22/08/2024
১।
২৬ জুলাই ২০০৫। আচমকা ভারী বর্ষণে মহারাষ্ট্র ভেসে গেল বন্যায়। মুম্বাই শহর অব্দি রক্ষা পায়নি। শহরের প্রধান বিমানবন্দর পানিতে ডুবে বন্ধ থাকলো ৩০ ঘন্টা। মুম্বাই-পুনে এক্সপ্রেসওয়েতে কোনো গাড়ি চলল না ২৪ ঘন্টা।
পানিতে ভেসে ডুবে "হাবুডুবু খেতে খেতে" মারা গেল অন্তত ১০৯৪ জন ভারতীয় নাগরিক।
২।
২০০৮ সাল। এবার উত্তর প্রদেশের গোমতি নদীর(!) পানি ফুলে বন্যায় ভাসল লখনৌ। ১৫ জন ভারতীয় মারা গেলেন সেবার।
৩।
২০১৩ সালের জুন মাস। উত্তর ভারতে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হলো। উত্তরাখন্ডসহ উত্তরের রাজ্যের মানুষ বৃষ্টিতে স্রেফ ভেসে গেল। মৃতের সংখ্যা ঠিক কত হিসেব করা যায়নি। ধারণা করা হয় এই সংখ্যাটা ৬ হাজারের কম নয়।
৪।
২০১৫ সালের জুন জুলাই মাস। উত্তর থেকে এবার পশ্চিম ভারত, গুজরাট। জুন জুলাই মাসে দুই ধাপের বন্যায় মারা গেল অন্তত ১৫০ জন মানুষ।
৫।
সাল একই, কিন্তু এবার দক্ষিণ ভারত। সেই একই কাহিনী, ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় তামিল নাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৫০০ জনের বেশি।
৬।
ব্যাক টু নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া, আসাম। ২০১২ সালে পাহাড়ি ঢলের বন্যায় ১২৪ জন মানুষ মারা যায় যার বেশিরভাগই ভারতীয় ও অল্প কিছু মানুষ বাংলাদেশী। ২০১৫ সালের বন্যায় আসামের ডুবরি জেলায় মারা যান ৪২ জন। ২০১৬ সালে আসামে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৬। ২০১৭ সালে মিজোরাম ও ত্রিপুরা ছাড়া নর্থ ইস্টের বাকি ৫ রাজ্যেই বন্যা হয়। হাবুডুবু খেয়ে মারা যাওয়া ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা এবার অন্তত ৮৫ জন। এছাড়াও আসামে ২০১৮ সালে ১২ জন, ২০১৯ সালে ৫৯ জন, ২০২০ সালে আসাম ও অরুনাচলে ৩৫ জন এবং ২০২২ সালে আসামে অন্তত ২৫ জন মারা যান।
৭।
২০১৭ সালে ভারী বৃষ্টিতে বন্যায় গুজরাটে মারা যান ২০০ জনের বেশি।
৮।
২০১৮ সালে কেরালায় বন্যায় মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা অন্তত ৪৪৫।
৯।
২০২০ সালে হায়দ্রাবাদে আকস্মিক বন্যায় মারা যান ৯৮ জন।
১০।
২০২১ সালে উত্তরাখান্ডে বন্যায় মৃতের সংখ্যা অন্তত ২০০ জন।
১১।
২০২১ সালে মহারাষ্ট্রের বন্যায় মারা যান অন্তত ২৫০ জন। এছাড়া অন্তত ১০০ জন মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
১২।
২০২৩ সালের জুলাইতে উত্তর ভারতে বন্যায় মারা যান ১০৫ ভারতীয়। আগস্টে আরেক দফা বন্যা হয়। সেখানে হিমাচল প্রদেশে অন্তত ৭১ জন এবং উত্তরাখন্ডে জীবন হারান ১০ জন।
১৩।
২০২৩ সাল, উত্তর ভারত থেকে দক্ষিন ভারত চেন্নাইয়ে সাইক্লোনের কারণে হওয়া বন্যায় মারা যান ১৭ জন মানুষ।
:
:
আমরা ভাটির দেশ, বন্যা আমাদের নিয়তি। কিন্তু কাঁটাতারের ওপাশের অনেকের মনে হতে পারে ভারতে বোধহয় বন্যা হয়ই না, যা হবার সব বাংলাদেশেই হয়। তাদের জন্য ২০০৫ সাল থেকে এখন অব্দি হওয়া বন্যার হিসাব সংক্ষেপে দিলাম।
হিসাবটা ২০০৫ সালই কেন? কারণ ঐ সময় থেকেই আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস শুরু হয়। আবার ঐ সময়টা থেকে মার্কিং আরেকটা কারণেও জরুরি। সে সময় সরকারে ছিল বিএনপি জামাত। তারপর এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এরপর ১৬ বছরের আওয়ামী রাজত্ব।
মোটামুটি ৩ টা সরকারের আমলে পত্রিকা পড়েছি। সাক্ষী হয়েছি কীভাবে বাংলাদেশের মিডিয়া ধীরে ধীরে নখদন্তবিহীন হয়ে গেল। মিডিয়াকে আমরা মোটামুটি নিয়মিতই গালাগাল দিই ক্লিকবেইটের জন্য। ২০ বছর একেবারে কম সময় নয়। ভালো মন্দ মিলিয়ে বাংলাদেশি মিডিয়াকে কম দেখলাম না।
কিন্তু একটা জিনিস কোনোদিনই বাংলাদেশী মিডিয়ায় দেখিনি, সেটা হলো বন্যায় বিপর্যস্ত ভীত মানুষকে নিয়ে ট্রল। বাংলাদেশের কোনো মেইনস্ট্রিম মিডিয়া ভারতের এতগুলো ঘটনায় ট্রল দূরে থাক, সহানুভুতির অভাব দেখিয়েও নিউজ করেনি। "হাবুডুবু খেতে খেতে আর্জি" ধরনের নোংরামি শিরোনাম এখনো আমাদের কল্পনার বাইরে।
কলকাতার জি ২৪ ঘন্টা সেখানে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় মিডিয়া। এমন একটা হেডলাইন ভাবা, সেটা লেখা, সেটাকে ডিজাইন করা এবং সম্পাদনার পর প্রকাশ করতে গিয়ে তাদের একবারও মনে হয়নি কাজটা উচিত না!
এই কদিন আগে একটা ভারতীয় পরিবারের পাহাড়ি ঢলে ভেসে যাওয়ার ভিডিও দেখে প্রায় প্রত্যেক বাংলাদেশী আহত হয়েছে। আমার নিউজফিডে এই ভিডিও এসেছে না হলেও ১০০ বার। কোথাও কোনো ট্রলের উপাদান নেই।
আমাদের দেশের একটা অংশের মানুষের জন্য আজকে ভয়ানক দিন এসেছে। আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দিয়ে মাস্তানির কথা বাদই দিলাম, সাধারণ মানুষ হিসেবে সহানুভূতি দেখিয়ে একটা শিরোনাম দেয়া যেত। সেটা না পারলে চুপ থাকতে পারতো। তার বদলে ইতরের মতো একটা শিরোনাম দিল জি ২৪ ঘন্টা।
মিডিয়া এ ধরনের শিরোনাম দেয় তার অডিয়েন্স টার্গেট করে। বোঝাই যাচ্ছে পশ্চিম বাংলার মানুষজনের মন পড়েই তারা এমন লিখেছে। পশ্চিম বাংলার সাথে আমাদের অনেক দূরত্ব আছে, ভুল বোঝাবুঝি, বিরোধীতা ও পারস্পারিক বিদ্বেষও আছে। কিন্তু তারপরেও সেখানকার মানুষের চিন্তাস্থর এত নিচে নেমেছে এটা ভাবতেই পারিনি। হাজার হোক, একটা কমন ভাষা আমরা শেয়ার করি।
আগেই বলেছি, আমরা বন্যার দেশের মানুষ। আমাদের এখানে বন্যা আসে, বন্যা চলেও যায়। খেয়াল করে দেখবেন, গত ২০ বছরে এখানে বন্যায় আর গণহারে মানুষ মরে না। আমরা ফাইট দিতে শিখছি। শেখা এখনো অনেক বাকি। কিন্তু ভারতের চেয়ে যে বেশি শিখে গেছি এটা ভারতীয়দের মৃত্যুর সংখ্যাই সাক্ষী দিচ্ছে।
এই বন্যাও চলে যাবে। আশা করি বড় কিছু হবে না। হলে কিছু মানুষকে হয়তো আমরা হারাব। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে এই ক্ষতি আমাদের জন্য হৃদয় ভঙ্গের। কিন্তু প্রিয় ভারত, আমরা এই বিপদও অবশ্যই জিতব।
একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আপনারা দুঃখ পেয়েছেন, পেতেই পারেন। কিন্তু তারপর এদেশের সংখ্যালঘু মানুষের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে করলেন ইতিহাসের অন্যতম নির্লজ্জ প্রোপাগান্ডা মিশন। তাতে কী লাভ হয়েছে? আপনাদের মিশন ফেইল করেছে পিও। এই দেশে আপনাদের পরিচিত হিন্দুদের থেকে খবর নিয়ে দেখেন, আপনারা তাদেরকে বিপদে ফেলেছেন। তাদেরকেও আপনাদের শত্রু বানিয়েছেন। আপনাদের নির্লজ্জ ও আকাশ কুসুম প্রোপাগান্ডায় আমাদের হিন্দুদের ন্যায্য দাবী ও ভীতিত ভিত্তি নষ্ট হয়েছে। এই প্রোপাগান্ডার কারণে তারা আক্রান্ত হলেও আর বলার সাহস পাচ্ছে না। বাংলাদেশী হিন্দুদের অপূরনীয় ক্ষতি আপনারা করেছেন।
আমি যে তথ্যগুলো নিয়েছি এইগুলা গোয়েন্দা সংস্থার ক্লাসিফাইড তথ্য না। গুগলে এক ক্লিক করলেই এই তালিকা চলে আসবে। অন্য দেশের বন্যা আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে মশকরা করার আগে নিজের দেশে কতজন মরে সেটাও তো অন্তত দেখার দরকার ছিল। নাকি নোংরামির তাড়না এত বেশি ছিল, এসব নিয়ে ভাবতেই ইচ্ছে করেনি?
আমাদের দেশের মানুষ খুব ভালো সেটা আমরাই বলি না। আমরা ভালো খারাপ মানুষজন মিলে ফাইট দেব। আপনাদের পাপেট সরকার নামবে এটা যেমন আপনাদের চিন্তাতেও ছিল না, আপনারা বোধহয় এটাও জানেন না এই সংগ্রামে সাধারণ হিন্দুদের অবদান ত্যাগ বেশি বৈকি কম ছিল না। আপনারা আবারও যদি বিশ্বাস নাও করেন, এই ফাইট হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই মিলে আমরা আবার জিতব, দেখিয়েন।
আর হ্যাঁ, মনে রাখব আমাদের একদম নাজুক সময়ে নিজেদের দেশের বন্যায় হাজার হাজার মৃত্যু দেখার পরেও আপনারা আমাদেরকে মক করেছেন। শুধু মনেই রাখব। এমন দুর্যোগ কারোর হোক চাই না। যদি আবার আপনাদের এমন বন্যা হয়, আবার শয়ে হাজারে মানুষ আপনাদের মারা যায় তখনো আপনাদের এই ঘৃণা মনে রাখব।
না, আপনাদের মতো "বন্যায় হাবুডুবু" শিরোনামের কিছু কেউ লিখবে না। লিখলেও অন্তত আমি সেই মিডিয়া অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করবো।
আমরা মনে রাখব শুধু এটা বোঝাতে, আপনারা নিজেদেরকে আমাদের চেয়ে সভ্য ও ভালো ভেবে যে মিথ্যা আনন্দ পান...আপনাদের এই ধারণা, বিশ্বাস ও আনন্দের পুরোটাই ভুয়া।
# # #