16/04/2024
টিবিএ নিউজে "ভিলেজ অব চিটাগং ১৮৩৭" শিরোনামে সুন্দর একটা লেখা লিখেছে। যদিও লেখাটা কিছুটা লম্বা, তবে লেখাটা পড়ে প্রায় ২০০ বছর পূর্বের কর্ণফুলি নদীর অংশ থেকে চট্টগ্রাম শহরের দৃশ্য, পটিয়া উপজেলার হুলাইন গ্রামের কথা, লক্ষাচর, চকবাজারসহ তখনখার মানুষের জীবনযাপন এর ধরণ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।
https://www.tbsnews.net/bangla/%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0/news-details-209931
‘ভিলেজ অব চিটাগং ১৮৩৭’: একটি ঐতিহাসিক দাঙ্গা এবং পেন্সিলে আঁকা ছবির গল্প
[রাজনৈতিক ইতিহাসের ডামাডোলে আমাদের সামাজিক ইতিহাসের ছোট ছোট অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাখ্যান হারিয়ে গেছে, যেগুলো আর কখনোই উদ্ধার করা যাবে না। উনিশ শতকের দক্ষিণ চট্টগ্রামে সে রকম হারিয়ে যাওয়া একটি উপাখ্যানকে গল্পের ছলে উদ্ধার প্রচেষ্টা। যে গল্পের সবটুকু ইতিহাস নয়, আবার সবটুকু কল্প নয়। দেশীয় চরিত্রগুলো বাদ দিলে বিদেশি চরিত্রগুলো ঐতিহাসিক সত্যের অংশ]
উড়ো সংবাদ
হেমন্তের কুয়াশা যেমন বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে ঘাসের ডগার কানে কানে আসন্ন শীতের বার্তা পৌঁছে দেয়, চাটগাঁ শহর থেকে উড়ে আসা সংবাদটিও তেমনি কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের মানুষদের কানে অনাগত এক দুর্যোগের সংকেত পৌঁছে দিল।
এ ধরনের খবরগুলো মুখ থেকে মুখে ছড়ানোর সময় ডালপালা বিস্তার করতে থাকে। এক কান থেকে অন্য কানে স্থানান্তরিত হবার সময় আকার-আকৃতি যেমন বদলাতে থাকে, তেমনি আয়তনেও বাড়তে থাকে গুণিতক হারে। মাঝে মাঝে দেখা যায় আসল খবর হারিয়ে গিয়ে আরেকটা নতুন খবরে রূপান্তরিত হয়েছে। কোনো কোনো গন্তব্যে এ সংবাদটিও সেই দশাপ্রাপ্ত হয়েছিল।
আসল ব্যাপার কিন্তু সত্যিই গুরুতর। চট্টগ্রামের নতুন কমিশনার হার্ভে সাহেবের হঠাৎ ঘোষণাÑএখন থেকে জমির খাজনা চার গুণ বেশি গুনতে হবে। প্রচলিত বিশ গণ্ডায় কানির হিসেব বদলে আঠারো গণ্ডায় কানি হবে। আইন অমান্য করলে জেল, জরিমানা, জমি ক্রোক।
৭৬ বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রাম শাসন শুরু করার পর এই প্রথম বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল চট্টগ্রামের মানুষ।
ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের যেতে হবে পটিয়ার হুলাইন গ্রামের রাইসুদ্দিন খন্দকারের উঠোনে।
শান্তির জনপদে উত্তাপ
বহুকাল আগে শায়েস্তা খাঁর আমলে মগ ধাওনির পর থেকে আরাকানি অত্যাচার থেকে রক্ষা পেয়ে পটিয়ার হুলাইন গ্রামের মানুষেরা কয়েক পুরুষ ধরে মোটামুটি শান্তিতেই বসবাস করছিল। বেধড়ক মার খেয়ে আরাকানিরা পালিয়ে নাফ নদীর দক্ষিণে চলে গিয়েছিল। শত বছরের অত্যাচারিত কৃষককুল যেভাবে মগ ধাওনিতে অংশ নিয়েছিল, সেসব গল্পের অংশবিশেষ এখনো বংশপরম্পরায় টিকে আছে।
মোগল শাসন জারির থেকে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর মোটামুটি শান্তির জনপদ। বাইরের দুনিয়ার তেমন কোনো খবর এখানে এসে পৌঁছায় না। মোগল বাদশার রাজত্ব শেষ হয়ে কোম্পানি শাসন শুরু হবার ব্যাপারটা গ্রামের মানুষ জেনেছিল বহুদিন পর। শাসকদের সাথে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো রকম সম্পর্ক না থাকায় পরিবর্তনের তেমন কোনো প্রভাবও পড়েনি কৃষকদের মধ্যে। কোম্পানির সাথে তাদের কোনো লেনদেন নেই। তাদের সব কাজকারবার সালিস-বিচার থেকে খাজনাপাতি সবকিছুর গন্তব্য রাইসুদ্দিন মাতব্বরের উঠোন পর্যন্ত। সাধারণ মানুষের কাছে রেঙ্গুন, আকিয়াব, কলকাতা, বিলাত, দূরবর্তী নক্ষত্রের মতো। এমনকি কাছের শহর চাটগাঁর সাথেও তাদের তেমন যাতায়াত নেই।
খাজনা বৃদ্ধির ব্যাপারটা পুরো চট্টগ্রামের মাথাব্যথা হলেও প্রথম তোলপাড়টা রাইসুদ্দিন খন্দকারের উঠোনে শুরু হবার পেছনে একটা ঘটনা আছে।
প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসে ধান ওঠার সময় রাইসুদ্দিনের উঠোনে সম্পন্ন মানুষেরা বসে হুক্কা টানতে টানতে গল্প গুজব করে, পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করে, নানান কূটকাচালি করে। সেই সব আড্ডায় দেশ দুনিয়ার নানান কাহিনির টুকরো-টাকরা অংশও ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যায়। এই গ্রামে রাইসুদ্দিন খন্দকার একমাত্র মানুষ চাটগাঁ শহরে যার নিয়মিত যাতায়াত আছে। তিনি মাসে, দুই মাসে একবার শহরে গিয়ে ঘুরে আসেন। সঙ্গে যায় তার ডান হাত আজহারউদ্দিন। আজহারের কথা একটু পরে আসছে। রাইসুদ্দিনের পরিচয়টা আরেকটু খোলাসা হোক।
আঠারো শতকে মোগল শাসনের শেষ দিকে রাইসুদ্দিনের পিতামহ হাসমত খন্দকার চাটগাঁ শহরের এক মোগল থানাদারের কর্মচারী ছিলেন। রজু খাঁ নামের সেই থানাদারের সাথে সম্পর্কের সুবাদে তিনি অনেক জমিজমা টাকাকড়ির মালিক হয়েছিলেন। সেই আমলে চাটগাঁ শহরের সাথে হুলাইন গ্রামের একমাত্র সংযোগ ছিল হাসমত খন্দকার। তার কাছ থেকে গ্রামের মানুষ একদিন জানতে পেরেছিল দেশের রাজা বদলে গেছে। নতুন রাজা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। লোকমুখে শুধুই 'কোম্পানি'।
কোম্পানি আমলের শুরুতে হাসমত খন্দকার কোনো একটা অনাগত দুর্দিনের আশঙ্কা করে শহরের পাঠ চুকিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। একমাত্র পুত্র শফিউদ্দিন খন্দকারকে কোনো দিন শহরে যেতে দেননি তিনি। রাইসুদ্দিনের জন্মের কয়েক বছর পর একদিন ভেদবমি করতে করতে মরে গেল শফিউদ্দিন খন্দকার। শিশু রাইসুদ্দিন তখন থেকে পিতামহের ছায়াতেই বেড়ে উঠতে থাকে।
পিতামহের মৃত্যুর পর বিষয়-সম্পদের দায়িত্ব নিজের কাঁধে এলে শহরে যাতায়াত শুরু রাইসুদ্দিনের। জমিদারি কায়দায় গ্রামের পাশের খালে একটা বজরা নৌকা বাঁধা থাকে সব সময়। ছগির মাঝির সাথে আরও দুই মাল্লা সেই বজরা পরিচালনা করে। বজরায় রাত্রিযাপনসহ নানান আরাম-আয়েশের বন্দোবস্ত আছে।
উত্তরাধিকারসূত্রে রাইসুদ্দিন গ্রামের অঘোষিত জমিদার। কিন্তু তিনি কোনো লাঠিয়াল পোষেন না কিংবা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়েও চলাফেরা করেন না। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী আজহারউদ্দিন নামের এক যুবক। দূর সম্পর্কের আত্মীয় আজহারের বাড়ি হুলাইন থেকে আঠারো ক্রোশ দক্ষিণে আজিমপুর গ্রামে। কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় জমিদারবাড়িতে। রাইসুদ্দিনের বোনের শ্বশুরবাড়ি ওই গ্রামের খন্দকারবাড়িতে। সেখান থেকে হুলাইন গ্রামে আজহারের আগমন তার সহকারী কিংবা দেহরক্ষী হিসেবে। একুশ বছর বয়সী আজহারের দৈহিক শক্তির মতো বিষয়বুদ্ধিও বেশ ভালো। জমিজমা, খাজনা, মামলা-মোকদ্দমা সবকিছুতে রাইসুদ্দিন তার উপর নির্ভর করে। আড়ালে তাকে রাইসুদ্দিনের সেনাপতি বলে ডাকা হয়। সম্পর্কে আত্মীয় হওয়াতে তার সাথে রাইসুদ্দিন খন্দকারের সম্পর্ক ঠিক মনিব-কর্মচারী নয়। বয়সের তারতম্য থাকা সত্ত্বেও সম্পর্কটিতে সৌহার্দ্যের অভাব নেই। জমিদার পরিবারের সাথে আজহারের ঘনিষ্টতা সেটাকে আরও পোক্ত করেছে।