চম্পা কলা ও সাগর কলা
প্রথমেই স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সে সময় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে আমাদের শ্রেনী শিক্ষক ছিলেন বাবু মনীন্দ্র কুমার বৈদ্য। স্যার দেখতে ভীষন রকম ছোট-খাট। টকটকে ফর্সা গায়ের রং। শেভ করার পর মুখটা নীলাভ হয়ে থাকত। প্রথম প্রথম দেড় ব্যাটারি ডাকা হত স্যারকে। পরবর্তীতে স্যারের নামকরন করা হয় চাম্পা কলা। শুরুতে আড়ালে আবডালে ঢাকা হত চাম্পা কলা। পরের দিকে শুনিয়ে শুনিয়ে আমাদের বিভিন্ন কথার মাঝে চাম্পা কলা ঢুকিয়ে দিতাম। স্যার শুনতেন। যেমন ধরুন স্যার যাচ্ছে করিডোর দিয়ে। আমরা বলতাম, চাম্পা কলা খাইতে মন চায়। আবার বিভিন্ন রকম অশ্লীল রসিকতাও করতাম আমরা। সে সময় যেমন হয় আরকি। স্যার যে বুঝতে পারতেন তা কিন্তু জানতাম না আমরা। পরে ক্লাশে একদিন তিনিই নিজেই বলেছিলেন চাম্পা কলার মাহাত্ম্যটা তিনি বুঝেন । ক্লাশ টেনে উঠে আমি স্যারের কাছে ইংরেজী প্রাইভেট পড়তাম। বেশী মানুষ পড়ত না স্যারের কাছে। স্যারও বেশী পড়াতেন না। সব মিলিয়ে দুই ব্যাচে বিশ জন। থাকতেন বয়েজ হোস্টেলের একটা রুমে। হোস্টেল সুপার ছিলেন তিনি।
স্যারের নোটগুলো ছিল ভীষন রকম ছোট-খাট। পাতার পর পাতা লেখা তিনি পছন্দ করতেন না। টু দা পয়েন্ট উত্তর তিনি পছন্দ করতেন। প্রতি তিনটে ভুল বানানের জন্য তিনি এক নম্বর কাটতেন। কেবল তিনি না। সে সময়ের আরেক জাঁদরেল শিক্ষক কাদের স্যারও প্রতি তিনটে শব্দের ভুলের জন্য এক নম্বর কাটতেন। বৈদ্য স্যার আমাদের বাংলার ক্লাশও নিতেন। মনে আছে একবার পনের না জানি ষোল পৃষ্ঠা বাংলা রচনা লিখেছিলাম। স্যার আমার লেখার প্রশংসা করলেও নম্বর দেননি। কেন দেননি তা পরে বলেছিলেন। প্রাসঙ্গিক ছিল না লেখাগুলো। এরপর অনেক বাঁক গেছে জীবনে। জীবনের ভাঙ্গনে আমরা কম-বেশী সবাই দিশেহারা হয়েছি। কিন্তু হাইস্কুলের স্যারদের কিছু কথা কিছু কিছু করে কেউ কখনও ভুলেনি। এ কথাগুলো মাঝে মাঝে যেন মাথার ভেতর ধাক্কা দেয়। সব কথা একদিনে মনে পড়ে না। ধাক্কাও দেয় না। আজ প্রশ্ন ফাঁসের খবরটা পড়তে গিয়ে যেমন স্যারের কথা মনে পড়ল।
সময়টা ক্লাশ টেনের শেষের দিকের বিদায়লগ্ন। বৈদ্য স্যার বিদায় বেলার ক্লাশ নিচ্ছিলেন। আমাদের হাইস্কুল জীবনের শেষের দিক ছিল তখন। স্যার বলছেন, টোকাটুকি, নকল করে নম্বর কখনও নিও না তোমরা। কারন যে নম্বরগুলো অপরেরটা দেখে বা নকল করে পাবা সে নম্বরগুলো তোমাদের আজীবন ভোগাবে। দেখবা চাকরি পাবা না নম্বর হিসেবে। মানুষ হাসাহাসি করবে। তার চেয়ে নিজে যা, সে মোতাবেক নম্বর পাও। সে অনুসারে জীবন চালাও। দেখবা আটকাবে না। টাকা পয়সা তো পড়ালেখা না করেও আয় করা যায়। পড়ালেখা কি জন্য সেটা বুঝার চেষ্টা কর।
আমি জানি স্যারকে কেউ এখন একথা গুলো শুনিয়ে যদি বলে আপনি একদা একদিন এ কথাগুলো বলেছিলেন – তিনি মনে করতে হয়ত পারবেন না। কত ক্লাশে কত কথাই তো তারা বলেছেন। কত ছাত্রই তো তা শুনেছে। স্যারদের মনে থাকে না। কিন্তু কোন না কোন ছাত্র-ছাত্রী, কোন না কোন শিক্ষকের কথা মাথায় গেঁথে নেয়। একটা জীবনবোধ আর ন্যায়-অন্যায়ের সীমা তাদের কথা দিয়ে অবচেতন মনে তৈরী হয়। মনে আছে সে সময়েরই এক স্যার একদিন ক্লাশে বলেছিলেন, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে চক হাতে নিয়ে দাঁড়ালে মাথাটা যেন খুলে যায় আমার। কত কথা যে আমার মুখ দিয়ে বের হয় যা অন্য সময় ভাবি না। মাথায় আসে না। এ জন্যই তোদের ক্লাশ করা দরকার। আমারও দরকার। আমি জানি না আমাদের স্কুল গুলোতে এসব কথা স্যারেরা বলেন কিনা এখন। মনে হয় বলেন না। টাকার পাহাড়ে চড়ার স্বপ্নে বিভোর জাতির শিক্ষকরাও এর বাইরে নন। চাম্পা কলার জায়গায় বাজারে সাগর কলার ছড়াছড়ি। যে জাতি আগে সাগরকলা খেতে চাইত না, সে জাতি এখন চাম্পা কলা দেখলে নাক সিঁটকায়।
আমি কি সব সময় নীতি-আদর্শ মেনে চলেছি ? বা চাম্পা কলাদের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী কি নীতি মেনে চলতে পেরেছে জীবনে? না। পারেনি। আমিও পারিনি। আমারও বিচ্যুতি হয়েছে। তবে অসৎ কাজটা করার সময়েও আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে। কাজটা যে ঠিক হচ্ছে না সে জন্য নিজের কাছে নিজেরা লজ্জিত হই। অপমানিত হই। কুঁকড়ে থাকি। ইহাই জীবন এবং বাস্তবতা বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেই। আমরা এটুকু জানি, যা করছি ঠিক করছি না। আমরা স্যারদের র্ব্যথ ছাত্র। কিন্তু এই যে র্ব্যথ ছাত্র – এই বোধটুকুর জন্য আমরা এখন কিন্তু খানিকটা গর্ব করতেই পারি। কারন, এখন এই বোধটুকু নেই। কুঁকড়ে যাওয়া নেই। লজ্জিত হওয়া নেই। হয়ত এসব এখন আর র্গব করার বিষয় না। বোকামীর বিষয়। কোনটা সঠিক তার মাপকাঠি যখন পাল্টে যায় তখন মানসিক বোধটুকুও পাল্টে যায়।
প্রশ্ন ফাঁসে শিক্ষকরা জড়িত থাকার খবরে শুনলে অবাক হই না । পরীক্ষার হলে নিজ নিজ ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তর বলে দেওয়া দেখলে অবাক হই না। প্রাইভেট না পড়লে ফেল করিয়ে দেওয়া দেখলে অবাক হই না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন স্কুল। কোচিং সেন্টারকে পাল্টে বানানো হয় স্কুল। পড়া দেওয়া ও আদায় করতে কোন স্কুল কতটা পটু তার খোঁজ নেন সবাই। এখানে যারা পড়ান তাদের নৈতিকতা কি, ব্যক্তিজীবনে কি করেন তার খোঁজ কেউ করেন না। অথচ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের টিচারদের অবেচতন মনে অনুকরন করে। এখন ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড শিক্ষক-শিক্ষিকার ছড়াছড়ি। বেশীরভাগই কত টাকা মাইনের স্কুলে চাকুরি পাবেন, আর ভাল কোন ব্রান্ডের স্কুলে চাকুরি পাবেন তার চেষ্টায় বিভোর। আরও ভাল স্কুলে সুইচ করা কিংবা ট্রান্সফার নেওয়া না গেলে ক্যারিয়ার কল্কে পায় না। সুন্দর করে বিভিন্ন দিবস পালন করা হয় সরকারী-বেসরকারী স্কুল গুলোতে। পাশ্চ্যাতের কিছু গাল ভরা র্টাম ব্যবহার করা হয়। প্যারেন্টস ডে, টিচার ডে, গ্রীন ডে, এগ ডে, কালচার উইক – সবগুলো জানি না। নতুন নৈতিকতার দৃষ্টান্তে বেড়ে উঠা ছাত্র-ছাত্রীরা নতুন নৈতিকতা মানা শিক্ষক-শিক্ষিকাকে ক্লাশে হেডফোন দিয়ে গান শুনতে দেখলে জানবে ওটাই স্বাভাবিক। আরও খারাপ উদাহরনের দৃশ্য আর সংবাদ মাঝে মাঝে পত্রিকায় পড়ি। মানুষের কাছে শুনি। সেগুলো বলতে মন চায় না। হাজার হোক মনীন্দ্র কুমার বৈদ্যেদের রেখে যাওয়া চেয়ারে তো এরা বসে। বৈদ্য স্যারদের ছোঁয়ার জন্য ও চেয়ারগুলোর সম্মানহানি কিভাবে করি!
ছোটখাট বৈদ্য স্যারদের ছায়ার বিশালত্ব এত বড় যে পুরো জীবন ঢাকা পড়ে যায়। চারদিকের এত আয়োজন, এত প্রচেষ্টা, এত পয়সার ধ্বনি সেই ছায়াগুলোকে পেরিয়ে যাচ্ছে না কেন ?
post by Kausar Sarwar
কারো কাছে কি জানা আছে স্যার এখন কোথায় আছেন?
CHITTAGONG COLLEGIATE SCHOOL
Thousand bodies - one soul Thousand lives - one goal... Long Live Chittagong Collegiate School. Alum
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের অন্যতম কিংবদন্তি গনিতের স্যার জহিরুল হক স্যার আজ কিছুক্ষন আগে ইন্তেকাল করেছেন।
১৯৭২-১৯৯৫ পর্যন্ত গনিতের অন্যতম সেরা শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ ২৩ বছর কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষকতা করেন। এখান থেকেই শিক্ষকতা পেশার ইতি টানেন। কুমিল্লার মুরাদনগরে জন্ম নেওয়া স্যারের সবকিছুই এখন চট্টগ্রামে।
মহান রাব্বুল আলামিন উনাকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন, আমিন।
10/07/2025
Collegiate has once again proven its enduring legacy!
Congratulations to all the successful candidates.
01/12/2024
We mourn. Our sincere condolences to Araf's family.
28/11/2024
Written by asif ikbal
আমি চট্টগ্রামের সেইন্ট প্লাসিডস স্কুলে পড়েছি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা আর আবৃত্তি তে জেলা আর বিভাগ পর্যায়ে প্রথম হবার সুবাদে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের তখনকার প্রধান শিক্ষক মরহুম আ.ন.ম. আবদুল হাই স্যার জোর করে আম্মাকে ইনফ্লুয়েন্স করে আমাকে কলেজিয়েট স্কুলে বছরের মাঝপথে নিয়ে আসেন। কলেজিয়েটে আমার বড় ভাইয়া সদরুল পাশাও পড়েছেন এবং স্যুটিং এ কমনওয়েলথ শিরোপা জিতেছিলেন। সে গল্প অন্য আরেকদিনের। আজ বলবো আমার এক বন্ধুর কথা।
আমি যেদিন সেইন্ট প্লাসিডস ছেড়ে কলেজিয়েটে প্রথম সেভেন বি'তে ক্লাস শুরু করি তখন আমি বন্ধুহীন। চেনা পৃথিবী ছেড়ে পুরো অচেনা এক পরিবেশে। এখানে ক্লাস শুরু হয় দশটায়, শেষ হয় পাঁচটায়। প্লাসিডসে শুরু হতো সকাল ৮.৩০ এ আর শেষ দুপুর ১ টায়। প্লাসিডস মিশনারী ধাঁচের স্কুল বলে ইংরেজির চল বেশ আর কলেজিয়েটে আঞ্চলিক বাংলাই মুখ্য। মনে পড়ে আমার কলেজিয়েটের ডে শিফটের ভর্তির প্রথম দিন ছিলো শুক্রবার। তখন রোববার ছুটি ছিলো। কলেজিয়েটে শুক্রবারের টিফিন ব্রেক হতো সকাল ১১.৩০ মিনিটে, নামাজের জন্য। আর খেলা পাগল ছেলেরা নামাজ বাদ দিয়ে নেমে পড়তো ফুটবল আর ক্রিকেট খেলায়। আমিও তাই করেছিলাম প্রথম দিন। খেলতে খেলতেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায় শিবলী, রাফাত, সোমেন, ইকবাল, আনিস, রনি, নাসির, মঞ্জুর, জুয়েল, শেখ আনিস, অভিজিত, কামরুল, সরোয়ার, মোর্শেদুল, শাহীন, মাসুদ, আকন্দ, খসরু, অনিমেষ, সৌমেন, দেবু, তাপস, পলাশ সহ আরও অনেকের সাথে। নামাজ না পড়ে খেলার অপরাধে লাল বিস্কুটের ক্লাসে সেদিন আমার সাথে কি হয়েছিলো সেটা অনেকের মনে না থাকলেও পাশে বসে থাকা বন্ধু আশিক ইমরানের অথবা খসরুর ভোলার কথা নয়।
কলেজিয়েটের বন্ধুদের মধ্যে খসরু আর শাহীন ছিলো দু'ভাই। শাহীন ছিলো দল কাপানো, উড়নচণ্ডী, দূরন্ত, হাসিখুশি আর খসরু শান্তশিষ্ট, পড়ুয়া, মিশুক। সত্যি বলতে স্কুল জীবনে দু' ভাইয়ের মধ্যে খসরুর চেয়ে শাহীনের সাথে আমার সখ্যতা ছিলো বেশী। কিন্তু কলেজ জীবন থেকেই ব্যাপারটা পালটে গেলো। খসরু আর আমি চট্টগ্রাম কলেজে সুযোগ পেলাম। আমাদের ক্লাসের সেকশনও হলো 'বি'। কলেজ জীবনের হাজারো দুষ্টুমিতে আমরা আরও কাছে আসলাম। চট্টগ্রাম কলেজে এমনিতেই স্কুলের বন্ধুদের একটা আলাদা বোঝাপড়া তো থাকেই। আমার সেইন্ট প্লাসিডস আর কলেজিয়েটের সবার সাথেই বন্ধুত্ব ছিলো। কিন্তু অবাক ব্যাপার, খসরুর প্লাসিডসের বন্ধু বেশী ছাড়া কম ছিলো না! এরপর আমরা দুজনই বিকম পড়লাম একসাথে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে একই সেকশনে। তারপর আবার আমাদের দেখা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে (ইন্সটিটিউট অফ বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন)। এখানেই আমাদের বোঝাপড়াটা অন্যমাত্রা পায়। আমরা আবার সেই একই সেকশনে (বি, জীবনে খুব কমই এ সেকশনে পড়েছি)। দুজনই হোস্টেলে একই তলায় কাছাকাছি থাকতাম। আমাদের সব আনন্দ, উল্লাস, উৎকন্ঠা, যন্ত্রণা, বেদনা আমরা ভাগাভাগি করেছি। বিশেষ করে যখন আমার মা মারা যায় তখন সব বন্ধুদের নিয়ে খসরুর পাশে এসে দাঁড়ানো এবং আমাকে গ্যাপ পড়ে যাওয়া পড়াশোনায় সাহায্য করা - এগুলো খুব স্পর্শ করেছিলো আমাকে তখন। নব্বই এর উত্তাল আন্দোলনের সময় আলিমুল্লাহ মিয়া স্যারের মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট পরীক্ষা পেছানোর সংগ্রাম, রাহী স্যারের মার্কেটিং কমিউনিকেশন ক্লাসের তারছেড়া এসাইনমেন্ট ডিকোডিং, কম্পিউটার ম্যানেজম্যান্ট ক্লাসের স্ট্রাগলে উপায়ন্তর না দেখে ইমরান স্যারের কাছে ক্লাস শিফট করা, পরীক্ষার আগে একসাথে চ্যাপ্টার রিভিউ, হোস্টেলের অন্য প্রান্তে গ্রীন সুপার মার্কেটের আলাউদ্দিন সুইটমিটে রাতের জ্বীন হয়ে মিস্টি খেতে যাওয়া, সাজিদের গাড়িতে করে রাতের জ্যোছনা দেখতে যাওয়ার পাগলাটে গল্প, গভীর রাতে আইবিএ হোস্টেলের ছাদ বারান্দায় নিলয় দার গান, এরকম কতো কিছুই না আমরা করেছি একসাথে। এরপর আমাদের পেশাদার জীবনে আমরা দুজন দুপথে গিয়েছি ঠিকই, কিন্তু হৃদ্যতা আর বোঝাপড়াটা অটুটই রয়ে গেছে।
আজ খসরুর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন দোস্ত। জীবন কাটুক সুস্বাস্থ্যে, আনন্দে, সাফল্যে, শান্তিতে। লাভ এন্ড হাগ দোস্ত।
চম্পা কলা ও সাগর কলা
প্রথমেই স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সে সময় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে আমাদের শ্রেনী শিক্ষক ছিলেন বাবু মনীন্দ্র কুমার বৈদ্য। স্যার দেখতে ভীষন রকম ছোট-খাট। টকটকে ফর্সা গায়ের রং। শেভ করার পর মুখটা নীলাভ হয়ে থাকত। প্রথম প্রথম দেড় ব্যাটারি ডাকা হত স্যারকে। পরবর্তীতে স্যারের নামকরন করা হয় চাম্পা কলা। শুরুতে আড়ালে আবডালে ঢাকা হত চাম্পা কলা। পরের দিকে শুনিয়ে শুনিয়ে আমাদের বিভিন্ন কথার মাঝে চাম্পা কলা ঢুকিয়ে দিতাম। স্যার শুনতেন। যেমন ধরুন স্যার যাচ্ছে করিডোর দিয়ে। আমরা বলতাম, চাম্পা কলা খাইতে মন চায়। আবার বিভিন্ন রকম অশ্লীল রসিকতাও করতাম আমরা। সে সময় যেমন হয় আরকি। স্যার যে বুঝতে পারতেন তা কিন্তু জানতাম না আমরা। পরে ক্লাশে একদিন তিনিই নিজেই বলেছিলেন চাম্পা কলার মাহাত্ম্যটা তিনি বুঝেন । ক্লাশ টেনে উঠে আমি স্যারের কাছে ইংরেজী প্রাইভেট পড়তাম। বেশী মানুষ পড়ত না স্যারের কাছে। স্যারও বেশী পড়াতেন না। সব মিলিয়ে দুই ব্যাচে বিশ জন। থাকতেন বয়েজ হোস্টেলের একটা রুমে। হোস্টেল সুপার ছিলেন তিনি।
স্যারের নোটগুলো ছিল ভীষন রকম ছোট-খাট। পাতার পর পাতা লেখা তিনি পছন্দ করতেন না। টু দা পয়েন্ট উত্তর তিনি পছন্দ করতেন। প্রতি তিনটে ভুল বানানের জন্য তিনি এক নম্বর কাটতেন। কেবল তিনি না। সে সময়ের আরেক জাঁদরেল শিক্ষক কাদের স্যারও প্রতি তিনটে শব্দের ভুলের জন্য এক নম্বর কাটতেন। বৈদ্য স্যার আমাদের বাংলার ক্লাশও নিতেন। মনে আছে একবার পনের না জানি ষোল পৃষ্ঠা বাংলা রচনা লিখেছিলাম। স্যার আমার লেখার প্রশংসা করলেও নম্বর দেননি। কেন দেননি তা পরে বলেছিলেন। প্রাসঙ্গিক ছিল না লেখাগুলো। এরপর অনেক বাঁক গেছে জীবনে। জীবনের ভাঙ্গনে আমরা কম-বেশী সবাই দিশেহারা হয়েছি। কিন্তু হাইস্কুলের স্যারদের কিছু কথা কিছু কিছু করে কেউ কখনও ভুলেনি। এ কথাগুলো মাঝে মাঝে যেন মাথার ভেতর ধাক্কা দেয়। সব কথা একদিনে মনে পড়ে না। ধাক্কাও দেয় না। আজ প্রশ্ন ফাঁসের খবরটা পড়তে গিয়ে যেমন স্যারের কথা মনে পড়ল।
সময়টা ক্লাশ টেনের শেষের দিকের বিদায়লগ্ন। বৈদ্য স্যার বিদায় বেলার ক্লাশ নিচ্ছিলেন। আমাদের হাইস্কুল জীবনের শেষের দিক ছিল তখন। স্যার বলছেন, টোকাটুকি, নকল করে নম্বর কখনও নিও না তোমরা। কারন যে নম্বরগুলো অপরেরটা দেখে বা নকল করে পাবা সে নম্বরগুলো তোমাদের আজীবন ভোগাবে। দেখবা চাকরি পাবা না নম্বর হিসেবে। মানুষ হাসাহাসি করবে। তার চেয়ে নিজে যা, সে মোতাবেক নম্বর পাও। সে অনুসারে জীবন চালাও। দেখবা আটকাবে না। টাকা পয়সা তো পড়ালেখা না করেও আয় করা যায়। পড়ালেখা কি জন্য সেটা বুঝার চেষ্টা কর।
আমি জানি স্যারকে কেউ এখন একথা গুলো শুনিয়ে যদি বলে আপনি একদা একদিন এ কথাগুলো বলেছিলেন – তিনি মনে করতে হয়ত পারবেন না। কত ক্লাশে কত কথাই তো তারা বলেছেন। কত ছাত্রই তো তা শুনেছে। স্যারদের মনে থাকে না। কিন্তু কোন না কোন ছাত্র-ছাত্রী, কোন না কোন শিক্ষকের কথা মাথায় গেঁথে নেয়। একটা জীবনবোধ আর ন্যায়-অন্যায়ের সীমা তাদের কথা দিয়ে অবচেতন মনে তৈরী হয়। মনে আছে সে সময়েরই এক স্যার একদিন ক্লাশে বলেছিলেন, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে চক হাতে নিয়ে দাঁড়ালে মাথাটা যেন খুলে যায় আমার। কত কথা যে আমার মুখ দিয়ে বের হয় যা অন্য সময় ভাবি না। মাথায় আসে না। এ জন্যই তোদের ক্লাশ করা দরকার। আমারও দরকার। আমি জানি না আমাদের স্কুল গুলোতে এসব কথা স্যারেরা বলেন কিনা এখন। মনে হয় বলেন না। টাকার পাহাড়ে চড়ার স্বপ্নে বিভোর জাতির শিক্ষকরাও এর বাইরে নন। চাম্পা কলার জায়গায় বাজারে সাগর কলার ছড়াছড়ি। যে জাতি আগে সাগরকলা খেতে চাইত না, সে জাতি এখন চাম্পা কলা দেখলে নাক সিঁটকায়।
আমি কি সব সময় নীতি-আদর্শ মেনে চলেছি ? বা চাম্পা কলাদের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী কি নীতি মেনে চলতে পেরেছে জীবনে? না। পারেনি। আমিও পারিনি। আমারও বিচ্যুতি হয়েছে। তবে অসৎ কাজটা করার সময়েও আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে। কাজটা যে ঠিক হচ্ছে না সে জন্য নিজের কাছে নিজেরা লজ্জিত হই। অপমানিত হই। কুঁকড়ে থাকি। ইহাই জীবন এবং বাস্তবতা বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেই। আমরা এটুকু জানি, যা করছি ঠিক করছি না। আমরা স্যারদের র্ব্যথ ছাত্র। কিন্তু এই যে র্ব্যথ ছাত্র – এই বোধটুকুর জন্য আমরা এখন কিন্তু খানিকটা গর্ব করতেই পারি। কারন, এখন এই বোধটুকু নেই। কুঁকড়ে যাওয়া নেই। লজ্জিত হওয়া নেই। হয়ত এসব এখন আর র্গব করার বিষয় না। বোকামীর বিষয়। কোনটা সঠিক তার মাপকাঠি যখন পাল্টে যায় তখন মানসিক বোধটুকুও পাল্টে যায়।
প্রশ্ন ফাঁসে শিক্ষকরা জড়িত থাকার খবরে শুনলে অবাক হই না । পরীক্ষার হলে নিজ নিজ ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তর বলে দেওয়া দেখলে অবাক হই না। প্রাইভেট না পড়লে ফেল করিয়ে দেওয়া দেখলে অবাক হই না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন স্কুল। কোচিং সেন্টারকে পাল্টে বানানো হয় স্কুল। পড়া দেওয়া ও আদায় করতে কোন স্কুল কতটা পটু তার খোঁজ নেন সবাই। এখানে যারা পড়ান তাদের নৈতিকতা কি, ব্যক্তিজীবনে কি করেন তার খোঁজ কেউ করেন না। অথচ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের টিচারদের অবেচতন মনে অনুকরন করে। এখন ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড শিক্ষক-শিক্ষিকার ছড়াছড়ি। বেশীরভাগই কত টাকা মাইনের স্কুলে চাকুরি পাবেন, আর ভাল কোন ব্রান্ডের স্কুলে চাকুরি পাবেন তার চেষ্টায় বিভোর। আরও ভাল স্কুলে সুইচ করা কিংবা ট্রান্সফার নেওয়া না গেলে ক্যারিয়ার কল্কে পায় না। সুন্দর করে বিভিন্ন দিবস পালন করা হয় সরকারী-বেসরকারী স্কুল গুলোতে। পাশ্চ্যাতের কিছু গাল ভরা র্টাম ব্যবহার করা হয়। প্যারেন্টস ডে, টিচার ডে, গ্রীন ডে, এগ ডে, কালচার উইক – সবগুলো জানি না। নতুন নৈতিকতার দৃষ্টান্তে বেড়ে উঠা ছাত্র-ছাত্রীরা নতুন নৈতিকতা মানা শিক্ষক-শিক্ষিকাকে ক্লাশে হেডফোন দিয়ে গান শুনতে দেখলে জানবে ওটাই স্বাভাবিক। আরও খারাপ উদাহরনের দৃশ্য আর সংবাদ মাঝে মাঝে পত্রিকায় পড়ি। মানুষের কাছে শুনি। সেগুলো বলতে মন চায় না। হাজার হোক মনীন্দ্র কুমার বৈদ্যেদের রেখে যাওয়া চেয়ারে তো এরা বসে। বৈদ্য স্যারদের ছোঁয়ার জন্য ও চেয়ারগুলোর সম্মানহানি কিভাবে করি!
ছোটখাট বৈদ্য স্যারদের ছায়ার বিশালত্ব এত বড় যে পুরো জীবন ঢাকা পড়ে যায়। চারদিকের এত আয়োজন, এত প্রচেষ্টা, এত পয়সার ধ্বনি সেই ছায়াগুলোকে পেরিয়ে যাচ্ছে না কেন ?
(রিপোস্ট। প্রথম লিখেছিলাম নভেম্বর, ২০১৭ তে। এখনকার দিনগুলোতে লেখাটা রিপোস্ট করতে ইচ্ছা হলো। এখনও আমি বিশ্বাস করি যে ফলাফলে সত্যিটা প্রতিফলন হয় না সেই রেজাল্ট গোল্ডেন এ+ হলেও তা আসলে গলার কাঁটাই। তা ভোগায়, মুক্তি দেয় না। ) : post by Kausar Sarwar
29/08/2024
জহিরুল হক স্যারের সাথে --
জহিরুল স্যার আমাদেরকে অংক করাতেন । কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক । আমাদের সবার প্রিয় তিনি । অনেকদিন থেকে ভাবছিলাম - স্যারের সাথে দেখা করব । হারুন ও জামালকেও বলেছি । আজ ঠিক করলাম - যাব । বিকালে স্যারের বাইতুল আমান বাসায় আমরা । পুরানো কথা অনেক বললেন তিনি । তাঁর বয়স ৮৫ বছর । উনি আমাদেরকে ৫৩ বছর আগে পড়িয়ে ছিলেন । আজও স্যার অনেক ভালো আছেন । একটা সুন্দর বিকেল কাটালাম । আল্লাহ্ স্যারকে ভালো রাখুন । স্মৃতিতে তিনি উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন । আমরা তিন কলেজিয়েট ৭৩ খুব উজ্জীবিত , আজ । moududul alam
আমার এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ডের ইনস্টিটিউশনাল প্রাইডের প্রায় পুরো অংশটাতেই (if not the only one) বলতে গেলে আছে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল। আর সব কলেজিয়েটদের মধ্যেই মোটামুটি কলেজিয়েটকে নিয়ে আবেগের অন্যতম দুইটা বড় জিনিস হচ্ছে,
১। স্কুলের ব্যাজে লিখা - Truth shall prevail।
২। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ব্যক্তি একজন এক্স-কলেজিয়েট।
Truth has prevailed. Now The ex-collegiate has been nominated by the generational leaders. What a rebellious and inspiring time to be a student from this generation. From this Institute.
Hopefully, we are on the right track now, after half a century of relentless bloodshed and corruption, finally some beacon of hope to look up to.
Written by Usama Ibne Anwar
08/08/2024
অভিনন্দন ড: ইউনুস . আপনার দিকে তাকিয়ে সমগ্র বাংলাদেশ. Collegiate পরিবার সব সময়ে আপনার সাথে.
25/07/2024
শোক সংবাদ:
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ১৯৬৪ ব্যাচের ছাত্র ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক - ২০১৯ ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য - ২০১৭ পুরষ্কার প্রাপ্ত এবং গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রাবন্ধিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক স্যার ইন্তেকাল করেছেন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।
আল্লাহ উনাকে ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন... আমীন।
লেখা: Mohammad Ali
04/07/2024
Wishing you a happy and peaceful retirement life sir. You are always in our heart.
Legendary teacher Zahid sir has retired from service on 03.07.24.
Photo courtesy : Collegiate legends
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the school
Website
Address
Chittagong Collegiate School, Ice Factory Road, Chattogram
Chittagong
4000
Opening Hours
| Monday | 07:30 - 16:30 |
| Tuesday | 07:30 - 16:30 |
| Wednesday | 07:30 - 16:30 |
| Thursday | 07:30 - 16:30 |
| Saturday | 07:30 - 16:30 |
| Sunday | 07:30 - 16:30 |