21/11/2023
নতুন শিক্ষাক্রমের ভবিষ্যৎ ভয়াবহতার আখ্যান:
নতুন বইয়ের নবম শ্রেণীতে শিক্ষার্থীরা ৫৮ পাতার ৩টা পদার্থবিজ্ঞানের চ্যাপ্টার পড়বে। প্রথম চ্যাপ্টারে নিউটনের সূত্র, দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে তাপমাত্রা ও তাপ আর তৃতীয় চ্যাপ্টারে পড়বে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেখানে তরঙ্গ-পার্টিকেল ডুয়ালিটি, হেইসেনবার্গের অনিশ্চয়তার প্রিন্সিপল ইত্যাদি। একই দেশের ইংরেজি মাধ্যমের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী (মানে আমার বড় কন্যা পড়েছিল) ২১৬ পাতার ৮ চ্যাপ্টারের পদার্থবিজ্ঞানের বই যেখানে ছিল ইউনিটস এবং মেজারমেন্ট, ইলেকট্রিসিটি, ফোর্সেস এন্ড মোশন, রশ্মি এবং তরঙ্গ, আর্থ এন্ড স্পেস, এনার্জি, মাগনেটস এন্ড কারেন্ট, atoms এন্ড nuclei প্রভৃতি পড়বে। অর্থাৎ ইংরেজি মাধ্যমের সপ্তম শিক্ষার্থীরা যা পড়বে বা জানবে আমাদের বাংলা মাধ্যমের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও তা পড়বে বা জানবে না।
আর নবম দশম অর্থাৎ ও লেভেলে আছে ২৭১ পাতার পূর্ণাঙ্গ পদার্থবিজ্ঞান বই যেখানে আছে ৮টি ইউনিট। প্রথম ইউনিট হলো ফোর্স এন্ড মোশন, দ্বিতীয় ইউনিট হলো ইলেকট্রিসিটি, তৃতীয় ইউনিট হলো ওয়েভস, চতুর্থ ইউনিট হলো এনার্জি রিসোর্সেস, পঞ্চম ইউনিট হলো সলিড্স, লিকুইডস এন্ড গ্যাসেস, ষষ্ঠ ইউনিট হলো মাগনেটিজম এন্ড ইলেক্ট্রোমেগনেটিজম, সপ্তম ইউনিট হলো রেডিওএক্টিভিটি এন্ড পার্টিকেল এবং অষ্টম ইউনিট এস্ট্রোফিজিক্স।
তাহলে একই দেশের নবম দশম শ্রেণী পাশ করা ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পার্থক্য বুঝতে পারছেন? একটা দেশে অর্থেবিত্তে ইংরেজি মাধ্যমের খরচ বহন করতে পারবে সেই ধনীর সন্তানরা সপ্তম শ্রেণীতেই যতটা পদার্থবিজ্ঞান পড়বে আমাদের বাংলা মাধ্যমের নবম শ্রেনীতে এসেও ততটা গভীরে পড়বে না। এই বৈষম্য আপনি কিভাবে ঘুচাবেন? কোনদিন ঘুচবে না। আবার উচ্চতর গণিততো নবম দশম শ্রেণী থেকে সম্পূর্ণ বাদ। অথচ ইংরেজি মাধ্যমের নবম দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা গণিতে পড়ে ৪৪৩ পাতার একটি পূর্ণাঙ্গ বই। এই বইয়ে আছে ১২টি চ্যাপ্টার যেখানে আছে নাম্বার, এলজেব্রা-১, Mensuration, জিওমেট্রি, এলজেব্রা-২, ট্রিগোনোমেট্রি, গ্রাফস, সেট্স ভেক্টরস এন্ড functions, matrices & ট্রান্সফর্মাশন্স, স্ট্যাটিসটিক্স এন্ড প্রোবাবিলিটি, ইনভেস্টিগেশনস, প্রাকটিক্যাল প্রব্লেমস এন্ড ধাঁধা। যেহেতু বিভাগ উঠিয়ে দিয়েছে তাই বর্তমান শিক্ষাক্রমের এইসব বিষয়ের সামান্যতম রাখলেও সবার জন্য করা যাবে না। তাহলে গণিতও কত কম জানবে বুঝতে পারছেন? একই কথা বলা চলে রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। শুধু ইংরেজি মাধ্যমে না। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানিতে যারা বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়ে তারা আরো ডিপ লেভেলে ফিজিক্স পড়ে। দুইদিন আগেই বলেছিলাম ১০০ বছরেরও অনেক আগে ম্যাক্স প্ল্যাংক মাত্র ১০ বছর বয়সে শক্তির নিত্যতা সূত্র সম্মন্ধে স্কুলে পড়েছিলেন।
৯ম বা ১০ম শ্রেণীর নতুন পাঠ্যক্রমের ভেতরে কতটুকু বিজ্ঞান আর গণিত রয়েছে, সেটা কি একাদশ শ্রেণীতে উঠে তাদের যেই বর্তমান সিলেবাস আছে সেটার সাথে কোপ করার মত করে তাদের তৈরী করা হবে? একদম না। নতুন শিক্ষাক্রমে একটা মাত্ৰ বিজ্ঞানের বই পড়ে একাদশে ওরা ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি আর বায়োলজির আলাদা তিনটে বিশাল সিলেবাসের ভার বইতে পারবে না না না। এই সামান্য জিনিসটা বুঝতে কি বড় বিজ্ঞানী হওয়া লাগবে? এইটা বোঝা তো কমনসেন্সের ব্যাপার। তার মানে এখন উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসও কেটেছেঁটে লঘু করতে হবে! তাহলে নতুন শিক্ষাক্রম পড়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা কিভাবে গণিত অলিম্পিয়াড করবে? কিভাবে ফিজিক্স অলিম্পিয়াড করবে? অথচ বর্তমান কারিকুলাম পড়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা এই দুটিসহ অন্যান্য সব অলিম্পিয়াডে খুবই ভালো করছে। এরা আরো ভালো করতো যদি আমাদের স্কুলগুলোতে আরো ভালো মানের শিক্ষক দিতে পারতাম। আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা যদি শ্রেণীকক্ষে আরো অধিক মনোযোগী হতেন। হবে কিভাবে? এত অল্প বেতনে এরাতো চলতে পারে না।
বাংলা মাধ্যমের বর্তমান সিলেবাসের উপর একটা কালিমা লেপে দেওয়া আছে। একটা কথা চালু আছে যে বাংলা মাধ্যমের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটা মুখস্থনির্ভর, কোচিং নির্ভর। না বুঝলেতো মুখস্ত করতেই হবে। পদার্থবিজ্ঞান কিংবা গণিততো মুখস্তের তেমন কিছু নাই। অথচ মুখস্তের কালিমা লেপে এইগুলোকেই কেটে ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হলো শ্রেণী কক্ষে বিজ্ঞানকে সার্জারি করে স্লাইস করে করে লজিক্যাললি পড়াতে পারার মত যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় না। কিছু কিছু কোচিং সেন্টারে ভালো শিক্ষক আছে বলেই শিক্ষার্থীরা কোচিং মুখী হয়েছে। কিন্তু যত ভালো শিক্ষকই সেখানে থাকুক কোচিং একটা ব্যবসা। সেখানে সঠিকভাবে পড়ানোর বদলে ওই মেধাবী শিক্ষকরা ট্রিকস বা শর্টকাট রাস্তা শেখায়। অথচ কোচিং এর শিক্ষকদের মানের শিক্ষকই যদি বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের যথেষ্ট বেতন দেওয়া হয় আর তারা যদি বিদ্যালয়ে যথেষ্ট সময় দেয় তাহলেই বর্তমান বাংলা মাধ্যমের সিলেবাস দিয়ে ম্যাজিক্যাল সাফল্য সম্ভব।
গতবার যারা অনার্স শেষ করেছিল তাদের অনেকেই অত্যন্ত মেধাবী কিছু শিক্ষার্থী ছিল। এদের একজন জার্মানি চলে গিয়েছে, কয়েকজন তত্তীয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে চলে গিয়েছে বাকিরা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগেই আছে। তত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানেও আমি একটি কোর্স পড়াই বলে ওদের সবাইকেই আমি পড়িয়েছি। পড়িয়ে আমি মুগ্ধ। এদের অন্তত একজন ভর্তি পলীক্ষায় একদম প্রথম দিকে থেকেও পদার্থবিজ্ঞানেই ভর্তি হয়েছে। সে বুয়েটেও সুযোগ পেয়েছিল। সম্প্রতি এদের কয়েকজন ফিজিক্স সাবজেক্ট জিআরই দিয়েছিল। এদের অন্তত দুজনের কথা জানি যারা ৯৩০ এর উপরে পেয়েছে, ১ জন সাধারণ জিআরইতে ৩২৩ পেয়েছে, IELTS-এ ৮.৫ পেয়েছে। এছাড়া আমার আরো ৩ জন ছাত্র খুবই অল্প প্রস্তুতিতে IELTS-এ ৮পেয়েছে। এরা সবাই বাংলা মাধ্যমে পড়ে এসেছে। এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি এদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে এত আনন্দ পাই। আমার আশংকা নতুন শিক্ষাক্রম যারা পড়ে আসবে তাদের মধ্যে থেকে এমন মেধাবী আর হয়ত পাব না। আমার এই আশংকার কারণগুলো নিশ্চই উপরের লেখা থেকে বুঝতে পারছেন? বর্তমান বাংলা মাধ্যমের কারিকুলামকে আরেকটু কেটেছেঁটে, স্কুলগুলোতে ভালো শিক্ষক দিয়েই আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য পেতে পারতাম। আসলে বিজ্ঞানের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এই দেশ থেকে আর বড় বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তার পাব না।
ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত আপনারা সিভিক আইন সেখান, রান্না বান্না সেখান, সুস্থ থাকা সেখান, বনে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে পরিবেশ ও প্রাণীদের সম্মন্ধে সেখান। পরীক্ষা কম থাকুক। এইসবে আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু সপ্তম শ্রেণী থেকে আস্তে আস্তে সিরিয়াস জিনিস পড়াতে হবে। নবম শ্রেণীতে এসে যাদের গণিত ও বিজ্ঞানের বিষয় ভালো লাগবে তাদেরকে গণিত ও বিজ্ঞান নিতে দিন, যাদের মানবিকের বিষয় ভালো লাগবে তাদের মানবিকের বিষয় নিতে দিন আর যাদের ব্যবসার বিষয় ভালো লাগবে তাদের ঐসব বিষয় নিতে দিন। এই সময়টাই ভিত্তি গড়ার সময়। বড় বহুতল ভবন বানাতে হলে যেমন ভিত্তির জন্য মাটির নিচে গভীরে যেতে হয় অর্থাৎ যত বেশি উঁচু ভবন হবে তত বেশি গভীরে ফাউন্ডেশন দিতে হবে। তাই সম্পটোম শ্রেণী থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত এই ফাউন্ডেশন তৈরির কাজকে স্কুল ও কলেজকে করতে হয়।
Courtesy: Dr.Kamrul Hassan Mamun Sir, Professor of Physics,DU.