28/11/2021
গৃহহীন মা-মেয়ে, মেয়ের চান্স বুয়েটে!
হ্যাঁ, এটাই বাস্তব সত্য, এই বাংলাদেশে, এমনকি বিশ্বেও এরকম ঘটনা হয়তো প্রথম। গৃহহীন অবস্থা থেকে একটা দেশের টপ বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশনে সামনের দিকে স্থান করে নেয়া!
মেয়েটার নাম শোভা রানী... আগে বিভিন্ন ভার্সিটির পজিশনগুলো দেখে নেয়া যাক, তারপর একটা ছোট টুকরো গল্প..
বুয়েট...৭২২,
ইন্জিনিয়ারিং গুচ্ছ...৮৮৬,
ঢাবি..১০৯
রাবি...৩য়
বুটেক্স...৩৬৫
শোভার জন্মের কয়েক মাস আগেই তার বাবা মারা যান। ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়ুয়া তার মা। নানু অকালে মারা যাওয়ায় মায়ের বিয়ে হয় মাত্র ১৩/১৪ বছর বয়সে। বিয়ের পর স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর সদ্য জন্ম নেয়া মেয়েকে নিয়ে কি করে চলে 'অপয়া' মায়ের সংসার?
শোভা পেল না পৈতৃক ভিটা। মেয়ে, মায়ের অধিকার নাই সেখানে (হায়রে আইন!)! বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পর মামার বাড়িতে ঠাঁই। সেখান থেকেও একসময় বিদায় নিতে হলো। কখনো স্কুলের দপ্তরী, কখনো গৃহপরিচারিকা। গৃহকর্তা একটা সময় পর আর দুইজনকে জায়গা দিতে রাজি না। বের হয়ে যেতে হলো। মেয়ে বাচ্চা, নিজেও অল্পবয়সী। সীমাহীন নিরাপত্তার ঝুঁকি! স্বামীহীন অবস্থায় শোভার মাকে এলাকাবাসী, আত্মীয়স্বজন বাধ্য করে ২য় বিয়ে করতে। কিন্তু সেখানে চলে নির্যাতন। রাত-দিন ঝগড়া! শোভা বড় হতে থাকে। এরকম পরিবেশে পড়াশোনা?
শোভা ৭ম শ্রেণিতে উঠার পর শুরু করে টিউশনি। মায়ের দায়িত্ব, নিজের দায়িত্ব নিয়ে নেয় নিজেই! হুম, এই বয়সেই! শুধু সামাজিকতার খাতিরে লোক দেখানো সৎ বাবার বাড়িতে তার মাথা গোঁজা। খাওয়া-দাওয়া পড়াশোনার দায়িত্ব এই শোভার কাঁধেই!
শোভা আরো বড় হতে থাকলো। পিএসইসি, জেএসসি, এসএসসি, সব পরীক্ষায় জিপিএ ৫.০ পেয়ে গেলো। তার এই খবর শুনে প্রথম আলো এগিয়ে আসলো এইচএসসি এর সময়।
এরপর এডমিশন কোচিং?
হুম৷ আবারো সেই ঘুড্ডি ফাউন্ডেশন, আমাদের কোলাবরেটর। তাদের নেয়া পরীক্ষায় এই শোভা রানী বেশ ভালো নাম্বার পায়, বৃত্তি পায় ঢাকায় বর্ণ কোচিং-এ ফ্রি কোচিং এবং থাকা-খাওয়ার।
শোভার সাথে আমাদের ফাউন্ডেশনের পরিচয় তার প্রথম তিন মাসের বৃত্তি শেষ হওয়ার পর। মেয়েটা খুব ভালো করছে কোচিং-এ, কিন্তু বাড়ি ফিরে যাবে সেই অবস্থাও নাই গৃহহীন মেয়েটার। মা নির্যাতন সহ্য করে সৎ বাবার বাড়িতে থাকেন। এদিকে করোনার কারণে কোচিং এর মেয়াদ বাড়তে থাকে ঢাকায়। কিন্তু স্পন্সর যদি আর চালাতে না চান, সেই কারণে আমাদের ফাউন্ডেশনে তার আবেদন জমা পড়ে।
সৌভাগ্যক্রমে সেই স্পন্সর আবার সাগ্রহে ফিরে আসেন। এত মেধাবী মেয়েটা যাওয়ার জায়গা নাই কোথাও। শোভা সেই থেকে হোস্টেলে। ঈদ আসে, পূজা আসে, শোভার যাওয়া হয় না মায়ের কাছে! পূজা উদযাপন? না, জন্মাবধি সেই উৎসব তার পালন করা হয় নি তার!
শোভার আবেদন আমাদের ফাউন্ডেশনে আবার আসে এই ভার্সিটি ভর্তি ফর্ম ফি ও যাতায়াত খরচ নিয়ে। আমরা যা পেরেছি, নিয়মানুযায়ী দিয়েছি। আমাদের কনট্রিবিউশন জাস্ট এইটুকুই!
এতগুলো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে একের পর এক টপে তার নাম আসার পর শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে।আমি আমার মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীর দিন (৬ই নভেম্বর) ওর ব্যাপারে পুরো জানার পর সারাটা দিন মন খুব খারাপ করেছিলাম, অনেক কান্না করেছিলাম। আমি খুব অবিশ্বাস্য এক ঘোরের মধ্য দিয়ে গেলাম। বাধ্য হলাম ওর সাথে সরাসরি কথা বলার ব্যবস্থা নিতে। না হলে আমার যে মনটা শান্ত হচ্ছিল না!
ওর সাথে থাকা আমাদের ফাউন্ডেশনের মোমিনা এবং হোস্টেলের পরিচালক আব্দুল মোমিন মারফত তার সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হলো। ওর সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো। মাথা নুইয়ে সেই ভিডিও কলে আমি মাথা নত করে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়েছি তাকে, এবং বলেছি আরো অনেক শ্রদ্ধা ও সম্মান ওর মাকে পৌঁছে দিতে।
এদিকে এই শোভাও নাকি আমার সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়েছিল অনেক আগে থেকে। জিজ্ঞেস করলাম কেনো? কারণ আমরা তো আগে তাকে মাসিক বৃত্তি দেই নি। তাই সরাসরি কথা বলার সুযোগ হতো না। সে বললো, যারা মাসিক বৃত্তি পেত, তাদেরকে নিয়ে যে আমি প্রতিমাসে একবার অনলাইনে বসতাম, তখন তার ইচ্ছে হতো আমার সাথে কথা বলার। সেই সুযোগ না পেয়ে সে আমার মিটিং এর রেকর্ড করা কথাগুলো শুনতো মোটিভেশন এর জন্য! আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি এই বয়সে যে দিগ্বিজয়ী, তাতে আর কারো মুখের বুলি শোনার দরকার আর পড়ে না। বরং তোমার এই ছোট্ট জীবন থেকে আমি আজ যা শুনলাম, তাতে আমার মায়ের কথা বারবার মনে হচ্ছে।
শোভার সাথে আজ আবারো আমার কথা হলো। আমিই উদগ্রীব ছিলাম ওকে আবারো সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানানোর জন্য! সাথে ছিল আমার বাসার বেড়াতে আসা আমাদের ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর আতিকুর রহমান ভুঁইয়া... সেও অভিনন্দন জানালো!
শেষ কথাঃ
এত সুখের খবরেও মেয়ে মায়ের কাছে যেতে পারছে না। শোভা এবং তার মা যে এখনো গৃহহীন। মেয়ে থাকে ঢাকায় হোস্টেলে, আর মা কোনোরকমে অন্যের বাড়িতে...
শোভাকে শুধু কথা দিয়েছি, সামনের দিনগুলোতে আমরা আছি সবসময়। সেই সুযোগ পেলে আমরাই বরং ধন্য ও গর্বিত হবো। আর তার মাকে নিয়ে একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থাও আমরা করার চেষ্টা করবো।
চন্দ্রনাথ সাহা
মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন