25/07/2026
আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল 🤲
মৃত্যুর খুব কাছ থেকে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে নতুন জীবন ফিরে পাওয়া I
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা একজন মানুষকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
কয়েকদিন আগেও আমি হয়তো ভাবিনি, মৃত্যুর এতটা কাছাকাছি গিয়ে আবার নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার হবে।
একেবারে স্বাভাবিক ব্যস্ত জীবনের মাঝেই হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা ও একের পর এক বমি শুরু হয়। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ শারীরিক সমস্যা মনে হলেও খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি হতে থাকে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যে বাস্তবতা সামনে এলো, তা ছিল কল্পনারও বাইরে।
চিকিৎসকরা জানান, আমার পিত্তথলি (Gallbladder) মারাত্মক সংক্রমণের কারণে ফেটে গিয়েছিল (Gallbladder Perforation)। এর ভেতরে প্রচুর পুঁজ (Empyema) জমে গিয়েছিল, বড় বড় পাথর ছিল এবং সংক্রমণের প্রভাব আশপাশের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল।
পুরো পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং আমার জীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকি। তখনই বুঝতে পারলাম, এটি আর সাধারণ গলব্লাডারের সমস্যা নয়; আমি জীবনের এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।
চিকিৎসকরা দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করেন এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখেন। প্রায় একদিন ধরে বিভিন্ন প্রস্তুতি ও চিকিৎসার পর পরদিন আমার অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যেখানে সাধারণভাবে এই ধরনের ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়, সেখানে আমার জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকদের টানা পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় এক অসম লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে অস্ত্রোপচারের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এত কঠিন অবস্থার মধ্যেও তাঁরা পেট না কেটে ল্যাপারোস্কোপিক (দূরবীন) পদ্ধতিতেই সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ সেই অস্ত্রোপচারের পর মনে হয়েছিল, হয়তো সবচেয়ে কঠিন সময়টি পেরিয়ে এসেছি।
কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তটি তখনও বাকি ছিল।
অপারেশনের দিন রাতেই হঠাৎ আমার তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন একেকটি কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। একটি সময় মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবকিছু ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সেই রাতেই আমি নিজের অজান্তেই বারবার কালেমা তাইয়্যিবা পড়ছিলাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো এটাই আমার জীবনের শেষ রাত। আল্লাহর কাছে শুধু একটি প্রার্থনাই ছিল—যদি এটাই শেষ মুহূর্ত হয়, তবে যেন সঠিক ঈমান ও আকীদার সঙ্গে তাঁর কাছে ফিরে যেতে পারি; আর যদি আমার জন্য এখনও কোনো দায়িত্ব বাকি থাকে, তবে যেন তিনি আমাকে আবারও সুস্থ করে মানুষের সেবায় ফিরিয়ে দেন।
সেই কয়েকটি মুহূর্ত আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে—মানুষ কতটা অসহায়, আর জীবন-মৃত্যুর একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ।
আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কত পরিকল্পনাই না করি, অথচ পরবর্তী নিঃশ্বাসটিও আমাদের হাতে নেই।
আলহামদুলিল্লাহ। পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে তিনি আমাকে আবারও এই পৃথিবীর আলো, বাতাস এবং প্রিয় মানুষগুলোর কাছে ফিরিয়ে এনেছেন। মনে হচ্ছে, তিনি যেন আমাকে নতুন করে আরেকটি জীবন দান করেছেন।
এই সংকটময় সময়েও আমার মন বারবার চলে যাচ্ছিল আমার প্রিয় শিক্ষার্থী, গবেষক, সহকর্মী এবং ABCD Laboratory, Bangladesh-এর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোর দিকে।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও তাঁদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ, গবেষণার কাজ, চলমান প্রকল্প এবং দায়িত্বগুলোর কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল। হয়তো তাঁদের প্রতি এই দায়িত্ববোধই আমাকে ভেতর থেকে লড়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই আজ আবার তাঁদের মাঝে ফিরে আসতে পেরেছি।
আজ অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাই আমার প্রধান সার্জন এবং তাঁর পুরো মেডিকেল টিমের প্রতি। আমার জটিল পরিস্থিতিতে যেভাবে তাঁরা ধৈর্য, দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে নিরলস চেষ্টা করেছেন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না। মহান আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
আমার পরিবারের প্রতি...
এই কঠিন সময়টিতে সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে আমার মরহুম আব্বাজানকে। মাত্র পাঁচ মাস আগে তাঁকে হারিয়েছি। হাসপাতালের প্রতিটি দীর্ঘ রাতেই তাঁর অনুপস্থিতি আমাকে গভীরভাবে অনুভব করিয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
আমার আম্মিজানের অশ্রুসিক্ত দোয়া, উদ্বেগ এবং সন্তানের জন্য সীমাহীন মমতা ছিল আমার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। মহান আল্লাহ তাঁকে সুস্থতা, দীর্ঘ নেক হায়াত এবং দুনিয়া-আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
আর আমার দুই ছোট ভাইয়ের কথা আলাদাভাবে না বললেই নয়।
আমার অসুস্থতার পুরো সময়টাতে তারা শুধু দায়িত্ব পালন করেনি, বরং আমার ছায়া হয়ে ছিল। হাসপাতালের ছোট থেকে বড় প্রতিটি বিষয়, ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ, ওষুধ সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রিপোর্ট আনা, সারারাত জেগে পাশে থাকা—সবকিছু তারা এমনভাবে করেছে যেন আমার কোনো কষ্ট না হয়। আমার প্রয়োজন বলার আগেই তারা তা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। নিজেদের বিশ্রাম, ঘুম এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কথা ভুলে শুধু আমার জন্য ছুটে বেড়িয়েছে। জীবনের এই কঠিন সময়ে আমি নতুন করে উপলব্ধি করেছি—বিপদের দিনে ভাই শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়; তারা মহান আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামতগুলোর একটি। মহান আল্লাহ তাঁদের সুস্থ রাখুন, দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং তাঁদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
একই সঙ্গে আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ, যারা নীরবে আমার জন্য দুশ্চিন্তা করেছেন, আমার পাশে থেকেছেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে আমার সুস্থতার জন্য দোয়া করেছেন।
হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই ABCD Laboratory, Bangladesh-এর সকল শিক্ষার্থী, গবেষক, সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের। আপনাদের অসংখ্য ফোন, বার্তা, খোঁজখবর, ভালোবাসা এবং আন্তরিক দোয়া আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া যে কত বড় শক্তি, তা এই কয়েক দিনে নতুন করে উপলব্ধি করেছি।
আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি এবং হাসপাতাল থেকে রিলিজও পেয়েছি। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে প্রতিটি নতুন সকাল, প্রতিটি স্বাভাবিক নিঃশ্বাস এবং পরিবারের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত এখন আমার কাছে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতের এক একটি অমূল্য উপহার।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে—জীবন আসলে আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। কখন, কীভাবে, কোন মুহূর্তে সবকিছু বদলে যাবে, তা আমরা কেউই জানি না। তাই যতদিন তিনি আমাদের এই পৃথিবীতে রেখেছেন, ততদিন তাঁর শুকরিয়া আদায় করা, তাঁর ইবাদত করা, পরিবারকে ভালোবাসা এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আমার নতুন জীবনের প্রতিটি দিন যেন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবকল্যাণের কাজে উৎসর্গ করতে পারি—আপনাদের সবার কাছে সেই আন্তরিক দোয়া কামনা করছি।
মৃত্যুর খুব কাছ থেকে আবারও পৃথিবীর আলো, বাতাস, পরিবার, প্রিয় মানুষ এবং দায়িত্বগুলোর কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া।
------
Muhammad Junaid
Founder & PI
ABCD Laboratory, Bangladesh