Journal of Islamic Studies Bangla

Journal of Islamic Studies Bangla

Share

Discussion of Quran, Hadith and Islamic history

02/09/2024
03/11/2023

10/10/2023

একাধিক হাদিস থেকে সত্যিকারের মসীহ ও ভন্ড মসীহের তথ্য পাওয়া যায়। দাজ্জালের অনুসারীদের অধিকাংশই ইয়াহুদি হবে- তাও জানা যায়। হযরত ঈসা আ. যখন চুড়ান্ত যুদ্ধে দাজ্জালকে হত্যা করবেন, তখন দাজ্জালের এ অনুসারীরা দিকবিদিক দিশেহারা হয়ে ছুটোছুটি করবে। তারা বিভিন্ন গাছের ও পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকোবে। হাদিস আমাদেরকে জানাচ্ছে, তখন পাথর ও গাছগুলো কথা বলবে এবং ঈমানদারদেরকে জানিয়ে দেবে যে, ‘আমার আড়ালে একজন অবিশ্বাসী আশ্রয় নিয়েছে।’ হাদিসটি এমন।

আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যে পর্যন্ত মুসলিমরা ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করবে। এমনকি ইয়াহুদী পাথর ও গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলে পাথর ও গাছ বলবে ‘হে মুসলিম! আমার পিছনে ইয়াহুদী রয়েছে। এসো, ওকে হত্যা কর।’ কিন্তু গারক্বাদ গাছ এরকমটা বলবে না। কারণ এটি ইয়াহুদীদের গাছ।’’(সহীহুল বুখারী ২৯২৬, মুসলিম ১৫৭, ২৯২২, আহমাদ ৮৯২১, ১০৪৭৬, ২০৫০২)

এ হাদিসটিকে তীব্র ভাষায় ইহুদি বিরোধী হাদিস হিসেবে প্রচার করা হয়। অনেক মুসলিমও হাদিসটি নিয়ে চুপচাপ থাকার চেষ্টা করেন। অথচ হাদিসটি সত্যি। সাম্প্রতিক সময়ের ই-স-রা-ইলী ঘটনা প্রবাহেও তা বোঝা যায়। কারণ তারা এখন নিজেদের ভূখন্ডে প্রচুর পরিমাণে গারক্বাদ গাছ রোপন করছে।

পশ্চিমাদের অপপ্রচারের ফাঁদে পড়ে মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এই হাদিস নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- হে মুসলিম, আপনারা নিজেদের ইতিহাস জানুন। এন্টাইসেমিটিজম বা ইহুদি বিদ্বেষ ইউরোপীয় একটি টার্ম। এ ধরনের শব্দ আপনি ১৪শ বছরের মুসলিম ইতিহাসের কোথাও খুঁজে পাবেন না। ইউরোপীয়ানরা বিশেষত খৃস্টানেরা এ শব্দের প্রবর্তন করেছিল। আমাদের শরীয়াতে মুসলিম ও আহলে কিতাব নামক দুটো ধারার কথা বলে। আহলে কিতাবের মধ্যে খৃস্টান ও ইহুদি উভয়েই আছে। ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ইহুদি বিদ্বেষী বলার কোনো সুযোগ নেই।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, মুসলিম ও ইয়াহুদি মিলেই রোমান, বাইজেন্টাইন, বৃটিশ বা ফরাসী ঔপনিবেসিকদেরকে মুকাবেলা করেছে। ইতিহাসের বিচারে ইয়াহুদিদের সাথে খৃস্টানদের যে পারস্পরিক সম্পর্ক তার তুলনায় ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যকার আন্তরিক সম্পর্ক অনেকবেশি দৃশ্যমান। আজ পর্যন্ত ইহুদিদের যত বড়ো ধর্মতাত্বিকদের নাম জানা যায় তারা সবাই মুসলিম ভুখন্ডে জন্ম নিয়েছেন। ইহুদিরা যা কিছু করেছে, কোনো কিছুই খৃস্টান ভূখন্ডে করতে পারেনি। সবটাই তারা মুসলিমদের ভূখন্ডে বসেই করেছে। খৃস্টানেরা যতবার যত ভূমি থেকে ইহুদিদের উচ্ছেদ করেছে, প্রতিবারই মুসলিম শাসকেরা উদার মানসিকতা নিয়ে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন। এ কারণেই ১৯৪৭ সাল থেকে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ইহুদিদের আবাস ছিল মুসলিম ভুখন্ডেই। তাই খৃস্টানদের মুখে মুসলিমদেরকে ইহুদি বিদ্বেষী হিসেবে সমালোচনা করা শোভা পায় না।

এবার হাদিসটি নিয়ে পরিস্কার ভাষায় বলছি। এ হাদিসে ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু কথা বলা হয়েছে। শুধু এই একটি নয়, শেষ জমানা নিয়ে অসংখ্য হাদিস বর্নিত হয়েছে। আপনি যদি এগুলোকে বিশ্বাস করেন, তাহলে পুরোটাকেই বিশ্বাস করতে হবে। আপনি যদি দাজ্জালের আগমনে বিশ্বাস করেন, মসীহের আগমনে বিশ্বাস করেন, মসীহের হাতে দাজ্জালের মৃত্যুকে বিশ্বাস করেন তাহলে গাছ পাথর ইহুদিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে- এটাকে কেন বিশ্বাস করবেন না? যদি না করেন, কোনোটাই করবেন না। আর যদি করেই থাকেন, যদি পৃথিবীর শেষ মুুহুর্তে সত্য ও মিথ্যার সে চুড়ান্ত লড়াইয়ে বিশ্বাস করেন, তাহলে এখন থেকেই সত্যের পক্ষে অবস্থান নিন।

আমাদের হীনমন্যতায় ভোগার বা কোনো বিষয় নিয়ে লুকোচুরি করার কোনো কারণ নেই। আমরা ইয়াহুদি বিদ্বেষী নই, তবে আমরা জায়নবাদের বিরুদ্ধে, জায়নবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। আর আমরা এ অবস্থান ধারণ করে যাবো ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্য পথের ওপর অটল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

-----ইয়াসির ক্বাদি
'কারবালা, ইমাম মাহদি, দাজ্জাল ও গাজওয়ায়ে হিন্দ' শীর্ষক বই থেকে।

13/06/2022

জিহাদ
--------------------------
জিহাদ ইসলামের একটি অন্যতম ফরজ। পবিত্র কুরআন-হাদিসে মুসলমানদের প্রতি জিহাদের আদেশ রয়েছে। রয়েছে জিহাদ না করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে মর্মস্পর্শী বর্ণনা। আখিরাতের জীবনে মুসলমানদের মুক্তির জন্য জিহাদের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। জিহাদ বলতে সাধারণত অস্ত্রধারণ, যুদ্ধ, লড়াই বোঝানো হয়। বস্তুত জিহাদ শব্দের অর্থ ব্যাপক। জিহাদ একটি আরবি শব্দ, জাহদ ধাতু থেকে নির্গত। জাহদ অর্থ দুঃখ-যাতনা ভোগ। দুঃখ-যাতনা সহ্য করে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালানো। জিহাদ শব্দটি একটি ব্যাপক ক্রিয়াপদ। এটা সংঘটিত হওয়ার বিভিন্ন সূত্র ও ক্ষেত্র আছে। সর্ব প্রধান ও সর্বশেষ ক্ষেত্র হচ্ছেÑ অস্ত্রধারণ, যুদ্ধ বা লড়াই, যাতে সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট ত্যাগস্বীকার করতে হয়। এমনকি প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণ বিলিয়ে দিতে হয়। আর জিহাদের পর্যায়কে যথার্থভাবে বোঝানোর জন্য আরবি ভাষায় বিশেষ শব্দ রয়েছে ‘কেতাল’। আল্লাহ তায়ালার প্রভুত্বের বাস্তব ও খাঁটি বিকাশ তথা আল্লাহ পাকের মনোনীত জীবনব্যবস্থা দ্বীন ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও উন্নতি এবং ইসলামের নির্ধারিত অনুশাসনগুলো প্রবর্তনের জন্য সারা জাহানকে বাঁধামুক্ত, নিরাপদ ক্ষেত্ররূপে পরিণত করার, কর্তব্য পালনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিটি সূত্র ও ক্রিয়া জিহাদের অন্তর্ভুক্ত এবং এ ব্যাপক অর্থে জিহাদ মুসলমানদের ওপর ফরজ। যুদ্ধ বা লড়াই জিহাদের একটি অন্যতম বিভাগ, এমনকি সাধারণত জিহাদ শব্দ এই অর্থকেই বোঝায় এবং বিশেষরূপে এই বিভাগটিকে ফরজ প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কুরআন শরিফের বহু আয়াতে এর অর্থের জন্য আরবি ভাষায় বিশেষ শব্দ কেতাল শব্দের মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব জিহাদ ধাতুগত অর্থেও ফরজ মনে করেন, আর যারা অস্ত্রধারণকে জিহাদের অন্তর্ভুক্ত না মেনে শুধু অন্যান্য রকমের চেষ্টা-তদবিরকেই জিহাদের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন, তারা উভয়ই মারাত্মক ভুলে পতিত আছেন। জিহাদ অস্ত্রধারণ অর্থে ফরজ হওয়ার প্রমাণে কুরআন শরিফের বহু আয়াত ও অনেক হাদিস বিদ্যমান আছে।
ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তোমরা অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ফিতনা সম্পূর্ণারূপে নির্র্মূল না হয়ে আল্লাহর দ্বীন অবশিষ্ট থাকে।’ (সূরা আনফাল : ৩৯)
তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো এবং জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা সবকিছু শোনেন জানেন।
যারা আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের পরিবর্তে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকেই যথাসর্বস্ব মনে করে এটাকে অবলম্বন করে আছে, (আখিরাতের জীবনের জন্য সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি) তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে যারা শহিদ হবে বা জয়ী হবে, অচিরেই তাদের পুরস্কার দান করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী, আপনি অস্বীকারকারী-মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যান এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান জাহান্নাম হবে।’
হে ঈমানদারগণ! তোমরা (প্রথম) স্বীয় সীমান্ত সংলগ্ন অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও, তারা যেন তাদের মধ্যে কঠোরতা দেখতে পায়।
‘বেরিয়ে পড়ো, অল্প অধিক (যাহা সাধ্য জুটে) সমরসাজে সজ্জিত হয়ে স্বীয় মাল ও জান উৎসর্গ করে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো। (সূরা তাওবা : ৪১)
আল কুরআনের জিহাদের এসব আয়াতের মর্মদৃষ্টে পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণায় গড়ে ওঠা এক শ্রেণীর মানুষ ইসলামের অপব্যাখ্যা করে থাকেন। সত্য উপলব্ধিতে ব্যর্থ এ শ্রেণীর লোকজন প্রশ্ন করেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলামে মারামারি-লড়াই-ঝগড়া কেন থাকবে। তা ফরজ তথা ইসলামের অপরিহার্য বিধান কেন হবে?
এরূপ শান্তির ধ্বজাধারীদের বোঝা উচিত, ইসলাম বলিষ্ঠ ধর্ম স্বভাবের পটভূমিতে তার প্রতিষ্ঠা। স্বভাব যা আছে, ইসলামেরও তা আছে। সংগ্রামের প্রয়োজনে সংগ্রাম করেই অগ্রসর হতে হয়। জালিমকে বাধা দাও, জুলুমকে বন্ধ করে। ন্যায় ও সত্য আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্য তরবারি চালাও, মারো, এটা স্বভাব, এটা ইসলামে রয়েছে। ইসলামে যুদ্ধ বা তরবারির স্থান সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। অন্যায়-অবিচারের যথাযোগ্য প্রতিকারের জন্য, ইসলামী আদর্শ বিস্তারের জন্য। আর এ ক্ষেত্রে সত্যের সাথে শক্তি কতই না সুন্দর। শক্তি ছাড়া সত্য দাঁড়াতে পারে না। আর সত্য-ন্যায় ইনসাফহীন শক্তি জুলুমে পরিণত হয়। তরবারির জোরে বল প্রয়োগে মুসলমান করা ইসলাম অনুমোদন করে না। আর জালিমের জুলুম, কাফির-মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কাপুরুষের মতো শুধু ভীরু হৃদয়ের মিনতি ইসলামে নেই।
সত্য ও শক্তি, দ্বীন ও দুনিয়ার চমৎকার মিলনই ইসলামের বৈশিষ্ট্য। ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা, জুলুম-জালিমের ভয়ে সন্ন্যাসী সেজে বনে গিয়ে জীবন ধারণ, দাপটের মুখে কাকুতি-মিনিতির সাথে শত্রুর দয়ায় জীবন বাঁচানো ইসলাম পছন্দ করে না। ঈমানের পরিচয়ও নয়। হুজুর সা: বলেন, ‘লা রোহবানিয়াতা ফিল ইসলাম’Ñ বৈরাগ্যবাদ ইসলামে নেই।
ঈমানের পরিচয় হলো সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে এক হাতে কুরআন, আর অন্য হাতে বাতিলের সব বাধা-বিঙ্গণ উপেক্ষা করে সত্য-ন্যায়কেপ্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
জিহাদের বিভিন্ন রূপক অর্থ ও আকৃতি সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রসার হওয়ার ফলে জিহাদের ইসলামী পারিভাষিক অর্থ আকৃতি সর্বসাধারণের ধ্যান-ধারণা থেকে ক্রমাগত বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। এমনকি সমাজে দ্বীনি শিক্ষাদানের কাজে যারা নিয়োজিত, তাদের স্মরণ হতেও জিহাদের প্রকৃত তাৎপর্য লুপ্তপ্রায়। সর্বদা আলোচনায় রূপক অর্থের ছড়াছড়ি। বুখারি, মুসলিম শরিফসহ সিয়াহ ছিত্তাহর হাদিস গ্রন্থের মধ্যে কিতাবুল জিহাদ তথা জিহাদ অধ্যায় বলার মধ্যে জিহাদের যে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যবহ অর্থ রয়েছেÑ এটাই জিহাদের পারিভাষিক অর্থ। দ্বীনের শিক্ষাদান, দ্বীনের প্রচার অনেক আমলই জিহাদের রূপক অর্থের আওতাভুক্ত। এতে জিহাদের সওয়াবও হাসিল করা যায়। কিন্তু এই অর্থ আর জিহাদের পারিভাষিক অর্থ উভয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যেমনÑ সূরা ইখলাছ তিনবার তিলাওয়াত করলে এক খতম কুরআন শরিফ তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়া যায়।
তবে ৩০ পারা কুরআন খতমের সওয়াবের মধ্যে ব্যবধান তো নিশ্চয়ই রয়েছে। উল্লিখিত দুই অর্থে জিহাদের মধ্যে পরোক্ষ অংশগ্রহণ আর প্রত্যক্ষ ময়দানে নিয়োজিত থাকার মধ্যে মর্যাদা, তাৎপর্য ও সওয়াবের পার্থক্য আছে।
অতঃপর লক্ষণীয় বিষয় এই, দ্বীন ইসলাম শুধু গুটিকয়েক ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া-প্রার্থনা, জিকির-আশকারজাতীয় কার্য ও অনুষ্ঠানাদির নাম তথা সন্ন্যাস-বৈরাগ্যবাদের ধর্ম দ্বীন ইসলাম নয়। বরং ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি মানব জীবনের প্রতিটি স্তর ও পদক্ষেপকেই ইসলাম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। দ্বীন ইসলামের মধ্যে ইবাদত-বন্দেগির সাথে স্বতন্ত্র সমাজব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, পারিবারিকব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা রয়েছে এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শাসনতন্ত্র রয়েছে, যাকে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট বিশ্বে চালু করতে হবে।
মুসলিম শরিফ দ্বিতীয় খণ্ড ৮২ নম্বর পৃষ্ঠায় বর্ণিত একটি হাদিস লক্ষণীয়। হজরত মুহাম্মদ সা: কোথাও কোনো সৈন্যবাহিনী পরিচালিত করলে সে বাহিনীর অধিনায়ককে বিশেষ রূপে কিছু বিষয়ে নির্দেশ দিতেন।
সবসময় আল্লাহর ভয় জাগ্রত রাখবে। সাথীদের সুখ-শান্তির প্রতি নজর রাখবে। আল্লাহর নামে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। আল্লাহর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। জিহাদের ময়দানে যে ধনসম্পদ অধিকারে আসবে, তা আত্মসাৎ করবে না। শত্রুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। শিশু, নারী বা দুনিয়ার সংশ্রববিহীন সাধু-সন্ন্যাসীদের হত্যা করবে না।
অস্বীকারকারী, মুশরিক শত্রুদের প্রতি অস্ত্রধারণ করার আগে তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটি বিষয়ে সুযোগ প্রদান করবে।
তাদেরকে ইসলামের দিকে আকুল আহ্বান জানাবে। যদি তারা সে আহ্বানে সাড়া দেয়, তাবে তাদের পক্ষে ইসলামকে গ্রহণীয় গণ্য করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। যদি তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে, তবে তাদের জিজিয়া তথা ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স আদায়ের আদেশ দিবে। যদি সে আদেশ তারা মেনে নেয়, তবে তাদের সে আনুগত্য গ্রহণীয় গণ্য করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। যদি তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য প্রার্থনাপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
এসব শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যায়, জিহাদ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি সংস্কারমূলক ব্যবস্থা। একমাত্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে জিহাদের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। এর ফলে আশ্চর্যজনক ইতিহাসের সৃষ্টি হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সা:-এর দীর্ঘ ১০ বছরের জীবনে ছোট-বড় প্রায় ১০০ যুদ্ধ পরিচালিত হয়। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ যুদ্ধের সংখ্যা প্রায় ২৭টি। মহানবী সা:-এর সারাজীবনের সব যুদ্ধে মুসলিম ও কাফির মিলে প্রায় এক হাজার ১৮ জন মানুষ নিহত হয়েছে। যে আরব দেশে প্রতি মাসে সহস্রাধিক মানুষ মারামারি করে খুন হতো, সে দেশে মাত্র সহস্র মানুষের জীবনের বিনিময়ে বিশ্বব্যাপী চিরস্থায়ী শান্তির ব্যবস্থা হয়। তিনি মদিনাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বনবী সা: যুদ্ধের ময়দানে এমন একজন সেনাপতি ছিলেন, তিনি যুদ্ধ করেছেন সম্পদ লাভের জন্য নয়, সম্পদ সমবণ্টনের জন্য। তিনি যুদ্ধ করেছেন শুধু রাজ্য বিস্তারের জন্য নয়, কল্যাণ বিস্তারের জন্য। তিনি যুদ্ধ করেছেন সন্ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য নয়, পৃথিবী থেকে সন্ত্রাস দূর করার জন্য। তিনি যুদ্ধ করেছেন আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য নয়, হক প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি যুদ্ধ করেছেন মানুষের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে।মহানবী সা: বলেছেনÑ ‘আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় মুজাহিদের তুলনা ওইরূপ রোজাদার, নামাজে দণ্ডায়মান তিলাওয়াতকারীর ন্যায়, যে তার রোজা বা নামাজ আদায়ে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি প্রকাশ করে না। যতক্ষণ না সে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে।’ (বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত পৃষ্ঠা ৩২৯)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: রাসূলুল্লাহ সা: থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সা: মক্কা বিজয়ের দিন বললেন, ‘মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরত নেই। অবশ্য জিহাদ ও নিয়তের বিধান বজায় রইল। আর তোমাদের যখনই জিহাদে গমনের জন্য (রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে) আহ্বান করা হবে, তখনই তোমরা তার জন্য বের হবে।’ (বুখারি মুসলিম, মিশকাত পৃষ্ঠা ৩৩০)
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার জিহাদই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বলে গণ্য হবে।’ (বুখারি ও মসুলিম থেকে মিশকাত)
নবী সা: বলেছেন, ‘যে বান্দার পা দু’টিতে আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে ধুলা লাগবে, অতঃপর ওই বান্দাকে দোজখ স্পর্শ করবে, এটা কখনো হতে পারে না।’ (বুখারি থেকে মিশকাত)
হুজুুর সা: আরো বলেছেন, ‘তোমাদের জান-মাল ও মুখ দ্বারা (অর্থাৎ সব রকম শক্তি দ্বারা) তোমরা মুশরিকদের সাথে জিহাদ করো।’ (আবু দাউদ, নাসায়ি ও দারিমি থেকে মিশকাত)
নবী সা: আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জিহাদ না করে অথবা অন্তরে জিহাদের নিয়ত ও অনুপ্রেরণা না রেখে মৃত্যুবরণ করে, সে এক প্রকার মুনাফিকের মৃত্যুবরণ করে।’ (মুসলিম থেকে মিশকাত)
নবী সা: আরো বলেছেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল সর্বদায় হকের ওপর কায়েম থেকে জিহাদরত থাকবে এবং ওই সব লোকের ওপর বিজয়ী হয়ে থাকবে, যারা তাদের বিরোধিতা করবে। অবশেষে তাদের সর্বশেষ দলটি মাসিহ দাজ্জালের সাথে মোকাবেলা করবে।’ (আবু দাউদ থেকে মিশকাত)।
বর্তমান যুগের তথাকথিত সভ্যতার দাবিদারদের আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এমনকি শিশুরাও রক্ষা পায় না। দেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। যুগ যুগান্তর পর্যন্ত একটি জাতি বা সভ্যতার ওপর নেমে আসে বিভীষিকাপূর্ণ পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী তথাকথিত সভ্য মানুষেরা জিহাদকে চোখের কাটা রূপে দেখবে এবং দোষারোপ করবে তাতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। বস্তুত এটি তাদের হিংসাত্মক কার্যের মাপকাঠিতে সংস্কারমূলক কাজকে পরিমাপ করার পরিণতি। অপ্রিয় হলেও সত্য, জিহাদই বর্তমান বিশ্বের মজলুম মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে পারে। তাই আজ সময়ের দাবি হলোÑ অস্বীকারকারী ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা। জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া।

20/05/2022

"ইসলামের শালীনতা ও পোশাক"

পুরুষ ও স্ত্রীলোকের পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কে ইসলামী আইন যথাযথ উপদেশ ও নির্দেশনা দান করেছে। ইসলাম যথাযথ পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে দু’টি বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রথমত, মানবদেহ ঠিকমতো আচ্ছাদন করা। কারণ, বিশ্রীভাব দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করা ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত, সৌন্দর্যায়ন ও ভূষণ বাড়িয়ে তোলা।

পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে বলা হয়েছে- ‘হে বনি আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদের পোশাক দিয়েছি এবং সর্বোত্তম পোশাক হচ্ছে তাকওয়ার পোশাক’ (সূরা আরাফ, ৭-২৬)।

দেহ ঠিকমতো আচ্ছাদন করা এবং ভূষণের মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিত। যদি এই ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে শয়তানের পথই অনুসরণ করা হবে। এ সম্পর্কে কুরআন বলেছে-

‘হে বনি আদম! শয়তান তোমাদের প্রথম বাবা-মাকে যেভাবে বেহেশত থেকে বহিষ্কার করেছিল এবং তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান উভয়ের সামনে দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করেছিল, তোমাদেরকে কিছুতেই শয়তান যেন সেভাবে প্রলুব্ধ না করতে পারে’ (সূরা আরাফ, ৭-২৭)।

পুরুষ ও স্ত্রীলোকের জন্য একই ধরনের পোশাক পরিধান করতে ইসলাম অনুমতি দেয়নি। ইসলাম পুরুষ ও স্ত্রীলোকের প্রভেদ রক্ষা করতে চায়। পুরুষ ও স্ত্রীলোকের একে অপরের পোশাক পরিধানের মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। নবী করিম সা: বলেছেন- ‘পুরুষের স্ত্রীলোকের মতো পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ এবং স্ত্রীলোকের পুরুষের মতো পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ’ (বুখারি)।

ইসলাম পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবহারে জাঁকজমক ও আড়ম্বর নিষিদ্ধ করেছে। কুরআন এ সম্পর্কে বলেছে- ‘আল্লাহ জাঁকজমকপূর্ণ (গর্বিত) লোককে পছন্দ করেন না’ (সূরা আল হাদিদ, ৫৭-২৩)।

নবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জাঁকজমক বা গর্ব দেখানোর জন্য তার পোশাক ভূমি পর্যন্ত স্পর্শ করায় (বিনা কারণে পোশাক লম্বা করে) আল্লাহ শেষ বিচারের দিন তার দিকে তাকাবেন না’ (বুখারি)।

পোশাক-পরিচ্ছদ অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে। কারণ, ইসলাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিয়েছে। মুহাম্মদ সা: বলেছেন- ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করো। কারণ ইসলাম ধর্মে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে’ (ইবনে হারান)।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: স্ত্রীলোকদের স্বর্ণালঙ্কার ও সিল্কের বস্ত্র পরিধান করার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি এগুলো পুরুষদের পরিধান করার অনুমতি দেননি। এর কারণ, সম্ভবত এগুলো স্ত্রীলোকদের জন্যই প্রকৃতিগতভাবে উপযুক্ত এবং পুরুষদের জন্য খুব একটা উপযুক্ত নয়।

পুরুষ ও স্ত্রীলোক অবশ্যই শালীনতাপূর্ণ পোশাক পরিধান করবে। নবী করিম সা:-এর সুন্নাহ হচ্ছে, মানুষ তার দেহ যথাযথভাবে আচ্ছাদন করবে। পুরুষদের অন্তত নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। দেহের অন্যান্য অংশ বিভিন্ন কারণে খোলা রাখা যেতে পারে। স্ত্রীলোক অবশ্যই তার দেহ যথাযথভাবে ঢেকে রাখতে হবে। নবী সা: বলেছেন, ‘একটি বয়স্ক মেয়ের জন্য তার দেহ খোলা রাখা ঠিক নয়। সে অবশ্যই তার মুখমণ্ডল ও হাতের সামনের অংশ খোলা রাখতে পারে’ (আবু দাউদ)। নবী সা: আরো বলেছেন- ‘স্ত্রীলোকদের এমন পাতলা পোশাক পরতে অনুমতি দেয়া হয়নি, যা তার শরীর দেখাতে পারে’ (ইমাম মুসলিম)।

ইসলাম মেয়েদের বয়স হওয়ার পর ভালো করে বুক ঢেকে ওড়না পরতে বলেছে। ফ্যাশনের নামে অনেক কিশোর ও যুবতী ওড়না পরা বাদ দিয়েছেন। অনেকে গামছার মতো ওড়না গলায় জড়িয়ে রাখছেন অথবা এক দিক দিয়ে ঝুলিয়ে রাখছেন। ওড়না গামছা নয়। যা দিয়ে ভালো করে মাথা ও বুক ঢাকা হয় না, তাকে ওড়না বলা চলে না।

এই প্রবণতা রোধ করা অবশ্যই প্রয়োজন। তা না হলে পরবর্তীকালে কিশোরীদের মধ্যে পাশ্চাত্যের মতো স্কার্ট ও হাফপ্যান্ট পরার রেওয়াজ চালু হতে পারে। আল কুরআনের ‘সুরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারীদের ওড়না পরার নির্দেশ দিয়েছেন। আয়াতটি হলো- ‘মুসলিম নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে; তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে; তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার ওড়না দিয়ে আবৃত করে’ (সূরা আন নূর, ২৪-৩১)।

এ বিধান ঘরে-বাইরে দুই স্থানেই প্রযোজ্য। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে পুরুষদেরকেও তাদের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

উপরিউক্ত আয়াতে ‘খুমর’ (এক বচন ‘খিমার’) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘খিমার শব্দের অর্থ ওড়না বা চাদরজাতীয় পোশাক। জাহেলিয়াতের জমানায় স্ত্রীলোকেরা মাথায় ওপর একপ্রকার চাদর দিয়ে পেছনের খোঁপা বেঁধে রাখত। তাদের সম্মুখের দিকের বোতাম খোলা থাকত। এতে গলা ও বুকের উপরাংশ স্পষ্ট দেখা যেত। বুকের ওপরে কোর্তা ছাড়া আর কিছু থাকত না (ইবনে কাসির, কাশাফ, মুহাম্মদ আসাদ লিখিত ‘মেসেজ অব দ্য কুরআন, মাওলানা মওদুদিকৃত ‘তাফহিমুল কুরআন’, সূরা নূরের তাফসির অংশ)। এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর মুসলমান নারী ও কিশোরীদের মধ্যে ওড়না ব্যবহার করার রেওয়াজ চালু হয়। ঈমানদার মহিলারা আল্লাহর এ নির্দেশ শুনে অবিলম্বে তদনুযায়ী আমল শুরু করেন। এর প্রশংসা করে হজরত আয়েশা রা: বলেছেন, ‘যখন সূরাটি নাজিল হয় তখন নবী করিম সা:-এর কাছে লোকেরা তা শুনে নিজের স্ত্রী, কন্যা ও বোনদেরকে এই আয়াতের কথা শোনায়। আয়াত শুনে প্রত্যেকে উঠে ওড়না বা চাদর দিয়ে সর্বাঙ্গ জড়িয়ে নেয়। পরের দিন ফজরের নামাজে যত স্ত্রীলোকই মসজিদে নববীতে হাজির হয়, তারা সবাই ওইভাবে ওড়না বা চাদর পরা ছিল। এ পর্যায়ে আরেকটি বর্ণনায় হজরত আয়েশা রা: বলেছেন, ‘নারীরা পাতলা কাপড় পরিত্যাগ করে মোটা কাপড়ের ওড়না বানিয়ে নিয়েছিল’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, আবু দাউদ, কিতাবুল লিবাস; তাফহিমুল কুরআন, সুরা নূরের তাফসির)।

ওপরের আলোচনায় সুস্পষ্ট, মাথা ও বুক ঢেকে নারী ও কিশোরীদের ওড়না পরার নির্দেশ কুরআন থেকেই এসেছে। এটা কারো বানানো বিধান নয়। অথচ বেশির ভাগ লোক জানে না যে, ওড়না পরা কুরআনের নির্ধারিত অবশ্যকর্তব্য। এ ছাড়া অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘গায়ের মাহরামদের’ (অর্থাৎ যাদের সাথে কোনো নারীর বিয়ে বৈধ) সামনে মাথা ঢাকা ফরজ এবং চেহারা, হাতের সামনের অংশ ও পায়ের পাতা ছাড়া শরীরের কোনো অংশ খোলা রাখা বৈধ নয় (আবু দাউদ ও হিদায়া, নজর অধ্যায়)।

পোশাকের ফ্যাশনের নামে কুরআনের বিধান অমান্য করে আজ ওড়না উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা অনেকে করছেন। অনেক বয়স্ক মেয়েকে ওড়না ছাড়া বাইরে চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। টেলিভিশনের অনেক অনুষ্ঠানেও ওড়না ছাড়া মেয়েদের অংশগ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে এবং অংশ নিতে দেয়া হচ্ছে। অথচ ওড়না ব্যবহার করা ইসলামী শালীনতার সর্বোত্তম উদাহরণ। বাংলাদেশের মুসলিম জনগণের দায়িত্ব হচ্ছে, এ সংক্রান্ত কুরআনের নির্দেশ কার্যকর করা।

আমাদের পোশাক প্রস্তুতকারকদের প্রভাবিত করা কর্তব্য, যেন তারা উপযুক্ত ওড়না ও সালোয়ারসহ পোশাকের ডিজাইন করেন। আর তারা যেন এমন পোশাক ডিজাইন না করেন, যার মাধ্যমে সমাজে ইসলামী শিক্ষার বিরোধী নির্লজ্জতা বা বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলাম স্ত্রীলোকের সম্ভ্রমের প্রতি মর্যাদা দেয় এবং খারাপ লোকদের ক্ষুধার্ত চক্ষু থেকে তাদের নিরাপদে রাখতে চায়। তাই ইসলাম স্ত্রীলোকদের সাধারণ পোশাকের ওপরে চাদর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে, যখন সে কাজের জন্য বা অন্যান্য উদ্দেশ্যে বাইরে যায়। কুরআন এ সম্পর্কে বলেছে- ‘হে নবী! আপনার পত্নী, কন্যা ও মুমিন নারীদের চাদর (মাথা ও বুক আচ্ছাদন করে) পরিধান করতে বলুন। এটাই ভালো স্ত্রীলোকের পরিচয়ের উত্তম পথ এবং এতে করে তাদের কখনো বিব্রত করা হবে না’ (সূরা আল আহজাব, ৩৩-৫৯)।

চাদরটি বড় হওয়া সঙ্গত। চাদরের বুনন ভালো হওয়া প্রয়োজন। মহিলাদের দিকে নজর দেয়া নিয়ে বিখ্যাত ফিকাহর গ্রন্থ ‘হিদায়া’তে প্রাথমিক যুগের হানাফি ইমামদের মতামত নিম্নলিখিতভাবে উল্লিখিত আছে, ‘বেগানা পুরুষের নারীর চেহারা ও হাতের তালু ছাড়া অন্য অংশের দিকে দৃষ্টি দেয়া জায়েজ নয়।’

কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘নারীরা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না কেবল সে সৌন্দর্য ছাড়া, যা স্বতঃই প্রকাশ হয়ে পড়ে। তা ছাড়া চেহারা ও হাত প্রকাশ করার প্রয়োজন পুরুষদের সাথে বিভিন্ন কাজকারবার ও লেনদেন করার জন্য।’ হজরত ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, ‘পায়ের দিকেও নজর দেয়া জায়েজ। কেননা এরও প্রয়োজন অনেকসময় দেখা দেয়।’ ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত আছে, ‘হাতের কনুই পর্যন্ত দেখা জায়েজ। কারণ এটিও অনেকসময় স্বতঃই প্রকাশিত হয়। তবে কুচিন্তা থেকে নিরাপদ না হলে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া চেহারার দিকে তাকাবে না’ (হিদায়া, নজর অধ্যায়)।

যদি মানবজাতি ইসলাম প্রদত্ত পোশাক-পরিচ্ছদের নীতি মেনে চলে, তাহলে তা অবশ্যই পুরুষ ও স্ত্রীলোকের সম্ভ্রম নিশ্চিত করবে এবং একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে

10/01/2021

-----------------ঈমান -------------
(৪র্থ পর্ব)

১১. দিল ও যবানের একাত্মতা ঈমান। এখানে নেফাকের কোন স্থান নেই।

إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ l اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসে তারা বলে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল’। আল্লাহ জানেন যে, তুমি নিশ্চয়ই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।

* ওরা ওদের শপথগুলিকে ঢালরূপে ব্যবহার করে এবং ওরা আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে। ওরা যা করছে তা কত মন্দ!-আল মুনাফিকূন ৬৩ : ১-২

সামনে ইরশাদ হয়েছে-

هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنْفِقُوا عَلَى مَنْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنْفَضُّوا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ l يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ

ওরাই বলে, ‘তোমরা আল্লাহর রাসূলের সহচরদের জন্য ব্যয় করো না, যাতে ওরা সরে পড়ে’। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর ধন-ভান্ডার তো আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না। * ওরা বলে, আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে যারা মর্যাদাবান তারা হীনদেরকে সেখান থেকে বহিস্কার করবে। কিন্তু মর্যাদা তো আল্লাহরই, আর তাঁর রাসূল ও মুমিনদের। তবে মুনাফিকগণ তা জানে না।-আল মুনাফিকূন ৬৩ : ৭-৮

১২. ঈমান একটি স্থায়ী অঙ্গিকার, ‘ইরতিদাদ’ সাধারণ কুফরের চেয়েও ভয়াবহ কুফর

ঈমান আল্লাহ ও বান্দাদের মধ্যকার এক স্থায়ী অঙ্গিকারের নাম; যার কোনো মেয়াদ নেই। যখনই ঈমানের সম্পদ পাওয়া গেল তখন থেকেই এর পুষ্টি ও বর্ধন, শক্তি ও সংস্কারে মগ্ন থাকা জরুরি। সবসময় সতর্ক থাকা চাই, এমন কোনো কথা বা কাজ যেন প্রকাশিত না হয়, যা ঈমান নষ্ট করে। আর আল্লাহর দরবারে তাঁর শেখানো দুআ করতে থাকা চাই-

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনপ্রবণ করো না এবং তোমার নিকট হতে আমাদেরকে করুণা দাও, নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।-আলে ইমরান ৩ : ৮

আল্লাহর কাছে ঐ বান্দার ঈমানই গ্রহণযোগ্য, যে ঈমানের উপর অবিচল থাকে। পক্ষান্তরে যে ঈমান থেকে সরে যায় সে তো দুই বিদ্রোহে লিপ্ত-কুফরের বিদ্রোহ ও ইরতিদাদের বিদ্রোহ।

অবিচল মুমিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে খোশখবরি-

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ l أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ خَالِدِينَ فِيهَا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

* যারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক তো আল্লাহ’ অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। * তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, তারা যা করত তার পুরস্কার স্বরূপ।-আল আহকাফ ৪৬ : ১৩-১৪
-১৪

অন্য আয়াতে আছে-

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ l نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآَخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ l نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ

যারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ’, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয়, ফিরিশতা এবং বলে, তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিতও হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। * ‘আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর। * এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।-হামীম আসসাজদা ৪১ : ৩০-৩২

পক্ষান্তরে যারা ঈমানের উপর কায়েম থাকে না; বরং পশ্চাদপসরণ করে কিংবা বারবার এদিক-ওদিক আসা-যাওয়া করে এদের কাছে দ্বীন এক ক্রীড়ার বস্ত্ত! ইরতিদাদ (সত্য ধর্ম থেকে পিছু হটা) মূলত মুনাফিকদের কাজ। এর দ্বারা তারা দুর্বল ঈমানদারদের সংশয়গ্রস্ত করতে চায়। কুরআন মাজীদে তাদের এই অপকৌশলের বিবরণ আছে। (দেখুন : আলে ইমরান ৩ : ৭২-৭৩)

যে কোনো ইরতিদাদ সাধারণ কুফর থেকে ভয়াবহ। সাধারণ কুফর তো সত্য দ্বীন থেকে বিমুখ থাকা বা গ্রহণ না করা, কিন্তু ইরতিদাদ নিছক বিমুখতাই নয়, এ হচ্ছে বিরুদ্ধতা। সত্য দ্বীন গ্রহণ করার পর তা বর্জনের অর্থ ঐ দ্বীনকে অভিযুক্ত করা, যা নির্জলা অপবাদ। বরং ইরতিদাদ তো সত্য দ্বীনের প্রতি বিরুদ্ধতার পাশাপাশি ‘ইফসাদ ফিল আরদ’ (ভূপৃষ্ঠে দুস্কৃতি) ও বটে। বিশেষত মুরতাদ (সত্য দ্বীন ত্যাগকারী) যখন কটাক্ষ-কটূক্তি এবং অবজ্ঞা বিদ্রূপে লিপ্ত হয়। এ তো সরাসরি ‘মুহারিব’ (যুদ্ধঘোষণাকারী) ও ‘মুফসিদ ফিল আর্দ’ (ভূপৃষ্ঠে দুস্কৃতিকারী)

মুরতাদ সম্পর্কে কুরআন কারীমের আসমানী হুঁশিয়ারি পাঠ করুন :

إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آَمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبِيلًا l بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا l الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا

যারা ঈমান আনে ও পরে কুফরী করে এবং আবার ঈমান আনে, আবার কুফরী করে, অতঃপর তাদের কুফরী প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোনো পথে পরিচালিত করবেন না। * মুনাফিকদেরকে শুভসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে! *মুমিনগণের পরিবর্তে যারা কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারা কি ওদের নিকট ইযযত চায়? সমস্ত ইযযত তো আল্লাহরই।-আন নিসা ৪ : ১৩৭-১৩৯

كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ l أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ أَنَّ عَلَيْهِمْ لَعْنَةَ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ l خَالِدِينَ فِيهَا لَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْظَرُونَ l إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ

আল্লাহ কিরূপে সৎপথে পরিচালিত করবেন সেই সম্প্রদায়কে, যারা ঈমান আনার পর ও রাসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেওয়ার পর এবং তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পর কুফরী করে? আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না, *এরাই তারা যাদের কর্মফল এই যে, তাদের উপর আল্লাহর, ফিরিশতাগণের এবং মানুষসকলের লানত, * তারা তাতে স্থায়ী হবে। তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না; * তবে এর পর যারা তওবা করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় তারা ব্যতিরেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-সূরা আলে ইমরান ৩ : ৮৬-৮৯

কিন্তু যারা সারা জীবন কুফরের উপর থাকে আর মৃত্যু উপস্থিত হলে তওবা করে তাদের তওবা কবুল হয় না।

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَنْ تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الضَّالُّونَ

ঈমান আনার পর যারা কুফরী করে এবং যাদের সত্য প্রত্যাখ্যান-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে তাদের তওবা কখনো কবুল হবে না। এরাই পথভ্রষ্ট।-আলে ইমরান ৩ : ৯০

আরো ইরশাদ হয়েছে-

وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآَنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

তওবা কবুলের বিষয়টি তাদের জন্য নয়, যারা অসৎকর্ম করতে থাকে। পরিশেষে তাদের কারও যখন মৃত্যুক্ষণ এসে পড়ে, তখন বলে, এখন আমি তওবা করলাম এবং তাদের জন্যও নয়, যারা কুফর অবস্থায়ই মারা যায়। এরূপ লোকদের জন্য তো আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্ত্তত করে রেখেছি।-সূরা নিসা (৪) : ১৮

আর এই প্রশ্ন যে, দুনিয়াতে মুরতাদের শাস্তি কী, এর জবাব তো সুস্পষ্টই। মুরতাদ যেহেতু আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধ ঘোষণাকারী ও ভূপৃষ্ঠে অনাচার বিস্তারকারী এজন্য তার শাস্তি মৃতুদন্ড, যা কার্যকর করা সরকারের উপর ফরয।

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآَخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ l إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করে বেড়ায় এটাই তাদের শাস্তি যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শুলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়াতে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। * তবে, তোমাদের আয়ত্তাধীনে আসার পূর্বে যারা তাওবা করবে তাদের জন্য নয়। সুতরাং জেনে রাখ যে, আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-আল মাইদা ৫ : ৩৩-৩৪

আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

من بدل دينه فاقتلوه

অর্থাৎ, যে তার ধর্ম (ইসলাম) পরিবর্তন করে তাকে হত্যা কর।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬৯২২

অন্য হাদীসে আছে, একবার মুয়ায রা. আবু মূসা আশআরী রা.-এর সাথে সাক্ষাত করতে এলেন, (তাঁরা উভয়ে ঐ সময় ইয়ামানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে দায়িত্বশীল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন) মুয়ায রা. দেখলেন, এক লোককে তার কাছে বেঁধে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? আবু মূসা আশআরী রা. বললেন, এ লোক ইহুদী ছিল, ইসলাম গ্রহণ করেছিল, আবার ইহুদী হয়ে গেছে। আপনি বসুন। মুয়ায রা. বললেন, একে হত্যা করার আগ পর্যন্ত আমি বসব না। এটিই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালা। তিনি একথা তিনবার বললেন। সেমতে ঐ মুরতাদকে হত্যা করা হল।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬৯২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৭৩৩

বিশেষত যে নাস্তিক বা মুরতাদ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কটূক্তি করে কিংবা ইসলামের নিদর্শনের অবমাননা করে সে তো সরাসরি ‘মুফসিদ ফিল আরদ’’ (ভূপৃষ্ঠে দুষ্কৃতিকারী)। এ ব্যক্তি রাসূল অবমাননাকারী হিসেবেও ‘‘ওয়াজিবুল কতল’’ (অপরিহার্যভাবে হত্যাযোগ্য) এবং দুষ্কৃতিকারী হিসেবেও।

একারণে প্রত্যেক মুসলিম জনপদের দায়িত্বশীলদের উপর ফরয, উপরোক্ত দন্ড কার্যকর করে নিজেদের ঈমানের পরিচয় দেয়া। যেখানে এ আইন নেই তাদের কর্তব্য, অবিলম্বে এই আইন প্রণয়ন করে তা কার্যকর করা, যদি তারা আখিরাতের কল্যাণ চান।

তারা যদি এই সৎসাহস করেন তবে তা তাদের ‘মসনদে’র জন্যও উত্তম। নতুবা মনে রাখতে হবে, যাদের নারাজির ভয়ে তারা এইসব দন্ড কার্যকর করা থেকে বিমুখতা প্রদর্শন করছেন তারা না তাদের মসনদ রক্ষা করতে পারবেন, না আখিরাতের কঠিন পাকড়াও থেকে মুক্ত করতে পারবে, আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়া তো অনিবার্য-ই।
(চলমান)

05/01/2021

--------------------ঈমান -------------------
(৩য় পর্ব)
৯. ঈমান একটি একক, এতে বিভাজনের অবকাশ নেইঃ

এটি ঈমান-সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা পুরোপুরি স্পষ্ট ও স্বীকৃত হওয়ার পরও অনেককে উদাসীনতা প্রদর্শন করতে দেখা যায়। ঈমান সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ইসলামের সকল অকাট্য বিধান ও বিশ্বাসকে সত্য মনে করা এবং কবুল করা অপরিহার্য। এর কোনো একটিকে অস্বীকার করা বা কোনো একটির উপর আপত্তি তোলাও ঈমান বরবাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যেমন অজু হওয়ার জন্য অজুর সবগুলো ফরয পালন করা জরুরি, কিন্তু তা ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য অজুভঙ্গের সবগুলো কারণ উপস্থিত হওয়া জরুরি নয়। যে কোনো একটি কারণ দ্বারাই অজু ভেঙ্গে যায়। তদ্রূপ ঈমান তখনই অস্তিত্ব লাভ করে যখন ইসলামের সকল অকাট্য বিধান ও বিশ্বাস মন থেকে কবুল করা হয়। পক্ষান্তরে এসবের কোনো একটিকেও অস্বীকার করার দ্বারা ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।

আর অবজ্ঞা ও বিদ্রূপ তো এতই ভয়াবহ যে, তা শরয়ী দলীলে প্রমাণিত ছোট কোনো বিষয়ে প্রকাশিত হলেও সাথে সাথে ঐ ব্যক্তির ঈমান শেষ হয়ে যাবে এবং তার উপর কুফরের বিধান আরোপিত হবে।

আকাইদ ও আহকামের বিদ্রূপ কিংবা অস্বীকার তো এজন্যই কুফর যে, তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য বর্জন এবং তাঁদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ। সুতরাং গোটা ইসলামকে অস্বীকার বা বিদ্রূপ করা আর ইসলামের কোনো একটি বিষয়কে অস্বীকার বা বিদ্রূপ করা একই কথা! উভয় ক্ষেত্রে একথা
বাস্তব যে, ঐ ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং ঔদ্ধত্য ও বিরুদ্ধতা প্রকাশ করেছে। ইবলীস তো কাফির মরদূদ হয়েছিল একটি হুকুমের উপর আপত্তি করেই। বিষয়টি এমনিতেও স্পষ্ট। এরপরও আল্লাহ তাআলা কুরআন হাকীমে একাধিক জায়গায় তা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন।

أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান কর? সুতরাং তোমাদের যারা এরকম করে, তাদের একমাত্র পরিণাম পার্থিব জীবনে হীনতা এবং কেয়ামতের দিন তারা কাঠিন শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে, তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর নন।-আল বাকারা ২ : ৮৫

আরো ইরশাদ হয়েছে-

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا l أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا l وَالَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُولَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا

যারা আল্লাহ ও তার রাসূলগণকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় ও বলে, আমরা কতক (রাসূল)-এর প্রতি তো ঈমান রাখি এবং কতককে অস্বীকার করি। আর (এভাবে) তারা (কুফর ও ঈমানের মাঝখানে) মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করতে চায়।

এরূপ লোকই সত্যিকারের কাফির। আর আমি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্ত্তত করে রেখেছি।

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তাদের কারও মধ্যে কোনও পার্থক্য করবে না, আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মফল দান করবেন।

আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-সূরা নিসা ৪ : ১৫০-১৫২

যারা শরীয়তের শুধু ‘শান্তির বিধান গ্রহণ করেন আর জিহাদের বিধানকে সন্ত্রাস বা উগ্রবাদিতা বলেন; উপদেশের কথাগুলো গ্রহণ করেন আর হদ-তাযীর ও কিসাসের বিধান বর্জনীয় মনে করেন; ইবাদতের বিষয়গুলো গ্রহণ করেন, আর লেনদেন ও হালাল-হারামের বিধান মানতে অসম্মত থাকেন; ব্যক্তিগত জীবনের বিধিবিধান গ্রহণ করেন, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র-পরিচালনার বিধি-বিধান (প্রশাসন, নির্বাহী ও বিচার-বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট) সম্পর্কে বিরূপ থাকেন; অথবা ইবাদত ও লেনদেনের বিধান মানেন, কিন্তু বেশ-ভূষা, আনন্দ-বিষাদ, পর্ব-উৎসব ও জীবন যাপনের আদব কায়েদার ইসলামী নির্দেশ ও নির্দেশনার প্রতি বিরূপ থাকেন বা মানাকে জরুরি মনে করেন না এরা সবাই ইসলামের কিছু অংশের অস্বীকার বা কিছু অংশের উপর বিরুদ্ধপ্রশ্নের কারণে নিজের ঈমান হারিয়ে বসেছেন। তাদের ঈমান মূলত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর নয়; নিজ পসন্দ-অপসন্দের উপর কিংবা নেতা ও গুরুর পছন্দ-অপছন্দের উপর। নতুবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান তো এইটাও এবং ঐটাও। এরপরও এই দ্বিমুখিতা কেন? আল্লাহর আদেশ তো এই-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ

হে মুমিনগণ! তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।-আল বাকারা ২ : ২০৮

ভালোভাবে বুঝে নিন, শরীয়তের বিধি বিধানকে হক ও অবশ্যপালনীয় বলে স্বীকার করার পর পালনে ত্রুটি হলে তা গোনাহ, কুফর নয়। কারণ এই ব্যক্তি নিজেকে অপরাধী মনে করে। পক্ষান্তরে বিধানের উপর বিরুদ্ধপ্রশ্ন বা প্রতিবাদের অর্থ সরাসরি আনুগত্য-ত্যাগ, যা সাধারণ অপরাধ নয়, বিদ্রোহ। এটা মানুষকে দুনিয়ার বিধানে ‘মোবাহুদ দম’ (হত্যাযোগ্য) আর আখিরাতের বিধানে চিরজাহান্নামী সাব্যস্ত করে।

১০. ঈমানী আকাইদ ও আহকাম স্পষ্টভাবে ঘোষিত ও গোটা উম্মাহর দ্বারা প্রজন্ম পরম্পরায় প্রবাহিত, এতে বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা অস্বীকারেরই এক প্রকার

ঈমানী আকাইদ ও আহকাম অস্বীকার করা, অবজ্ঞা ও বিদ্রূপ করা এবং বিরুদ্ধ প্রশ্নের লক্ষ্যবস্ত্ত বানানো যেমন কুফর তেমনি এগুলোর কোনো একটিরও এমন কোনো ‘ব্যাখ্যা’ করাও সরাসরি কুফর, যার দ্বারা তার প্রতিষ্ঠিত অর্থই বদলে যায়। কোনো কিছুর অপব্যাখ্যা ও অর্থের বিকৃতি হচ্ছে ঐ বিষয়টি অস্বীকারের ভয়াবহতম প্রকার। ঈমানের বিষয়গুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত অর্থেই ঈমান আনতে হবে। নিজের পক্ষ হতে সেগুলোর কোনো অর্থ নির্ধারণ করে, কিংবা কোনো বেদ্বীনের নবউদ্ভাবিত অর্থ গ্রহণ করে ঈমানের দাবি করা সম্পূর্ণ অর্থহীন ও সুস্পষ্ট মুনাফেকী।

‘ব্যাখ্যা’ তো ঐখানে হয় যেখানে ভাষার বাকরীতি ও মর্মোদ্ধারের নীতিমালা অনুযায়ী একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু যেখানে কোনো বিধান বা বিশ্বাসের অর্থ ও মর্ম আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে অসংখ্য মুমিনের সুসংহত সূত্রে প্রজন্ম পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে আসে এবং যাতে প্রতি যুগে মুসলিম উম্মাহর ইজমা ও ঐকমত্য বিদ্যমান থাকে সেখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার অবকাশ থাকে কীভাবে? সেখানে তো ঐ অর্থই নিশ্চিত ও নির্ধারিত। ওখানে ভিন্ন ‘ব্যাখ্যার’ অর্থ ঐ অকাট্য ও প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে অস্বীকার করা।

যেমন কেউ বলল, ‘নামায সত্য, কিন্তু তা পাঁচ ওয়াক্ত নয়, দুই ওয়াক্ত।’ কিংবা বলল, ‘নামায সত্য, কিন্তু আসল নামায তা নয়, যা মুসল্লিগণ মসজিদে আদায় করেন, আসল নামায তো মনের নামায, যে তা আদায় করতে পারে তার দেহের নামাযের প্রয়োজন নেই।’ (নাউযুবিল্লাহ)

কিংবা বলল, ‘শরীয়ত সত্য, কিন্তু তা আম বা সাধারণ মানুষের জন্য, খাস বা বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আছে আলাদা শরীয়ত।’ (নাউযুবিল্লাহ)

কিংবা বলল, ‘শরীয়ত তো প্রাচীন যুগের ব্যাপার, আজকের উন্নতির যুগে এর সংস্কার প্রয়োজন।’ (নাউযুবিল্লাহ)

কিংবা বলল, ‘‘শরীয়ত মানা একটি ঐচ্ছিক ব্যাপার। মানলে ভালো, না মানলেও দোষ নেই।’ (নাউযুবিল্লাহ)

কিংবা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মতো বলল, ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল ও খাতামুন্নাবিয়্যীন। তবে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীও নবী, তিনি জিল্লী বা বুরুজী নবী। এর দ্বারা খতমে নবুওতের আকীদায় কোনো ধাক্কা লাগে না।’ (নাউযুবিল্লাহ)

তো এইসব কুফরী ‘ব্যাখ্যা’ এবং এজাতীয় আরো অসংখ্য ‘ব্যাখ্যা’, যার আবরণে বেদ্বীন-মুলহিদ চক্র ‘জরুরিয়াতে দ্বীন’ (দ্বীনের সর্বজনবিদিত বিষয়) ও ‘কাওয়াতিউল ইসলাম’ (ইসলামের অকাট্য বিষয়াদি)-এর অস্বীকার করে এবং সেই কুফরীকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা করে, এর দ্বারা তো তাদের কুফরী আরো ভয়াবহ হয়ে যায়। ‘অস্বীকারে’র সাথে ‘অপব্যাখ্যা’ যুক্ত করে নিজেদেরকে সাধারণ কাফিরের চেয়েও মারাত্মক প্রকারের কাফির- মুলহিদ, যিন্দীক ও মুনাফিকের সাড়িতে অন্তর্ভুক্ত করে।

আল্লাহ তাআলার এই হুঁশিয়ারি এদের সকলের মনে রাখা উচিৎ-

إِنَّ الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي آَيَاتِنَا لَا يَخْفَوْنَ عَلَيْنَا أَفَمَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ خَيْرٌ أَمْ مَنْ يَأْتِي آَمِنًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

যারা আমার আয়াতসমূহকে বিকৃত করে তারা আমার অগোচরে নয়, শ্রেষ্ঠ কে-যে ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে সে, না যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে থাকবে সে? তোমাদের যা ইচ্ছা কর; তোমরা যা কর তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা।-হা-মীম আসসাজদা ৪১ : ৪০

দ্বীনকে অপব্যাখ্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলা ‘সাবীলুল মুমিনীন’কে মানদন্ড বানিয়েছেন। এবং ‘সাবীলুল মুমিনীন’ (মুমিনের সর্বসম্মত পথ) থেকে বিচ্যুতিকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধতার মতো জাহান্নামে যাওয়ার কারণ সাব্যস্ত করেছেন। এ কারণে কোনো ইসলামী আকীদা বা হুকুমের (বিশ্বাস বা বিধানের) এমন সকল ‘ব্যাখ্যা’র গন্তব্য জাহান্নাম, যা উম্মাহর সর্বসম্মত ‘ব্যাখ্যার’ বিরোধী।

وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

* কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকেই সে ফিরে যায়, সে দিকেই তাকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর তা কত মন্দ আবাস!-আন নিসা ৪ : ১১৫

আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে একথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুনাফিকদের কাছে আল্লাহ তাআলার এই মানদন্ড পছন্দনীয় নয়। তারা ঈমানের দাবি করে, কিন্তু মুমিনদের মতো ইমান আনে না, নিজেদের মনমতো ঈমান আনে। এরা মুমিনদের মনে করে বুদ্ধিহীন। আজও আমরা একই প্রবণতা লক্ষ করছি-

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آَمِنُوا كَمَا آَمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آَمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَكِنْ لَا يَعْلَمُونَ l وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آَمَنُوا قَالُوا آَمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ l اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ l أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى فَمَا رَبِحَتْ تِجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ

যখন তাদেরকে বলা হয়, যে সকল লোক ঈমান এনেছে তোমরাও তাদের মত ঈমান আনয়ন কর, তারা বলে, নির্বোধগণ যেরূপ ঈমান এনেছে আমরাও কি সেরূপ ঈমান আনব? জেনে রাখ, এরাই নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না। * যখন তারা মুমিনগণের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন নিভৃতে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি। আমরা শুধু তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করে থাকি। * আল্লাহ তাদের সাথে তামাশা করেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দেন। * এরাই হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রান্তি ক্রয় করে। সুতরাং তাদের ব্যবসা লাভজনক হয়নি, তারা সৎপথেও পরিচালিত নয়।-আল বাকারা ২ : ১৩-১৬

সুতরাং হেদায়াত এদের কাছে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে তাদেরই কাছে যাদের এরা ‘বুদ্ধিহীন’ বলে।
(চলমান)..........

Want your school to be the top-listed School/college in Chittagong?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Chittagong