23/05/2016
শৈশবে যখন পলোগ্রাউন্ড কলোনিতে ছিলাম তখন আকাশটা আরেকটু নীল ছিল। এই তামাপোড়া শহরে আরেকটু খোলা বাতাস ছিল। কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে ২-১টা মাঠ ছিল ছোট-বড়-মাঝারি। টাইগারপাস থেকে বহদ্দারহাট যাওয়ার পথে মিষ্টি চেহারার কয়েকটা বাড়ির সামনে একচিলতে উঠানও ছিল। বৃহৎ বৃহৎ অট্টালিকার নিচে চাপা পড়ে গেছে শৈশবের সেই শহর, কিন্তু পলোগ্রাউন্ড কলোনি এখনো ঠিক সেই আগের মতই আছে।
বিদেশি ফুটবল এবং ক্রিকেট খেলা ব্যাতীত এই কলোনিতে আরো কত রকম খেলা যে খেলেছি তার কোনো ইয়ত্তা নাই। শিশু বয়সে সবচেয়ে অপমানজনক ছিল যার মাথা ন্যাড়া তার জন্য একখানা চার লাইনের ছড়া---"বেল মাথা চাইর আনা,চাবি দিলে ঘুরেনা,চাবি হইলো নষ্ট,বেল মাথার কষ্ট।"শুধু ছড়া কেটে ছেড়ে দিলে এক কথা ছিল, সাথে যে যখনি সুযোগ পেত মাথায় তবলা বাজিয়ে যেত, ওদিকে মা-বাপদের একটা ধারণা ছিল যে মাথাটা টাক্কু বেল করলে চুল হবে ঘন কালো, কাজেই নিয়মিত শুনতে হতো ঐ ছড়া।
মাঝে মাঝে বড়রা খেলায় না নিলে মেয়েদের সাথে খেলতাম পুতুল আর রান্নাবাটি। কিছুক্ষন খেলেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলতাম, এ জিনিসে পোষাবে না। এছাড়া মেয়েরা আরো কিছু ছড়া কাটতো। কি যেন........."আকাশ থেকে নেমে এল ছোট্ট একটি প্লেন,সেই প্লেনে বসে ছিল একটি ছোট্ট মেম,মেমকে আমি জিজ্ঞেস করলাম হোয়াট ইজ ইউর নেম?, মেম আমাকে উত্তর দিল মাই-নেম-ইজ-বিউ-টি-ফুল।"এই বলে হাসতে হাসতে মেয়েরা একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তো, যদিও এই ছড়ায় এত হাসির কি আছে, এখনো বুঝিনি। মাঝে মাঝে সবাই হাত পাততো, আবার চলতো ছড়া, প্রতি শব্দে একেকজনের হাতে ছোঁয়া--"ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা"। যার হাতে পড়তো "যা", সে বাদ পড়ে গেল।
তারপরে একটু বড় হয়েছি, তবে অতটা বড় না যে বড়দের সাথে খেলতে পারি, কিন্তু লাফঝাঁপ পারি হালকা। প্রতিবেশিনী বোনেরা খেলার সাথীর অভাব হলে মাঝে মাঝে আমাদের ডাক দিতেন "কুতকুত" খেলায়। এক টুকরা চাড়া ছুড়ে দিয়ে তারপরে একদমে কুতকুত কুতকুত বলতে বলতে এক পায়ে লাফিয়ে সেই চাড়াটাকে ঠেলে ঠেলে কোর্টের শেষ মাথায় নিতে হবে,৬ নম্বর ঘরে গিয়ে আবার ২ পা ফেলা যেত। আপুদের দড়িলাফেও মাঝে মাঝে অংশ নেয়ার সুযোগ হতো, দড়িতে পা বেঁধে আমরা পড়ে যেয়ে আপুদের বিনোদন দেয়া ছিল আমাদের মত "দুধভাত" দের কাজ। দুদভাত মানে, তোমরা খেলার অংশ নও, তবে থাকতে পারো আরকি, কান্নাকাটি করো না। দুধভাত নেয়ার ব্যবস্থা সব খেলাতেই ছিল, যে পিচ্চিটাকে বড়রা খেলায় না নিলে গিয়ে বাপ-মাকে নালিশ করে সাধের খেলাটা পণ্ড করে দেয়ার ব্যবস্থা করবে তাকে ঠাণ্ডা করার জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল এটা।
একেবারেই উপভোগ করতে পারতাম না যে খেলাটা, তার নাম "কানামাছি।" একবার চোর হয়েছ তো তোমার দফা শেষ, চোখ বেঁধে মাঝখানে ছেড়ে দেয়া হবে আর তোমার কাজ হলো তোমার আশপাশে ঘুরে ঘুরে যারা "কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যারে পাবি তারে ছোঁ" বলে গায়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে (আসলে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে যাচ্ছে) তাদের পাকড়াও করা। সিনেমাতে মাঝে মাঝে নায়ক-নায়িকা এই মহা রোমান্টিক খেলাটা খেলে থাকেন, আগেকার বাদশাহ-বেগমরাও নাকি খেলতেন।
একদম বাচ্চাকালের আরেকটা খেলা ছিল, ওপেনটি বায়োস্কোপ। জেমসের গানটা মনে আছে? ওই যে---"ওপেনটি বাইস্কোপ,নাইন টেন টেইস্কোপ,সুলতানা বিবিয়ানাসাহেব বাবুর বৈঠকখানা।"এই ছড়া বলতে বলতে রেলগাড়ির মত লাইন করে একদল ঘুরে ঘুরে যেত হাত উঁচু করে রাখা ২ জনের মাঝ দিয়ে, ছড়া শেষ হবার সাথে সাথে হাত নামিয়েএকজনকে পাকড়াও করে ফেলা হয়, যে ধরা খাবে তার কাজ হলো ঐ দু'জনের ছড়ানো পায়ের উপর দিয়ে লাফ দেয়া। লাফ দিতে গিয়ে মাঝে মাঝেই মুখ থুবড়ে পড়লেও উৎসাহের অভাব নেই, ধুলা না লাগলে আর খেলাধুলা কি? ওটার সাথেই চলতো "এলন্ডি লন্ডন" নামের আরেকটা খেলা, যে চোর, সে পেছন ফিরে থাকবে, অন্যরা একটু দূর থেকে তার দিকে এগিয়ে আসবে, চোর "এলন্ডি লন্ডন" বলেই ঝট করে পেছন ফিরে তাকানোর আগেই একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে, যদি নড়াচড়া ধরা পড়ে তবে একদম আগের জায়গায়। যে সবার শেষে থাকবে, সে হবে পরবর্তী চোর।
বৃষ্টিতে ঘরের বাইরে খেলতে না পারলে তখন চলতো "চোর-পুলিশ-সাহেব-গোলাম", চার টুকরো কাগজে চারটা নাম লেখা হবে, প্রতিটায় আলাদা পয়েন্ট থাকবে, না দেখেই চারজন চারটা তুলে নেবে, যে পুলিশ পাবে, তাকে অনুমান করতে হবে কে চোর। যদি পারে, চোরের পয়েন্ট টাও সে পাবে, না পারলে, শূন্য।
ডাঙ্গুলি খেলাটা খেলেছি যখন শিশু থেকে শৈশবে পৌছেছি। একটু বিপজ্জনক থাকায় বাব-মায়ের ভয়ে খুব বেশি দিন খেলতে পারিনি। ব্যথা পাবার ১০০ ভাগ সম্ভাবনা নিয়েও অবশ্য "বম্বাস্টিং" খেলাটা খেলেছি নিয়মিত। একটা টেনিস বল নিয়ে যাকে নাগালে পাও যাবে তাকেই গায়ের জোরে মারাটাই হচ্ছে বম্বাস্টিং খেলা। টেনিস বল লাগতো আরেকটা খেলাতেও, সেটা "সাত চাড়া", একটা ইটের উপর ৭টা চাড়া (ইটের টুকরো) বসিয়ে দূর থেকে বল মেরে সেগুলো মাটিতে ফেলেই ভোঁ দৌড় দিতে হবে, এবং তারপর বিপক্ষের হাত এড়িয়ে আবার ওই চাড়াগুলো ইটের উপর বসাতে হবে। বিপক্ষের কাজ হবে বলটা নিয়ে চাড়াভাঙ্গা দলের গায়ে লাগানো, বলাই বাহুল্য, এখানেও গায়ে বল মারার ব্যাপারে কোনরকম দয়ামায়া চলতো না, চারা বসানোর বীরপুরুষ হওয়া তাই খুব একটা সোজা কাজ ছিল না।
গত ১২ই মে আমার ছোট্ট একটা অপারেশন হয়েছে। বেশ কয়েকদিন অবসর সময় কাটালাম, আশাকরি দু-এক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে উঠবো। পুরো অবসর সময়টাই কাটিয়েছি পলোগ্রাউন্ড কলোনির স্মৃতিচারন লিপিবদ্ধ করে।
ম.ই উজ্জ্বল
Facebook.com/ujjalakg