17/10/2020
বিজ্ঞানের সেরা হাতিয়ারঃ ডেটা বা তথ্য
(সমুদ্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা)
বিজ্ঞানীদের কাছে ডেটা হচ্ছে আবিষ্কারের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুল বা হাতিয়ার। ডেটা হল এমন এক হাতিয়ার যা অনুমান যাচাই এবং চলমান পরিক্ষীণসমূহ সম্ভব করে। তবে ভাল ফলাফল পেতে হলে যে কোনও সরঞ্জামের মতো ডেটাও সঠিকভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা জানতে হবে। ডেটা বা তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয় তা জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, এটি সংগ্রহ করার পরে কীভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তাও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং,বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার জন্য ডেটা কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে ভাল ডেটা তৈরি করা যায় এবং কীভাবে ডেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয় তা আমাদের জানা অত্যন্ত জরুরী। তার আগে আমাদের সমুদ্র বিজ্ঞানীদের এটাও জানা দরকার যে, ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে কীভাবে নিরবিছিন্ন মহাসাগর পর্যবেক্ষণ উদ্যোগ একটা বিস্ময়কর চমক তৈরি করল।
বিজ্ঞান হচ্ছে পৃথিবী কিভাবে কাজ করছে তা উৎঘাটন করা । একজন বিজ্ঞানী যা নিয়ে ই কাজ করেন না কেন, উনি মূলত পৃথিবীকে ই দেখার বা বুঝার চেষ্টা করেন । পৃথিবীকে দেখতে হলে সবার আগে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জামের যোগান। সুতরাং, বিজ্ঞানীরা আমাদের গ্যালাক্সির কৃষ্ণগহবর নিয়ে গবেষণা করুক অথবা মহাসাগরের ভাইরাস অনুসন্ধান করুক, সকল বিজ্ঞানীর ই মূল টার্গেট হল পৃথিবী কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে দেখে তা বুঝতে পারা। মহাসাগর দেখার সর্ব প্রথম অভিযান করেছিলেন জন মরি এবং চার্লস অইভল থমসন ১৮৭২ সালে এইচএমএস চেলেঞ্জোর নামক গবেষণা জাহাজে বিশ্বসমুদ্র অভিযানের মাধ্যমে। এ সকল বিজ্ঞানীরা মহাসাগর প্রদক্ষিণ করেছিলেন, ওজন এবং দড়ি ব্যাবহার করে মহাসাগরের গভীরতা মেপেছিলেন, সমুদ্রতল থেকে কাদা ও প্রাণী তুলে এনেছিলেন, অসংখ্য রেকর্ড লিপিবদ্ধ করেছিলেন এবং প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। ১৮২৩ সালে যখন মেরী এনিং জীবাশ্ম দেখতে চেয়েছিলেন; তিনি হাতুরি, ব্যাগ ও নোটবুক নিয়ে ই উঁচু পাহাড়ের খাঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে উঠেছিলেন এবং তিনিও অনেক ছবি এঁকেছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল একটা সম্পূর্ণ প্লিজিওসর (লম্বা গলা যুক্ত সামুদ্রিক সরীসৃপ) যা তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত-ই হয়নি। মেরীকুরি, ডারউইন, কেপলারসহ এধরনের সকল বিজ্ঞানী-ই তৎকালীন সময়ে সহজলভ্য সরঞ্জাম ব্যাবহার করে সে সময়ের তথ্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করে তাদের চারিদিকে পৃথিবীকে বুঝার চেষ্টা করেছিলেন। তারা যে সকল তথ্য, উপাত্ত্ব সংগ্রহ করেছেন, এঁকেছেন ও লিপিবদ্ধ করেছেন তার সবগুলো ই ছিল ডেটা।
আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞানীদের কাছে অসংখ্য উন্নত সরঞ্জাম রয়েছে যা দিয়ে তারা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারছেন আরও দ্রুত, সঠিক ও বিপুল পরিমানে। কিন্তু এখনও তারা একই কাজ ই করছেন, পৃথিবীটাকে দেখে ডেটা সংগ্রহ করছেন। পরিমাপ, নমুনা, ফটোগ্রাফ, অঙ্কন, এসব-ই ডেটা। বিজ্ঞানী হিসেবে মাঠে কিংবা ল্যাবে যেখানে-ই কাজ করুন না কেন, ডেটা সংগ্রহ-ই তাদের কাজের মূল উদ্দেশ্য। কারণ, ডেটা-ই পৃথিবী কে দেখার ও ছবি আঁকা সম্ভব করে দেয়। এ জন্য বলা হয় পৃথিবী কিভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করতে, নির্ভুল তত্ত্ব তৈরিতে ডেটা নিজে-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হিসেবে কাজ করে ।
যে কোন সরঞ্জামের মত ডেটা কে ও সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। ডেটার ভুল ব্যাবহারে ভুল ছবি তৈরি হয়, যা ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত করে। ডেটাকে সঠিক ভাবে ব্যাবহারের জন্য বিজ্ঞানীরা দুটো বিষয় বিবেচনায় আনেনঃ ডেটা কি ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ডেটা কিভাবে পরজবেক্ষন, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সাগর মহাসাগর থেকে ডেটা সংগ্রহ সব সময় ই সমস্যা সংকুল। এর প্রধান কারণ সমুদ্র অনেক বিশাল এবং এটি সব সময় গতিশীল বা অস্থির। ১৮৭২ সালে বিজ্ঞানীরা চ্যালেঞ্জের জাহাজে ৪ বছর সমুদ্রে অভিযান করে নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টের ডেটা সংগ্রহ করেছিলেন এবং অপরিশোধিত ডেটা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত মহাসাগরের কোন তথ্য ই জানা ছিল না। সুতরাং তৎকালীন সময়ে নেয়া নির্দিষ্ট সময়ের স্বল্প ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল ডেটা ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু যেহেতু সমুদ্র সব সময়ই প্রবাহমান, তাই সঠিকভাবে সমুদ্র কে বুঝতে হলে বা বিশেষ করে সময়ে সাথে সমুদ্র কিভাবে পরিবর্তিত হয় তা জানতে হলে অপেক্ষাকৃত মানসম্পন্ন, নিরবিচ্ছন্ন এবং ধারাবাহিকভাবে সংগ্রহ করা ডেটার কোন বিকল্প নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসামান্য উন্নতির ফলে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে বিপ্লবী সব সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি যা দিয়ে বিপুল পরিমাণের ডেটা সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা অ্যাটলান্টিক, প্যাসিফিক ও ভারতীয় মহাসাগরের নীচে আধুনিক উন্নত সরঞ্জামের সমাহার বসিয়ে ডেটা সংগ্রহ স্টেশন স্থাপন করেছেন যেগুলো অবিচ্ছিন্ন ভাবে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করছে ধারাবাহিক ভাবে। যেমনঃ স্বয়ংক্রিয় ডুবো রোবট, সৌর চালিত সেন্সর সিস্টেম বয়, ক্যাবল সংযুক্ত সী ফ্লোর সেন্সর সিস্টেম এবং ক্যামেরা যেগুলো বিদ্যুৎ ও ডেটাসহ কন্ট্রোল ষ্টেশনের সাথে সংযুক্ত। সুতরাং, সমুদ্রের মূল অংশ থেকে এখন ধারাবাহিক ভাবে তাৎক্ষণিক পানির তাপমাত্রা, সামুদ্রিক স্রোতের গতিবেগ ও গতিপথ, লবনাক্ততা, টারবিডিটি, সামুদ্রিক শৈবালের ঘনত্ব বা ক্লোরোফিলের উজ্জ্বলতার ডেটা সংগ্রহ হচ্ছে। এইসকল অত্যাধুনিক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে ডেটা সংগ্রহের সবচেয়ে বিপ্লবী উন্নতি হল অবিচ্ছিন্ন ও প্রতি একক সময়ে আগের চেয়ে অনেক বেশী ডেটা সংগ্রহের সক্ষমতা । এসকল অবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক ডাটা ব্যাবহার করে সময়ের সাথে সমুদ্রের ট্র্যাক পরিবর্তনের পর্যবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে। এইচএমএস চ্যালেঞ্জেরে ৪ বছরে যে ডেটা সংগ্রহ হয়েছে তার চেয়ে ও অনেক বেশী ডেটা এখন প্রতিদিন সংগ্রহ হচ্ছে আরও বিশুদ্ধ ও উন্নত পদ্ধতিতে। অবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক এ বিশাল ডেটা ভাণ্ডার স্টোর ও বিশ্লেষণ করতে এখন বিজ্ঞানীরা ব্যাবহার করছেন উন্নত ও শক্তিশালী কম্পিউটার । যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার উন্নত এসকল সরঞ্জাম এখন ক্লান্তিহীন ভাবে সপ্তাহের প্রতিদিন ২৪ঘণ্টা ই ডেটা সংগ্রহ, মজুত ও বিশ্লেষণ করছে, এমনকি সংক্রিয় ভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব করছে।
যে কারো ইন্টারনেট সংযুক্তি থাকলে, এসব ডেটার বেশীর ভাগ ই এক্সেস করতে পারে। তবে এসব ডেটা ব্যাবহার করতে জানা-ই এখন দুর্দান্ত যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে বিপুল পরিমান ডেটা কিভাবে সামলাতে হবে ও ব্যাবহার করতে হবে?আর এটা ই হল ডেটা বিশ্লেষণের কৌশল! সাধারনত বিজ্ঞানীরা তিনটি ধাপে ই ডেটা বিশ্লেষণ করে থাকেনঃ ১। ওরিয়েন্টেশন বা সাজানো ২। ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যা করা ও ৩। সিন্থেসিস বা সমন্নয় করা। ডেটা ওরিয়েন্টেশন বলতে বিজ্ঞানীদের টার্গেট অনুযায়ী ডেটা সুনির্দিষ্ট করে এবং তা কিভাবে, কখন, কোথায় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তা নিশ্চিত হয়ে টার্গেট টুলস ও টেকনিকে ব্যাবহার উপযোগী করে সাজানো কে বুঝায়। দ্বিতীয়ত, ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যা করা মানে সাজানো ডেটা প্রাথমিকভাবে দেখে প্যারামিটার এর অবস্থা বিচার বিশ্লেষণ করা বিশেষ করে ডেটার ট্রেন্ড ও মেসেজ বুঝতে পারা, যেমন এটা কি বাড়ছে, নাকি কমছে? কি ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে? কখন এবং কোন অবস্থায় পরিবর্তন লক্ষণীয় মাত্রায় হচ্ছে ইত্যাদি। চূড়ান্ত পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার টার্গেট ও প্রাথমিকভাবে ডেটা ব্যাখ্যায় উদ্ভুদ ধারণার বিচার বিশ্লেষণ করে যথাযথ কারণ উদ্ঘাটন করাকে-ই সিন্থেসিস বলা হয়। সুতরাং, এভাবে পৃথিবী ও পৃথিবীতে চলমান সকল প্রাকৃতিক ঘটনপ্রাবাহ বুঝতে ডেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম হেসেবে কাজ করে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ একটি চলমান ও অসমাপ্ত প্রক্রিয়া। কারণ, নতুন তথ্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যে তত্ত্ব আবিষ্কার হচ্ছে তা আবার নতুন নতুন আইডিয়া, ধারণা ও উতসাহবেঞ্জক প্রশ্ন তৈরি করছে। এসব ধারণা ও প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরও ডেটার প্রয়োজন হয়। আবার সে ডেটার ওরিয়েন্টেশন, ইন্টারপ্রিটেশন এবং সিন্থেসিস করতে হয়। এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন আর উত্তরের পর উত্তর খুঁজার যে অবিরাম প্রক্রিয়া তা ই গবেষণা। তাই চুরান্তভাবে বলা যায়, ডেটা হচ্ছে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম যা শুধু নতুন নতুন হাইপোথিসিস তৈরি করে না, যাচাই বাচাই করে চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করতেও অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। সুতরাং, বিজ্ঞানীরা তাদের তত্ত্ব বা মতবাদ পরিবর্তন পরিবর্ধন করে পরিমার্জন কিংবা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে, যা দিয়ে আরও সঠিক চিত্র বা ছবি তৈরি করে পরিস্কার ও পরিচ্ছন্নভাবে বুঝতে পারে প্রকৃতি ও পরিবেশ সত্যিকার অর্থে কিভাবে কাজ করছে। এ জন্য যথাযথভাবে বলা হয়ে থাকে যে ভাল ডেটা ছাড়া ভাল বিজ্ঞান করা যায়না ।
-----ডক্টর মোহাম্মাদ মোসলেম উদ্দিন, বিভাগীয় প্রধান, ওশানোগ্রাফি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়