20/04/2020
#করোনাকাল : গ্রোথ অব ইকোনোমি ভারসাস গ্রোথ অব স্পিরিটুয়ালিটি
১। গ্রোথ তত্ত্ব পাল্টে যাচ্ছে । শত বছর ধরে গড়ে ওঠা ইকোনোমিক গ্রোথ তত্ত্ব পাল্টাতে সময় লাগবে, বড় জোর ছয় মাস । তিন মাস পার হয়ে গেছে । তিন মাস বাকী আছে ।
২। কর্পারেটরা বলেন, ট্রাস্ট তৈরি করতে সময় লাগে । যুগের পর যুগ । যে ব্রান্ড যত পুরানো, সে ব্র্যান্ডের তত ট্রাষ্ট । এ ট্রাস্ট ভাঙতে সময় লাগেনা । এখন দেখা যাচ্ছে- ন্যাচারাল সাইন্স ছাড়া সোশ্যাল সাইন্সের থিউরিগুলো ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে । ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে কাঁচের বাটির মত ।
৩। গ্রোথ তত্ত্ব গড়ে ওঠেছে ভোগবাদের উপর ভিত্তি করে । অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা নিশ্চিত করতে মানুষের বেশি সম্পদ লাগেনা । ভোগ করতে লাগে । ইগোকে পুষ্ট করতে লাগে । ভোগ আর ইগোর পুষ্টি ; এর উপর গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক তত্ত্ব ‘ গ্রোথ থিউরি ‘ ।
৪। পৃথিবীর বড় অর্থনীতি গুলোর দিকে তাঁকান । জিডিপির ১-৩ ভাগ মাত্র কৃষি ; ১৭-২০ ভাগ শিল্প ; ৭৬-৮০ ভাগ সেবা বা সার্ভিসেস । ৭৬-৮০ ভাগ সেবায় স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা সেবা বড়জোর দশ ভাগ । পরিবহন সংশ্লিষ্ট সেবা হতে পারে আরও দশভাগ । বাকি সব সেবা ভোগ কিংবা ইগোর পুষ্টি ।
৫। কয়েকটি উদাহরণ দেই । বিশ বছর আগেও আমরা টয়লেট টিস্যু ব্যবহার করি নাই। দশ বছর আগে ব্যবহার করতাম রুমাল- ফেসিয়াল টিস্যু নয় । এখন চিন্তা করুন- টিস্যু শিল্পে কত বিনিয়োগ, কত শ্রম, কত গ্রোথ । । ঢাকার আশেপাশের রিসোর্টগুলোর কথা চিন্তা করুন । এতে কত বিনিয়োগ, কত শ্রম, কত প্রবৃদ্ধি । একরাত থেকে স্যুইমিং পুলে একটি সেলফি দিলেন, বিশ হাজার টাকা খরচ । ইগো পুষ্ট হলো ।
৬। স্মার্ট ফোন শিল্প এবং বিপণণে গ্রোথ চিন্তা করুন । ক্যামেরার পরিবর্তন আর মডেল পরিবর্তন । গ্রোথের প্রয়োজনে আবিস্কার, শ্রম । মোবাইলের মডেল পাল্টালেন- ইগো পুষ্ট হলো । গ্রোথের প্রয়োজনে আবিস্কার, শ্রম । এভিয়েশন সেক্টরের গ্রোথ চিন্তা করুন । আমাদের পররাষট্রমন্ত্রী যতবার বিদেশ গিয়েছেন, পাড়ার কলিম সাহেব তার চেয়ে কম যান নাই । এ রকম কোটি কলিম সাহেবেদের বিদেশ যাত্রার যোগান দিতে পৃথিবীর উদর ক্রমশ: শুন্য হয়ে যাচ্ছে । লক্ষ কোটি বছর ধরে পৃথিবীর উদরে জমা করা তেল, গ্যাস- গ্রোথের যোগান দিতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ।
৭। ভোগবাদ, ইগোর পুষ্টিতে সুড়সুড়ি আছে । সুড়সুড়ি দু’রকম । যন্ত্রে এবং মস্তিষ্কে । যন্ত্রে সুড়সুড়ি দিয়ে পাপিয়াদের গ্রোথ হয় । তাই, বিশ্বব্যাপী পর্নোর গ্রোথ অকল্পনীয় । মস্তিষ্কে সুড়সুড়ি দিয়ে বিনোদন সেক্টরের গ্রোথ হয় । প্রাচীন সম্রাটরা মস্তিষ্কে সুড়সুড়ি নেয়ার জন্য পাশা খেলতেন । আমরা এখন চ্যানেল পাল্টাই । বিনোদন সেক্টরের গ্রোথ নিয়ে সারা বিশ্ব উত্তাল অথচ স্বাস্থ্য , শিক্ষা, গবেষণায় তার ছিঁটে ফোঁটা নেই । নায়ক- নায়িকা, গায়িকা কিংবা খেলোয়াড় বিনোদন এবং ভোগের জগতের যোগসূত্র তৈরি করছেন । বিজ্ঞানীরা এখন মরিয়া হয়ে চিৎকার করছেন- টিকার জন্য মেসি – রোনালদোর কাছে যান । আমাদের বেতন মাত্র ১৮০০ ইউরো । আমরা আর কত পারি ।
৮। এর বিপরীত চিত্রও আছে । মাও সেতুং এর আমল থেকে চীনে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার । বঙ্গবন্ধু পঞ্চাশের দশকে দু’বার চীন গিয়েছেন । ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইতে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতার অসাধারণ দার্শনিক বর্ণনা আছে । চীনের মৌলিক দর্শন এখনও আগের মতই আছে । ইউরোপ- আমেরিকায় সুড়সুড়িতে বিনিয়োগ অনেক বেশি অথচ চীন, মালয়েশিয়া, কিউবা, ইরানে পর্ণোগ্রাফি দেখার সুযোগও নেই । বিনোদনের হাজার চ্যানেল নিয়ে পাগলামি নেই । স্বাস্থ্য, শিক্ষায়- এদের অগ্রাধিকার সবচেয়ে বেশি ।
৯। করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে গ্রোথ তত্ত্ব পাল্টে যেতে পারে । ঝড় উঠলে যেমন দীঘির ‘ বাবল- বুদবুদ’ থাকেনা ; তেমনি বাবল ইকোনমি বিদায় নিয়ে একটি প্রসাধনবিহীন ম্যাটম্যাটে চেহারার অর্থনীতি ভেসে উঠবে । কালো মেয়েকে কালোই দেখাবে । দাঁত উঁচু থাকলে, উঁচুই । খানাখন্দে ভরা পৃথিবীকে নতুনভাবে জানতে হবে ।
১০। সমাস্যা হলো, ইকোনোমিক গ্রোথ না হলে পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি লোকের কর্মসংস্থানের কি হবে ? কর্মসংস্থান সেখানেই হবে, যেখানে আপনি বুদ্ধিমান, প্রাজ্ঞ বিনিয়োগ করবেন । সুড়সুড়ির বিনিয়োগ সহজ, কিন্তু প্রাজ্ঞ নয় । বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে আরও কত বিনিয়োগের দরকার ছিল, তা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে । শিক্ষায়, পুষ্টিতে বিনিয়োগের অন্তহীন সুযোগ আছে । তাই গ্রোথ তৈরি করতে হবে, শিক্ষায়- স্বাস্থ্যে, পুষ্টিতে । শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে কর্মসংস্থানের বেশি বেশি সুযোগ তৈরি করতে হবে ।
১১। পুরানো গল্পটা এখানেও প্রাসঙ্গিক । সৃষ্টিকর্তা মানুষের অপারেটিং সিস্টেমটা বানিয়ে তিনভাগে ভাগ করলেন । প্রথমভাগে, মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে প্রাণীর টিকে থাকার ‘ survival spirit’ দিলেন । এতে পড়ল ক্ষুধা, কাম, ফ্লাইট অর ফাইট রেসপন্স এসব । দ্বিতীয় ভাগে, মানবকুলকে পরীক্ষার জন্য ‘ ego spirit’ দিয়ে দিলেন । এতে পড়ল, ইগো, ভোগ, ক্ষমতা, সম্পদের লোভ । তৃতীয় ভাগ ‘ spirituality spirit’ । একে স্পিরিটুয়ালিটি, ক্ষমা, দানশীলতা, দায়িত্ব, মহত্ব দিয়ে সাজালেন ।
১২। তারপর, এ তিনভাগের মধ্যে ব্যালেন্স করার ব্যবস্থা করলেন । প্রথমটার ( ক্ষুধা-কাম) গ্রোথ বাড়লে, তৃতীয়টার ( স্পিরিচুয়ালিটি) গ্রোথ কমবে । দ্বিতীয়টার ( ইগো-ভোগ- লোভ-ক্ষমতা) গ্রোথ বাড়লে, প্রথমটারও ( ক্ষুধা-কাম) গ্রোথ বাড়বে । তৃতীয়টার গ্রোথ বাড়লে, প্রথম, দ্বিতীয় দু’টোর গ্রোথ নিয়ন্ত্রণে থাকবে ।
১৩। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বনেতারা দ্বিতীয়টার গ্রোথ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন । সাথে প্রথমটাও দ্রুত বাড়ছে । তৃতীয়টা দ্রুত কমছে । এ স্কেলে মানবজাতির গড় ‘কিউ’ কোনদিকে সেটা বের করার ব্যবস্থা থাকলে আমার ধারণা সেটা দুই এর নীচেই থাকবে ।
১৪। এ কারণে, লিডারশিপ সাইন্সের বিজ্ঞানীরা আইকিউ ( বুদ্ধিমত্তা) , ইকিউ ( Emotional Quotient- আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা) এর পাশাপাশি নতুন একটা কিউ নিয়ে দীর্ঘদিন ভাবছেন । এটাকে বলা হচ্ছে এসকিউ ( Spiritual Quotient) । তাঁরা বলছেন, সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ করতে গেলে লিডারশিপের এবং জনগণের ‘এসকিউ’ বাড়াতে হবে ।
১৫। নতুন ধারার অর্থনীতিবিদগণ গ্রোথের বিজ্ঞান নিয়ে ভাবছেন । গ্রোথকে কতটা সাধারণ মানুষের উপকারে আনা যায়, সুখ ( হ্যাপিনেস ইনডেক্স) বাড়ানো যায় , সে চেষ্টাও চলছে । জোসেফ স্টিগলিজ সহ নোবেল বিজয়ী অনেক অর্থনীতিবিদ – এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন । করোনা তাঁদের জন্য একটা সুযোগ এনে দিয়েছে । উৎসাহীদের জন্য তাঁদের একটা বইয়ের নাম দেই ( for good measure: an agenda for moving beyond GDP) । নেট থেকে ডাউনলোড করে পড়তে পারেন ।
১৬। করোনা পরবর্তী পৃথিবীর কি বড় পরিবর্তন আসবে ? অনেক বিশ্বনেতার মনোজগত পাল্টে যেতে পারে । অনেকের যাবেনা । ( ট্রাম্প করোনা নিয়ে আপসেট না- নির্বাচনী প্রচারণা হচ্ছেনা এ নিয়েই আপসেট । লক আউট তুলে দেয়ার চেষ্টা করছেন বারবার ) । তবে, মানবজাতির এসকিউ ‘Spiritual Quotient’ কিছু হলেও বাড়বে- এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ।
সংগ্রহ : মঞ্জুর সাদেক
চুয়েট শিক্ষার্থী