03/09/2026
রোগীটার নাম দরকার নাই। আপনি নিজেই তারে চেনেন। পেটে ব্যথা নিয়া সে চেম্বারে গেছে। সিরিয়াল নিসিল সকালে, ডাক পড়ল রাত নয়টায়। ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতেই ডাক্তার প্যাড টাইনা নিলেন। দুই তিনটা প্রশ্ন। পেটে একবার হাত। তারপর কলম চলল। আলট্রাসনো, সিবিসি, লিভার ফাংশন, ক্রিয়েটিনিন, এন্ডোস্কোপি, আরো হাবিজাবি অনেক কিছু। কলম দিয়াও লেখে নাই, একটা ছাপানো ফর্মে টিক দিসেন। মাঝে মাঝে পুরুষ মানুষের ফর্মেও টিক পইড়া যায় প্রেগন্যান্সি টেস্ট।
লোকটা কাগজটা হাতে নিয়া বাইর হইল। দরজার বাইরেই একজন কাছে আইসা দাঁড়াইল। ভাই, কোথায় করাইবেন? চলেন আমার সাথে, ছাড় পাইবেন। বিল হইল সাড়ে সাত হাজার। দালাল বলল, বিশ পার্সেন্ট ছাড় দিলাম, ছয় হাজার দেন।
লোকটা মনে মনে হিসাব করল, পনেরোশ টাকা বাঁচল। ভাবল, আজকের দিনটা তাও ভালো গেল। আর ঠিক ওই মুহূর্তে তার সাথে সবচেয়ে বড় প্রতারণাটা হইয়া গেল, যেইটা সে জীবনেও জানবে না।
ওই ছাড়টা আসলে কী? দালাল রোগী নিয়া গেলে সেন্টার তারে কমিশন দেয়। একজন দালাল সাংবাদিককে বলসিলেন, একটা সেন্টার দালালদের প্যাথলজি পরীক্ষায় চল্লিশ শতাংশ আর ইমেজিংয়ে ত্রিশ শতাংশ কমিশন দেয়। তাঁর নিজের ভাষায়, অনেক সময় রোগীকে বিশ শতাংশ ছাড় দিই, বাকি পনেরো বা বিশ শতাংশ নিজে নিই, রোগীকেও তো সন্তুষ্ট করা লাগে। যে লোকটা আপনাকে ছাড় দিতেসে, সে ওইটা নিজের পকেট থেকে দিতেসে না। সে দিতেসে তার কমিশনের ভিতর থেকে। আর দেওয়ার পরেও তার হাতে থাকতেসে পনেরো বিশ শতাংশ। মানে ওই বিলটায় চল্লিশ শতাংশ আগেই ফোলানো ছিল।
আপনি ছাড় পান নাই। আপনি ফোলানো দামের একটা টুকরা ফেরত পাইসেন, আর ওইটার জন্য কৃতজ্ঞ হইয়া বাসায় ফিরসেন। আপনি যেই ডাক্তারের কাছেই যান না কেন, ওই পরীক্ষার টাকার বিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ ঘুইরা ওই ডাক্তারের কাছেই পৌঁছায়।
কীভাবে, ওইটা বোঝার জন্য একটা সহজ প্রশ্ন করেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভিতরে যেই ঘরটায় ডাক্তার বইসা রোগী দেখেন, ওই ঘরটার ভাড়া কে দেয়?
উনি দেন না।
কিন্তু ঘরটার তো একটা দাম আছে। ওই জায়গাটা কিনতে বা ভাড়া নিতে টাকা লাগসে। ঘরটা বানাইতে টাকা লাগসে। এসি আছে, আলো আছে, চেয়ার টেবিল আছে, সহকারী আছে। মাসে বিদ্যুৎ বিল আছে, রক্ষণাবেক্ষণ আছে। মালিক তো দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালান না। তাহলে ওই খরচটা ওঠে কোথা থেকে?
ওইটা ওঠে আপনার পরীক্ষার বিল থেকে। ভাড়াটা মাফ হয় নাই। ভাড়াটা আপনার ঘাড়ে চালান কইরা দেওয়া হইসে, আর আপনাকে জানানোও হয় নাই।
আর একজন ডাক্তার যদি জানেন যে রোগী পরীক্ষা করাইলে তাঁর নিজের লাভ, তখন কী হয়? তিনি ইচ্ছা কইরা খারাপ কিছু করেন, তা না, মানুষের মন এইভাবে চলে না। যা হয় তা হইল, সন্দেহ হইলে তিনি পরীক্ষাটা লিখা দেন। আরেকটা লিখলে ক্ষতি কী, এই ভাবনাটা একটু বেশি সহজে আসে। আর ওই একটু বেশি সহজে আসাটাই, সতেরো কোটি মানুষের দেশে, বছরে কত হাজার কোটি টাকা দাঁড়ায়, ওইটা কেউ কোনোদিন হিসাব করে নাই।
আর টাকাটা যায় নগদে। নগদ মানে ব্যাংকে ঢোকে না। নিরীক্ষায় ধরা পড়ে না। আয়করের লোক কোনোদিন খোঁজ পায় না। কোনো কাগজ নাই, কোনো সই নাই, কোনো প্রমাণ নাই। যেই টাকার কোনো নথি নাই, ওই টাকার অস্তিত্বও নাই। আর যেই জিনিসের অস্তিত্ব নাই, ওইটা নিয়া তদন্তও হয় না।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা হইল, ওই কমিশনের অনেকটা ডাক্তারের কাছে পৌঁছায়ও না। যারা টাকাটা বিলি করে, তাদের একটা শক্ত সিন্ডিকেট গইড়া ওঠে। তারা বেশিরভাগ সময় ওই টাকা তুইলা নিজেরাই মাইরা দেয়। আর সেন্টারের কোনো সমস্যা নাই, তারা ওইটা খরচ হিসাবেই ধইরা রাখসে। খরচটা ঠিকই আপনার বিলে বসানো আছে। ওইটা শেষে কার পকেটে গেল, ওই প্রশ্নটা মালিকের না।
মানে আপনি টাকাটা দিসেন, ওইটা কে খাইল কেউ জানে না, শুধু আপনি জানেন না যে আপনি দিসেন।তো সব ডাক্তার কি কমিশন নেন? না, নেন না। আর সব সেন্টার কি কমিশন দেয়? না, দেয় না।
বারডেম দেয় না। আর্মড ফোর্সেস প্যাথলজি দেয় না। আইসিডিডিআরবি দেয় না। বেসরকারিদের মধ্যে ইবনে সিনাও দেয় না, যদিও তাদের সেন্টারে বসা ডাক্তারদের কাছ থেকে তারা ভাড়াও নেয় না। আর তারা টিকা আছে। বছরের পর বছর। এইটাই প্রমাণ যে জিনিসটা অসম্ভব না। যেই দেশে একটা প্রতিষ্ঠান কমিশন ছাড়া চলতে পারে, সেই দেশে বাকিরা পারে না কেন? উত্তরটা সহজ। তাদের পারতে হয় না। কারণ কেউ জিজ্ঞাসা করে না।
আর এইখানেই সবচেয়ে বিস্ময়কর জিনিসটা।
অনলাইনে বিভিন্ন সেন্টারের পরীক্ষার দাম পাশাপাশি রাখেন। কোনো ব্যাখ্যা দিয়া মেলানো যায় না। ডায়াবেটিসের পরীক্ষা এইচবিএ ওয়ান সি। পপুলারে পনেরোশ টাকা। বারডেমে আটশ চল্লিশ। ইবনে সিনায় সাতশ পঞ্চাশ। পপুলারের দাম ইবনে সিনার ঠিক দ্বিগুণ, বারডেমের চাইতে ঊনআশি শতাংশ বেশি। একই রক্ত, একই যন্ত্র, রিপোর্টে একই সংখ্যা।
লিভার ফাংশন টেস্ট। ল্যাবএইডে ষোলশ। বারডেমে এগারোশ পঞ্চাশ। পপুলারে এক হাজার। ইবনে সিনায় সাতশ পঞ্চাশ। ল্যাবএইডের দাম পপুলারের চাইতে ষাট শতাংশ বেশি, আর ইবনে সিনার চাইতে একশ তেরো শতাংশ বেশি।
রক্তের গ্রুপ আর আরএইচ। ইবনে সিনায় পাঁচশ। বারডেমে সাড়ে চারশ। আইসিডিডিআরবিতে আড়াইশ। ল্যাবএইডে দুইশ। এইখানে হিসাবটা উল্টায়ে গেল। যেই ইবনে সিনা লিভার টেস্টে সবার চাইতে সস্তা, তারাই রক্তের গ্রুপে সবার চাইতে দামি, ল্যাবএইডের আড়াই গুণ।
এখন প্রশ্নগুলা করেন।
পপুলারকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার এইচবিএ ওয়ান সি-র দাম বারডেমের প্রায় দ্বিগুণ কেন? ল্যাবএইডকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার লিভার টেস্টের দাম রাস্তার ওইপারের পপুলারের চাইতে ষাট শতাংশ বেশি কেন?ইবনে সিনাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা তো কমিশন দেন না, তাহলে আপনার রক্তের গ্রুপের দাম ল্যাবএইডের আড়াই গুণ কেন? আর বারডেমকে জিজ্ঞাসা করেন, আইসিডিডিআরবি যেই কাজটা আড়াইশ টাকায় করে, আপনার সাড়ে চারশ লাগে কেন? আপনার দামটা যৌক্তিক, এইটা আমারে একটু বুঝান। এই প্রশ্নগুলা কেউ করে না। কোনো সাংবাদিক না, কোনো কমিটি না, কোনো অধিদপ্তর না। আর যেই দামের ব্যাখ্যা কেউ চায় না, সেই দাম কোনোদিন কমেও না।
তবে আসল ক্ষতিটা টাকার না। আরো বড় কিছুর।
রোগী ডাক্তারের কাছে যায় একটা জিনিস কিনতে। ওষুধ না, পরীক্ষা না। সে কিনতে যায় একটা সিদ্ধান্ত। আমার শরীরে কী হইতেসে, আর এখন আমার কী করা দরকার। ওই সিদ্ধান্তটা যাচাই করার ক্ষমতা তার নাই। ওইটা থাকলে তো সে ডাক্তারের কাছে যাইতই না। মানে সে যা কিনতেসে, ওইটা সে পরীক্ষা কইরা দেখতে পারে না। পুরা লেনদেনটা দাঁড়ায়া আছে একটাই জিনিসের উপর। বিশ্বাস। বিশ্বাস দুনিয়ার সবচেয়ে দামি সম্পদ। সোনা না, তেল না, জমি না। বিশ্বাস। এইটা একটা স্পিরিচুয়াল এসেট না, এইটা একটা ইকোনমিক এসেট।
পকেট থেকে এক হাজার টাকার নোটটা বাইর কইরা দেখেন। ওইটা এক টুকরা কাগজ। খাওয়া যায় না, পরা যায় না, পোড়াইলে সামান্য আগুন হয়। ওই কাগজের নিজের কোনো দাম নাই। তাহলে ওইটা দিয়া আপনি চাল কিনেন কীভাবে? কারণ দোকানদার বিশ্বাস করে যে কাল সেও ওইটা দিয়া কিছু কিনতে পারবে। এইটুকুই। টাকা আসলে একটা কাগজে ছাপানো বিশ্বাস। ব্যাংকে আপনার জমা টাকাটাও তাই। ওই টাকা সিন্দুকে পইড়া নাই, ওইটা অন্য কাউকে ধার দেওয়া হইয়া গেছে। আপনি রাখেন এই বিশ্বাসে যে চাইলে ফেরত পাবেন। একদিন যদি সবাই একসাথে গিয়া চায়, কোনো ব্যাংক টিকবে না। ব্যাংক টিকে থাকে কারণ সবাই একসাথে চায় না। শেয়ার একটা বিশ্বাস। বন্ড একটা বিশ্বাস। চেক, বিমা, ব্যাংকঋণ, দলিল, সবগুলাই কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি। আর প্রতিশ্রুতির দাম নির্ভর করে একটা জিনিসের উপর, লোকটা কথা রাখবে কিনা।
যেই সমাজে মানুষ একে অন্যকে বিশ্বাস করে, সেখানে কাজ হয় সস্তায় আর দ্রুত। এক ফোনে পণ্য চইলা আসে। আর যেই সমাজে বিশ্বাস নাই, সেখানে প্রতিটা লেনদেনে উকিল লাগে, জামানত লাগে, তিনজন সাক্ষী লাগে, আর সন্দেহ লাগে। ওই বাড়তি খরচটাই অবিশ্বাসের দাম, আর ওইটা গোটা দেশ প্রতিদিন শোধ করে। বিশ্বাস উইঠা গেলে অর্থনীতি টিকতে পারে না, কারণ অর্থনীতি জিনিসটাই আসলে পরস্পরের উপর ভরসার একটা জাল।
আর চিকিৎসা এই পুরা তালিকার সবচেয়ে চরম উদাহরণ। চাল কিনতে গিয়া আপনি চালটা হাতে নিয়া দেখতে পারেন। জামা কিনতে গিয়া সেলাই দেখতে পারেন। কিন্তু ডাক্তার যখন বলেন আপনার এন্ডোস্কোপি লাগবে, তখন আপনার হাতে যাচাই করার কিচ্ছু নাই। শূন্য। তাই ডাক্তার আর রোগীর সম্পর্কটা কেনাবেচার সম্পর্ক না। ওইটা আমানতের সম্পর্ক। আপনি নিজের শরীরটা একজনের হাতে জমা রাখতেসেন, ঠিক যেভাবে টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন।আর যেই মুহূর্তে ওই প্রেসক্রিপশনের সাথে একটা কমিশনের শতাংশ জুইড়া যায়, ওই আমানতটা আর নিরাপদ থাকে না। তখন রোগী আর জানে না তার সত্যিই এন্ডোস্কোপি লাগবে কিনা, নাকি ওইটা কারও মাসের হিসাব। সে সন্দেহ নিয়া বাইর হয়। দ্বিতীয় ডাক্তারের কাছে যায়। তৃতীয়জনের কাছে যায়। আর যার সামর্থ্য আছে, সে একদিন পাসপোর্ট বানায়, ভিসার লাইনে দাঁড়ায়, ট্রেনে ওঠে।
আমরা এইটাকে বলি রোগীর অসচেতনতা। এইটা অসচেতনতা না। এইটা ব্যাংকে লাইন পড়ার মতো ঘটনা। মানুষ যখন আর ভরসা করে না, তখন সে জমাটা তুইলা নিয়া যায়। ব্যাংক ডুবতে বসলে সরকার বাঁচাইতে যায়। খবর হয়, তদন্ত হয়, টাকা ঢালা হয়। আর এই ব্যাংকটা ডুবতেসে চল্লিশ বছর ধইরা, প্রতিদিন, প্রতিটা চেম্বারে। কেউ একটা তদন্তও করে নাই।
দোষটা তাইলে কার?
ডাক্তাররা লোভী হইয়া গেছে, এইটা বলা সহজ। ওইটা লোভ না, ওইটাই ডিজাইন। ওইটাই বন্দোবস্ত। যেই রাষ্ট্রে ইন্সটিটিউশন নাই, সে বন্দোবস্ত দিয়া চলে। যেই ডাক্তার এই টাকা নেন না, তিনি কী পান? তিনি একই সময় দিয়া কম আয় করেন। তাঁর পাশের চেম্বারের লোকটা তিনটার জায়গায় সাতটা লিখে দ্বিগুণ কামায়। দুইজনের ডিগ্রি এক, রোগীও কাছাকাছি। আমি অন্য লেখায় বলসিলাম, যেই বাজারে মান যাচাই করা যায় না, সেই বাজার সৎ লোককে শাস্তি দেয়। এইখানেও ঠিক তাই।
আর টাকাটা আসে কার পকেট থেকে?
গ্রামের যেই লোকটা মাসে বারো হাজার টাকা কামায়, তার একটা এমআরআই লাগলে ওই মাসে ভাত কেনার টাকা থাকে না। সে ধার করে। আর তার ধার করা টাকার ভিতরে ত্রিশ চল্লিশ শতাংশ যাইতেসে এমন এক জিনিসের পিছনে, যার সাথে তার রোগের কোনো সম্পর্কই নাই।
সে জানে না। সে কোনোদিন জানবেও না। আর এইটা ঠেকানো কঠিন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাতেই আছে, লাইসেন্সের কপি প্রবেশপথের সামনে দৃশ্যমান জায়গায় স্থায়ীভাবে ঝুলাইতে হবে। আর গত বছর চট্টগ্রামে সিভিল সার্জনের দল একটা হাসপাতালে গিয়া দেখল, পরীক্ষার কোনো মূল্যতালিকাই প্রদর্শন করা হয় নাই, আর ল্যাব টেকনিশিয়ানের বদলে সহকারীরা রক্ত নিতেসেন। নিয়ম আছে। কেউ মানে না। কারণ না মানলে কিছুই হয় না।
প্রতিটা পরীক্ষার দাম প্রকাশ্যে ঝুলুক, আর অনলাইনে থাকুক। যেই দাম সবাই পাশাপাশি রাইখা দেখতে পারে, ওই দামে চল্লিশ শতাংশ ফোলানো রাখা কঠিন। উপরের ওই তুলনাগুলা আমি যদি ঘরে বইসা করতে পারি, তাহলে অধিদপ্তর কেন পারবে না?
প্রেসক্রিপশনের নিচে এক লাইন ছাপা থাকুক, এই পরীক্ষাগুলা আপনি যেকোনো জায়গায় করাইতে পারেন। এইটুকুতেই দালালের অর্ধেক কাজ শেষ।
আর ডাক্তার যেই ঘরে বসেন, ওই ঘরের একটা ভাড়া থাকুক, কাগজে লেখা ভাড়া। ভাড়া না থাকা মানেই সম্পর্কটা অন্য কিছু দিয়া শোধ হইতেসে।
আপনি নিজে খুব বেশি কিছু পারবেন না, এইটাই সত্য। আপনি জানেন না কোন পরীক্ষাটা দরকার ছিল। তবে একটা প্রশ্ন করতে পারেন। ডাক্তার সাহেব, এই পাঁচটার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে জরুরি, আর কোনটা পরে করলেও চলবে? এই প্রশ্নটা করার অধিকার আপনার আছে। আর দালালের সাথে যাইবেন না, যে আপনাকে ছাড় দিতেসে, ওই ছাড়টা আপনারই টাকা। অনেক কষ্টের উপার্জনের টাকা।
এই দেশে সবার একটা অভিভাবক আছে। ব্যবসায়ীদের আছে চেম্বার। শিল্পমালিকদের আছে সমিতি। ডাক্তারদের আছে সংগঠন। ওষুধ কোম্পানির আছে সমিতি। ডায়াগনস্টিক মালিকদেরও সমিতি আছে। কারও গায়ে হাত পড়লে পরদিন সংবাদ সম্মেলন হয়, বিবৃতি হয়, দরকার হইলে সেবা বন্ধ হইয়া যায়। শুধু ওই লোকটার কেউ নাই, যে রাত নয়টায় ছয় হাজার টাকার বিল হাতে নিয়া দাঁড়ায়া আছে। তার কোনো সমিতি নাই। তার হইয়া কেউ বিবৃতি দেয় না। সে অসুস্থ, সে ভয় পাইতেসে, সে জানে না তার কী হইসে, আর সে জানে না তার সাথে কী করা হইতেসে।এই দেশে রোগীর কোনো অভিভাবক নাই। আদতে আমজনতার কোন অভিভাবক নাই।
ওই করিডোরটার কথা আমার বারবার মনে পড়ে। যেইখানে সে কাগজ হাতে দাঁড়ায়া থাকে, আর তার পাশে আরেকজন আইসা কাঁধে হাত রাখে। আমি আগেও ওই করিডোরের কথা লিখসি। যেইখানে প্রসূতির স্বামী রক্ত খুঁজতেসেন। যেইখানে থ্যালাসেমিয়ার রোগীর বাবা প্রতি মাসে দাঁড়ান। এইটা সেই একই করিডোর। আর ওইখানে যে দাঁড়ায়া থাকে, সে আপনার জীবনের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তটার উপর ব্যবসা কইরা খায়।
আমরা তারে তাড়াই নাই। কেউ চিন্তাও করে নাই, তাকে তাড়াইতে হবে। কারণ ওই আমজনতা সে আসলে এই রাষ্টের কেউ না। কেউ না।