05/12/2025
এমন মা-বাবা হারিয়ে যাচ্ছে আজ...
গভীর রাত। নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ বাড়ির সবচেয়ে আদুরের একমাত্র ৩ বছরের ছোট্ট সোনামণির একটা দুর্বল গোঙানির শব্দ। ঘুম ভাঙল বাবা-মায়ের। চোখ কচলে পাশে তাকালেন।
মা কপালে হাত রাখতেই যেন বিদ্যুৎ চমকালো। ছোট্ট সোনামণির শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপা হলো। প্রায় ১০২ ডিগ্রি! চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে গেল মা-বাবার।
কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো বাচ্চার চিৎকার। এমন চিৎকার যে পুরো বাড়ি জেগে উঠলো।
অবস্থা দেখে কেউ ছুটছে জলপট্টির জন্য, কেউ সাপোজিটরি খুঁজছে, কেউ নাপা সিরাপের বোতল হাতে নিয়ে দিশেহারা আর কেউবা ফোনে ডাক্তারের সন্ধান করছে। চারদিকে হৈচৈ, অস্থিরতা, উদ্বেগ আর আতঙ্কের ছোটাছুটি।
কিন্তু মা? মা তখনও শান্ত।
শান্তভাবে বাচ্চাকে কোলে তুলে নিলেন। আস্তে আস্তে পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন। আর মুখে? মুখে অবিরাম শেফা সংক্রান্ত দু'আগুলো পড়ে যাচ্ছেন।
"আসআলুল্লা-হাল ‘আযীম, রাব্বাল ‘আরশিল ‘আযীম আন ইয়াশফিইয়াক..."
সবাই মিলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মা? তিনি তখনও শান্তভাবে জ্বর কমানোর ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যস্ত। মুখে দু'আর জপ অব্যাহত।
কিছুক্ষণ পরও জ্বর না কমায় মা বাচ্চাকে বাবার কোলে দিলেন। গেলেন অযু করতে। ফিরে এসে দুই রাকাত সলাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। সিজদায় গেলেন। সেই সিজদায় মাথা রেখে কাঁদলেন। সবটুকু কথা, সবটুকু আকুতি উজাড় করে দিলেন তাঁকে, যিনি সব শোনেন, যিনি সব দেখেন, যিনি একমাত্র শিফা দানকারী।
সলাত শেষে এসে কিছু টাকা সদাকা করে ছোট্ট করে আবারো রুকইয়াহ করে দিলেন সোনামণিকে। তারপর ফোনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মেডিসিন দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি শান্ত হতে শুরু করলো। জ্বরও নামতে লাগলো।
এবার একটা রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হই। আমাদের সমাজের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানের কোন বিপদ বা অসুস্থ হলে আমরা কী করি?
পেরেশান হয়ে যাই। ভয়ে অস্থির হয়ে যাই। এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করি। বাচ্চার অস্বস্তিতে নিজেরাও বিরক্ত হয়ে উঠি। হাসপাতালে দৌড়াই।
কিন্তু জানেন কি, আমাদের প্রথম পদক্ষেপটা কী হওয়া উচিত ছিল? যে কাজটা সবার আগে করা দরকার, সেটাই আমরা বেমালুম ভুলে যাই!
সেটা হলো রবের কাছে ফিরে যাওয়া।
দুই রাকাত সলাত পড়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে সাহায্য চাওয়া। সিজদায় পড়ে তাঁর কাছে বলা, যিনি একমাত্র শিফা দানকারী।
হ্যাঁ, ডাক্তার দেখাবেন। মেডিসিন দেবেন। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেবেন। ইসলাম কখনো দুনিয়ার এই মাধ্যমগুলো নিতে নিষেধ করেনি।
কিন্তু সবার আগে রবের কাছে যান। কারণ তিনিই তো বলেছেন,"আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে।....." (সূরা বাকারাহ: ১৮৬)
আসুন, আমরা এমন মা হই। এমন বাবা হই।
যারা সবার আগে, যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো বিপদে সবার আগে মহান রবের দিকেই ফিরে যান।
আপনারা ভাবছেন, এতে কী লাভ?
লাভ শুধু আপনার একার নয়। ডাবল লাভ!
১. আপনার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক মজবুত হবে।
২. সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনার সন্তানও শিখবে!
যখন সে অসুস্থ হবে, কোনো বিপদে পড়বে, তখন সে সবার আগে কার কাছে যাবে? ইন শা আল্লাহ, সে তার রবের কাছেই যাবে।
কারণ, বাচ্চাকে শুধুমাত্র কথা দিয়ে দ্বীন শেখানো যায় না, জীবন দিয়ে শেখাতে হয়! আপনার প্রতিটি কাজ, আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া, এগুলোই তো আপনার সন্তানের জীবনের প্রথম ইসলাম শিক্ষা কেন্দ্র।
তাই আসুন, এমন মা-বাবা হই, যারা হারিয়ে যায়নি। যারা আজও জানে, বিপদে সবার আগে কার দরজায় কড়া নাড়তে হয়।
#প্যারেন্টিং #সন্তান