ কিছু তথ্য গুঁজে দিয়েছিল এর ভেতরে। উদ্দেশ্য ছিল- পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরেও যদি কোনো সভ্যতা থেকে থাকে, তারা যদি কখনো হুট করে তাদের আকাশে ভয়েজারকে দেখতে পায়, তারা হয়তো ভয়েজারে থাকা আমাদের তথ্যগুলো থেকে জেনে যাবে, এই সীমাহীন মহাবিশ্বে তারাও একা নয়, আরও কোনো সভ্যতা তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছে, জ্ঞান বিনিময়ের চেষ্টা চালাচ্ছে!
পৃথিবী থেকে পাঠানোর সময় ভয়েজার-১ এ একটা গোল্ডেন রেকর্ড ভরে দেয়া হয়েছিল। যাকে বলা হয় 'মানবতার টাইম ক্যাপসুল'। এই রেকর্ডে ছিল-
- ৫৫ টি ভাষায় শুভেচ্ছাবার্তা (সব ভাষাতেই মোটামুটি এই একটা কথাই ছিল- “Hello from the children of planet Earth, Peace and greetings.” এটাকে কসমিক গ্রিটিং মেসেজ বলা হয়।
মজার ব্যাপার হলো, গোল্ডেন রেকর্ডে আমাদের বাংলা ভাষাও ছিল- "নমস্কার, বিশ্বের শান্তি হোক"।)
- পৃথিবীর বিভিন্ন শব্দ (বৃষ্টি, বজ্রপাত, সমুদ্রের ঢেউ, বাতাস, হৃৎস্পন্দন, কুকুরের ডাক, শিশুর কান্না ইত্যাদি)।
- গান (বিটোফেন, ভারতীয়, আফ্রিকান, চিনা সংগীত, উদাহরণ হিসেবে: Chuck Berry এর “Johnny B. Goode” শুনে দেখতে পারা যায়)।
- ছবি (ডিএনএ স্ট্রাকচার, মানবদেহের গঠন, গাণিতিক ডায়াগ্রাম ইত্যাদি)।
ভয়েজার উৎক্ষেপণের পুরো বিষয়টাতে লিড দিয়েছিলেন কার্ল সেগান। তিনি ও তাঁর টিম ভেবেছিল- যদি কেউ কখনো এটা পেয়ে যায় (ভয়েজার-১ এবং গোল্ডেন ডিস্ক), তারা যেন বুঝতে পারে—আমরা ছিলাম, আমরা কেমন ছিলাম।
পৃথিবী থেকে বহু বহু দূরে চলে যাবার পর ভয়েজার-১ একটা ছবি পাঠিয়েছিল (সংযুক্ত ছবিটি)। সেই ছবিতে পৃথিবীকে একটা ধূসর-নীল বিন্দু দেখাচ্ছিল।
সেই বিন্দু দেখিয়ে কার্ল সেগান বলেছিলেন-
"Look again at that dot. That's here. That's home. That's us. On it everyone you love, everyone you know, everyone you ever heard of, every human being who ever was, lived out their lives. The aggregate of our joy and suffering, thousands of confident religions, ideologies, and economic doctrines, every hunter and forager, every hero and coward, every creator and destroyer of civilization, every king and peasant, every young couple in love, every mother and father, hopeful child, inventor and explorer, every teacher of morals, every corrupt politician, every "superstar," every "supreme leader," every saint and sinner in the history of our species lived there--on a mote of dust suspended in a sunbeam".
কার্ল সেগানের এই লেখাটা আরও বড়। পুরোটা পড়ার ধৈর্য্য অবশ্যই আমাদের নেই। পুরো টেক্সটের একটা সংক্ষিপ্ত কাব্যিক রূপ এখানে লিখে ফেলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করবেন-
ওই বিন্দুটার দিকে আবার তাকাও-
ওটাই আমাদের ঘর,
ওটাই আমাদের সবকিছু।
ওখানেই জন্ম নিয়েছে ভালোবাসা,
ওখানেই ঘৃণা, যুদ্ধ, আর স্বপ্ন।
যত মানুষ জন্মেছিল-
সবাই হেঁটেছে সেই ক্ষুদ্র আলোছায়ার ওপর।
হাসি, কান্না, জয় আর পরাজয়,
রাজা আর ভিখারি,
নায়ক আর ভীতু মানুষ-
সব গল্প এই বিন্দুটির ভেতরেই লেখা।
মহাবিশ্বের বিশাল অন্ধকারে
এটা কেবলই এক ধূসর নীল বিন্দু,
তবু আমাদের কাছে-
ওটাই পুরো পৃথিবী, ওটাই সব।
আমরা নিজেদের খুব বড় ভাবি,
নিজেদের গুরুত্ব নিয়ে গর্ব করি,
কিন্তু দূর থেকে দেখলে-
সব অহংকার বিলীন হয়ে যায় এই এক বিন্দুতেই...!
©️