11/08/2026
যে তাঁতের কাপড় একসময় কেউ কিনতে চাইত না, আজ সেটাই বিদেশে বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ দামে। আর এই বদলটা রুবিনা আক্তার নিজের চোখে দেখেছেন।
ছোটবেলা থেকে রুবিনার ঘুম ভাঙত তাঁতের শব্দে। বাবা তাঁতি, দাদাও ছিলেন। কুমিল্লার সেই গ্রামে প্রায় প্রতি ঘরেই কাঠের তাঁতে সুতো ওঠানামা করত সারাদিন, খট, খট, খট।
তারপর শব্দটা একে একে থেমে যেতে লাগল। বাজারে সস্তা মেশিনের কাপড় ঢুকল। এক গজ হাতে বুনতে যেখানে সারাদিন লাগে, মেশিন সেখানে মিনিটে বের করে হাজার গজ। দাম নেমে গেল, তাঁতিরা লোকসানে পড়ল। রুবিনার পাড়ার একের পর এক তাঁত বন্ধ হলো, কেউ রিকশা চালাতে গেল, কেউ গার্মেন্টসে। বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের তাঁতটাও চুপ হয়ে গেল কোণে।
রুবিনা ভাবতেন, এই শিল্পটা বুঝি শেষ। বাবার হাতের ওই খাদি, ওই তাঁতের নকশা, সব হারিয়ে যাবে।
কিন্তু একদিন একটা জিনিস চোখে পড়ল তার। অনলাইনে এক বিদেশি মেয়ে গর্ব করে দেখাচ্ছে তার জামা, লিখেছে "handwoven, natural, sustainable"। দাম দেখে রুবিনার চোখ কপালে। হাতে বোনা বলেই সেই কাপড় দামি, মেশিনের কাপড়ের চেয়ে কয়েকগুণ।
তখন একটা কথা মাথায় বিঁধল। মেশিন যেটা পারে না, সেটাই তো তাদের কাছে আছে। ওই "হাতে বোনা" জিনিসটাই, যেটাকে তারা এতদিন দুর্বলতা ভেবেছিল।
রুবিনা বাবার সেই পুরোনো তাঁতটা আবার চালু করলেন। পাড়ার যে কয়জন বুড়ো তাঁতি এখনো ছিলেন, তাদের ডাকলেন। অল্প কিছু খাদি আর তাঁতের কাপড় বুনলেন, ভালো ছবি তুললেন, আর সাথে জুড়ে দিলেন গল্পটা, কে বুনেছে, কোন গ্রামে, কত বছরের ঐতিহ্য।
বিদেশি ক্রেতারা ঠিক এই গল্পটার জন্যই এসেছিল। তারা শুধু কাপড় কিনছিল না, কিনছিল একজন মানুষের হাতের সময়, একটা টিকে থাকা ঐতিহ্য।
তবে এই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোই ছিল রুবিনার আসল পরীক্ষা। কাপড় বোনা সে জানত, কিন্তু বিদেশি বায়ার কোথায় পাবে, সেটা জানত না। শুরুতে অনেকদিন হাতড়েছে।
প্রথমে সে যা করল, নিজের বোনা কাপড়ের সুন্দর ছবি তুলে অনলাইনে দিতে শুরু করল, ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকে, ইংরেজিতে, সাথে সেই গল্পটা, কোন গ্রামের হাতে বোনা, কত বছরের ঐতিহ্য। ধীরে ধীরে বিদেশি কিছু মানুষ আগ্রহ দেখাতে লাগল, কেউ কমেন্ট করত, কেউ দাম জিজ্ঞেস করত।
এর সাথে সে খুঁজে বের করল কিছু আন্তর্জাতিক হ্যান্ডিক্রাফট আর সাসটেইনেবল ফ্যাশনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দুনিয়ার মানুষ ঠিক এমন হাতে বানানো জিনিসই খুঁজতে আসে। সেখানে নিজের ছোট একটা পেজ খুলল, কয়েকটা পণ্য তুলল। প্রথম অর্ডারটা এসেছিল একজন বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে, মাত্র একটা কাপড়ের। রুবিনা সেটা এমন যত্ন নিয়ে বুনে, সুন্দর করে প্যাক করে পাঠাল, যেন এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্ডার। তবে বায়ার খুজেঁ পাওয়ার জার্নিটা মোটেও সহজ ছিলোনা। আর বেশিরভাগ মানুষ এই জায়গাটাতেই থেমে যায়।
ঠিক এই জায়গাটার জন্যই আমরা তৈরি করেছি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট অপারেটিং সিস্টেম EximTool. যেখানে প্রোডাক্ট লিখে সার্চ দিলেই সামনে চলে আসে HS কোড, ডিউটি, কোন দেশে ডিমান্ড বেশি, স্টেপ-বাই-স্টেপ এক্সপোর্ট প্রসেস গাইড, আর ১১০+ দেশের ভেরিফাইড বায়ার কন্টাক্ট, সব এক জায়গায় গোছানো। ছড়ানো তথ্যের পেছনে দৌড়ানো বন্ধ, ডেটা দেখে সোজা সিদ্ধান্ত। রুবিনার মতো যাদের হাতে পণ্য আছে কিন্তু বায়ার নেই, তাদের জন্য এই একটা জিনিসই পুরো পথটা সহজ করে দেয়।
আজ রুবিনার গ্রামে আবার সেই শব্দটা ফিরেছে, খট, খট, খট, কিন্তু এবার সেই কাপড় যাচ্ছে দেশের বাইরে। সে নতুন কিছু আবিষ্কার করেনি, যা ছিল তা-ই ফিরিয়ে এনেছে, শুধু দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলেছে।
দুনিয়া এখন মেশিনের ভিড়ে আবার খুঁজছে মানুষের হাতের ছোঁয়া। আমাদের যেটা আছে, যেটাকে আমরা মূল্যহীন ভেবে ফেলে দিচ্ছি, সেটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। দরকার শুধু সঠিক তথ্য আর একটা শুরু।
আপনার আশপাশে এমন কোন পুরোনো শিল্প নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে, যেটার দিকে দুনিয়া আসলে নতুন করে তাকাতে শুরু করেছে?