29/09/2025
আমার অধ্যয়নকৃত প্রিয় বিদ্যাপিঠ
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল
♦️ ~ রাজিউর রহমান বিতান
বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত একটি অন্যতম ঐতিহাসিক স্হাপনা আমাদের প্রিয় বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল।
ঐতিহ্যের স্মারক লালচে ইটের সেই বয়েসী দালান ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত "চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল"।
চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের গর্ব আমাদের প্রিয় এই বিদ্যাপিঠ।
এই স্কুলে আমি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ নিয়েছি।
♦️প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে পাঁচটি বছরের রোমাঞ্চকর স্মৃতি আমাকে এখনো পুলকিত করে, স্মৃতিকাতর করে।
সময়-সুযোগ পেলে আমি এখনো ছুটে যাই আমার স্মৃতিজাগানিয়া স্কুলটির আঙিনায়।
♦️এই স্কুলে আমি,আমার বড় ভাই, ভাতিজাসহ অনেক নিকটাত্মীয় পড়াশোনা করেছে বলেই নয় পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে স্কুলের বিশাল মাঠটিতে প্রায়ই ফুটবল খেলতে চলে যেতাম মাদারবাড়ি এলাকা থেকে। সেই সুবাদেও স্কুলটি আমার অনেক আপন।
♦️খাজা আজমেরী কিন্ডারগার্টেন স্কুল, মোগলটুলি আগ্রাবাদ থেকে পঞ্চম শ্রেণির সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুবাদে পরীক্ষার সেন্টার পরেছিলো চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে।
সেদিনই প্রথম কলেজিয়েট স্কুলের আঙিনায় পদার্পণ করি আমি।
সেটি ছিলো ১৯৮৪ সাল।
♦️১৯৮৫ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির ক শাখায় অর্থাৎ দিবা শাখায় ভর্তি হতে পেরে
আনন্দ ছিলো সীমাহীন।
পড়াশোনার পাশাপাশি নানারকম কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পুলক সঞ্চার হচ্ছিলো একের পর পর। যেন এক অ্যাডভেঞ্চার টিমের সদস্য হয়ে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে চলেছি নানান কর্মকাণ্ডে।
♦️স্কুলে বিএনসিসি করতাম (আর্মি শাখায়)।
♦️বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য হয়েছি এই স্কুল থেকে।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া প্রতিযোগিতায় ১৯৮৮ সালে নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন পুরো স্কুলে প্রথম স্হান অধিকার করেছিলাম আমি।
বার্ষিক মিলাদ মাহফিল উপলক্ষে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্হান লাভ করেছিলাম।
♦️ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন প্রথমবারের মত স্কুল ও থানা পর্যায়ে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম।
আবৃত্তির নির্ধারিত কবিতা ছিলো কাজী নজরুল ইসলামের লিখা 'মোহররম'।
স্কুল থেকে প্রতি বছর বার্ষিক শিক্ষা সফর এবং বনভোজন হতো।
🔷স্যারেরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে আমাদেরকে নিয়ে গিয়েছিলেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে এবং স্টিল মিলের সন্নিকটে ইস্টার্ন ক্যাবলস এ শিক্ষা সফরে।
🔶যতদূর মনে পড়ে সপ্তম শ্রেণীতে শিক্ষা সফর হয়েছিলো কর্ণফুলি নদীর ওপারে মেরিন ফিসারিজ একাডেমিতে।
🔷অষ্টম শ্রেণিতে উঠার পর শিক্ষা সফর হয়েছিলো বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রে।
🔶নবম শ্রেণিতে উঠার পর গিয়েছিলাম কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও কাপ্তাই হ্রদ ভ্রমণে।
🔷দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন গিয়েছিলাম কাপ্তাইস্হ কর্ণফুলি পেপার মিল পরিদর্শনে।
🌹এরপর ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার পূর্বে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমরা নিজেরাই এসএসসি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলাম স্কুল মিলনায়তনে।
আমাদের সাংস্কৃতিক আয়োজনে তখনকার সময়ে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ব্লু হর্নেট ব্যান্ড সেদিন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছিলো এটা মনে আছে।
এই স্মৃতিগুলোর পাশাপাশি আরো অনেক স্মৃতিরা ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে হৃদয়ের আঙিনায়।
🖊️আমরা কয়েকজন বন্ধু তখন ছড়া-কবিতা-গল্প লিখতাম।
সেটাই ছিলো আমাদের লিখালিখির হাতেখড়ি।
ছড়াপত্র,দেয়ালিকা এসবের সাথে যুক্ত থেকেছি সেই স্কুলজীবনে।
🔻জীবনে প্রথম সাইকেল চালানো শিখেছি স্কুলের মাঠে। কলেজিয়েট স্কুলের বিপরীত দিকে রেলওয়ে কলোনির পাশে সাইকেল ভাড়া নিতাম ঘন্টায় চার টাকা হিসেবে। প্রথম দিন সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে কয়েকবার পরে গিয়েছি ঠিকই কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে পুরোদমে ফুল স্পীডে বাই-সাইকেল চালানো শিখে গিয়েছিলাম স্কুলের সেই মাঠেই।
এরকম আরো কত নস্টালজিয়া যে জুড়ে আছে প্রিয় সেই স্কুলটি ঘিরে বলে শেষ করা যাবেনা।
🔻আমার জীবনের স্মৃতির ডায়েরিতে লাল কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষে ঘিরে থাকা সেই বয়েসী লালচে ইটের দালান এখনো জুড়ে আছে অমলিনভাবে।
২০১০ সাল থেকে এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ "চট্টগ্রাম কলেজিয়েটস" এর আজীবন সদস্য হওয়ার পর থেকে প্রায় নিবিড়ভাবে এখনো যুক্ত আছি একনিষ্ঠ সদস্য হয়ে।
২০১৬ সালে সংগঠনে সাহিত্য ও প্রকাশনা বিভাগের সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি।
উক্ত সংগঠনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি।
এই সবকিছু আসলে নিজের প্রিয় বিদ্যাপিঠটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই করা।
আমার প্রিয় স্কুলের সকল সতীর্থ ভাই-বন্ধুদের আন্তরিক সহযোগিতায় আমরা স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও নিজেদের নিয়োজিত রেখেছি। শহীদ মিনার,স্মৃতিসৌধ,সুপেয় পানির ব্যবস্হা, প্রতি বছর স্কুলের এসএসসি উত্তীর্ণ কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন, প্রাক্তন ও বর্তমান অসুস্থ ছাত্র-শিক্ষকদের চিকিৎসা সহায়তায়ও আমাদের সক্রিয় ভূমিকা থাকে।
আমাদের কলেজিয়েটস কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
♦️চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল আমাদের প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
যে বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করে গেছেন এমন অসংখ্য ছাত্র যাঁরা পরবর্তী জীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় খ্যাতিলাভ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন - কবি নবীন চন্দ্র সেন,বিজ্ঞানি ড.আবদুল্লাহ আল মূতি সরফুদ্দীন, প্রখ্যাত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ,তাঁর অনুজ প্রখ্যাত বিজ্ঞান লেখক ড.মুহম্মদ জাফর ইকবাল,প্রখ্যাত অভিনেতা আবুল হায়াত,দৈনিক আজাদী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এম এ মালেক,উপমহাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার প্রখ্যাত দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদসহ অগণিত দেশসেরা গুণীজন।
আমাদের এই স্কুল এমনই এক স্কুল যেখানে আমাদের দুরন্ত কৈশোরের পাঁচমিশালি দিনগুলির মায়াভরা স্মৃতিরা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।
রঙধনুর মতই সাত রঙে বর্ণিল সময়গুলি ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে কলেজিয়েট স্কুল প্রাঙ্গণে।
সঙ্গতকারণেই আমরা প্রাক্তন ছাত্ররা নিজেদের অধ্যয়নকৃত স্কুল এবং সতীর্থদের জন্য অন্য এক টান ও ভালোবাসা ধারণ ও অনুভব করি সবসময়।
আমাদের প্রিয় স্কুলের প্রতি আমাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আমরা আমৃত্যু রেখে যেতে পারবো বলে আশাবাদী ইনশাআল্লাহ।
©rrb🌿🌼🌹