International Arabic Language Institute

International Arabic Language Institute

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from International Arabic Language Institute, Education, Jahan Villa, House#07, Lane#03, ROAD#01, Block#L, Halishahar, Chittagong.

31/01/2022

বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে—আত-তাকাছুর

১. বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে

“বন্ধুবান্ধব সব এতদিনে নিজের বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছে। আমি এখনও ভাড়াটিয়া বলে মানুষের কথা শুনছি। ওদের বাসায় বেড়াতে গেলে নিজেকে ফকির-ফকির মনে হয়। আর না। এবার বাড়ি কেনার ঋণটা নিতেই হবে।”

“অনেক হয়েছে, আর না। পুরনো গাড়িটা ফেলে দিয়ে এবার একটা নতুন গাড়ি কিনবোই। প্রতিবেশির বড় গাড়িটার পাশে আমার গাড়িটাকে একটা টেম্প্যু মনে হয়।”

“আমার পুরনো আমি-ফোনটা মানুষের সামনে বের করতে লজ্জা লাগে। সবাই যেন কেমন-কেমন করে তাকায়। আজকাল সবার হাতে আমি-ফোন ৭। পাশের বাড়ির কাজের মেয়েটার হাতেও আমার থেকে নতুন মডেলের ফোন!”

এই যে লোক দেখানোর প্রতিযোগিতার মানসিকতা—অন্যদের থেকে ভালো বাড়ি, গাড়ি কিনতে হবে। সব দামি ব্রান্ডের জিনিস ব্যবহার করি দেখাতে হবে—বেশি-বেশি পাওয়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা হচ্ছে আত-তাকাছুর (التَّكَاثُر)।[১][৪]

একসময় আমরা অনেক কাটখোর পুড়িয়ে বাড়ি কিনি। মানুষকে গর্ব করে দেখাই নতুন কেনা দামি আসবাবপত্র, ঝকঝকে বাথরুম। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই সেই স্বপ্নের বাড়ির উপর থেকে মন উঠে যায়। বেড়াতে গিয়ে অন্যের বাড়ির আসবাবপত্র, বাথরুম দেখে আফসোস শুরু হয়। আবার হয়তবা একদিন শখের ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনি। মানুষকে বলে বেড়াই, “এবার গাড়িটা কিনেই ফেললাম। বেশি না, মাত্র ৩৫ লাখ। সস্তায় পেয়ে গেছি, কী বলেন?” তারপর কয়েক বছর না যেতেই বন্ধুর নতুন গাড়ির সামনে সেটাকে লক্কড় মনে হয়। একসময় সবাইকে গর্ব করে দেখিয়ে বেড়ানো নতুন মোবাইল ফোনটা দুই বছর না যেতেই টেবিল থেকে সরিয়ে পকেটে লুকিয়ে রাখতে হয়। এত চেষ্টা করে এতসব পাওয়ার পরেও বেশিদিন প্রাপ্তির সুখ ধরে রাখা যায় না। শুরু হয় আবার প্রতিযোগিতার দৌড়।

আল-হা أَلْهَا হচ্ছে: কিছু একটা আমাদেরকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখে যে, আমাদের যা করার কথা তা করতে আমরা ভুলে যাই। বিনোদন হচ্ছে লাহউ لَهْو , কারণ বিনোদন আমাদেরকে বাস্তবতা ভুলিয়ে রাখে। আমাদের যা করার কথা, তা না করে আমরা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় কাজে বুঁদ হয়ে থাকি। অনেকের বেলায় কাজ হয়ে গেছে লাহউ, কারণ যেটুকু কাজ করলে তার ভালোভাবে চলে যেত, সে তার দ্বিগুণ কাজ করছে তার নিজের বাড়ি, গাড়ি, দামি ফোন, বিদেশ বেড়াতে যাওয়ার জেদ পূরণ করার জন্য। কারও বেলায় লাহউ হয়ে গেছে মাস্টার্স, পিএইচডি ডিগ্রির পেছনে ছোটা। তার অমুক বন্ধু, তমুক আত্মীয় পিএইচডি করে ফেলল। অথচ সে একটা ব্যাচেলর্স ডিগ্রি নিয়ে অশিক্ষিত হয়ে বসে আছে? তাছাড়া এখন যে বেতন পাচ্ছে তা দিয়ে একটা মাত্র বাড়ি হবে। ছেলে-মেয়ের জন্য আলাদা বাড়ি, কয়েকটা জমি রেখে যেতে হবে না? —এই আরও বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় তার কাজ, পড়াশুনা তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাকে কী ভুলিয়ে দিয়েছে?

আল্লাহ تعالى নির্দিষ্ট করে বলে দেননি তাকে কী ভুলিয়ে দিয়েছে। আরও বেশি পাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় আমরা কী ভুলে বসে আছি, তা যেন আমরা নিজেরা চিন্তা করে বের করি।[১] মানুষ যেন দৌড়ানো বন্ধ করে একটু থামে। পেছনে ফিরে তাকায়। তাকিয়ে যেন দেখে সে কী সর্বনাশ করে ফেলেছে। তাহলে সে নিজেই বুঝতে পারবে সে কী ভুলে গেছে।

কেউ যখন আমাদেরকে বলে, “ভাই, চলেন না, নামাজ পড়তে যাই?” অথবা, “ভাই, কালকে আসেন না একসাথে কিছুক্ষণ কুর‘আন পড়ি, ইসলাম নিয়ে একটু পড়াশুনা করি?” অথবা, নামাজের পরে মুসল্লিরা যখন অনুরোধ করেন, “ভাই একটু বসবেন? কিছু জরুরি আলোচনা হবে। আপনার অনেক কাজে লাগবে।” — তখন আমরা বলি, “সরি ভাই, আজকে খুব ব্যস্ত আছি। আরেকদিন হবে।” —আমরা মনে করি যে, আমরা আসলে অনেক ব্যস্ত। আমাদের জরুরি কাজ আছে। অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, এগুলো আসলে আমাদের আসল-কাজ, আসল-দায়িত্ব থেকে ভুলিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু না। আমরা নিজেরাই এমন সব কৃত্রিম ব্যস্ততা, কৃত্রিম দায়িত্বের মধ্যে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলেছি যে, খেয়াল করে দেখার সুযোগই পাচ্ছি না, আমাদের আসলে কী নিয়ে এবং কাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা উচিত ছিল। নিজেদের উপর চাপিয়ে দেওয়া এই সব কৃত্রিম মোহ সবার আগে আমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহকে تعالى। এগুলো হয়ে গেছে আল্লাহর تعالى থেকে আমাদেরকে দূরে রাখার ফাঁদ মাত্র।

বাবা-মা ভুলে গেছে সন্তানদের কথা। সন্তানেরা বড় আশা নিয়ে তাদের কাছে আসে একটু সময় পাওয়ার জন্য। কিন্তু তারপর, “আমার এখন কাজ আছে”, “আমার সামনে পরীক্ষা, পড়তে হবে” —এই সব শুনে মন খারাপ করে বার বার ফিরে যায়। কারও সন্তানেরা সপ্তাহে একদিন মাত্র বাবাকে দেখতে পায়, কারণ বাকিদিনগুলো বাবা সকালে চলে যায়, গভীর রাতে আসে। আরও বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা এই বাবা-মা’দেরকে সন্তানদের অধিকার, সন্তানদের সঠিকভাবে বড় করার দায়িত্ব ভুলিয়ে দিয়েছে। এদের সন্তানেরা তাদের জন্য ভবিষ্যতে শান্তি এবং সওয়াবের উৎস না হয়ে, বরং একেটা টাইমবোম-এ পরিণত হচ্ছে। এখন শুধু ফেটে যাওয়ার অপেক্ষা। তখন হাজার কপাল চাপড়িয়েও তাদেরকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তখন শুধুই আফসোস হবে, “হায়! যদি একটু বাচ্চাদের সময় দিতাম! তাদেরকে ইসলাম শেখাতাম, কুর‘আন পড়াতাম, নামাজ পড়ে ডাকতাম, শালীনতা শেখাতাম!” —তারপর বাকি জীবন শুধু আফসোস করে, মানুষের কটু কথা শোনা থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে।

কেউ আবার নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে গেছে। কাজের ব্যস্ততায়, পড়াশুনার চাপে কয়েকদিন পর পর ওষুধ খেয়ে নিজেকে কোনোভাবে ঠিক রাখতে হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, তত তার শরীর খারাপ হচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। দেহ তেল-চর্বিতে ভরে যাচ্ছে। হার্টে কলেস্টরেল জমে ব্লক তৈরি হচ্ছে। আরও বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা এদেরকে তাদের দেহের অধিকার ভুলিয়ে দিয়েছে। একদিন তাদের দেহ বিদ্রোহ করবে। তারপর তারা বাকি জীবনটা আফসোস করে ধুঁকে ধুঁকে পার করবে। হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।

আবার কেউ দিনরাত নিজেকে বিনোদনে বুঁদ করে রেখেছে। প্রতিদিন এরা ঘণ্টাখানেক টিভি দেখে। ঘণ্টাখানেক মোবাইলে ফেইসবুক, চ্যাট, গল্প করে। তারপর কম্পিউটারে মুভি, কার্টুন, ভিডিও গেমে বুঁদ হয়ে থাকে। কয়েকদিন পর পর রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। —এভাবে প্রতিমাসে শত শত ঘণ্টা এরা ব্যয় করে বিনোদনের পেছনে। এই বিপুল পরিমাণের সময় এরা কাজে লাগাতে পারত নতুন কিছু শিখে, নিজের কর্ম দক্ষতা বাড়িয়ে, নতুন যোগ্যতা অর্জন করে, নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিয়ে, আল্লাহর تعالى সাথে সম্পর্ককে সুন্দর করে, পরিবারকে সময় দিয়ে। কিন্তু না, বিনোদন এদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে জীবনে কী করলে আসলেই সত্যিকারের কিছু অর্জন হতো। কী করলে নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ, সম্মানের এবং সুখের হতো। মাত্রাতিরিক্ত বিনোদন এদের দৃষ্টিকে ঘোলা করে দিয়েছে। এরা দেখতে পাচ্ছে না যে, সামনে এক গভীর খাঁদের দিকে এরা হেঁটে যাচ্ছে। আরেকটু পরেই এর ভেতরে পড়ে যাবে। তারপর বাকি জীবনটা সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য আফসোস করতে থাকবে। “হায়! একটু যদি ঠিকমতো পড়াশুনা করতাম! একটু যদি কাজ শিখতাম! বাবা-মা, সন্তানদের আরো সময় দিতাম! নামাজ পড়তাম, কুর‘আন পড়তাম!” —কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ফিরে আসার আর কোনো উপায় নেই।

২. যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছে যাও

কিছু মানুষের চোখ কোনোদিন খোলে না, যতক্ষণ না তারা কবরে পৌঁছে যায়। আবার কিছু মানুষের যখন এক পা কবরে চলে যাওয়ার অবস্থা হয়, তখন তারা উপলব্ধি করে সারাজীবন কী ভীষণ ভুল করে ফেলেছে। তখন আর নিজের জীবনে এবং কাছের মানুষদের জীবনে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে না। নিয়তি মেনে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কবরে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। তাদের সেই কান্না কেউ দেখতেও পায় না।

এই আয়াতে আল্লাহর تعالى শব্দ চয়ন লক্ষ্য করার মতো। আয়াতটির আরবির অর্থ আসলে “যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছে যাও” নয়, বরং অর্থ হচ্ছে “যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থান ঘুরতে যাও”।[১][৫] —কবর আমাদের স্থায়ী ঠিকানা নয়। যদি হতো তাহলে বিচারের দুশ্চিন্তা থাকত না। দুনিয়ার ভুলের মাশুল দেওয়ার দরকার হতো না। বরং কবর হচ্ছে কিছুদিনের জন্য ঘুরতে যাওয়া। তারপর একসময় সেখান থেকে আমাদেরকে বের করে ফেলা হবে। তখন শুরু হবে আসল বাস্তবতা। মানুষ সেদিন জানতে পারবে তার পৃথিবীর জীবনটা আসলে বাস্তবতা ছিল না, শুধুই একটা মায়া ছিল। একটা পরীক্ষা। আসল বাস্তবতা কেবল শুরু হলো বলে!

না! তোমরা একদিন জানতে পারবে। আবারো বলছি, না! তোমরা একদিন জানতে পারবে
সেদিন থেকে শুরু হবে মানুষের সত্যিকারের অস্তিত্ব। যেই অস্তিত্বের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেই অস্তিত্ব নিয়ে সে চিরকাল থাকবে। পৃথিবীর জীবনটা যে একটা সামান্য সময়ের পরীক্ষা ছিল, সেদিন মানুষ সেটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করবে। ভীষণ লম্বা সময় ধরে সেই নতুন বাস্তবতা তার চোখের সামনে খুলতে থাকবে। শুরু হবে কঠিন, লম্বা এক বিচার পর্যায়। সেই প্রক্রিয়াটা এত লম্বা সময় ধরে হবে যে, পৃথিবীর ৭০-৮০ বছরের জীবনও তার কাছে তখন একদিন বা কয়েক ঘণ্টার সমান মনে হবে। সেদিন আমরা এক নতুন বিশ্বজগত, মহাবিশ্ব চলার নতুন সব পদ্ধতি, সময়-এর এক নতুন রূপ দেখতে পারবো।

৩. সত্যিই, তোমরা যদি নিশ্চিতভাবে জানতে কী ঘটবে

হায়! মানুষ যদি জানত যে সেদিন কী হবে, তাহলে তারা আজকে এইভাবে নিজেদের জীবনটাকে শেষ করত না। কেউ যদি উপলব্ধি করত যে, কীভাবে সেদিন তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মহাশক্তিমানের সামনে দাঁড় করানো হবে: প্রতিটা কাজের হিসেব দেওয়ার জন্য, তাহলে আজকে সে বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অন্ধের মতো দিনরাত দৌড়াতো না। নিজেকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন কাজে ডুবিয়ে রাখত না। আরও টাকা, আরও সম্মান, আরও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় আল্লাহকে تعالى ভুলে থাকত না।

৪. অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখতে পাবে। আবারো বলছি, তোমরা অবশ্যই নিজের চোখে তাকে দেখতে পাবে

প্রতিটি মানুষ জাহান্নামের ভয়ংকর রূপ, সেখানকার প্রচণ্ড শাস্তি নিজের চোখে দেখবে। শুরু হবে বিচার। কিছু মানুষ বিচারে হেরে যাবে। তাদেরকে তখন সেই ভয়ংকর জায়গায় ফেলে দেওয়া হবে। আর কিছু মানুষ বিচারের পর পার পেয়ে যাবে। আল্লাহ تعالى তাদের উপর দয়া করবেন। তাদেরকে ছেড়ে দেবেন।

আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কল্পনা করতে বলছেন যে, আমরা প্রত্যেকে জাহান্নামের ভয়ংকর রূপ একদিন নিজের চোখে তাকিয়ে দেখবো। সেই ভীষণ দৃশ্য দেখে আমাদের কেমন লাগবে, সেটা যেন এখনি আমরা কল্পনা করি। কারণ আমরা যত গভীরভাবে কল্পনা করবো, আশা করা যায় আমাদের তত তাড়াতাড়ি হুশ ফিরবে। আমরা বুঝতে পারবো যে, দুনিয়াতে আমরা এমন সব কাজে ডুবে আছি, যেগুলো শুধুই আমাদেরকে সেইদিনের চরম বাস্তবতা থেকে ভুলিয়ে রেখেছে। আমাদের জলদি জেগে ওঠা দরকার।

৫. তারপর, সেদিন তোমাদেরকে সুযোগ-সুবিধাগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে

সেদিন আমাদেরকে আন-নাঈম النَّعِيمِ অর্থাৎ যাবতীয় সুখ, আনন্দ, সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আল্লাহ تعالى কাউকে মেধা দিয়েছেন। কাউকে স্বাস্থ্য দিয়েছেন। কাউকে সম্পদ দিয়েছেন। কাউকে আবার অফুরন্ত সময় দিয়েছেন। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে: যে যা নিয়ামত পেয়েছি জীবনে, সেটাকেই কাজে লাগানো। যাদের মেধা আছে কিন্তু টাকা-পয়সা নেই, তারা তাদের মেধাকেই কাজে লাগাবে ভালো কাজে। ইসলামের জন্য নিজে পড়াশুনা করবে, অন্যদের শেখাবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, লেখালেখি করবে।

যাদের স্বাস্থ্য আছে, কিন্তু মেধা, টাকা-পয়সা নেই, তারা তাদের স্বাস্থ্য দিয়েই ইসলামের জন্য কাজ করবে। মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা বানাতে বিনামূল্যে পরিশ্রম দেবে। গরিবদের জন্য বাড়ি মেরামত করে দেবে। এলাকার উন্নয়নে কাজ করবে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

যাদেরকে আল্লাহ تعالى অঢেল সম্পদ দিয়েছেন, তারা তাদের সম্পদ দিয়ে ইসলামের চর্চা, প্রসার, প্রচারে অর্থনৈতিকভাবে সবরকম সাহায্য করবে। মসজিদে টাকা দেবে, মাদ্রাসা বানিয়ে দেবে, এতিমখানা তৈরি করবে। গরিব আত্মীয়, এতিমদের ভরণপোষণ দেবে।

আর যাদের মেধা, স্বাস্থ্য, সম্পদ কিছুই নেই, আছে শুধুই সময়, তারা তাদের সময়কে কাজে লাগাবে নিজে ইসলাম শিখে এবং আশেপাশের মানুষকে ইসলামের দিকে ডেকে। তারা হয়ে যাবে সমাজের বিবেক। সমাজে ঘটে যাওয়া নিত্যনতুন অনাচার, অপসংস্কৃতির প্রবেশ, কিশোর-তরুণদের উচ্ছন্নে যাওয়ার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে কাজ করবে। ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝাবে, ফিরে আসতে বলবে। যেসব জায়গায় গিয়ে মানুষ অপকর্ম করে, সেখানে গিয়ে সশরীরে বাঁধা দেবে।

আল্লাহ تعالى যাকে যতটুকুই সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন, যা কিনা আল্লাহর تعالى আরও কাছে যাওয়ার জন্য সে কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগাতে পারত, সেগুলোর ব্যাপারেই তাকে জবাব দিতে বলা হবে। দুনিয়াতে সে যত আরাম-আয়েসের উপকরণ পেয়েছে, যত বিনোদন করে গেছে, যতটুকু সময় সুখে থেকেছে, তার জন্য তাকে সেদিন জিজ্ঞাসা করা হবেই। লাতুসআলুন্না لَتُسْأَلُنَّ —দুই বার জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, জিজ্ঞেস করা হবেই হবে, কোনো ছাড় নেই। মানুষ কি সেগুলো পেয়ে আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞ হয়েছিল? তারপর, কৃতজ্ঞতা দেখানোর জন্য কী করেছিল সে?

উপসংহার
সম্মান, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি অর্জনে চেষ্টা করা দোষের কিছু নয়। দোষ হচ্ছে যখন তা আমাদেরকে আল্লাহর تعالى কথা ভুলিয়ে দেয়। আল্লাহর تعالى প্রতি অকৃতজ্ঞ করে দেয়। যখন সেগুলোর পেছনে ছুটতে গিয়ে ইসলাম ভুলে যাই। পরিবারকে ভুলে যাই। সন্তানদের ঠিকভাবে সময় দেই না। বাবা-মা’র সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখি না। সময়মত নামাজ পড়তে ভুলে যাই। সমাজের অন্যায়-অনাচার দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যাই। নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকি। এলাকার এতিম, গরিবদের দিকে তাকাই না। আত্মীয়দের আবেদন উপেক্ষা করি। যখন আমাদের যাবতীয় চেষ্টা হয়ে যায় মানুষকে দেখানোর জন্য প্রতিযোগিতা। অন্যের থেকে নিজেকে সম্পদশালী বলে জাহির করার মানসিকতা। তখনি তা আমাদেরকে এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

একারণে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে: আমাদের এখন যা কিছুই আছে এবং যা কিছুই আমরা পাওয়ার চেষ্টা করছি, তার সবকিছুই আল্লাহকে تعالى খুশি করার জন্য পাওয়ার চেষ্টা করা। তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের চেষ্টা এবং যোগ্যতাগুলো পরিবার, বাবা-মা, আত্মীয়, এতিমদের উপকারে লাগবে। ইসলামের প্রচার এবং প্রসারে অবদান রাখবে। তখনি আমরা বলতে পারবো যে, সেগুলো পেয়ে আমরা সত্যিই আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখিয়েছিলাম।

[১] বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর। [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ। [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি। [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী। [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি। [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী। [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ। [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ। [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস। [১৪] তাফসির আল কুরতুবি। [১৫] তাফসির আল জালালাইন। [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ। [১৭] তাফসীর আহসানুল বায়ান — ইসলামিক সেন্টার, আল-মাজমাআহ, সউদি আরব [১৮] কু’রআনুল কারীম – বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর — বাদশাহ ফাহাদ কু’রআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স। [১৯] তাফসির আল-কাবির। [২০] তাফসির আল-কাশ্‌শাফ।

Photos 23/01/2018
19/01/2018

দশটি কারণ : কেন মুসলমানদের আরবী শিখা উচিত?

১. সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ পৃথিবীর বর্তমান, অতীতের অনেক ভাষা থেকে আরবীকে বাছাই করেছেন সমগ্র মানবতার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে। শুধু এ কারণটাই মুসলমানদের আরবী ভাষা জানার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যদি চাইতেন আরবী ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায়, এমনকি সকল ভাষায় কুরআন নাযিল করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেই কুরাআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই, আমরা কুরআনকে আরবী ভাষায় নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।‘ এই আয়াতটা আরবী ভাষার অনন্য বৈশিষ্ট্যের ইংঙ্গিতবাহী যাতে অন্যান্য সকল ভাষায় চেয়ে আরবী ভাষার শ্রেষ্টত্ব এবং আ্ল্লার কথাগুলোর সঠিক অর্থ অনুধাবনের যোগ্যতা সম্পন্ন এ ভাষা যা অন্য কোন ভাষার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নেই। বস্তুত: আল্লাহ তায়ালাই আরবী ভাষাকে এ অনন্য বৈশিষ্ট্যের এবং অন্যান্য ভাষা থেকে শ্রেষ্টত্বের মর্যাদায় আসিন করেছেন।

২. আপনি যদি আল্লাহকে সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা মনে করেন এবং আল্লাহর মনোনীত সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি নবী হযরত মুহাম্মদ (সHappy হয় তাহলে প্রত্যেক মুসলমানের কি উচিত নয় আল্লাহ এবং তার নবীর এ ভাষাকে শিক্ষার জন্য , আল্লাহ এবং তার রাসুল কি বলেছেন তা বোঝার জন্য নিজের সমগ্র প্রচেষ্টাকে নিয়োজিত করা? কিভাবে একজন মুসলমান এই ভাষা শিখার জন্য সময় খুজঁবে না যেখানে বিশ্বের অনেক ভাষা শিখা এবং অর্থ উপার্জনের জন্য তার যথেষ্ট সময় থাকে?

৩. বিরাট সংখ্যক পণ্ডিত বিশ্বাস করে কুরআনের রচনাশৈলি, বাগ্মিতা অন্য যে কোন সাহিত্যের তুলনায় অনেক উচু মানের। আরবী ভাষার জ্ঞান না থাকলে স্রষ্টা কতৃক সরাসরি প্রেরিত এই অতুলনীয় সাহিত্য রচনাকৌশলটা থেকে সবসময় নিজেকে বঞ্চিত রাখা হবে।

৪. কুরআন হাদিসের বাইরে আরবী ভাষায় রয়েছে সুবিশাল এবং সমৃদ্ধ ইসলামী সাহিত্যে উত্তরাধিকার। আরবী ভাষায় বিভিন্ন পড়ালেখার রয়েছে বিপুল পরিমান বৃত্তির ব্যবস্থা যা ইসলাম শিক্ষার প্রচার এবং প্রসারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নতির জন্য বরাদ্ধ করা আছে। এ ভাষায় দক্ষ হয়ে না উঠলে এসব থেকে মুসলিম উম্মাহ, মুসলিম ইনিস্টিটিউটগুলো কোন উপকার পাবে না এবং সমৃদ্ধ হবে না। যা পরোক্ষভাবে মুসলিমদের বিপক্ষেই যাবে।

৫. উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী বিজ্ঞান আরবী ভাষাগত বিজ্ঞান থেকে আহরণ করা যাতে বেশকিছু ভাষাগত ইস্যুর আলোচনা আছে। এসব বুঝার জন্য আরবী ভাষা বিজ্ঞানের উপর ব্যপক দখল থাকা দরকার। এসব বিজ্ঞানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আল-তাফসীর (কোরানের ব্যাখ্যা), 'উলুম আল-কুরআন (কোরান বিজ্ঞান),' ইলমে আল-হাদীছ, আল-ফিকহ (ইসলামী বিধান), আল-আকিদাহ (ইসলামী ধর্মশাস্ত্র)। ইসলামের দু’টি প্রধান উৎস কুরআন ও হাদীছ আরবী ভাষায় হওয়ার এসবের অর্ন্তনীহিত অর্থ অনুধাবন, সঠিক বার্তা বুঝতে পারা তখনই সম্ভব হবে যখন আরবী ভাষার চর্চা অনেক উন্নত পর্যায়ে থাকবে। ইসলামী বিজ্ঞান চায় এসবের বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ। তাহলেই শুধু কুরআন হাদিছের সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব।

৬. হযরত উমর (রাHappy বলেছেন:

‘সুন্নাহ শিখুন এবং আরবী শিখুন। কুরআনকে আরবীতে শিখুন কারণ এটা আরবী ভাষায় রচিত।‘

তিনি আরো বলেছেন:

‘আরবী শিখুন কারণ এটা আপনার ধর্মের একটা অংশ কিভাবে মৃতের সম্পদ বন্টন করতে হবে( আল ফারাইদ) তা বুঝতে আরবীকে জানুন কারণ এটা আপনার ধর্মের অংশ।‘

ইমাম শাফেঈ কুরআনকে বুঝার জন্য বিশ বছর ধরে আরবী শিখেছিলেন (কারণ এটা হচ্ছে বিশুদ্ধ উৎস)।

কিছু কিছু পণ্ডিত আরবী ভাষাকে মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক ভাষা হিসাবে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন কুরআন, হাদিসের অধ্যয়ন প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক। যেহেতু কুরআন হাদিস আরবী ভাষার জ্ঞান ছাড়া শিক্ষাকরা সম্ভব নয় সুতরাং আরবী ভাষাও বাধ্যতামূলক করা হউক।

৭. আরবী ভাষার জ্ঞান একজন মুসলিমকে তার ইবাদতকে আবেগময় এবং অর্থবহ করে দেয়। সালাত, কুরআন তেলওয়াত, খুতবা শ্রবনে, দুয়া করার সময় অর্থ বুঝাটা একজন মুসলমানের মধ্যে প্রবল আবেগ সৃষ্টি করতে পারে যা না বুঝে করলে অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে। সংক্ষেপে, আরবী জ্ঞান আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে একজন মধ্যস্থতাকারিকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলে। অন্য কথায়, আরবী আমাদেরকে কুরআন এবং নবীজীর নির্দেশনাকে সরাসরি শুনতে এবং পালনকরতে সক্ষম করে।

৮. অনুবাদের একটা সমস্যাযুক্ত প্রকৃতি আছে যার কারণেই মুসলিমদের আরবী জানা উচিত। আমাদের অধিকাংশ ঐতিহ্য এখন অনারব মুসলিম জনগণের নিকট অনধিগম্য। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তারা সেখানে পৌঁছতে পারবে না। অনুবাদের একটা নিজস্ব ঘাটতি থেকে যায় যা পুরো বিষয়টার স্বাদ নেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এটার পরিসীমা নিম্নমান, অগ্রহনযোগ্য, ভুল অনুবাদও হতে পারে।

৯. সংস্কৃতির প্রবাহ হচ্ছে ভাষা। একটি ভাষা তার বক্তাদের উপর অমোচনীয় প্রভাব বিস্তার করে। আরবী ভাষার মধ্যে ইসলামী সংস্কৃতিটা একটা পজিটিভ ভিত্তির উপর বিদ্যমান। নি:সন্দেহে কুরআন সুন্নার একটা স্থায়ী চিহ্ন আরবী ভাষার মধ্যে নীহিত। তাছাড়া দীর্ঘ চৌদ্দশত বছর ধরে আরবী প্রায় অবিকৃতই আছে।

১০. যদি কিছু সংখ্যক অমুসলিম মুসলমানদের জন্য ঘৃণা ছড়ানোর জন্য এবং ইসলামকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নেয়ার জন্য মুসলমানদের উপর আধিপত্য বজায় রাখার জন্য আরবী নিয়ে গবেষণা করতে পারে তাহলে একজন মুসলিম ইসলামকে সমুন্নত রাখার জন্য, তার বিশ্বাসকে (ঈমান) মজবুত করার জন্য , মুসলিম উম্মাহকে এন্টি ইসলামিস্টদের ষড়যন্ত্র, ইসলামফোবিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কেন আরবী অধ্যয়ন করবে না?

18/01/2018

আরবী ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের করণীয়

আরবী ভাষা ও সাহিত্য চর্চা বিগত শতাব্দীর নববইয়ের দশক পর্যন্ত সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরবী বিভাগ এবং কওমী মাদরাসার পাঠ্যসূচীর মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে আরবী ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র ও পরিধি বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে এবং এর জন্য পৃথক পাঠ্যসূচী, প্রতিষ্ঠান ও বিভাগ ব্যক্তি পর্যায়ে অথবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গড়ে উঠে। এর জন্য এক বছর বা দু’বছর মেয়াদি কোর্সও চালু করা হয়। এসব কোর্সে সাধারণত কওমী মাদরাসার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তকারী ও সনদপ্রাপ্ত ছাত্ররা ভর্তি হয় এবং নতুন করে আরবী ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় আত্ননিয়োগ করে। এর ফলে তারা আরবী ভাষার ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং বলার ও লেখার যোগ্যতাও কমবেশী লাভ করতে সক্ষম হয়।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি আরবী ভাষা, ব্যাকরণ ও সাহিত্যের পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করার পরও ছাত্ররা কেন নতুন করে আরবী ভাষা ও সাহিত্যের কোর্সে ভর্তি হয় এবং কমপক্ষে এক-দুই বছর ব্যয় করে? এর সহজ উত্তর হল, আমাদের কওমী মাদরাসাগুলোর আরবী পাঠ্যক্রমের চূড়ান্ত লক্ষ্য আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পান্ডিত্য অর্জন নয় বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে:

১. বিশুদ্ধভাবে আরবী ইবারত পাঠ করার দক্ষতা অর্জন।

২.আরবী ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদি পাঠ করে এর মর্ম উপলব্ধি করার দক্ষতা অর্জন।

৩.পবিত্র কুরআন ও হাদীসের অসাধারণ ভাষাগত নৈপুণ্যের সাথে পরিচিতি লাভ।

তবে এটা অনস্বীকার্য যে, কওমী মাদরাসার আরবী পাঠ্যক্রমেও এমন মৌলিক উপাদান রয়েছে যার মাধ্যমে একজন প্রতিভাধর শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে আরবী ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনে সক্ষম হতে পারে। বাসত্মবেও এর প্রমাণ লক্ষ্য করা যায়।[1]

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া উচিত। সেটা হচ্ছে, ভাষা চর্চা ও সাহিত্য চর্চা কি একই বিষয়? নিরেট সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে কি ব্যবহারিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষিক দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব? এর পরিষ্কার ও যথার্থ উত্তর হল, না। কারণ, যে কোনো ভাষার প্রাচীন সাহিত্যধর্মী গদ্য ও পদ্যের ভাষা হচ্ছে দুর্বোধ্য, দৈনন্দিন জীবনে অব্যবহৃত এবং ব্যবহারিক জীবনের ভাষিক প্রয়োজন পূরণে অক্ষম। এই বাস্তবতা কেবল আরবী ভাষার ক্ষেত্রেই নয় পৃথিবীর জীবন্ত যে কোনো ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ও লক্ষ্যণীয়। তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আরবী সাহিত্যের প্রাচীন পদ্য ‘আস সাবউল মু‘আল্লাকাত’, ‘দিওয়ানুল হামাসা’, ‘দিওয়ানুল মুতানাববী’ এবং প্রাচীন গদ্য বিশেষ করে ‘মাকামাতে হারিরী’ ইত্যাদি প্রামাণ্য ও উচ্চাঙ্গের সাহিত্য-গ্রন্থাদি পাঠ করে দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক ভাষা শিক্ষা করা আদৌ সম্ভবপর নয়। আর এ কারণেই ছাত্ররা এসব গ্রন্থাদি পাঠ করেও ভাষাগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার জন্য নতুন করে ভাষাচর্চা করতে বাধ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী ও আরবী সাহিত্যের ছাত্ররা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেও ঐ একই কারণে নতুন করে ভাষা কোর্সে ভর্তি হতে বাধ্য হয়।

আদব বা সাহিত্য শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার এবং অনেকটা অপপ্রয়োগের বিষয়টি লক্ষ্যণীয়। বিষয়টি এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, নিছক নাহু-সরফের স্বল্প মেয়াদি কোর্সের নামও দেয়া হয় ‘‘আরবী আদবের কোর্স’’। আবার কোথাও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মানের আরবী গদ্য ও পদ্যের কোর্সকেও ‘‘আরবী সাহিত্যের কোর্স’’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটাকে ‘‘যুল্ম’’ বললে অযৌক্তিক হবে না। কারণ যুল্ম শব্দের অর্থই হচ্ছে وضع شيء في غير محله غير محله (কোনো কিছুর অপপ্রয়োগ)। আরও লক্ষ্যণীয় যে, এই স্বল্প মেয়াদি ভাষা কোর্সের নাম দেয়া হয় (تخصص تخصص في الأدب) অর্থাৎ সাহিত্যের অনার্স কোর্স। অথচ অনার্স কোর্স বা বিশেষায়িত কোর্সের জন্য অন্ততপক্ষে চার বছরের প্রয়োজন। অপরদিকে যারা এই কোর্সে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের অনেকেরই নামের আগে الأديب الأريب"" (সুসাহিত্যিক) শব্দটি যোগ করা হয়। কাজেই আদব শব্দটির পারিভাষিক অর্থ ও এর মূল উপাদান কী সে ব্যাপারে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের অবস্থান যথার্থরূপে ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নিরূপণ করতে সক্ষম হব।

বলা বাহুল্য যে, আরবীতে ‘আদব’ শব্দের একাধিক সংজ্ঞা রয়েছে। এখানে আমরা কেবল তিনটি সংজ্ঞা তুলে ধরতে চাই। এর দুটো হল সাধারণ সংজ্ঞা, আর অপরটি হল ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কেন্দ্রিক সংজ্ঞা। আদবের দুটো সাধারণ সংজ্ঞ নিম্নরূপ:

الأدب هو الكلام الإنشائي البليغ الذي يقصد به إلى التأثير في عواطف القراء والسامعين سواء أكان شعرا أم نثرا (د. شوقي ضيف/ تاريخ الأدب العربي)

অর্থ : সাহিত্য হচ্ছে বিরচিত প্রাঞ্জল বক্তব্য -সেটা কাব্য হোক অথবা গদ্য- যার লক্ষ্য হচ্ছে পাঠক ও শ্রোতাবৃন্দের আবেগকে প্রভাবিত করা।

الأدب إنما هو ألفاظ مختارة وتراكيب متقنة وأساليب مجودة, معان مؤثرة. (د. عبد العزيز بن محمد الفيصل / الأدب العربي وتاريخه)

অর্থ: সুচয়িত শব্দাবলী, বলিষ্ঠ গঠনরীতি, সুষমামন্ডিত রচনাশৈলী এবং হৃদয়গ্রাহী অর্থমালাই হচ্ছে সাহিত্য।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কেন্দ্রিক আদব বা সাহিত্যের সংজ্ঞা হচ্ছে নিমণরূপ:

كل شعر أو نثر يؤثر في النفس، ويهذب الخلق، ويدعو إلى الفضيلة، ويبعد عن الرذيلة بأسلوب جميل (د. عبد العزيز بن محمد الفيصل / الأدب العربي وتاريخه)

অর্থ: সাহিত্য হচ্ছে এমন প্রতিটি কাব্য বা গদ্য যা নান্দনিক প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টি করে, চরিত্রকে পরিশীলিত করে, শালীনতার প্রতি আহবান করে এবং অশালীনতা হতে দূরে রাখে।

উপরোক্ত সংজ্ঞা দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, সাহিত্য কেবল ব্যাকরণের কিছু নিয়ম কানুন ও হাজার খানেক শব্দ মুখস্থ করার নাম নয় এবং দুর্লভ বর্ণনাভঙ্গি ও কিছু দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করে দু’একটা রচনা লেখাও সাহিত্য চর্চা নয়। সাথে সাথে এ বিষয়টিও সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, লেখক মাত্রই সাহিত্যিক নয়। বরং সাহিত্যিক হতে হলে আরও অনেক ভাষিক গুণ ও প্রতিভার অধিকারী হতে হয়। যে কোনো ভাষায় সাহিত্য চর্চার জন্য প্রাথমিকভাবে যে বিষয়গুলো অপরিহার্য তা হচ্ছে:

১. শব্দমালা (المفردات)

২. ব্যাকরণ (النحو والصرف)

৩. শব্দতত্ত্ব (علم المعاني)

৪. বর্ণনা বিদ্যা (علم البيان)

৫. শব্দালঙ্কার (علم البديع)

৬. ছন্দশাস্ত্র (علم العروض)

৭. কল্পনা (الخيال)

৮. আবেগ (العاطفة)

এই বাস্তবতার আলোকে বলা যায় যে, আমাদের দেশে স্বল্প মেয়াদি যে কোর্সগুলোর আয়োজন করা হয়, তা আদৌ সাহিত্যে (متخصص) বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোর্স নয়। বরং তা হচ্ছে প্রাথমিক ভাষা শিক্ষার কোর্স। এই কোর্সের মাধ্যমে ছাত্ররা আরবী ভাষায় বলা, লেখা ও পড়ার যোগ্যতা অর্জনের একটা কার্যকর সুযোগ পায়। এই মৌলিক ভাষিক যোগ্যতা বিশেষ করে পড়া ও বলার যোগ্যতা যথাযথ ও কাঙ্ক্ষিত মানে অর্জন করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগে যত্নবান হতে হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে:

১. উচ্চারণের বিশুদ্ধতা (صحة النطق)

২. শব্দ কাঠামোর বিশুদ্ধতা (صحة الضبط)

৩. এ‘রাবের বিশুদ্ধতা (صحة الإعراب)

৪. বাচনভঙ্গির বিশুদ্ধতা (صحة الأداء)

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও যথার্থ বাচনভঙ্গি পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় বলা ও পড়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত। তবে সাধারণ লিখিত আরবী ভাষায় যেহেতু স্বরচিহ্ন বা ধ্বনিচিহ্ন (حركات) থাকে না, সাথে সাথে আরবী ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যার একাধিক কাঠামো থাকলেও তা একক বানানে লেখা হয় তাই সেগুলো পড়ার সময় বাক্যের পূর্বাপর ও প্রসঙ্গ অনুযায়ী সঠিক কাঠামো নির্ণয় করে তা উচ্চারণ করতে হয়। এ জন্য আরবী শব্দের একাধিক কাঠামো ও কাঠামোভেদে অর্থের পার্থক্যটা বিশেষভাবে জানতে হয়। এর জন্য শিক্ষার্থীদেরকে পরিশ্রম করতে হয় এবং ব্যাপক অনুশীলন করতে হয়। তাই কোনো ছাত্র যদি স্বরচিহ্ন বিহীন কোনো আরবী লেখা বিশুদ্ধ উচ্চারণ, বিশুদ্ধ এ‘রাব ও সঠিক শব্দ কাঠামো রক্ষা করে পড়তে পারে তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় সে আরবী ভাষা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে। কাজেই এ বিষয়ে শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদেরকেও সজাগ থাকতে হবে এবং তাঁদের মাঝেও এ গুণ পরিপূর্ণরূপে না হলেও যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত পর্যায়ের হতে হবে।

আরবী শিক্ষার্থীকে লিখন যোগ্যতা অর্জনের জন্য অবশ্যই আরবী ভাষায় তার শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে। বানানের নিয়ম-কানূন শিখতে হবে। ব্যাকরণসম্মত ও অর্থপূর্ণ বাক্যগঠন পদ্ধতি জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী একক বিষয়ভিত্তিক পরস্পর যুক্ত ও সুবিন্যস্ত বাক্য গঠনের অনুশীলন করতে হবে। প্রাথমিক সত্মরে ছাত্রদেরকে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ও সরল বাক্য গঠনের অনুশীলন করানো হবে। পর্যায়ক্রমে তাদের মাঝে বিষয়ভিত্তিক ও বিভিন্ন আকার আকৃতির সরল, যৌগিক ও জটিল বাক্য গঠনের যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে। সাথে সাথে একই বক্তব্য শব্দ পরিবর্তন এবং বাক্য কাঠামো ও বর্ণনাভঙ্গি পরিবর্তন করে ব্যক্ত করার অনুশীলনও করতে হবে। এ লক্ষ্যে ভাষা শিক্ষার্থীদেরকে অবশ্যই বিভিন্ন বর্ণনাভঙ্গির (أساليب البيان) সাথে পরিচিত হতে হবে এবং কোন্ বিষয় বা বক্তব্যের জন্য কোন্ বর্ণনাভঙ্গি উপযোগী সেটাও ভালো জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী বর্ণনাভঙ্গিতে পরিবর্তন ও বৈচিত্র আনতে হবে। তা না হলে তারা একই ধরনের বাক্য গঠনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং একই ধরনের বর্ণনাভঙ্গির মাঝে সীমাবদ্ধ

হয়ে পড়বে। লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্র কেবল সাহিত্যধর্মী রচনা পড়ে এবং তা অনুকরণ করতে শিখে। তাদের সব বিষয়ের রচনায়ই এই সাহিত্যধর্মী বর্ণনাভঙ্গির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। এমনকি নিরেট গবেষণাধর্মী ও সাধারণ বিষয়ের লেখাতেও তারা ঐ একই সাহিত্যধর্মী বর্ণনাভঙ্গি ব্যবহার করে থাকে, যা অত্যন্ত দোষণীয়। কারণ আরবী প্রবাদবাক্যে সুস্পষ্টরূপে বলা হয়েছে, "لكل مقام مقال" অর্থাৎ অবস্থা ভেদে বক্তব্য হতে হবে। যেমন বিষয় হবে বর্ণনাভঙ্গিও তেমনি হতে হবে। অন্যথায় তা দোষণীয় বলে বিবেচিত হবে।

সমসাময়িক বিষয় ও ব্যবহারিক জীবনের উপযোগী আরবী ভাষা শিখতে হলে অবশ্যই আরবী পত্র-পত্রিকা পড়তে হবে এবং সেখান থেকে শব্দ শিখতে হবে। কারণ পত্রিকা হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম যা জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ ও পরিভাষা উপস্থাপন করে থাকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন সংবাদ ও প্রবন্ধাদি প্রকাশ করার মাধ্যমে। যে কোনো জীবন্ত ও বহুল ব্যবহৃত ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা ভাষাবিজ্ঞানীগণ স্বীকার করেন এবং ব্যবহারিক জীবনের উপযোগী যে কোনো ভাষা শিক্ষার জন্য ঐ ভাষার পত্র-পত্রিকা পড়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাই আধুনিক ও ব্যবহারিক আরবী ভাষা শিখতেও এই একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। একটা কথা আমাদের ভালো করেই মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেসব আরবী গ্রন্থ সমসাময়িক যুগের লেখকগণ রচনা করেছেন সেগুলো পড়ে বুঝার জন্যও আমাদেরকে এই আধুনিক ও ব্যবহারিক আরবী ভাষা শিখতে হবে। কাজেই আমাদের দেশে আরবী ভাষা শিক্ষা কোর্সে আরবী সংবাদপত্র পঠন ও অনুধাবনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এর জন্য যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ব্যবস্থাও করতে হবে।

পরিশেষে যে বিষয়টির প্রতি আরবী ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা হল, ভাষিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য আমাদের ভাষা চর্চাটা হতে হবে সামগ্রিক এবং তা অবশ্যই ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও জ্ঞান-বিজ্ঞান ভিত্তিক এবং প্রয়োজন পূরণে হতে হবে কার্যকর ও ফলপ্রসূ। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ভাষা চর্চার পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও নিয়মতান্ত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক সাধনা ও অনুশীলন। অন্যথায় আমাদের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত মানের আরবী ভাষা শিক্ষাও সম্ভব হবে না এবং আরবী সাহিত্য চর্চাও সম্ভব হবে না।

[1] বিশেষ করে যেসকল কওমী মাদরাসায় ‘আততারীকু ইলাল আরাবিয়্যাহ’ (এসো আরবী শিখি) ‘আততামরীনুল কিতাবী’, ‘কাছাছুন নাবিয়্যীন’, ‘আল কিরাআতুর রাশেদাহ’ ও ‘মুখতারাত’ ইত্যাদি কিতাবগুলো নেসাবের অমত্মর্ভুক্ত- সেখানে বিষয়টি বেশি সহজ হয়।

18/01/2018

বিদেশ যাওয়ার আগে আরবী ভাষা শিখবেন কেন?

আরবের গালফ কান্ট্রিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেশেই আমাদের দেশের অনেকেই বসবাস করেন কাজের খাতিরে। প্রায় সবগুলো দেশের রাস্ট্রীয় ভাষা আরবী ভাষা। অনেক সময় আরবী কথোপকথন না জানার কারনে উর্ধতন কর্মকর্তা কিংবা মালিকদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা সম্ভব হয় না। তাই চাকুরীতে দ্রুত উন্নতিও পাওয়া যায় না। একইভাবে কোন সমস্যা/চাহিদা মালিকপক্ষের কাছে, সরকারী অফিসিয়ালদের কাছে উপস্থাপন করা যায় না কিংবা স্থানীয় লোকজনের সাথেও কথাবার্তা বলা যায় না। এইজন্য আপনি যেই ভিসাতেই এইসব দেশের যাবার পরিকল্পনা করছেন, আপনার জন্য অবশ্যই আরবী ভাষা শিখে যাওয়াটাই সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। তাই এখনেই শিখে নিন বেসিক আরবী ভাষা কথোপকথন চাকুরীতে দ্রুত উন্নতি পেতে।

17/01/2018

ইসলামে আরবী ভাষা, এর গুরুত্ব ও উম্মতের পুনর্জাগরণে এর ভূমিকা
ভাষা

তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে। [রূম: ২২]

ভাষা একে অপরের সাথে চিন্তা, ভাবনা ও ধারনার যোগাযোগের মাধ্যম। এর মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা একজন থেকে অন্যজনে প্রবাহিত হয়, এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। লিখিত হোক বা অলিখিত, এটাই মানুষের জন্য চিন্তা-চেতনা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে প্রাচীনকাল হতে। ভাষা অবশ্যই আমাদের চিন্তা প্রক্রিয়ার অংশ নয় বরং এর ফলাফল। এ বিষয়টি Rational ও Empirical উভয় চিন্তার পদ্ধতি দ্বারাই প্রমাণ করা সম্ভব। এটা আমরা বুঝতে পারি যখন আমরা দেখি বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে একই চিন্তা-চেতনা একই ভাবে বিরাজ করে কিন্তু তা প্রকাশ করার সময় বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করে। উদাহরনসরূপ, একজন ইংরেজ, একজন চাইনিজ, একজন জার্মান কিংবা একজন বাঙ্গালী ভিন্ন ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিজমকে তাদের আদর্শ হিসেবে নিতে পারে। ভিন্ন ভাষা তাদের আদর্শিক চিন্তার মধ্যে কোনো পার্থক্য ঘটায় না।

ভাষা অনেকটা মানুষের মতোই। এর উদ্ভব হয়, বিবর্তন হয়, উন্নতি হয়, দূর্বলতা দেখা দেয় এবং কখনো কখনো ভাষার মৃত্যু তথা বিলুপ্তিও দেখা দিতে পারে। ভাষার উৎপত্তি মূলত কথ্য রুপে শুরু হয়, পরবর্তীতে তা লিখিত রুপে আসে এবং কোনো প্রতিষ্ঠিত ভাষার পন্ডিতগণ সাধারণত তখনই ভাষার নিয়মনীতি তথা ব্যকরণ রচনা করেন যখন তারা ভাষার বিকৃতির আশঙ্কা করেন।

আরবী ভাষা

অন্য সকল ভাষার মতোই আরবীও পৃথিবীর একটি প্রচলিত ভাষা। এটি একটি সেমিটিক ভাষা এবং পৃথিবীর বৃহত্তম সেমিটিক ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মানুষের জন্য এটি তাদের প্রধান ভাষা। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রায় ২২টি দেশের রাষ্ট্রভাষা এটি। ধারণা করা হয়ে থাকে যে প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে এ ভাষা অস্তিত্বে আসে যদিও এর লিখন প্রক্রিয়ার শুরু আরো অনেক পরে। কেউ কেউ এ ভাষার উৎপত্তি আরো আগে মনে করেন। কোনো কোনো আলেম এটাও মনে করেন যে এ ভাষাটি আল্লাহর পক্ষ হতে আদম (আ) নিয়ে এসেছিলেন, তবে এ মতটি বিতর্কিত।

ইসলামের সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ক

যদি আমি একে অনারব ভাষার কুরআন করতাম, তবে অবশ্যই তারা বলত, এর আয়াতসমূহ পরিষ্কার ভাষায় বিবৃত হয়নি কেন ? কি আশ্চর্য যে, কিতাব অনারব ভাষার আর রাসূল আরবীভাষী। বলুন, এটা বিশ্বাসীদের জন্য হেদায়েত ও রোগের প্রতিকার। যারা ঈমান আনয়ন করে না, তাদের কানে আছে ছিপি, আর কুরআন তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তাদেরকে যেন দূরবর্তী স্থান থেকে আহ্বান করা হয়। [হা মীম আস-সাজদাহ: ৪৪]

আরবী ভাষার সাথে ইসলামের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও অবিচ্ছিন্ন। পবিত্র কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর উপর নাযিল হয়েছে আরবী ভাষায়। এবং পুরো কুরআনই আরবী ভাষায় নাযিলকৃত। এটি সম্পূর্ন আরবী এবং এতে কোনো বিদেশী শব্দ নেই। ইমাম শাফেঈ' তার আর-রিসালাহ গ্রন্থে বলেন: "কুরআন এই দিক নির্দেশনা দেয় যে আল্লাহর কিতাবের কোনো অংশই আরবী ভাষার বাইরে নয়...।" আল্লাহর কিতাবের ১১টি আয়াত হতে এ নির্দেশনা পাওয়া যায় যে কুরআন সম্পূর্ন আরবী ভাষায় নাযিলকৃত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"বিশ্বস্ত রূহ একে নিয়ে অবতরন করেছে। আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হন। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।" [সূরা শু'আরা: ১৯৩-১৯৫]

"এমনিভাবে আমি এ কুরআনকে আরবী নির্দেশরুপে নাযিল করেছি।" [সূরা রাদ: ৩৭]

"এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি।" [সূরা শুরা: ৭]

"আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।" [সূরা যুমার: ২৮]

"এবং এ কুরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়।" [সূরা নাহল: ১০৩]

ইসলামী আদর্শের সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ক ও এর গুরুত্বকে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়।

মৌলিক বিশ্বাস: এক্ষেত্রে ভাষা তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। কোনো ব্যক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে ঈমান এনে আল্লাহ, তার ফেরেশতা, রাসূল, ওহী, বিচার দিবস ও কদর-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে মুসলিম হতে পারে। এক্ষেত্রে ভাষার জ্ঞান থাকা অনিবার্য নয়।

পালন: ইসলাম পালন করার জন্য কিছু পরিমান আরবী জানা অবশ্যই দরকার। উদাহরণসরূপ, নামায আদায় ইত্যাদি।

ইসলামী জ্ঞান ও আইনবিদ্যা: ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে প্রকৃতভাবে জানতে হলে ও ইসলামী শরীয়াহর আইনসমূহ অধ্যয়ন করতে হলে আরবী ভাষার জ্ঞান অত্যাবশ্যকীয়। উদাহরণসরূপ, হকুম শরঈ', উসূল আল ফিকহ ইত্যাদি। সকল যুগেই মুসলিম পন্ডিতগণ ইজতিহাদের জন্য আবশ্যক আরবীভাষা, এর নাহু-সরফের জ্ঞান, শব্দভান্ডার, ব্যকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমানে জ্ঞান রাখতেন।

শাইখ তাকী (রহ) বলেন, "ঈমান ও আহকাম বোঝার বিষয়টি ইসলামে দুটি ভিন্ন বিষয়। ইসলামে ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয় বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলী দলীল দ্বারা। যাতে করে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কিন্তু আহকাম বোঝার বিষয়টি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করে না, বরং আরবী ভাষা জানার উপর, হুকুম বের করে আনার যোগ্যতা, দূর্বল হাদীস হতে সহীহ হাদীস পৃথক করার উপরও নির্ভর করে।" [১]

যেহেতু ইসলামী শরী'য়াহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় এবং যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি সেহেতু ইসলাম নিয়ে যেকোনো গভীর অধ্যয়ন-এর সাথে আরবী ভাষার অধ্যয়ন থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। এখানে আরবী ভাষা বলতে প্রাচীন (Classical) আরবী ভাষা ও তার কাঠামোকে বোঝানো হচ্ছে। কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষার চর্চা এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। এছাড়াও ইসলামী সভ্যতাকে শক্তিশালীভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য আরবী ভাষাকে বিকৃতির হাত রক্ষা করাও আবশ্যক।

আমাদের সালাফ তথা পূর্ববর্তীগণ এ বিষয়গুলো খুব ভালোভাবেই বুঝতেন। বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশিদীনের আমলেও এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

উমর (রা) আবু মূসা আশ'আরী (রা)-কে চিঠিতে লিখেছিলেন, "সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন ও আরবীর জ্ঞান অর্জন কর এবং কুরআন আরবীতে অধ্যয়ন কর কারণ এটা আরবী।" [২]

আরেকটি বর্ণনায় উমর (রা) বলেন, "আরবী শেখ কারণ এটি তোমাদের দ্বীনের অংশ"। তিনি আরো বলেছেন, "কারো কুরআন পড়া উচিত নয় ভাষার জ্ঞান ছাড়া"।

উবাই বিন কা'ব (রা) বলেছেন, "আরবী ভাষা শেখ ঠিক যেভাবে তোমরা কুরআন হিফজ করা শেখ"। [৩]

আলী (রা) যখন কুফায় তার রাজধানী স্থানান্তরিত করেন তখন সেখানে তিনি নতুন একধরনের আরবীর চর্চা দেখতে পান। এতে তিনি বেশ চিন্তিত হন এবং তিনি তৎকালীন আরবী পন্ডিত আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালীর সাথে বৈঠক করেন এবং তাকে আরবী ভাষার মৌলিক নীতিসমূহ বিশ্লেষন করেন। ইবনু কাছীর (রহ) তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে লিখেছেন,

"আবুল আসওয়াদ হচ্ছে তিনি যাকে নাহুজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত করা হয়। এবং বলা হয়, যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন তাদের মধ্যে তিনি প্রথমদিককার একজন। তিনি তা আমীর-উল-মু'মিনীন আলী ইবনে আবী তালিব (রা) হতে গ্রহণ করেছেন।" [৪]

ইমাম শাফেঈ' আরবী ভাষার জ্ঞান থাকাকে ফরজে আইন মনে করতেন এবং তিনি তার আরব ছাত্রদের আরবী ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করার তাগিদ দিতেন। তিনি তার ছাত্রদের বলতেন, "নিশ্চয়ই আমি জ্ঞান অন্বেষনকারীদের ব্যপারে এই ভয় পাই যে তারা আরবী ভাষার নাহু (ব্যকরণ) সঠিকভাবে জানবে না এবং এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সেই হাদীসের (বাস্তবতার) মধ্যে প্রবেশ করবে, 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন (জাহান্নামের) আগুনের মধ্যে তার আসন খুজে নেয়'"। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহও ইমাম শাফেঈ'র মতো অনেকটা একই মত পোষন করতেন। তার মতে যেহেতু একজন মুসলিমের জন্য কুরআন সুন্নাহ বোঝাটা আবশ্যক সেহেতু "অত্যবশ্যকীয় কিছু পালন করার জন্য যা প্রয়োজন তাও অত্যাবশ্যক"-এই নীতি অনুযায়ী আরবী ভাষা শেখাও আবশ্যক। তিনি আরো বলতেন, "আরবী ভাষা ইসলাম ও এর অনুসারীদের প্রতীক এবং যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি দ্বারা জাতিসমূহ নিজেদের পৃথক করে ভাষা তাদের মধ্যে অন্যতম।" [৫]

মু'জিযা

২৮ টি হরফ। এ কটি হরফ ও এর দ্বারা গঠিত শব্দ দিয়েই পৃথিবীতে পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। আমরা জানি, কুরআন একটি মু'জিযা যা মানবজাতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জসরূপ। এবং অন্যান্য নবী-রাসূলদের মু'জিযার সাথে কুরআনের পার্থক্য হচ্ছে, অন্যান্য নবী-রাসূলদের সময় শেষ হলে তাদের মু'জিযারও সমাপ্তি ঘটত, কিন্তু কুরআন একটি চলমান মু'জিযা যার সমাপ্তি হয়নি। যদিও কুরআনের মু'জিযা হওয়াটা আমাদের কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণিত। কিন্তু এ বিষয়টি শুধু জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ, অভিজ্ঞতা দ্বারা নয় (But this is only through knowledge, not through experience) । একমাত্র আরবী ভাষা শেখা ছাড়া এ অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি অর্জন করা সম্ভব নয়।

ঐতিহাসিকভাবে এ ভাষার অবহেলা ও এর পরিনাম

মুসলিমদের পতনের পেছনে যেভাবে কাফেরদের চক্রান্ত ছিল, ঠিক একইভাবে মুসলিমদের মধ্যেও বেশ কিছু দূর্বলতা দেখা দিয়েছিল। এবং এসব কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম এক কারণ হলো আরবী ভাষার প্রতি অবহেলা। যদিও মুসলিমরা এ ভাষার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল, কাফেররা ঠিকই এ ভাষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। এ জন্যই তারা আরব-তুর্কিদের মধ্যে বিভেদ লাগানোসহ আরো অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। শাইখ তাকী (রহ) তার বই "ইসলামী রাষ্ট্র"-তে বলেন:

"এরপর ইসলামের শত্রুরা আরবী ভাষার উপর আক্রমণ চালায়। কারণ, এই ভাষাতেই ইসলাম এবং এর হুকুম আহকামকে প্রচার করা হয়। তাই, তারা ইসলামের সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ককে ছিন্ন করতে ব্যাপক তৎপরতা চালায়। কিন্তু, প্রথমদিকে তারা সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কারণ, প্রথমদিকে মুসলিমরা যে দেশই জয় করেছে সেখানেই তারা কোরআন, সুন্নাহ ও আরবী ভাষাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে এবং জনগণকে তারা এ তিনটি জিনিসই শিক্ষা দিয়েছে। বিজিত জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং আরবী ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলেছে। কিছু কিছু অনারব এ ব্যাপারে এতো পারদর্শীতা অর্জন করেছে যে, তারা ইসলামের প্রখ্যাত মুজতাহিদও হয়েছে। যেমন, ইমাম আবু হানিফা। কেউ কেউ বা হয়েছে অত্যন্ত উচুঁ মাপের কবি, যেমন, বাশার ইবন বুরদ। আবার, কেউ বা হয়েছে প্রখ্যাত লেখক, যেমন, ইবন আল-মুকাফফা'। এভাবেই, মুসলিমরা (প্রথমদিকে) আরবী ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিল। ইমাম শাফেঈ' কুরআনের কোন ধরনের অনুবাদ বা অন্য কোন ভাষায় সালাত আদায় করাকে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। আবার, যারা কুরআন অনুবাদের অনুমতি দিয়েছেন, যেমন, ইমাম আবু হানিফা, তারা অনুবাদকে কুরআন হিসাবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করেছেন। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে আরবী ভাষা সবসময় মুসলিমদের মনোযোগ ও গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। বস্তুতঃ এ ভাষা হচ্ছে ইসলামের মৌলিক অংশ এবং ইজতিহাদের জন্য এক অপরিহার্য বিষয়। আরবী ভাষা ব্যতীত উৎস থেকে ইসলামকে বোঝা অসম্ভব এবং এ ভাষা ব্যতীত শরীয়াহ্‌ থেকে নির্ভুল ভাবে হুকুম-আহকাম বের করাও সম্ভব নয়। কিন্তু, হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে, আরবী ভাষার গুরুত্ব ধীরে ধীরে হৃাস পেতে থাকে। কারণ, এ সময় এমন সব শাসকেরা ক্ষমতায় আসে যারা আরবী ভাষার প্রকৃত গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং এ বিষয়টিকে তারা ক্রমাগত অবহেলা করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের আরবী ভাষার উপর দখল কমে যায় এবং ইজতিহাদের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে যায়। এখানে মনে রাখা দরকার যে, যেকোনো বিষয়ে শরীয়াহ্‌র হুকুম খুঁজে বের করতে হলে, যতগুলো উপাদান অপরিহার্য তার মধ্যে আরবী ভাষা একটি। বস্তুতঃ ইতিহাসের এই পর্যায়ে, আরবী ভাষা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে, রাষ্ট্রের শরীয়াহ্‌ সম্পর্কিত ধ্যানধারণাও অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং সেইসাথে, অস্পষ্ট হয়ে যায় শরীয়াহ্‌ আইনকানুন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। ইসলামী রাষ্ট্রকে দূর্বল ও রুগ্ন করে ফেলতে এ বিষয়টি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের পক্ষে নতুন নতুন সমস্যা সমূহকে বোঝা এবং সে সমস্যাগুলোর মুকাবিলা করা কঠিন হতে থাকে। একসময় রাষ্ট্র উদ্ভুত সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয় কিংবা সমাধানের লক্ষ্যে ভ্রান্ত পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। এভাবে, সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রের সমস্যা ঘনীভূত হতে থাকে এবং ইসলামী রাষ্ট্র একসময় অন্তহীন সমস্যার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে।" [৬]

সুতরাং এ থেকে বোঝা যায় এ ভাষা অবহেলার পরিনাম কতটা মারাত্মক ছিল।

এ ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য

আরবী একটি অত্যন্ত চমৎকার ভাষা। এর কাঠামো অত্যন্ত দৃঢ়, সংগঠিত ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুবই জটিল। অনেক ভাষাবিদই এ চিন্তা করে হতবাক হন যে কিভাবে এ ভাষা প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভব হলো।

নিম্নে আরবী ভাষার (Grammatical Structure) সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়া হল,

পদ বা শব্দের শ্রেণীবিভাগ (اجزاء الكلام): শব্দকে তিনভাগে ভাগ করা হয় আরবীতে

১. বিশেষ্য/Noun (اسم) ২. ক্রিয়া/Verb (فعل) ৩. অব্যয়/Particle (حرف)

লিঙ্গ (الجنس): আরবী ভাষায় লিঙ্গ মূলত দু'টি, পুংলিঙ্গ (المذكر) ও স্ত্রীলিঙ্গ (المئنث)। উদাহরনসরূপ, (زيد، خالد، احمد) এগুলো পুংলিঙ্গবাচক শব্দ আবার (فاطمة، داكا، ريح، نار، يد) এগুলো স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ। এছাড়াও এ ভাষায় কিছু সংখ্যক উভয় লিঙ্গের শব্দও রয়েছে যাদের (الجنس المشترك) বলা হয়। এ ভাষায় কোনো ক্লীবলিঙ্গ নেই।

বচন (العدد): আরবী ভাষায় বচন মূলত তিনটি।

১. একবচন (واحد) ২. দ্বিবচন (تثنية) ৩. বহুবচন (جمع)

এছাড়াও আরবী ভাষায় বহুবচনের বহুবচন-এর প্রচলন রয়েছে, যেমন- (فتح، فتوح، فتوحات)। এ বৈশিষ্ট সমূহের ফিকহী গুরুত্ব অপরিসীম। এর ফলে ফিকহ-এর কোনো মাসআলাকে অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করা যায়।

ক্রিয়া (الفعل): নিম্নোক্তভাবে আরবী ক্রিয়াকে ভাগ করা হয়,

১. অতীতকাল (الفِعْلُ الْماضِي) ২. বর্তমান/ভবিষ্যৎ কাল (الفِعْلُ الْمُضارِي)
৩. নির্দেশবাচক (فِعْلُ الأَمْر)

এ ভাষায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের জন্য একটিই Structure রয়েছে। যদিও কখনো কখনো ভবিষ্যৎকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য (فعل)-এর আগে একটি (س) যুক্ত করা হয়, যেমন, (بَدَأَ الإِسْلاَمُ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا)। [৭] এছাড়াও বচন, লিঙ্গ, কাল ইত্যাদি ভেদে ক্রিয়ার শাব্দিক রূপান্তর ঘটে যাকে (صَرْفُ الفِعْل) বলা হয়। এ বৈশিষ্ট্যের কারণেও ফিকহ-এর কোনো মাসআলাকে অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করা যায়।

ই'রাব (الإعرَب): সাধারণত বাক্যে প্রতি (مُعْرَب) শব্দের শেষ হরফের স্বর-চিহ্ন হলো ই'রাব। এ স্বর-চিহ্ন পরিবর্তনশীল, অবস্থার পরিবর্তনভেদে একটি শব্দের শেষ হরফ যবর (فَتْحَة), যের (كَسْرَة), পেশ (ضَمَّة) বা সুকূন গ্রহণ করতে পারে। যেমন, সাধারণত শব্দটি কর্তা (فاعِل) হলে পেশ গ্রহণ করে, কর্ম (مَفْعُول) হলে যবর গ্রহণ করে ইত্যাদি। পৃথিবীতে এ ধরনের স্বর-চিহ্ন বর্তমানে আরবী ছাড়া হাবশী ও জার্মান ভাষায় কিছুটা রয়েছে। স্বর-চিহ্ন প্রাচীন সভ্যতার একটি নিদর্শন। [৮] উদাহরণসরূপ, (جَاءَ زَيْدٌ، ضَرَبَ زيدً، قَلَمُ زَيْدٍ)

আরবী ভাষা প্রধানত একটি মূলশব্দ তাড়িত ভাষা (root-driven language)। এ ভাষায় বিভিন্ন Pattern (وزن)-এ অসংখ্য মূল শব্দ (مَصْدَر বা فِعْل) রয়েছে। উদাহরণসরূপ, (فَعَلَ، سَمِعَ، نَصْرٌ، ذَكَّرَ، تَعْلِيْم)। এসব মূল শব্দ হতে অসংখ্য শব্দ বের হয়ে আসে যাদের (مُشْتَقات) বলা হয়। উদাহরণসরূপ, (عِلْمٌ) এ শব্দের উপাদান (مادة) হচ্ছে (ع ل م) যা থেকে বের হয়ে আসে, (عَلِمَ، مَعْلُوم، عَلَّمَ، تَعْلِيم، مُعَلِّم، مُتَعَلِّم، عَلّامَة)।

কোনো ভাষার শক্তি পরিমাপ করতে হলে সে ভাষার শব্দভান্ডার-এর পরিমান দেখতে হয়। ভাষার শব্দ যত বেশি তত বেশি শক্তিশালী সে ভাষা। আরবী ভাষা এক্ষেত্রে এগিয়ে অর্থাৎ এ ভাষার বিশাল শব্দ ভান্ডার রয়েছে। যেখানে বাংলায় সব মিলিয়ে রয়েছে মাত্র ১ লক্ষ এবং ইংরেজীর রয়েছে ২ লক্ষাধিক শব্দ।

আরবী ভাষায় অনেক শব্দ রয়েছে যা বিভিন্ন অর্থে প্রকাশ পায়। উদাহরণসরূপ, (قضاء، قدر)। এ বৈশিষ্ট্য আরবী ভাষাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

অল্প কথায় বা বাক্যে অনেক অর্থ প্রকাশ আরবীতে যেমন সম্ভব অন্য ভাষায় তেমন সম্ভব নয়। আরবীতে প্রবাদ রয়েছে (خَيْرُ الكَلامِ ما قَلَّ وَدَلَّ) অর্থাৎ উত্তম কথা হলো সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থপূর্ণ। কুরআন ও হাদীস এমনি সব সংক্ষিপ্ত অর্থপূর্ণ বাক্যে পরিপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা)ও বলেছেন, 'আমাকে (جَوَامِعَ الْكَلِم) দেওয়া হয়েছে' [৯] অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত কথায় গভীর জ্ঞান দেবার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাকে। এ বিষয়টির উদাহরণ হিসেবে নিম্নোক্ত হাদীসটি উল্লেখ করা যেতে পারে,

تَهَادَوْا تَحَابُّوا

"উপহার বিনিময় কর, একে অপরকে ভালোবাসতে পারবে।" [১০] অর্থাৎ উপহার বিনিময় করলে পারস্পরিক ভালোবাসা-সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে।

এ ভাষার বর্ণনাশৈলী এত চমৎকার যে তা শ্রোতার কাছে ছবির মতো ধরা দেয়। এবং পবিত্র কুরআনে এ রকম অসংখ্য আয়াত রয়েছে। উদাহরণসরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا ~ وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

"তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সবচেয়ে সুন্দর ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে কথা বল। তাদের উপর রহমত (ভালবাসা/স্নেহ/দয়া/মমতা/করুনা) দিয়ে তোমার নতজানু হয়ে থাকা বিনয়ের ডানা মেলে দাও এবং বল: হে প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।" [বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪]

এ ভাষার এক অসামান্য সামর্থ্য রয়েছে অন্যান্য ভাষাকে গ্রাস করে ফেলার যখন তারা এর নিকটে আসে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণ দাওয়া নিয়ে যে অঞ্চলেই গেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই সে অঞ্চলের লোকজনের ভাষা সহজেই আরবীতে পরিনত হয়েছে। এর ফলে খিলাফতের অভ্যন্তরে অনেক অনারব আরবীতে অত্যন্ত পারদর্শী ব্যক্তিত্বে পরিনত হয়েছে। এমনকি আরবী ভাষার ব্যকরণের পথিকৃত সিবাওয়েও একজন অনারব ছিলেন। পরবর্তীতেও অনেক যুগ পর্যন্ত এ ধারা বজায় ছিল। কোনো অঞ্চলে অবহেলার কারণে এ ভাষা প্রতিষ্ঠা না হতে পারলেও সে অঞ্চলের বিদ্যমান ভাষার উপর ব্যপক প্রভাব বিস্তার করে গেছে এ ভাষা যা এখনও বিদ্যমান।

এ ভাষার আরো একটি সামর্থ্য হচ্ছে, এ ভাষা বিদেশী কোনো ভাষার শব্দকে আরবী শব্দতে রূপান্তর করতে পারে। অন্যকথায়, এ ভাষা অন্য ভাষার শব্দ Arabize তথা (مُعَرَّب) মু'আর্রাব করতে পারে। এ ভাষায় শব্দ ও এর আরবী রূপান্তর নিয়ে ইজতিহাদ করার জন্য জ্ঞানের আলাদা শাখা রয়েছে।

ইজতিহাদ

ইজতিহাদের জন্য শর্তাবলী রয়েছে যা উসূলের আলেমগণ ব্যখ্যা করে গিয়েছেন। এর জন্য দরকার বিস্তৃত জ্ঞান, কুরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান ও যথেষ্ঠ পরিমান আরবী ভাষাতত্ত্বের জ্ঞান... [শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানী, মাফাহীম, পৃষ্ঠা ৪৬]

আরবী ভাষার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হচ্ছে ইল্লত আহরণ অর্থাৎ একজন মুজতাহিদ কোনো নস (نص) থেকে হুকুমের পেছনের 'ইল্লাহ' বের করতে পারেন এবং অন্য পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগ করতে পারেন। এছাড়াও আইনগত দিক থেকে, আরবী ভাষায় কোনো বাক্যে বিভিন্ন শব্দের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বাক্যেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ প্রদান করে। উদাহরণসরূপ, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ইমাম হচ্ছে রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং সেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। এখানে 'সেই' শব্দটি আরবী ব্যকরণের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিতকরণ (اداة حصر)-এর হুকুম পায় এবং এটি একটি আলাদা সর্বনাম। এভাবেই তাঁর (সা) বক্তব্য, 'এবং সেই জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে' (রাষ্ট্রের) জন্য দায়িত্বশীলতাকে ইমামের জন্য সীমিত করে। সুতরাং, রাষ্ট্রের মধ্যে মূলত খলীফা ছাড়া আর কেউই শাসন করবার কোনো ক্ষমতা রাখেনা, হোক ব্যক্তি অথবা দল। [১১]

ইসলাম মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে সর্বশেষ জীবনব্যবস্থা। দুনিয়ার সমাপ্তি পর্যন্ত এ দ্বীন দিয়েই সমাজ পরিচালনা করতে হবে। আর এ কাজ করতে গিয়ে যুগে যুগে মুসলিম জাতিকে অসংখ্য নতুন সমস্যার সম্মুক্ষীন হতে হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যতেও হতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একমাত্র উপায় হচ্ছে ইজতিহাদ। ইজতিহাদ হচ্ছে সেই ইঞ্জিন যা ইসলামকে চালিত করে। এটি না থাকলে উম্মাহর মধ্যে জলাবদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং উম্মাহর সমৃদ্ধি থমকে যাবে। এবং ঐতিহাসিকভাবেও এ বিষয়টির সত্যতা আমরা দেখেছি। শাইখ তাকী (রহ) বলেন,

"(মুসলিম উম্মাহ্‌র) এ অধ:পতনের পেছনে একমাত্র একটি কারণই ছিল, (মুসলিমদের) প্রচন্ড দূর্বলতা যা তাদের ইসলামকে বোঝার জন্য চিন্তা করার যোগ্যতা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এ দূর্বলতার পেছনের কারণ ছিল ৭ম শতাব্দী হিজরীর প্রথম থেকে শুরু করে ইসলাম ও আরবী ভাষার বিচ্ছিন্নকরন যখন আরবী ভাষা ও ইসলামের প্রসার অবহেলিত হয়েছে। সুতরাং, যতক্ষন পর্যন্ত আরবী ভাষাকে ইসলামের সাথে এর এক অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অংশ হিসেবে মিশ্রিত না করা হবে, ততক্ষন পর্যন্ত এ অধ:পতন মুসলিমদের আরো অবনতির দিকে নিয়ে যাবে। এটা এ কারণে যে, এই ভাষার ভাষাগত ক্ষমতা ইসলামের শক্তিকে এমনভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে যে একে ছাড়া ইসলামকে বহন করা সম্ভব নয়, এবং যদি একে অবহেলা করা হয়, তবে শরীয়াহ্‌র মধ্যে ইজতিহাদ করা আর সম্ভবপর হবে না। (আর) আরবী ভাষার জ্ঞান ইজতিহাদের জন্য একটি মৌলিক শর্ত। এছাড়াও ইজতিহাদ উম্মতের জন্য অপরিহার্য যেহেতু এর সদ্ব্যবহার ছাড়া উম্মাহর উন্নয়ন সম্ভব নয়।" [১২]

সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে উম্মাহর সমৃদ্ধির সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ক কত গভীর।

উম্মাহ্‌র পূনর্জাগরণ

নিশ্চয়ই আল্লাহ এ কিতাবের দ্বারা বিভিন্ন জাতিকে উচ্চকিত করেন আর অন্যান্যদের করে দেন নিচু। [মুসলিম]

পূনর্জাগরণ বস্তুগত বা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের মধ্যে নিহিত নেই। বরং চিন্তাগত ও মতাদর্শিক উন্নয়নই পূনর্জাগরনের সঠিক ভিত্তি আর বস্তুগত উন্নয়ন হচ্ছে এর ফলাফল। আমরা যখন উম্মতের পূনর্জাগরনের কথা বলি তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ পুনর্জাগরণ ইসলামী আকীদাহ ও তা থেকে বের হয়ে আসা ব্যবস্থার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ আমাদেরকে পৃথিবীতে এ আকীদাহ প্রতিষ্ঠা ও এর ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এবং এ ব্যবস্থাটি রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহ্‌র মধ্যে আরবী ভাষায়। অতীতে আরবরা পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতিতে পরিনত হয়েছিল কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা এ ভাষায় পবিত্র কুরআন নাযিল করেছিলেন। এবং এ ভাষাতেই তারা শরীয়াহ বুঝেছিলেন এবং তা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এবং আরবী ভাষার কোনো কিছু সবচেয়ে ভালোভাবে আরবীতেই বোঝা যাবে। এক্ষেত্রে অনুবাদ গ্রহণযোগ্য নয় যেহেতু ভাষার অর্থ ও আকুতি অনেকটাই অনুবাদে হারিয়ে যায়। অন্য যেকোনো ভাষার সাহিত্য অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। উদাহরণসরূপ, আমরা শেক্সপিয়ারকে ইংরেজি, ইকবালকে উর্দূ, নজরুলকে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতেই পূর্নাঙ্গরূপে বুঝতে পারবো না। সুতরাং ইসলামী ব্যবস্থার খুটিনাটি বিশ্লেষন বুঝতে হলে আরবী ভাষার জ্ঞানও থাকতে হবে।

আমরা যারা হুকুম শরঈ' নিয়ে পড়াশুনা করেছি তারা জানি যে, ফরয-এ-কিফায়া ও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বাধ্যতামূলক ফরয দায়িত্ব এবং ফরয হিসেবে ফরয-এ-আইন হতে কোনো অংশে এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধুমাত্র পার্থক্য হল, ফরয-এ-কিফায়াকে পালন করার জন্য আল্লাহ পুরো উম্মতকে একসাথে দায়িত্ব দিয়েছেন, উম্মতের প্রত্যেকটি সদস্যকে আলাদা আলাদা চিহ্নিত করে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু উম্মাহর মধ্যে যথেষ্ঠ পরিমান সদস্য যদি সন্তোষজনকভাবে এ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে কাজটি সম্পন্ন করাটা পূরো উম্মতের জন্য ফরজে আইন হিসেবে ঝুলে থাকে। আমরা জানি ইজতিহাদ করাটা ফরযে কিফায়া এবং ইজতিহাদ করার জন্য আরবী ভাষা জানাটাও আবশ্যক। এবং উম্মতের মধ্যে প্রত্যেক যুগে অবশ্যই যথেষ্ঠ পরিমানে মুজতাহিদ থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে কি আমরা সে পরিমান মুজতাহিদ ও সেরকম ইজতিহাদ চর্চা দেখতে পাবো ? এখন আমরা একটু চিন্তা করলেই উপলব্ধি করতে পারবো যে বর্তমানে আরবী ভাষার জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য কতটা জরুরী। এছাড়াও খিলাফত প্রতিষ্ঠার দা'য়ী হিসেবে উম্মতের কাছ থেকে আস্থা ও নেতৃত্ব অর্জন করার জন্য আরবী ভাষা জানাটা খুবই জরুরী।

উপসংহার

"আল্লাহ তাঁর সেই বান্দার মুখ উজ্জ্বল করুন যে আমার কথা শুনেছে, সেগুলো মনে রেখেছে, বুঝেছে এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কারণ কেউ নিজে ফকীহ্‌ (জ্ঞানী) না হয়েও ফিকহ্‌ (জ্ঞান) বহনকারী হতে পারে। আবার কেউ তার নিজের চাইতে বড় ফকীহ (জ্ঞানী) এর নিকটও ফিকহ্‌ পৌঁছে দিতে পারে।" [আবু দাউদ, তিরমিযী এবং আহমদ থেকে বর্ণিত]

আমরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আমাদেরকেই পৃথিবীকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাহ দিয়ে শাসন করতে হবে। জনগণ আমাদের কাছেই আসবে ইসলাম শিখতে। আমরাই তারা যাদেরকে পৃথিবী বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরণ করা হবে আমিল, ওয়ালী কিংবা মুজাহিদ হিসেবে। ঠিক সেভাবেই যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের প্রেরণ করতেন। আমরা জানি, মু'আজ বিন জাবাল যখন ইয়েমেনে প্রেরিত হয়েছিলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে তিনি আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নত ও তার ইজতিহাদের দ্বারা রায় দেবেন। সুতরাং, আমরা যদি সেই আলী, মু'আজ, আমর ইবনুল আস (রা)-দের সত্যিকার উত্তরসূরী হয়ে থাকি এবং আমরা যদি কিছুদিনের মধ্যে তাদের মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত হই তখন কিভাবে আমরা উত্তমরুপে খিলাফতের অফিসকে চালাবো যখন আমরা আরবী ভাষার জ্ঞান রাখি না।

সুতরাং আমাদের আরবী ভাষা শিখতে হবে। শুধুমাত্র সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক যোগাযোগের আরবী ভাষা নয় যা আমাদের দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা একাডেমি শিক্ষা দেয়, বরং আমাদের আরবী শিখতে হবে দ্বীনকে বোঝার জন্য। ভাষা শিক্ষাকে আমাদের কঠিন কোনো কিছু মনে করা উচিত নয়। আর কেন আমরা আরবী ভাষা শেখাটা কঠিন মনে করব যখন আমরা জানি যে যাইদ (রা)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সা) হিব্রু ভাষা শিখতে বলেছিলেন তখন তিনি তা মাত্র ১৫ দিনে সম্পন্ন করেছিলেন। তার সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি ছিল না অথচ আমাদের সময়ে তা আছে। তার সময়ে কোনো টেকনোলজিও ছিল না তাকে এ বিষয়ে সাহায্য করার জন্য অথচ আমাদের সময়ে তা আছে। আমরা দুনিয়ার বিভিন্ন কাজের জন্য ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চ শিখতে পারলে আরবী কেন পারবো না। আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে আমাদের প্রত্যেকের এ কাজে অগ্রসর হওয়া উচিত। আল্লাহ্‌র কাছে দু'আ করি যাতে তিনি আমাদের তাঁর কিতাবের ভাষার সঠিক জ্ঞান দান করেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"আর যারা আমার পথে চেষ্টা সংগ্রাম করে তাদের আমি অবশ্যই আমার পথ দেখিয়ে দেব। আর আল্লাহ অবশ্যই রয়েছেন তাদের সাথে যারা সবচেয়ে উত্তমরুপে কাজ সম্পাদন করে।" [আনকাবুত: ৬৯]


তথ্যসূত্র:

[১] মাফাহীম, তাকী উদ্দীন আন-নাবহানী, পৃষ্ঠা ৪৭
[২] ইকতিদাউস সিরাতিল মুসতাকীম, ইবনু তাইমিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ২০৭
[৩] মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ
[৪] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনু কাছীর, ৮ম খ-, ৩৪৩ পৃষ্ঠা
[৫] ইকতিদা'উস সিরাতিল মুসতাকীম, ইবনু তাইমিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ২০৩
[৬] ইসলামী রাষ্ট্র, তাকী উদ্দীন আন-নাবহানী, পৃষ্ঠা ১৬৪
[৭] সহীহ মুসলিম
[৮] আরবী সাহিত্যের ইতিহাস, আ ত ম মুসলেহউদ্দিন, ইসলামী ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ২৬২
[৯] সহীহ মুসলিম
[১০] মুআত্তা ইমাম মালিক, সুনান আস-সাগীর লিল-বাইহাকী, মু'জাম আল-আওসাত লিত-তাবারানী
[১১] কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল, আবদুল কাদীম জাল্লুম, পৃষ্ঠা ৬০
[১২] মাফাহীম, তাকী উদ্দীন আন-নাবহানী, পৃষ্ঠা ১

International Arabic Language Institute Education

Want your school to be the top-listed School/college in Chittagong?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Telephone

Address


Jahan Villa, House#07, Lane#03, ROAD#01, Block#L, Halishahar
Chittagong

Opening Hours

Thursday 16:00 - 21:00
Friday 16:00 - 21:00
Saturday 16:00 - 21:00