18/04/2026
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাক্বাতুহু
মূলত আমি ছিলাম একজন সেকেন্ড টাইমার। এই "সেকেন্ড টাইমার" শব্দ টা তে কতটা ভয়, সংকোচ, অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা কাজ করে সেটা কেউ স্বয়ং সেকেন্ড টাইমার না হলে বোঝা দায়। আমার বাবা নিজেও একজন চিকিৎসক। ছোটবেলায় যখন বাড়ি যেতাম তখন সবার মুখে একটাই কথা ডাক্তারের মেয়ে ডাক্তার ই হবে। ডাক্তার হবে না তো কি হবে?? তখন তো আর এতকিছু বুঝতাম না। ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন একটা মাথাব্যথাও ছিলনা।মামা চবির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক।তার সাথে যখন মাঝে মধ্যে ভার্সিটি তে বেড়াতে যেতাম তখন মনে হত টিচার হব। আবার বাবাকে দেখে ডাক্তার হব ভাবতাম। মানে ঠিক করা ছিল না কি হব।ছোট বেলা থেকে অত আহামরি ভালো স্টুডেন্ট না হলেও এভারেজ ছিলাম। মানে পড়লেই খুব ভাল মার্কস আসবে কিন্তু পড়তাম না। আমার মা এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝত। তাই তিনি আমাকে সবসময় উৎসাহিত করত পড়ার জন্য। জেএসসিতে বৃত্তি আসার পর অনুভুত হলো আমি অতটাও খারাপ স্টুডেন্ট না যতটা আমি মনে করি, চেষ্টা করলেই পারা সম্ভব।
এসএসসির কিছুদিন আগে আমার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তার উপর স্কুল থেকে ব্যবহারিক এ বাদ পড়ে যাওয়া পরীক্ষণ যুক্ত হলো। আমি ১০৪° জ্বর নিয়ে ব্যবহারিক ও পাশাপাশি পরীক্ষার পড়া পড়তে লাগলাম। শুধুমাত্র ১০ টা নাম্বারের জন্য আমি চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সুযোগ হারালাম। মন ভারী হয়ে গেল। পুরো ইন্টারমিডিয়েট লাইফ জুড়ে আমার একটা ওভারথিংকিং কাজ করত। বই ভিজে যেত অশ্রুকণায়। এতগুলো মানুষের আশা আমি রক্ষা করতে পারব তো?কলেজে রেজাল্টও তেমন ভালো হত না। মানে টেনেটুনে পাশ যেটাকে বলে।তার উপর আমার আম্মু মাঝখানে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল এবং রাস্তায় দূর্ঘটনায় আব্বুর হাতের কব্জিতে হাল্কা ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছিল। পুরো বাসা জুড়ে তখন একটা যেন মুমূর্ষু অবস্থা। তখন অনুভব করলাম মানুষের এহেন কঠিনতম সময়ে পাশে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এমন অসহায়ত্বের সময় স্বস্তির কারণ হবার অভিলাষ, স্বপ্ন বুনা শুরু করলাম, "ডাক্তার হব"। আমার মা ছিল আমার জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।তাঁর মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দে ছিল স্বস্তির সুর, পর্বতসম হতাশা দূরীভূত করার অসীম শক্তি।আমি যখন তাকে বলতাম আমি কি বেশি দেরি করে ফেলেছি? তখন তিনি বলতেন, "মানুষের সাধ্যের বাইরে কিছু নেই , চেষ্টা করে মানুষ সেটাই পায় না যা সেটা চায় না''। মনে কিছুটা সাহস পেলাম। শুরু হল এইচএসসি। শিশু,বৃদ্ধ, তরুণ, কিশোর নির্বিশেষে সকল মহান জুলাই শহিদদের উপর নৃশংশ হত্যাযজ্ঞের চিত্র সর্বক্ষণ মনে ঘুরপাক খাওয়ায় মাঝখানে আন্দোলনের কারণে স্থগিত হওয়া পরীক্ষার পড়া পড়তে গিয়ে কোনো ভাবেই মনোনিবেশ করতে পারতাম না। একটা অশান্তি কাজ করত। অনেক দিন পড়িনি।
তারপর যখন খবর আসল পরীক্ষা আর হবে না, তখন চিন্তা করলাম রেটিনার কথা। যেহেতু সিনিয়রদের কাছ থেকে রেটিনার সুনাম আগে থেকে জানা ছিল। ভর্তি হলাম। শুরু করলাম আমার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রয়াস। প্রথমদিকে ঠিক ঠাক থাকলেও সময় যেতে যেতে কেন জানি পেরে উঠতে পারছিলাম না। মুল বইয়ের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক বইসমূহ তার উপর জিকে, ইংলিশ কেমন যেন অগোছালো হতে লাগল।রেটিনার অমায়িক, আন্তরিক, সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী আমায় ভরসা দিয়েছিল যে আমি পারব। কিন্তু কেন জানি কিছুতেই পেরে উঠতে পারছিলাম না। পড়া শেষ করতে না পারায় সৃষ্টি হতে লাগল বাড়তি ভয়, মানসিক চাপ। যাই হোক, যেকোনোভাবে শেষ করে পরীক্ষা দিতাম মার্ক আসত এভারেজ। কেন জানি পড়া গুছিয়ে নিতে পারিনি। ১৭ ডিসেম্বর পরীক্ষা দিয়ে আমি বুঝে গেছি চান্স হবে না।নাম্বার আসলো ৭০। রেজাল্ট পাওয়ার পর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আবার চেষ্টা করব।এরপর বাকি পরীক্ষা গুলো কোনোমতে দিলাম। চবি বাদে একটাতেও হল না। যদিও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেকেন্ড টাইম দেব, মনে একটা ভয় কাজ করতে লাগল। কারণ ২য় বার পরীক্ষা দিয়েও চান্স না পাওয়ার লজ্জা বা অপমান কোনোটাই সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। পরিবার কে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালাম , আমার গৃ্হশিক্ষক, আমার মামা,মা, নানু আমায় সমর্থন করল। আব্বু কিছুটা শঙ্কিত ছিল পাছে track out হয়ে যাই! যাইহোক পরে রাজি হয়েছিল। আমার মা বাবার পরে কেও যদি সবচেয়ে বেশি অবদান রেখে থাকে তাহলে সেটা হবে আমার মামা। ছোট বেলা থেকেই আমার পড়ায় বিশেষ যত্নবান ছিলেন ও পড়া সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার সহায়তা করতেন।যাইহোক সময় মোটামুটি যেহেতু হাতে ছিল সেহেতু পড়া কিছুটা হলেও গুছিয়ে নিতে পেরেছিলাম। গতবার যদিও পড়া শেষ করতে পারতাম না তবে বেসিক অতটা খারাপ ছিল না। তার সাথে সহায়িকা হিসেবে ছিল গুরুত্বপূর্ণ তথ্যবহুল ও সমৃদ্ধ ডাইজেস্ট,অনুশীলন প্রশ্নব্যাংক, ক্লাসে ভাইয়াদের দেয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক অতিরিক্ত তথ্য, নোট। প্রস্তুতি জোরালো করতে মূল বইয়ের পাশাপাশি রেটিনার এসব সহায়িকার অবদান অনস্বীকার্য।বিশেষ করে জিকের কথা যদি বলি, তাহলে এবারের জিকে ডাইজেস্টে বাড়তি ও কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দেয়ার পাশাপাশি টপিকের শেষে যে বিগত বিসিএস, মেডিকেল,ডেন্টালের বহুনির্বাচনি যুক্ত করার দিকটা ছিল খুব ফলপ্রসূ ও সময় বাঁচানো পদক্ষেপ। এতে বোঝা যেত কোনটিতে emphasize করা লাগবে।রেটিনার প্রতিটা পরীক্ষা যেন একেকটি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা।
সেকেন্ড টাইম জার্নি টা ছিল আমার জন্য খুবই স্পর্শকাতর সময়। প্রতিটি পরীক্ষা তে আমি আমার সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করতাম। কখনো যদি একটানা নাম্বার কম আসত তখন ভেতরে হতাশার বিষবাষ্পে ভরে যেত। সেই ধোঁয়াশায় চারদিক ঝাপ্সা অনুভূত হত৷ কিন্তু আমার মা, মামা, নানু, রেটিনার ভাইয়ারা, সাথে আমার গৃহশিক্ষক প্রতিনিয়ত আমার ভরসা দিয়েছে। আমার মা, বাবা যখন দুশ্চিন্তা করত তখন আমার গৃহশিক্ষক তাদের বলতেন এবার যদি কোনো সেকেন্ড টাইমার চান্স পায় সেটা ও পাবে। কেননা মার্ক মোটামোটি ভালই আসত,পড়ে যাই আর আর না পড়ে যাই।
পরীক্ষার আর মাত্র কয়েকদিন বাকী। শেষ রিভিশনের শেষের দিকে। পড়া অল্প কিছু বাকি ছিল কিন্তু পড়তে পারছিনা, অস্থির লাগছে, বই খুললেই দম বন্ধ হয়ে আসছে, যেন আমি নতুন বই খুলছি কিচ্ছুই পারিনা। মনোযোগ তো দূরে থাক বইয়ের দিকে তাকাতেও পারছিনা।যাইহোক কোনোভাবে মন শান্ত করে শুধু বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম।আগের রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করেও পারলাম না। পরীক্ষার খাতিরে শুধু চোখ বন্ধ করে রাখলাম। আমার গৃহশিক্ষক বললেন, " শুধু মাথা টা ঠান্ডা রাখলে কেবল চান্স না টপ হবে তোমার। টেনশন ফ্রি হয়ে পরীক্ষা দিবা। "
পরীক্ষার দিন, সৃষ্টিকর্তার কাছে মিনতি, "জীবনে যদি কোনো একটা ভাল কাজ ও করে থাকি সেটার উসিলায় হলেও আমাকে এটা দিয়ে দাও। আমার পড়া এগুলা কিছুই না যদি না তোমার রহমত না থাকে।" মা বাবা,ভাই, বোন মামা,নানু গৃহশিক্ষক ও শুভাকাঙ্খীদের দোয়া নিয়ে পরীক্ষার জন্য রওয়ানা হলাম। কোনোমতে স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে পরীক্ষা দিলাম। হলেই বুঝলাম আমার চান্স হবে।যদিও বাসায় এসে দেখলাম অনেক সহজ প্রশ্ন ভুল করেছিলাম। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় আসতেই দেখলাম পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্য কোরআন পাঠ করছে🥹
রেজাল্টের দিন স্বাভাবিকভাবেই এক উত্তেজনা কাজ করতে লাগল। ভয় হলো হিসাব করা নাম্বারের চেয়ে যদি কমে যায়।
যাইহোক সকলের উত্তেজনার অন্তিম ঘটিয়ে অবশেষে ফলাফল প্রকাশিত হলো।যেটার জন্য সেই সুদীর্ঘ বারো বছরের যাত্রা সেটা বাস্তবে দেখার পর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে খানিকটা সময় লাগল। It was too good to believe, Alhamdulillah.
সর্বোপরি, শোকরিয়া আদায় করি সেই মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালার যার দেওয়া সামর্থ্য, সাধ্য, আত্মবিশ্বাস ও অসীম রহমত কে অবলম্বন করে এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।
এই সাফল্য কখনোই আমার না।উপরন্তু মহান আল্লাহর দেয়া আর্তের সেবা করার এক অমূল্য সু্যোগ। এই সাফল্য আমার পরিবার এবং সে সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের যারা প্রতিটি মুহূর্তে আমার পাশে ছিল,সাহস জুগিয়েছে, অনুপ্রেরণা দিয়েছে। যাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে যদি শব্দচয়ন করি, ছোট পড়ে যাবে আমার শব্দমালা। বিশেষ করে আমার মা।
রেটিনা পরিবার ও ছিল সেই সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদেরই একজন।
~ নুজহাত লুবাবা ফুলেল
জাতীয় মেধা ৫১৩তম
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ