17/03/2018
"দক্ষিণ চট্টগ্রামে দোহাজারী কেন্দ্রীক জেলা করা হোক"
#দোহাজারীর নামকরণ ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস
দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীনতম বাণিজ্যিক উপ-শহর দোহাজারী। ঐতিহাসিক এ ইউনিয়নটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অতীতের বিভিন্ন রাজকীয় ও সরকারী-বেসরকারী দলিল-দস্তাবেজ, গেজেট, সাময়িকী ও পুস্তিকায় একথা প্রমাণিত যে দোহাজারী ৫৮৬ বছর পূর্বের ইতিহাসখ্যাত এক বিশাল জনপদের নাম। কেবল সুদূর মোঘল আমল থেকেই নয়, ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই ভিনদেশী রাজন্যবর্গের নিকট দোহাজারীর ভৌগোলিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাই ৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বর্মী রাজা দোহাজারী দখল করে এতদঞ্চলে নিজেদের শাসন কায়েম করে। ১১৬৭ খ্রিস্টাব্দে 'মগ রাজা' দোহাজারী জনপদকে নিজেদের শাসনাধীনে আনয়ন করে। এরপর পর্তুগীজরা সমুদ্রপথে সুদূর ইউরোপ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে এবং সেখান থেকে (সম্ভবত) নৌ পথে দোহাজারী আগমণ করে এবং এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ১৪২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্তমান ভারতের পাহাড়ী রাজ্য ত্রিপুরার তৎকালীন রাজা ধনমাণিক্য, ভারত বিজয়ী আফগান সুলতান মাহমুদ শাহ্ ও গৌড়ের নৃপতিরা এতদঞ্চল দখল করে দোহাজারীতে আঞ্চলিক শাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতঃ পর্যায়ক্রমে এতদঞ্চল শাসন করেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের জীবদ্দশায়ই তাঁর প্রথম পুত্র শাহজাদা দারা শিকোহ্ সাম্রাজ্যের শাসনভার নিজ হাতে নেয়ায় সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে এমন সন্দেহে অপর তিন শাহজাদা শাহ্ সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ বিদ্রোহ ঘোষণা করে রাজধানী দিল্লী অভিমুখে রওয়ানা হন। যুদ্ধে দারা শিকোহ্ পরাজিত হওয়ার পর দিল্লীর মসনদ নিয়ে তিন ভাইয়ের মধ্যে আবার তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। এসময় বিদ্রোহী শাহ্ সুজা আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আরাকান অঞ্চলে এসে আশ্রয় নেন। আরাকান যাত্রার সময় মোগল শাহজাদা দোহাজারী এসে পৌঁছালে শাহ্ সুজা ও তাঁর সৈন্যরা দোহাজারীর ভৌগলিক ও কৌশলগত অবস্থান, নয়নাভিরাম নৈস্বর্গিক শোভা ও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ দেখে দোহাজারীর প্রতি আকৃষ্ট হন। শাহ্ সুজা শেষ পর্যন্ত আরাকানে চলে গেলেও তাঁর দুই অনুসারী আঁধু খান ও যদু খান সহ একদল সৈন্য দোহাজারীতে অবস্থান নেন। এসময় নিজেদের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় মগ সম্প্রদায়ের লোকজন আগন্তুকদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হলে তারা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে বর্তমান সাতকানিয়া উপজেলার বোমাং হাট এলাকায় আশ্রয় নেন। এরপর আধু খাঁন ও যদু খাঁন দিল্লীতে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমতাসীন বাদশাহ্ আওরঙ্গজেবের নিকট নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বাদশাহ্ আওরঙ্গজেব তাঁদের কাছে এতদঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের কথা জানতে পেরে উৎসাহী হয়ে ওঠেন এবং দুই হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্যসহ দু'জনকে দোহাজারী পাঠিয়ে দেন। তাঁরা দিল্লী থেকে ফিরে এসে দোহাজারীতে ঘাঁটি স্থাপন করেন এবং দোহাজারীর প্রতিরক্ষায় দু'হাজার সৈন্য মোতায়েন করেন। তারা দোহাজারীকে প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন এবং এতদঞ্চলে মোগল রাজত্ব কায়েম করেন। এর আগে অত্র অঞ্চল কোন সুনির্দিষ্ট নামে অভিহিত না হলেও মোতায়েনকৃত সৈন্য সংখ্যার দু'হাজার শব্দের অনুকরণে এটি দোহাজারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এরপর ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাটের নির্দেশে মোগল সৈন্যরা দোহাজারী থেকে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) অভিযান পরিচালনা করে আরাকান পর্যন্ত পদানত করেন। আরাকান রাজ্য দখলের পর থেকে মোগলদের রাজত্বকাল অবধি দোহাজারী ছিল মোগল সুবেদার শাসিত রাজধানী। সাড়ে তিন শত বছর আগেকার উক্ত মোগল সেনা ঘাঁটি স্থাপিত হওয়ার পর দোহাজারী মোগল সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা নবাব সিরাজদ্দৌলাহকে পরাজিত করে বিহার-উড়িষ্যাসহ এদেশ দখল করার আগ পর্যন্ত দোহাজারী কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বিভিন্নভাবে চালু ছিল, যার তথ্য-প্রমাণ তৎকালীন রাজকীয় ও সরকারী দলিলপত্র এবং বিভিন্ন লেখায় বিদ্যমান রয়েছে। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জার্মান নেতা এডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তিকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন রণাঙ্গণে ঘায়েল করতে না পেরে ব্রিটিশরা বার্মা ফ্রন্ট খুলে জাপান আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একাধিক সামরিক ও প্রশাসনিক দপ্তর স্থাপণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্রিটিশরা এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দোহাজারীকে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নত করে। একটি বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক-প্রশাসনিক দপ্তর স্থাপণের লক্ষে আন্তর্জাতিক সমর বিশারদ কর্তৃক দোহাজারীকে নির্বাচন করায় একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, দোহাজারীর অবস্থান আঞ্চলিক কিংবা জাতীয় পর্যায়ের নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক মানের। এরপর দোহাজারীতে স্থাপিত হয় ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর বিশাল সামরিক ঘাঁটি। মায়ারাম দীঘি সংলগ্ন এলাকায়, হযরত সৈয়দ জালাল উদ্দীন বোখারী (রহঃ) মাজার সংলগ্ন এলাকায়, দেওয়ান হাটের উত্তর পার্শ্বে ও লালুটিয়া পাহাড়ে বিপুল সংখ্যক বহুজাতিক সৈন্য মোতায়েন করা হয়। জঙ্গী বিমান ও বোমারু বিমান ওঠা-নামা এবং বিমান সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দোহাজারীর চাগাচরে নির্মিত হয় বিশাল বিমানবন্দর। স্থাপিত হয় বিমানবন্দর সংলগ্ন বিমান সেনা ঘাঁটি। সেখানে এখনো এ সংক্রান্ত অনেক ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান রয়েছে। দোহাজারী ব্রীজের পশ্চিম পার্শ্বস্থ শঙ্খ নদীর উত্তর পাড়ে বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হয় গোলাবারুদের ঘাঁটি। এলাকাটি এখন বারুদখানা নামে খ্যাত। পূর্ব দোহাজারীতে স্থাপিত হয় যুদ্ধের কেল্লা বা সামরিক দপ্তর। এলাকাটি এখন কিল্লাপাড়া নামে পরিচিত। শুধু ব্রিটিশ আমলে নয়, পাকিস্তানি শাসনামলেও দোহাজারীর সার্বিক প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পটিয়া মহকুমার প্রধান হাসপাতালটি দোহাজারীতে স্থাপিত হয় যৌক্তিক বিবেচনায়, আবেগের বশে নয়। স্বাধীনতা পূর্বকালে প্রতিষ্ঠা করা হয় দোহাজারী বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র এবং দোহাজারী সি এন্ড বি অফিস। এখানে স্থাপিত হয় কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক; জোনাল পোষ্ট অফিস, টেলিফোন একচেঞ্জ অফিস, ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস ও ভূমি অফিস। বি.এ.ডি.সি যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের তৎকালীন পটিয়া মহকুমা ভিত্তিক প্রধান জোনাল অফিস স্থাপিত হয় দোহাজারীতে। সেখানে গড়ে তোলা হয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রসহ বিশাল বি.এ.ডি.সি কম্পাউন্ড। শহীদ বজলুর রহমান সড়কে রয়েছে বি.এ.ডি.সি কৃষি সম্প্রসারণ অফিস। হাজারী পুকুর পাড়ে রয়েছে বিশাল বি.এ.ডি.সি সার গুদাম। স্থাপিত হয় খাদ্য মন্ত্রনালয়ের অধীন দোহাজারী সিভিল সাপ্লাই কেন্দ্র। শঙ্খ নদী তীরে স্থাপিত হয় কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী দোহাজারী সাঙ্গুভ্যালী টিম্বার ইন্ডাষ্ট্রি, যা ইস্পাহানী নামে সমধিক পরিচিত। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ কর্তৃক দোহাজারী যথোপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় এখানে স্থাপিত হয় নৌ চলাচল সংস্থার আন্তর্জাতিক সাংকেতিক কেন্দ্র ডেকা চেইন রেড ষ্টেশন। প্রতিষ্ঠা করা হয় ৩২/৩৩ কেভী বিদ্যুৎ সাব ষ্টেশন, কয়েক বছর পূর্বে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে স্থাপিত হয় দোহাজারী সড়ক বিভাগের প্রধান দপ্তর। বাস্তবতার নিরিখে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে দোহাজারী হাসপাতাল ১০ শয্যা থেকে ৩১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বিপুল অর্থ ব্যয়ে শঙ্খ নদী তীরে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্ব সার গুদাম খ্যাত দোহাজারী বি.এ.ডি.সি কমপ্লেক্স, প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশ থানা। এখানে রয়েছে ফসলাদি সংরক্ষণের জন্য তিনটি বৃহদাকারের হিমাগার। যেগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আন্তঃজেলা বাণিজ্য কেন্দ্র। পূর্ব দোহাজারী বেগমবাজারে রয়েছে কলকাতায় জমিদার সমাবেশ সংক্রান্ত এক রাজকীয় অনুষ্ঠানে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণকারী 'দোহাজারী খান জমিদার বাড়ী'র ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ধ্বংসাবশেষ। দোহাজারীর রয়েছে সুদূর পার্বত্য জেলা বান্দরবান পর্যন্ত বিস্তৃত বনভূমি। উৎকৃষ্ট মানের মূল্যবান কাঠশিল্পের জন্য এতদঞ্চলের সুখ্যাতি অনেক পুরনো। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে বিগত ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ৯ম ও ১০ম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক ভূগোল'এ উল্লেখ করা হয়েছে দোহাজারী কাঠের জন্য প্রসিদ্ধ। দোহাজারীতে স্থাপিত হবে একটি 'পেপার মিল' ও 'জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র'। দোহাজারীর অনস্বীকার্য স্বাতন্ত্র্য-ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষে গঠিত সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ 'জেলা ও উপজেলা/থানার সীমানা নির্ধারণ কমিশন'এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ মর্মে প্রস্তাব পাঠায় যে, দোহাজারীকে থানায় উন্নীত করার জন্য সুপারিশ করা হোক। এছাড়া প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি চট্টগ্রাম জেলার ৫টি উপজেলার সমন্বয়ে দোহাজারীকে জেলা সদর দপ্তর করতঃ দক্ষিণ চট্টগ্রামে দোহাজারী কেন্দ্রীক জেলা করা হোক।