30/04/2025
আমি জাকারিয়া, আর এটি আমার গল্প—সংগ্রাম, ত্যাগ আর পরিবারকে বদলে দেওয়ার জেদ নিয়ে গড়ে ওঠা এক যাত্রা।
আমি সিরাজগঞ্জের একটি দূরবর্তী গ্রাম চরকাদাই থেকে এসেছি। আমাদের গ্রামে এর আগে কখনও কেউ বুয়েটে ভর্তি হতে পারেনি। এবার আমি সেই ইতিহাস গড়েছি—বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় ৩৮৩ তম হয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) বিভাগে সুযোগ পেয়েছি। এটি সহজ ছিল না, কিন্তু প্রতিটি কষ্ট সার্থক হয়েছে।
আমার শৈশব কেটেছে অনেক কষ্টে। আমার বাবা একজন কৃষক, কিন্তু নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের জমিতে খেটে আমাদের বড় পরিবারকে খাবার জোগাতেন। সংসারে ছিল বহু সদস্য, কিন্তু আয় ছিল সামান্য। আমার বড় বোনেরা পড়াশোনা ছেড়ে ঘরের কাজ সামলাতো। বড় ভাই বিভিন্ন জেলায়—ফরিদপুর, টাঙ্গাইল—মজুরি খাটতে যেতেন একটু বেশি পারিশ্রমিকের আশায়। আমরা গরিব ছিলাম, কিন্তু আমার পরিবার সব সময় বলেছে, “বড় স্বপ্ন দেখো।” তাদের ত্যাগ দেখেই আমি ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিলাম—আমি ভিন্ন কিছু করতে চাই। আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি কখনও শহরের নামী স্কুল বা কোচিং করা ছেলেদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করব না। আমি নিজের পথে হাঁটতে চেয়েছি, নিজের স্বপ্নকে বাস্তব করতে চেয়েছি।
আমার আশ্রয়স্থল ছিল স্কুল। আমি পড়তাম বেলতলা হাই স্কুলে—একটা সাধারণ গ্রামীণ স্কুল। পরে শাহজাদপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হই, সেখান থেকে শুরু হয় নতুন চ্যালেঞ্জ। আমাদের বাসা ছিল ছোট, শব্দে ভরা—পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন ছিল। তাই আমি মেসে উঠে পড়াশোনায় মন দিই। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট সব সময় ছিল। ২০২২ সালের আগে আমাদের একটি মোবাইলও ছিল না অনলাইন ক্লাস করার জন্য। পরে ভাইয়ের বৃত্তির টাকা ও এক আত্মীয়ের সহায়তায় একটি স্মার্টফোন পাই। সেই ফোনটা হয়ে উঠেছিল আমার বেঁচে থাকার রসদ। ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে দেখতাম যারা দারিদ্র্য জয় করে সফল হয়েছে—এই গল্পগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করত। সেই সঙ্গে আমি ইউটিউবের সেরা শিক্ষকদের ফ্রি ক্লাস থেকে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও রসায়নে দক্ষতা অর্জন করতাম।
এসএসসি-তে ভালো রেজাল্ট করলেও, ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাই নিজের এলাকায় থেকে আত্মনির্ভর হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাই। মাসে ৪,০০০ টাকা মেস ফি জোগাতে আমি ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতাম, মাসে পেতাম ৩,০০০ টাকার মতো। সেটা যথেষ্ট ছিল না—তাই অনেক সময় খাবার কম খেতাম বা ভালো খাতা কিনতাম না। সস্তা কাগজে পুরোনো প্রশ্ন সমাধান করতাম যেগুলো কিনতাম সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের দোকান থেকে।
আমার পরিবার এমন কিছু করেছে যা আমি কোনোদিন ভুলব না। আমার ভাই তার কষ্টার্জিত টাকায় আমাকে একটি বিখ্যাত অনলাইন কোর্সে ভর্তি করায়। আমার বোনের বিয়ের জন্য আমাদের এক চাচির জমি বিক্রি করা হয়—সেখান থেকে কিছু টাকা আমি ব্যবহার করি একটি নামী কোচিং সেন্টারের অফলাইনে পরীক্ষার জন্য যেখানে আমার ব্যাচমেটরাও পরীক্ষা দিত। আমি ঠিক করেছিলাম—এই ত্যাগ বৃথা যেতে দেব না।
পড়াশোনা ছিল আমার নেশা। প্রতিদিন ১২–১৩ ঘণ্টা ধরে ক্লাস করতাম, এমনকি কঠিন সময়েও—যেমন জুলাই আন্দোলনের সময়। আমার কোনো প্রাইভেট টিউটর ছিল না, তাই নিজেই সমস্যা বোঝার চেষ্টা করতাম। একা একা অংকের সমস্যা সমাধান করতে করতে দক্ষতা গড়ে উঠেছিল।
ভর্তি মৌসুম ছিল চরম প্রতিযোগিতামূলক। আবেদন ফি আর যাতায়াত খরচ বহন করাই কষ্টকর ছিল। আমি মাত্র তিনটি পরীক্ষায় আবেদন করতে পেরেছিলাম—বুয়েট, কুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরীক্ষার জন্য ট্রেনে দাঁড়িয়ে যেতাম খরচ কমানোর জন্য, অনেক সময় লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলতাম বন্ধুদের সামনে। আমি পরিচিতদের মাধ্যমে হোস্টেলে থেকেছি কারণ ঢাকা বা খুলনায় আমার কোনো আত্মীয় ছিল না। পরীক্ষার আগের রাতে ২–৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারিনি—চিন্তায় ঘুম আসত না। এদিকে আমার বাবা তখন গুরুতর অসুস্থ—টিউবারকুলোসিসে ভুগছিলেন। আমি পড়ার টেবিলে বসে কাঁদতাম, দোয়া করতাম—বাবার সুস্থতা আর আমার সাফল্যের জন্য। আমার ফোনের ওয়ালপেপারে মা-বাবার ছবি দিতাম—ওই মুখগুলোই আমার শক্তি ছিল।
বুয়েটের ফল প্রকাশের দিন আমি ভীষণ টেনশনে ছিলাম। কখন ফল আসবে তা নিয়ে অনেক গুজব ছিল। রাত ৯টার পর ফোনে রিফ্রেশ করতে থাকি—ব্যাটারি তখন মাত্র ২%। নেটওয়ার্ক খারাপ ছিল, PDF খুলতেই পারছিলাম না। প্রথমে নিজের নাম খুঁজে না পেয়ে মনে হলো—আমি ফেল করেছি। মা-কে বললাম, দুজনেই খুব ভেঙে পড়লাম। পরে এক বন্ধুকে মেসেজ দিলাম—তার র্যাঙ্ক ছিল ১৩০০-এর আশেপাশে—সে আমাকে একটু আশা জোগাল। এক সিনিয়রকে রোল নম্বর দিই—তিনি চেক করে বলেন, "তুই ৩৮৩ হয়েছিস, আর তোর সাবজেক্ট EEE!" বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমি তো ভাবতাম ওয়েটিং-এ থাকলেও হবে। EEE?
আমি দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম, কাঁদলাম। বাবার কপালে চুমু খেলাম—তিনিও কেঁদে ফেললেন। আমাদের ঘরে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল। সবাইকে জানালাম। আমার পরিবার, যারা এত কষ্ট করেছে, এবার প্রথমবারের মতো ভবিষ্যতের আলো দেখতে পেল। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করল—আমি একদিন আমাদের দারিদ্র্য ঘোচাতে পারব।
আমার জুনিয়রদের জন্য বলি—সংগ্রামকে আলিঙ্গন করো। এটাও পথের অংশ। নিজের তুলনা অন্যের সাথে করো না। সময় দাও পড়ার টেবিলে। সেল্ফ-স্টাডিই তোমার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। পাঠ্যবই ভালো করে পড়ো, নিয়মিত থেকো, সোশ্যাল মিডিয়ার মতো বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকো। কলেজে ঢুকেই সিরিয়াস হয়ে পড়াশোনায় মন দাও। ইউটিউবের ফ্রি ক্লাস কিংবা যেকোনো কোর্স ব্যবহার করে নিজের স্কিল গড়ে তোলো। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তোমার পরিবারের স্বপ্ন যেন তোমার চালিকাশক্তি হয়। তারা তোমার দিকে যে চোখে তাকায়, সেটা মনে রাখো। ওই দৃষ্টি তোমাকে ফোকাসড রাখবে।
এই পথ শুধু আমার ছিল না—এটা ছিল আমার বাবার ঘাম, ভাইয়ের ত্যাগ, বোনের সমর্থন আর মায়ের দোয়ার পথ। যদি আমি চরকাদাইয়ের মতো ইন্টারনেট-বিহীন, কাঁচা রাস্তার গ্রামের একজন ছেলে হয়ে বুয়েট যেতে পারি, তবে তুমিও পারো। যদি ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় হয়, তবে কোনো বাধাই বড় নয়।
– Jakaria Hossen
22/09/2022
09/09/2022
16/03/2022
13/01/2022