07/08/2026
অনেক বাবা-মা-ই মনে করেন, দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী ও শক্ত ব্যক্তিত্ব নিয়ে মানুষ জন্মায়।
অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং মানসিক দৃঢ়তার বড় একটি অংশ গড়ে ওঠে তার নিজের পরিবারে—ঘরের চার দেয়ালের ভেতরেই। বাবা-মায়ের আচরণ, কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত এবং সন্তানকে বড় করে তোলার পদ্ধতিই তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করে।
একটি শিশু উপদেশ বা বড় বড় বক্তৃতা শুনে সাহসী হয়ে ওঠে না। সে সাহস শেখে তখন, যখন তাকে নতুন কিছু চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়া হয়। ভুল করার স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং সেই ভুলের জন্য অপমান না করে ভালোবাসা দিয়ে শেখানো হয়। কারণ যে শিশু ভুল করতে ভয় পায়, সে নতুন কিছু শেখার সাহসও হারিয়ে ফেলে।
সন্তানের প্রতিটি চাওয়া বা আবদার সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করে দেওয়া ভালোবাসার পরিচয় মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এতে সে ধৈর্য, অপেক্ষা এবং পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে শেখে না। বরং বয়স উপযোগী ছোট ছোট দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করুন। নিজের বই-খাতা গুছিয়ে রাখা, খেলনা ঠিক জায়গায় রাখা, পরিবারের ছোটখাটো কাজে অংশ নেওয়া—এসবই তাকে শেখায় যে, এই পরিবারে তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় দায়িত্বশীলতা।
শিশুর আত্মবিশ্বাসও শুধু প্রশংসা শুনে তৈরি হয় না। অযথা প্রশংসা সাময়িক আনন্দ দিলেও প্রকৃত আত্মবিশ্বাস আসে নিজের প্রচেষ্টায় অর্জিত ছোট ছোট সফলতা থেকে। যখন সে নিজেই কোনো কাজ সম্পন্ন করতে পারে, কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে বা নিজের চেষ্টায় নতুন কিছু শিখে ফেলে, তখন তার অন্তরে একটি বিশ্বাস জন্ম নেয়—"আমি পারি। আমি চেষ্টা করলে আরও ভালো করতে পারব।"
আধুনিক অভিভাবকত্বের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো—সন্তানের পথ থেকে সব ধরনের কষ্ট, ব্যর্থতা, বাধা কিংবা চ্যালেঞ্জ সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু বাস্তব জীবন তো এমন নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে নানা পরীক্ষা, প্রতিকূলতা এবং সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
যে শিশুটি নিজের ঘরের ছোট ছোট সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে শেখেনি, যে কখনো অপেক্ষা করতে শেখেনি, যে ব্যর্থতার স্বাদ পায়নি কিংবা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়নি—বাইরের পৃথিবীর বড় বড় ঝড়ঝাপটা সামলানো তার জন্য অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামও আমাদের সন্তানদের এভাবেই গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। সন্তানকে শুধু আরাম-আয়েশে বড় করার কথা নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়।
এ কারণেই হযরত লোকমান (আঃ) তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন—
﴿يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ﴾
"হে আমার প্রিয় সন্তান! সালাত কায়েম করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদই আসুক না কেন, ধৈর্য ধারণ করো।"
— সূরা লোকমান: ১৭
লক্ষ্য করুন, তিনি তাঁর সন্তানকে বিলাসিতা বা আরাম-আয়েশের শিক্ষা দেননি। বরং তিনি শিখিয়েছেন আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে, সমাজের কল্যাণে কাজ করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করতে। কারণ একজন সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষ তৈরি হয় তার চরিত্র, ঈমান, দায়িত্ববোধ এবং ধৈর্যের মাধ্যমে।
তাই আসুন, আমরা শুধু ভালো ফলাফলের জন্য নয়, বরং একজন সৎ, সাহসী, দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে সন্তানকে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কারণ আজকের ছোট ছোট শিক্ষা, ছোট ছোট দায়িত্ব এবং ছোট ছোট সংগ্রামই আগামী দিনের একজন দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তৈরি করে।
শক্ত ও সুদৃঢ় ব্যক্তিত্ব জন্মগত নয়; সঠিক পরিবার, সঠিক শিক্ষা এবং সঠিক অভিভাবকত্বই একজন শিশুকে ভবিষ্যতের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
#প্যারেন্টিং_গাইড_১