09/01/2024
খনার বচনের খনা...
লেখক ও ভাষা গবেষক
মো. হারুন উর রশীদ ভূঁইয়া (রবিন)
টিকটিকি নিয়ে গ্রাম বাংলায় একটি লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। কেউ কোনো কথা বলার সময় যদি কোনো টিকটিকি পরপর তিনবার টিক টিক টিক করে ডেকে উঠে তাহলে সকলে ধরে নেয় কথাটি সত্য। কোন বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু জানা নেই, আনুমানিক কিছু একটা ধারণা করে কেউ কিছু একটা বললো, এমন মুহূর্তে টিকটিকি ডেকে উঠলে মানুষ ধরে নেয় ঐ ধারণাটিই সঠিক। কীভাবে এলো এ ধারণা। জেনে নেই খনার বচন ও খনা কে।
কথিত আছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি খনা। দ্বিতীয় নারী কবি রামী বা রজকিনী। তৃতীয় নারী কবি মাধবী। বাংলার চতুর্থ নারী কবি ও বাংলাদেশের প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতী। কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি।
ক) বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি কে?
খ) বাংলার প্রথম (নারী) কৃষিবিদ কে?
গ) বাংলার প্রথম জ্যোতিষবিদ্যা ও গণিতে পারদর্শী নারী কে?
ঘ) কে বাংলার প্রথম নারী পরিবেশবিদ?
ঙ) কার কথিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রখরতায় ঈর্ষান্বিত শ্বশুর ও স্বামী নিজেদের অধন্তনতা ও হীনমন্যতা আড়াল করতে প্রাজ্ঞ নারীর জিব কেটে দিয়েছিলেন?
সে হলো খনা ওরফে লীলাবতী। বাংলা অভিধানে খনা বলতে বিশেষ্য ও হিসেবে জ্যোতিষ ও গণিতশাস্ত্রে পারদর্শিনী প্রাচীন বাংলার প্রখ্যাত নারী, মিহিরের স্ত্রীও বরাহের পুত্রবধূকে বোঝায়। আবার বিশেষণ হিসেবে খনা বলতে নাকি সুরে কথা বলাকে বোঝায়। খনা বলতে আমরা সাধারণভাবে বুজি প্রাচীন বিদূষী এক বাঙালি নারীকে, যিনি একাধারে জ্যোতিষবিদ, গণিতজ্ঞ ও কবি। বাংলা অঞ্চলে কথিত আছে, শুভক্ষণে জন্ম নেওয়ার কারণে তিনি ক্ষণা বা খনা। আবার উড়িয়া ভাষায় খনা বা খোনা মানে বোবা। উড়িষ্যার প্রচলিত আছে, জিব কেটে মিহিরি লীলাবতীকে খোনা করে দেওয়ায় লীলাবতীর নাম হয় খোনা অথবা খনা। আবার কোন এক পন্ডিতের মতে, খনার বচনগুলোর সঙ্গে যেহেতু দিনক্ষণের একটা সম্পর্ক আছে, সেখানে ‘ক্ষণ’ থেকে ‘খন’ হয়ে ‘খনা’ শব্দটা এসেছে। খনা নিয়ে লিখিত কোন ইতিহাস নেই, যা আছে তা কেবল কথিত । সময়কাল নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট মতভেদ। খনার প্রকৃত জন্মস্থান কোথায়, তার পিতামাতা কে, কোথায় থেকে তিনি এসেছেন, সঠিক কোন সময়ে তিনি জন্মেছিলেন, কত দিন বেঁচেছিলেন এসব কোনোকিছুই নিশ্চিতরূপে কেউই জানেন না। তবে বিভিন্ন কিংবদন্তিগুলোকে একত্রে সাজালে খনার জীবনকালের একটা ধারণা করা যায়।
জন্ম
বাংলা (বারাসত) কিংবা সিংহল।
বেড়ে ওঠা
বারাসত (আচার্যের কন্যা), সিংহল (সিংহলের রাজকন্যা), অথবা রাক্ষসদের রাজত্বে (সিংহলে কিংবা বাংলার কোনো দ্বীপে)
খনার জীবনকাল
অনুমান করা হয় ৮০০ থেকে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ। কিন্তু ঐতিহাসিক চরিত্র বরাহ (৫০৫-৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) যদি খনার শ্বশুর হয়ে থাকেন, তাহলে খনার জীবনকাল আনুমানিক ৮০০-১১০০ খ্রিষ্টাব্দের চেয়ে আরও কয়েক শত বছর আগে হওয়ার কথা। ওদিকে খনার বচনের ভাষা, আঙ্গিক ও বাক্য গঠনের রীতি দেখে ভাষা বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই ধারণা এই বচনগুলোর বয়স চারশত বছরের বেশি হবে না। কারণ তৎকালে যে ভাষার প্রচলন ছিল তার সাথে খনার বচনের মিল পাওয়া যায় না। খনার বচন অপেক্ষাকৃত আধুনিক। এ ভাষার বয়স কোনোভাবেই চারশত বছরের বেশি হবে না।
উল্লেখ্য ভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। খুব সুন্দর একটি উদাহরণ দিতে পারি: চর্যাপদের কবিতা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা বিবেচনা করুন। খেয়াল করলে সহজেই ধরে ফেলা যায়। প্রাচীনকালের ক্রম অনুসারে এদেরকে সাজানো হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা যে কেউই চেষ্টা করলে সহজে অনুধাবন করতে পারবে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা অনুধাবন করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে, কারণ কবিতার ভাষা রবীন্দ্রনাথের কাল থেকে আরো আগের। অন্যদিকে চর্যাপদের কবিতা পড়ে বুঝতে গেলে রীতিমতো গবেষক হওয়া লাগবে। এটি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। এই ছোট্ট একটি তুলনা থেকেও বোঝা যায় খনার বচনগুলো কখনোই চারশত বছর আগে রচিত হয় নি। সেটা ধরে নিলে খনার জীবনকাল ৮০০-১১০০ খ্রিষ্টাব্দ না হয়ে আরও কয়েক শত বছর পরে হওয়ার কথা।
তবে এটা সম্ভব যে, বচনগুলো মৌলিকভাবে অন্যরকম করে অথবা অন্য কোন ভাষায় রচিত হয়েছিল। শুরুতে এগুলোর মৌখিক রূপ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো পুনর্নির্মিত, লিখিত ও পুনর্লিখিত হয়েছে। ধীরে ধীরে এগুলো ভাষান্তরিতও হয়েছে। হয়তো শুরুতে বচনগুলো প্রাচীনই ছিল, সময়ের সাথে সাথে মানুষের মুখে মুখে সেগুলো বিবর্তিত হয়ে আজকের রূপে এসে দাঁড়িয়েছে। খনার বচন নিয়ে আরো একটি প্রশ্ন দেখা দেয়। এখানে কৃষি, আবহাওয়া, খাদ্য, জ্যোতিষবিদ্যা সম্বন্ধে অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা বলা আছে। একজনের পক্ষে এতকিছু জানা সম্ভব নয়। বর্তমানের শিক্ষা পদ্ধতিতে কেউ বই পুস্তক পড়ে স্বল্প সময়ে অনেক কিছু জেনে ফেলতে পারে। কিন্তু সে সময়ে কোনোকিছু সম্বন্ধে জানতে হলে লাগতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। এত বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে যে একজনের পক্ষে এত বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করা কখনোই সম্ভব নয়।
এর একটি সমাধান হতে পারে এমন- যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে নানা ধরনের শ্লোক তৈরি করেছে। সেগুলো প্রচলিতও হয়েছে। পরবর্তীতে সেসব শ্লোক বিশেষ ব্যক্তির নামে প্রচলিত না হয়ে সবগুলো একত্রে একজন ব্যক্তি খনার নামে প্রচলিত হয়েছে। এখান থেকে একটি প্রশ্ন জাগে খনা নামে কেউ কি আদৌ ছিল? খনা কি আদৌ এই বচনগুলোর প্রবক্তা?
উত্তর হলো হ্যাঁ, খনা নামে একজন নারীর অস্তিত্ব ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাশাপাশি তিনি বেশ কতগুলো শ্লোক বা বচন প্রদান করেছিলেন তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ হলো খনার বচনের সবগুলোই তিনি প্রদান করেছেন কিনা? সবগুলোর প্রদত্তা তিনি না হওয়াটাই বাস্তবসম্মত। এক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, তিনি কৃষি, আবহাওয়া, খাদ্য সম্বন্ধে বেশ কিছু বচন প্রদান করেছিলেন। সেগুলো মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছিল। পরবর্তীতে কৃষি নিয়ে, আবহাওয়া নিয়ে, খাদ্য নিয়ে অন্যান্য যারাই কোনো শ্লোক বা বচন প্রদান করেছে সেগুলো খনার নামে পরিচিতি পেয়েছে। এ হিসেবে গ্রাম বাংলার শত শত বছরের হাজার হাজার মানুষ খনার বচনের রচয়িতা। তারা সকলে মিলে এক অভিন্ন খনা। এটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। কিছু উদাহরণ দিয়েই শেষ করছি আজকের লেখা-
ষোল চাষে মুলা,
তার অর্ধেক তুলা;
তার অর্ধেক ধান,
বিনা চাষে পান।
এটির মানে হলো ১৬টি চাষ দিয়ে মূলা বপন করলে ফলন পাওয়া যাবে ভালো। তুলা চাষ করতে হলে এর অর্ধেক চাষ অর্থাৎ ৮টি চাষ দিলেই হবে। ধান রোপণে এত চাষের প্রয়োজন নেই, মূলার অর্ধেক পরিমাণ অর্থাৎ ৪টি চাষ হলেই যথেষ্ট। অন্যদিকে পান উৎপাদন করলে কোনো চাষেরই প্রয়োজন নেই।
শীষ দেখে বিশ দিন
কাটতে মাড়তে দশ দিন।
অর্থাৎ চাষি যখন তার ধানের গাছে শীষ দেখতে পাবে তার ঠিক ২০ দিন পরেই যেন সে ধান কেটে নেয়। শীষ বের হবার ২০ দিন পর ধান কাটার এবং মাড়াই করার উপযুক্ত সময়।
শুনরে বাপু চাষার বেটা
মাটির মধ্যে বেলে যেটা
তাতে যদি বুনিস পটোল
তাতে তোর আশা সফল
অর্থাৎ বেলে মাটিতে যদি পটোল চাষ করা হয় তাহলে চাষি তার আশানুরূপ ফলন পাবে। এগুলো বাদেও আরো শত শত খনার বচন প্রচলিত আছে লোককথায়।