01/09/2026
:: উমার ফারূক-এ-আযমের চিঠি: নীল নদের উদ্দেশ্যে ::
মিসর বিজিত হওয়ার পর এক দিন মিসরবাসী হযরত সায়্যিদুনা আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে নিবেদন করলেন,
“হে আমির! আমাদের নীলনদের একটি প্রাচীন প্রথা রয়েছে, যা পালন না করা পর্যন্ত নদী প্রবাহিত হয় না।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “সেটি কী?”
তারা বলল, “আমরা এক কুমারী মেয়েকে তার পিতা-মাতার কাছ থেকে নিয়ে এসে সুন্দর পোশাক ও মূল্যবান অলঙ্কারে সাজিয়ে নীলনদে নিক্ষেপ করি।”
হযরত সাইয়্যিদুনা আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন,
“ইসলামে এর বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই এবং ইসলাম এ ধরনের প্রাচীন ও ভিত্তিহীন প্রথাগুলো মুছে ফেলে।”
সুতরাং, সেই প্রথাটি বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং নদীর প্রবাহ দিন দিন কমতে থাকল। এমনকি অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, লোকজন সেখান থেকে চলে যাওয়ার মনস্থ করল।
এটি দেখে হযরত আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমীরুল মু’মিনীন, দ্বিতীয় খলিফা হযরত সায়্যিদুনা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দরবারে পুরো ঘটনাটি লিখে পাঠালেন।
উত্তরে তিনি লিখে পাঠালেন:
“তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো, নিঃসন্দেহে ইসলাম এ ধরনের প্রথাগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আমার এই চিঠির সাথে একটি ছোট টুকরো কাগজ রয়েছে, সেটি নীলনদে ফেলে দিও।”
হযরত সাইয়্যিদুনা আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে যখন আমীরুল মু’মীনার পত্র পৌঁছাল এবং তিনি সেই চিঠি থেকে কাগজের টুকরোটি বের করলেন, তখন তাতে লেখা ছিল:
“(হে নীলনদ!) যদি তুই নিজে থেকে প্রবাহিত হয়ে থাকিস, তবে আর প্রবাহিত হোস না; আর যদি মহান আল্লাহ তোকে প্রবাহিত করে থাকেন, তবে আমি এক ও পরাক্রমশালী সত্তার দরবারে প্রার্থনা জানাচ্ছি যেন তিনি তোকে প্রবাহিত করেন।”
হযরত সাইয়্যিদুনা আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই কাগজের টুকরোটি নীলনদে নিক্ষেপ করলেন। ফলে মাত্র এক রাতেই ১৬ গজ পানি বৃদ্ধি পেল এবং মিসর থেকে এই প্রথার চিরতরে অবসান ঘটে। [1]
বর্ণিত ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়্যিদুনা ফারূক-এ-আযম রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাসনের পতাকা নদীর পানির ওপরও পতপত করে উড়ত এবং নদীর স্রোতও তাঁর অবাধ্য হতো না।
এটিও জানা গেল যে, বিশ্বজগতে ইসলামী শিক্ষার নূর ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে বহু অদ্ভুত ও অশরীয়তসম্মত প্রথা ও কুসংস্কার সমাজকে গ্রাস করে রেখেছিল। যেমন—নীলনদ যখন শুকিয়ে যেতে শুরু করত, তখন মিসরবাসীরা এর এক মর্মান্তিক সমাধান বের করেছিল; তারা প্রতি বছর একজন নিষ্পাপ তরুণীকে অলঙ্কারে সাজিয়ে নদীর উৎসর্গ হিসেবে অর্থাৎ নদীতে ফেলে দিত এবং এই ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দিত যে, নীলনদকে সচল রাখতে এটি অত্যন্ত জরুরি, নতুবা এটি শুকিয়ে যাবে।
কিন্তু উৎসর্গ হোন নুবুওয়াতের দৃষ্টি থেকে ফয়েয প্রাপ্ত ও রিসালাতের দরবারের শিক্ষা-দীক্ষায় ধন্য আমীরুল মু’মিনীন হযরত সায়্যিদুনা উমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ওপর, যখন তিনি তাদের এই অজ্ঞতাপূর্ণ প্রথা সম্পর্কে জানতে পারলেন, তখন নারী অধিকারের এই পতাকাবাহী ও ইসলামের নিবেদিতপ্রাণ আশিকের ঈমানি আত্মমর্যাদা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
তিনি নিজের ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার করে মিসরবাসীদের ইসলামের পরিপন্থী এই লজ্জাজনক প্রথার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং তা তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দিয়ে নারীর মর্যাদা সমুন্নত করেন। নারীদের তাদের প্রকৃত স্থান অর্জনে তিনি এমন এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন, যার জন্য স্বয়ং মানবতাও চিরকাল তাঁর ওপর গর্ববোধ করবে।
(আল-আযামাহ লিল-ইমাম আসবাহানী, পৃষ্ঠা ৩১৮, হাদিস: ৯৪০; সংক্ষেপিত, কারামাত-এ-ফারূক-এ-আযম, পৃষ্ঠা ১৫)