14/01/2023
"স্মৃতিচারণ"
লিখেছেনঃ জান্নাতুল ফেরদৌস (জান্নাত)
ব্যাচঃ ২০০৬
*আমাদের স্কুলের কিছু প্রাপ্তি এবং আমি*
জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে পরিচয়টা হয়েছিল আমি যখন ক্লাস ফাইভ এর শেষ সময়ে।তখন জাওবি র পক্ষ থেকে প্রচারণার জন্য আমাদের প্রাইমারি স্কুলে(মোহাম্মদ পুর স: প্রক একটি টিম এসেছিল।তখন থেকেই জাওবি তে পড়ার জন্য স্বপ্ন দেখা শুরু!
প্রাণের স্কুল জাওবি র সাথে পথচলাটা শুরু ২০০০ ইং তে যখন ক্লাস সিক্স এ ভর্তি হই।স্কুল থেকে এতো ভালোবাসা পাবো ভাবিনি।ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ায় শিক্ষক দের মনযোগটা একটু বেশিই ছিল।স্কুল থেকে প্রথম ভালোবাসার উপহার হিসেবে আখতার স্যার আমাকে ইংরেজি গ্রামার বইটা দিয়েছিলেন।প্রায়ই দিদার স্যার,শরীফ স্যার টিফিনের সময় আমি আর আমার ভাইয়াকে (মোজাহের আহমেদ,তখন ও ক্লাস নাইন এ পড়ে,রোল নং ০১)টিফিন কিনে দিতেন।আমাদের দুই ভাইবোনকে স্যারেরা অনেক ভালোবাসতেন।
দিদার স্যার ক্লাসে ঢুকামাত্র আমার মাথার সাথে মাথা ঠুকে বলতেন,"এই জান্নাত আরা কালকে তোমার মাথায় শিং গজাবে দেখো"।দেখতে অনেক টাই পিচ্চি ছিলাম তাই টিচার দের অনেক স্নেহ পেয়েছি।বেশি ভয় পেতাম গণিত টিচার এমদাদ স্যার কে(আমরা ওনাকে ডাকতাম কেরাণী স্যার,সরি*।
ক্লাস করতে করতে কখন যে ক্লাসমেট মেয়েগুলো আপন হয়ে গেলো।আর আমি পেয়েছিলাম আমার প্রিয় বান্ধবীকে(তাসমিন),যে আমি না খেলে তার টিফিন খেত না।
প্রথম দিকে কিছু দুষ্টু টাইপ এর বান্ধবী ও ছিল যারা ক্লাসে ছেলেদের সাথে ঝগড়া করতো।আর আমার উপর দায়িত্ব ছিল যারা ক্লাসে টিচার না থাকা অবস্থায় কথা বলে তাদের নাম লিখে টিচার কে দেয়া।টিচার কোন একদিন নাম চেক করতে না আসলে সেদিন একটা কথায় ই শুনতাম,"যা বাড়িতে গিয়ে আমাদের নাম গুলো ধুয়ে পানি খাস।"
সিক্স কি সেভেন এর সময়ে নতুন দুইজন টিচার- পাপড়ি ম্যডাম এবং রিদওয়ান উল বারী স্যার জয়েন করেছিলেন স্কুলে।ম্যাম ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি টাইপের।সারাক্ষন শুধু পরিচ্ছন্নতার কথাই বলতেন।
আর ধর্মীয় শিক্ষক বারী স্যার কে পেয়েছিলাম সৃজনশীল ধাচের একজন মানুষ হিসেবে।একেবারে এস এস সি পরীক্ষা পর্যন্ত পেয়েছি স্যার এর গাইড়লাইন।।সেভেন এ থাকতে বিদায় নিয়েছিলেন শরীপ স্যার এবং দিদার স্যার।খুবই মন খারাপ হয়েছিল তখন।
ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার সময় বুঝতে পেরেছিলাম একটা স্কুল তার ছাত্রছাত্রীদের থেকে কি চাই।অনেক কষ্ট করেছিলেন টিচার রা যাতে কেউ একজন হলেও সরকারি বৃত্তিটা পায়।কিন্তু আমরা কেউ টিচার দের খুশি করতে পারিনি।
নতুন করে আবার পেয়েছিলাম বেশ ক'জন ভালো টিচার।আফরোজা ম্যডাম,সায়েরা ম্যডাম।
আমরা যখন নবম শ্রেণিতে তখন একদিন প্রধান শিক্ষক আখতার স্যার এসে বলেছিলেন একটা কুইজ প্রতিযোগিতার কথা।আর সেটা হবে টেলিভিশন (CTV) এ সমপ্রচার।ক্লাস ক্যাপটেন হিসেবে আমাকেই নির্বাচন করা হলো ।আর দশম শ্রেণি থেকে ছিলেন দুই জন রোখসানা আপু এবং একজন ভাইয়া।
তো আবার শুরু টিচার দের দৌড়ঝাঁপ।
আমাদের অনুশীলনের বিষয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন পাপড়ি ম্যাম,বারী স্যার এবং চান মিয়া স্যার।কারণ জেনারেল নলেজ এর ছিটেফোঁটা ও আমাদের মাঝে ছিলো না!(বিশেষত আমি🤔)।প্রায় দুই সপ্তাহ চলেছিল অনুশীলন।
প্রতিযোগিতার দিন প্রধান শিক্ষক এবংপাপড়ি ম্যাম আমাদের কে নিয়ে গিয়েছিলেন নির্ধারিত স্থানে।পুরোটাই স্কুল এর খরচে।অবশেষে প্রতিযোগিতা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে এবং অবিশ্বাস্য ভাবে আমার নেতৃত্বে আমাদের দল জয়ী হয়।এটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।এবং স্কুল কে এর ক্রেডিট দিতে পারা টা আমার কাছে সবছে বড় ব্যপার ছিল ।
এভাবে কখন যে আমাদের ব্যাচটা 2006 এর পরীক্ষার্থী হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি।
আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল টিচার দের কঠিন পরিশ্রম। কারণ এই ব্যাচটা ই যে স্কুলের নামে প্রথম এক্সাম দিবে।আমাদের ও আর কি ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা তখন।টিচার রা আমাদের ব্যাচ টা কে নিয়ে খুব ই চিন্তিত ছিলেন।
নির্বাচনী পরীক্ষায় মাত্র ১৭ জন কে সিলেক্ট করা হয়েছিল।এই ক'জনকে নিয়ে ই চলেছিল শিক্ষক দের লড়াই।সাথে ছিল আমাদের স্কুল কমিটি র সভাপতি,সদস্যগণের অনুপ্ররেণা মূলক স্পিস।
এমনকি বিদায় অনুষ্ঠানে তো এক একজন নগদ অর্থ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন যদি কেউ GPA 5 পায়।
আলহামদুলিল্লাহ ওই বছর জাফরাবাদ উচচ বিদ্যালয় থেকে দুই জন GPA 5 (আমি এবং আমার কাজিন আনোয়ার জাহেদ)সহ মোট ১৬ জন পাস করে।যা ছিল গড়ে প্রায় ৯৮% পাস।এবং আমাদের স্কুল এক নতুন ভাবে পরিচিতি পায়।
এটা ছিল পুরোটা ই আমাদের টিচারদের অক্লান্ত পরিশ্রম এর ফল এবং ব্যাচ ক্রেডিট***।
দুই জন GPA 5 পাওয়াই টিচার দের খুশি যেন অনেক গুণ বাড়তি ছিল।স্যারদের খুশি র কারন এর একটা অংশ হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছি।কারণ স্কুল থেকে আমি অনেক পেয়েছি।
স্কুলের সহপাঠী,সিনিয়র,জুনিয়রদের কাছ থেকে পেয়েছি অপার ভালোবাসা।মিস করি হারিয়ে যাওয়া বন্ধন গুলো।
মিস করি ইলিয়াস স্যার এর গণিত ক্লাস।গণিত করানোর ফাঁকে স্যারের কপাল থেকে চুল সরানোর দৃশ্য আর মৃদু হাসি।
মিস করি আখতার স্যার এর শান্ত ভংগিতে ইংরেজি পড়ানো।
মিস করি চান মিয়া স্যার এর রসায়ন পড়ানোর ফাঁকে রসের কবিতা বলা আর
শাহানা ম্যডাম এর বাংলা পড়ানোর সময় মুচকি মুচকি হাসি।এবং প্রিয় সায়েরা ম্যাম এর জীববিজ্ঞান এর খুটিনাটি পড়া(আমার ফেবারিট সাবজেকট)।
ভালো থাকুক পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রিয় মানুষ গুলো।আপনাদের আশির্বাদ এবং অনুপ্ররেণা ই এই ক্ষুদ্র জীবনে চলার পথে পাথেয়।
প্রিয় বিদ্যালয়ের ঊত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।