14/11/2020
ইবনু আব্বাস (রা) বলেন: দিমাদ নামে আযদ শানুআ গোত্রের এক ব্যক্তি মক্কায় আগমন করে। সে বাতাস লাগা, যাদু-টোনা, বদনযর ইত্যাদির ঝাড়ফুঁক করত। সে মক্কার অর্বাচীনদের বলতে শোনে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাগল। তখন সে বলে, আমি যদি এ লোকটিকে দেখতে পারতাম তাহলে হয়ত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে সুস্থ করে তুলতেন। এরপর দিমাদ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে সাক্ষাত করে। সে বলে, মুহাম্মাদ, আমি বদ-বাতাসের ঝাড়ফুঁক করি এবং আল্লাহ আমার হাতে যাকে ইচ্ছা তাকে সুস্থ করেন। আমি কি তোমার চিকিৎসা করব? তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَمَّا بَعْدُ
“নিশ্চয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন তাকে কেউ বিভ্রান্ত করতে পারে না। আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তাকে কেউ হিদায়াত করতে পারে না। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই, এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। অতঃপর।”
কথাগুলি শুনেই দিমাদ বলে, তুমি কথাগুলি আমাকে আবার শুনাও। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথাগুলি তাকে তিনবার শুনান। তখন সে বলে: আমি গণক, যাদুকর ও কবিদের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনো তোমার এ কথাগুলির মত কথা শুনি নি। এগুলি সমূদ্রের গভীরে পৌঁছে গিয়েছে। এরপর সে বলে: তুমি তোমার হাত বাড়িয়ে দাও, আমি ইসলামের বাইয়াত গ্রহণ করব, একথা বলে সে ইসলাম গ্রহণ করে। ১.
আবূ মূসা আশআরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে খুতবাতুল হাজাত নিম্নরূপ শিক্ষা দিতেন:
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ [وَنَسْتَغْفِرُهُ] وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُِ.
“নিশ্চয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা আমাদের নফসের অকল্যাণ থেকে এবং আমাদের খারাপ কর্মগুলি থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন তাকে কেউ বিভ্রান্ত করতে পারে না। আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তাকে কেউ হিদায়াত করতে পারে না। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই, এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তিনি বলতেন,
فإن شئت أن تصل خطبتك بآي من القرآن تقول ..... أما بعد ثم تكلم بحاجتك
“তুমি যদি তোমার খুতবার সাথে কুরআনের কয়েকটি আয়াত সংযুক্ত করতে চাও তাহলে বলবে: (সূরা আল ইমরানের ১০২ আয়াত, সূরা নিসার ১ আয়াত ও সূরা আহযাবের ৭০-৭১ আয়াত)। এরপর তুমি বলবে, “আম্মা বা’দু”: অতঃপর, এরপর তুমি তোমার প্রয়োজন বলবে।” ২.
ইবনু মাসঊদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে সালাতের খুতবা ও হাজতের খুতবা শিক্ষা দেন। সালাতের খুতবা হলো: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ....। আর হাজতের খুতবা নিম্নরূপ শিক্ষা দেন। অন্য বর্ণনায় ইবনু মাসঊদ বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিবাহ ও অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য বক্তব্য পেশের বা হাজতের খুতবা নিম্নরূপ শিক্ষা দেন: (ইন্নাল হাম্দা.... থেকে মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু পর্যন্ত)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: এরপর তুমি তোমার খুতবার সাথে কুরআনের তিনটি আয়াত সংযুক্ত করবে (পূর্বোক্ত আয়াতগুলি)। ৩.
সহীহ হাদীসগুলিতে খুতবাতুল হাজাত এরূপই বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় বাক্যগুলির মধ্যে সামান্য হেরফের রয়েছে। এ সকল হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সকল প্রকার বক্তব্য, খুতবা, দরস, আলোচনা বা ওয়াযের আগে এ কথাগুলি দিয়ে বক্তব্য শুরু করা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। বিভিন্ন হাদীস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, তিনি সকল বক্তব্যের আগে সর্বদা এ কথাগুলি দিয়ে বক্তব্য শুরু করতেন। সাহাবীদেরকেও এরূপ শিক্ষা দিয়েছেন। সালাতের মধ্যে তাশাহ্হূদ বা “আত্তায়্যিাতু”-র মতই এগুলি তিনি শিক্ষা দিয়েছেন। কাজেই আমাদের সকলেরই উচিত সাধ্যমত আমাদের সকল বক্তব্যের শুরতে এগুলি বলা। আরবী বাক্যগুলি মুখস্থ বলা সম্ভব না হলে অর্থ অন্তত বাংলায় বলা যেতে পারে। হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, এটি নিয়মিত পালনের সুন্নাত। এ সুন্নাত পালন ও জীবন্ত করার মধ্যে সাওয়াব, বরকত ও অনেক ভাল প্রভাব রয়েছে।
উপরের হাদীসগুলি থেকে আমরা দেখি যে, এগুলির দুটি পর্যায় রয়েছে, প্রথম পর্যায় হলো আল্লাহর প্রশংসা, গুণবর্ণনা, সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থনা-মূলক বাক্যগুলির সাথে শাহাদাতাইন বলা। দ্বিতীয় পর্যায় হলো এরপর কুরআনের আয়াতগুলি বলা। সর্বদা দ্বিতীয় পর্যায়টি রক্ষা করতে না পারলেও ন্যূনতম প্রথম পর্যাটি রক্ষা করতে সর্বদা চেষ্ট করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
كُلُّ خُطْبَةٍ لَيْسَ فِيهَا تَشَهُّدٌ فَهِيَ كَالْيَدِ الْجَذْمَاءِ
“যে খুতবা বা বক্তব্য-ওয়াযের শুরুতে তাশাহ্হূদ নেই তা কর্তিত হস্তের ন্যায়।” ৪.
এখানে তাশাহ্হূদ বলতে শুধু “শাহাদাতাইন” বুঝানো হয় নি, বরং হামদ, সানা ও তাশাহ্হূদের সম্মিলিতি সে পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিখিয়েছেন তাই এখানে উদ্দেশ্য। যেমন সালাতের মধ্যে তাশাহ্হূদ বলতে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণবর্ণনা সহ শাহাদাতাইন বলার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শেখানো বাক্যগুলি বুঝানো হয়।
সাহাবী, তাবিয়ী ও পূর্ববর্তী যুগের আলিম ও বুজুর্গগণ তাদের সকল দরস, ওয়ায ও বক্তব্যের শুরুতে এ কথাগুলি বলতেন। আশা করি আমাদের আলিম, খতিব, ওয়ায়িয ও ‘দায়ী’গণ এ সুন্নাতটি জীবিত করবেন এবং তাঁদের দরস, তাদরীস, ওয়ায, খুতবা ও সকল বক্তব্য এ মাসনূন বাক্যগুলি বলে শুরু করবেন। বিবাহ অনুষ্ঠান, দরস, ওয়ায বা বক্তব্যের শুরুতে এ মাসনূন খুতবাটি বলার মধ্যে সুন্নাত পালন ও জীবিত করার সাওয়াব ছাড়াও সুন্নাতের কারণে বিশেষ বরকত ও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আমাদের এ খুতবা সংকলনের প্রতিটি আরবী খুতবার শুরুতে এ মাসনূন বাক্যগুলি লেখা হয়েছে। বাংলা আলোচনার শুরুতে শুধু সংক্ষেপে “নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লী আলা রাসূলিহীল কারীম” লেখা হয়েছে। তবে মুহতারাম খতীবগণের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, উপর্যুক্ত মাসনূন তাশাহ্হূদ বা খুতবাতুল হাজাতের প্রথম অংশটুকু অন্তত মুখস্থ করে নেবেন এবং প্রতি জুমুআর বাংলা আলোচনা এ মাসনূন বাক্যগুলি দিয়ে শুরু করবেন। আল্লাহ আমাদেরকে সুন্নাতের অনুসরণ ও জীবনদানের তাওফীক দিন। আমীন।
----------------------------
১.মুসলিম, আস-সহীহ ২/৫৯৩।
২.আবূ ইয়ালা, আল-মুসনাদ ১৩/১৮৫-১৮৭। হাদীসটির সনদ সহীহ।
৩. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৬০৯। আলবান, সহীহ সুনানি ইবন
মাজাহ ২/১৩৪। হাদীসটি সহীহ।
৪.তিরমিযী, আস-সুনান ৩/৪১৪। হাদীসটি সহীহ।