29/07/2025
ছাতক ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য: এক গৌরবময় পথচলা
সিলেট বিভাগের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ ছাতক—ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক এলাকা। শিক্ষা বিস্তারে এই অঞ্চলে বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তবে ছাতক ডিগ্রি কলেজ একটি ব্যতিক্রমী নাম। অর্ধশতাব্ধীকাল ধরে শিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠানটি ছাতকসহ গোটা সুনামগঞ্জ জেলায় আলোর বাতি হিসেবে কাজ করছে। এটি শুধু একটি কলেজ নয়, বরং একটি আদর্শ, একটি আন্দোলন, একটি গর্বের নাম।
প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের এক বছরের মাথায়, ১৯৭২ সালের ৫ই আগস্ট ছাতক ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ছাতক হাইস্কুলের প্রাঙ্গণে। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে ছাতকের কিছু গুণী ও শিক্ষানুরাগী মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
সাবেক গণপরিষদ সদস্য জনাব সামছু মিয়া চৌধুরী
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব সুজন মিয়া চৌধুরী,
দানবীর হাজী আকল মিয়া,
এবং জমি দানকারী হিসেবে ছিলেন জনাব সামছু মিয়া চৌধুরী, জনাব সুজন মিয়া চৌধুরী, হাজী যোয়াদ উল্লা, জনাব জমিরুল ইসলাম ও হাজী ওয়াহিদ মিয়া ও অন্যান্য।
এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন জনাব মোঃ মিরাজ উদ্দিন, যিনি তৎকালীন ছাতক হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী ও শিক্ষানুরাগী মানুষ। তাঁরই নেতৃত্বে ও ঐকান্তিক চেষ্টায় ছাতকে গড়ে ওঠে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠাকালীন চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা
সেই সময় ছাতক উপজেলায় উচ্চশিক্ষার কোনো সুব্যবস্থা ছিল না। ছাত্রছাত্রীদের সিলেট বা সুনামগঞ্জ শহরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো, যা অনেকেই পারতেন না। এই বাস্তবতায় ছাতকে একটি ডিগ্রি কলেজ স্থাপনের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়। আর সেই চাহিদারই ফল ছিল এই কলেজের জন্ম।
শিক্ষাগত অগ্রগতি ও বিভাগ সম্প্রসারণ
প্রথম দিকে কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পাঠদান শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং মানোন্নয়ন ঘটে।
১৯৮৬ সালে চালু হয় স্নাতক (পাস) কোর্স, যা কলেজটির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
২০১৪ সালে চালু হয় অনার্স কোর্স। প্রথমে হিসাববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ কিছু বিষয়ে সম্মান শ্রেণির পাঠদান শুরু হয়।
অবশেষে ২০১৮ সালে ছাতক ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণ লাভ করে, যা কলেজটির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সাফল্য।
সরকারিকরণের ফলে শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিভিন্ন সুবিধা বাড়তে থাকে। এতে শিক্ষার গুণগত মান অনেক বেড়ে যায়।
আধুনিক অবকাঠামো ও পরিবেশ
ছাতক ডিগ্রি কলেজের আজকের চেহারা অনেক উন্নত ও আধুনিক। কলেজে রয়েছে—
নিজস্ব একাধিক ভবন,
সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার,
বিজ্ঞানাগার ও আইসিটি ল্যাব,
খেলার মাঠ এবং
মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমসহ ইন্টারনেট সুবিধা।
শিক্ষকদের আন্তরিকতা, ছাত্রছাত্রীদের অধ্যবসায় ও প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কলেজটির একাডেমিক পরিবেশ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
সহশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা
শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কলেজটি শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশেও গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
প্রতি বছর আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি, নাটক, জাতীয় দিবস পালন ইত্যাদি।
ক্রীড়াক্ষেত্রে রয়েছে আন্তঃবিভাগ ফুটবল, ক্রিকেট ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।
এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অবদান
ছাতক ডিগ্রি কলেজ একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। যেমন:
বন্যা ও দুর্যোগকালে ত্রাণ বিতরণ,
করোনাকালে সচেতনতামূলক কাজ,
নিয়মিত রক্তদান কর্মসূচি,
বৃক্ষরোপণ অভিযান,
মাদকবিরোধী প্রচারণা।
এসব কাজ প্রমাণ করে কলেজটির সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ।
গর্বের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা
এই কলেজ থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেকেই দেশ-বিদেশে কৃতিত্বের সাথে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
প্রশাসন, চিকিৎসা, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও ব্যবসা—সবখানেই ছাতক ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গৌরবজনক অবস্থান রয়েছে।
তাঁরা আজ কলেজের সম্মান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।
আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সরকারিকরণের পর কলেজের শিক্ষা, প্রশাসন ও অবকাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আসে।
নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও পাঠ পরিকল্পনা এখন সরকারি মানদণ্ডে পরিচালিত হয়।
২০২৫ সালের ১৪ জুলাই ১৬তম বিসিএস ক্যাডার জনাব প্রফেসর বিমান বিহারী রায় প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করলে কলেজ প্রশাসনে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে।
ভবিষ্যতে কলেজে গবেষণামূলক কার্যক্রম, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার, নতুন অনার্স বিভাগ,হোস্টেল, নতুন একাডেমিক ভবন এবং ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
উপসংহার
ছাতক ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস একটি এলাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিষ্ঠান ছাতকের মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের সফল বাস্তবায়ন।
এটি প্রমাণ করে—সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকলে একটি জনপদে গড়ে ওঠে গৌরবময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আজও ছাতক ডিগ্রি কলেজ ছাতকবাসীর হৃদয়ে একটি ভালোবাসার নাম। আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠান দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজে পরিণত হবে—এই আশা ও দৃঢ় প্রত্যয় আমাদের সকলের।
(ফেইসবুক হতে শ্রদ্ধেয় বেলাল স্যারের টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত লিখা)