28/08/2025
পড়ন্ত বিকেলে চায়ের দোকানে গিয়ে গিয়ে দেখি– বাবা কাঁদছেন। দোকানের সামনে পাতানো বেঞ্চের এক কোণায় বসে আছেন। তার দু'পাশে মোখলেস চাচা এবং খবির চাচা। তাদের মুখে অবস্থাও ঈষৎ তরল। ভীষণ অবাক হলাম। দ্রুত পায়ে হেঁটে বাবার কাছে গিয়ে বললাম, “কি হয়েছে? কোন সমস্যা?”
বাবা আমাকে দেখে তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছলেন। গলার ভেজা স্বর স্বাভাবিক করতে করতে বললেন, “তেমন কিছু হয়নি। তুই এখানে কি করছিস?”
“মাথাটা একটু ধরছে। চা পান করতে এসেছি।”
“তা বেশ ভালো। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে আসিস। আমি যাই, আমার একটু কাজ আছে। তোর চায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে গেলাম।”
কথাগুলো বলে তিনি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। ব্যস্ত পায়ে বাড়ির পথ ধরলেন। আমার বাবা মানুষটা কাঠখোট্টা স্বভাবে, বেশিরভাগ সময় গম্ভীর মুখে থাকেন। কালেভদ্রে দু-একটা কথায় হেসে ফেলেন। তখন তাকে দেখতে চমৎকার লাগে। কিন্তু কখনো কাঁদেন না। আমার জীবনে আজই প্রথম তাকে কাঁদতে দেখলাম। বাড়িতে কিছু হয়নি। মায়ের শরীর ভালো আছে। দু-দিন আগেই মাসকাবারি বাজার করেছে তাই সে-সব নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তাহলে কাঁদছিলেন কেন? তৎক্ষণাৎ তার কান্নার সঠিক কোন কারণ খুঁজে পেলাম না। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করল।
দোকান থেকে এক কাপ তেঁতো চা পান করে বাড়িতে চলে এলাম। বাবাকে বলতেই তিনি ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেন। জানার আগ্রহ বাড়ল। মোখলেস চাচা অথবা খবির চাচার কাছে জিজ্ঞেস করলে হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে কিছু জানতে পারি। কিন্তু এখন তাদের কোথায় পাব? খবির চাচা আমাদের মসজিদের ইমাম। মাগরিবের নামাজের সময় তাঁকে পাওয়া যায়। দেরি করলাম না। অজু করে মসজিদে চলে গেলাম। খবির চাচাকে জিজ্ঞেস করতে তিনিও ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেন। চিকন গলায় বললেন, “তেমন কিছু না। কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিল।”
“আপনারা কি নিয়ে কথা বলছিলেন?”
কথার জবাব না দিয়ে তিনি প্রসঙ্গ ঘোরালেন। বললেন, “তোমার পড়াশোনার খবর কী? সামনেই তো এসএসসি পরীক্ষা। ভালো করে পড়ছ তো?”
“জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ। চেষ্টা করছি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।”
“বেশ ভালো। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো।”
“চাচা, আব্বা তখন…”
কথা শেষ করতে পারলাম না। খবির চাচা কাজের অযুহাত দেখিয়ে চলে গেলেন। মনটা খচখচ করতে লাগল। ব্যাপারটা জানতে না পারলে রাতে আমার ঘুম হবে না। সত্যিই ঘুম হলো না। সারারাত নানান কথা চিন্তা করতে লাগলাম। পরদিন সকালেই, হিমেলদের বাড়িতে গেলাম। হিমেল আমার বন্ধু। তাকে গোটা ব্যাপারটা খুলে বললাম। হিমেল বলল, “চাচার ব্যক্তিগত বিষয় থাকতে পারে না? এভাবে জানতে চাওয়াটা কি উচিত হচ্ছে?”
“তেমন কিছু হলে তোর আমাকে বলার দরকার নেই। তবুও তুই শোন। জীবনে প্রথমবারের মতো আব্বাকে কাঁদতে দেখেছি। আমার ভালো লাগছে না রে।”
আমার জোরাজুরিতে হিলেম রাজি হলো। মোখলেস চাচা কৃষক মানুষ। সারাদিন ক্ষেতে কাজ করেন। দশ টাকার বাদাম ভাজা কিনে নিয়ে হিমেল তার কাছে গেল। ঝলমলে গলায় বলল, “চাচার ফসল তো ভালো হয়েছে।”
মোখলেস চাচা পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে হাসলেন। বললেন, “ফসল পেলে কোথায়? সবে তো চারা গজিয়েছে।”
“ফসল কেমন হবে সে কথা চারা দেখলেই বোঝা যায়। নেন বাদাম খান।”
তিনি বাদাম নিলেন। বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন, “তা তুমি হঠাৎ কি মনে করে? রোদে দাঁড়ালে শরীর খারাপ হবে।”
“রোদের মধ্যে সারাদিন কাজ করেন, আপনার কিছু হয় না। আর আমি দু'মিনিট রোদে দাঁড়ালেই শরীর খারাপ হবে?”
“আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আর কিছু হয় না। কিন্তু তোমার তো আর অভ্যাস নেই। রোদ বসে জ্বর চলে আসবে।”
“চাচা আপনার সাথে একটা কথা ছিল। কথাটা খুব জরুরি। বলতে না পারলে আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।”
তিনি বিস্মিত গলায় বললেন, “কে শান্তিতে থাকতে দেবে না?”
হিমেল কথা না বলে মাটিতে বসে পড়ল। মোখলেস চাচা বললেন, “এখানে বসতে হবে না। ওই গাছের নিচে চলো। ছায়ায় বসে শুনব।”
তারা দু'জনে গাছের নিচে এসে বসল। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিঃশব্দে হেঁটে এসে গাছের পেছনে দাঁড়ালাম। কথোপকথন বেশ জোরে হওয়ায় সবটাই কানে আসছিল। মোখলেস চাচা বললেন, “তা বলো তোমার জরুরি কথা। শুনছি আমি।”
“শুনলাম গতকাল চায়ের দোকানে হুমায়ুন চাচা কাঁদছিল। ঘটনা কি? আগে-পরে তাকে তো কখনো কাঁদতে দেখিনি। সিরিয়াস কিছু হয়েছে নাকি?”
“খারাপ কিছু ঘটেনি। হুমায়ূনের ছেলেটা তোমার সাথে পড়ে না? একসাথেই তো চলাফেরা করো।”
খেয়াল ছিল, তবুও নিজের নাম শুনে কান খাড়া করলাম। হিমেল বলল, “হ্যাঁ পড়ে, কিন্তু কি হয়েছে?”
“ছেলেটা হুমায়ুনকে একটা জামা কিনে দিয়েছে। ঘরে বাজার খেতে দুই হাজার টাকা দিয়েছে। সে-সব বলছিল আর কাঁদছিল।”
“এখানে কান্না কী আছে?”
“আরে ওই কথাগুলো বলতে বলতে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। ছেলেটার বয়স বেশি না। স্কুলের গন্ডি পেরোয়নি। এর মধ্যে বাপ-মায়ের কথা ভাবতে শুরু করেছে। শুনেছি কুড়ি-পঁচিশটা মুরগির বাচ্চা কিনেছে। পুকুর পাড়ে হাত দুয়েক জায়গায় মরিচের চারা পুঁতেছে , লাল শাকের বীজ ছড়িয়েছে। এসব করে যে টাকা পেরেছে সব টাকা নাকি তার বাপের হাতে দিয়ে বলেছে- এই মাসে একটু কম কাজ করবে। ওভার টাইম করতে হবে না। বাড়ি এসে বিশ্রাম নেবে।”
“এতে কান্নার কী হলো? খুশি হওয়া উচিত।”
“সব খুশি কী আর হাসিতে প্রকাশ পায়? এসব তুমি বুঝবে না। বড় হও, যখন বাপ হবে তখন বুঝতে পারবে। সন্তানেরা একটু কিছু দিলেই বাপের মন ভরে যায়। তাছাড়া ছেলেটা এখনও ছোট। পড়াশোনার ফাঁকে বাপকে আঁচান দিতে এসব করছে। শুনেছি পড়াশোনাও বেশ ভালো। ক্লাসে ফাস্ট হয়। সত্যি নাকি?”
হিমেল মাথা দোলালো তবে কিছু বলল না। মোখলেস চাচা বললেন, “এসব কথা আবার তোমার বন্ধুটিকে বলতে যেও না। লোকের কাছে তার প্রশংসা করতে নেই।”
“বলব না। ওকে কিছু বলব না।”
“বুঝলে বাবা, মেয়ে দুটোকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। বয়স হয়েছে তবুও রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজ করতে হবে। একটা ছেলে থাকলে আমারও একটু আঁচান হতো। তবে দুঃখ নেই। মেয়ে দু'টোও আমায় খুব বোঝে। বড় মেয়েটা এবার ঈদে পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছে। ভালো পাঞ্জাবি। দাম দিয়ে কিনেছে। ছোট মেয়েটা পাঁচশ টাকা হাতে দিয়ে বলেছে- মন যা কিনে খেতে।”
কথাগুলো বলতে বলতে তিনিও কেঁদে ফেললেন। চোখের কোণাটা ভিজে উঠেছে। হাত দিয়ে দেখি পানি। একি! আমি কেন কাঁদছি?
মাস তিনেক আগে একবার হঠাৎই স্কুলের অফিস কক্ষে ঢুকে পড়েছিলাম। সুরভি ম্যাডাম খামের ভেতর টাকা ভরে ওপরে দু'লাইন উপদেশ বাক্য লিখছিলেন। কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম, “ম্যাডাম এটা কি করছেন?”
সুরভি ম্যাডাম হাসলেন। কোমল গলায় বললেন, “খামটা আমার বাবার হাতে দেব। প্রতি মাসেই দিই। বয়স হয়েছে তো তাই মিষ্টি খেতে নিষেধ করছি।”
“আপনার বাবা নিশ্চয়ই অনেক খুশি হয়? ইসস! আমিও যদি রোজকার করতাম, তাহলে আব্বাকে দিতে পারতাম।”
“চাইলে তুমিও রোজগার করতে পারো। সেখান থেকে দিতে পারো। সামান্য কিছুও অনেক সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার হয়।”
“আমি তো ছোট। টাকা রোজগার করব কিভাবে?”
“ইচ্ছে থাকলেই পারবে। এই যেমন ধরো: তোমাদের এখানটা গ্রাম। নিজেদের বাড়িতে থাকো। টিফিনের টাকা জমিয়ে মুরগির বাচ্চা কিনতে পারো। সেগুলোকে বড় করে বিক্রি করলে হাতে কিছু টাকা আসবে। কিংবা নিজেরা খেলেও খাবারের চাহিদা মিটবে। পুকুর পাড়ে সবজির গাছ লাগাতে পারো। এসব কাজ খুব সহজ এবং কম সময় লাগে। পড়াশোনার ফাঁকে খুব সহজেই করে ফেলা যায়।”
“কিন্তু এসব করলে লোকে কি বলবে? বলবে পড়াশোনার নামে খোঁজ নেই। টাকা কামাই করছে।”
“লোকের কাজ কথা বলা। সৎ পথে রোজগার করাটা কখনোই খারাপ কিছু হতে পারে না। তাছাড়া পড়াশোনা তো তোমার ওপর। তুমি সময় বুঝে ম্যানেজ করে নিতে পারলেই হলো।”
ম্যাডাম বলার পরই মুরগির বাচ্চা কিনলাম। খুব বেশি ঝামেলা হয় না। তিন বেলা খাবার দিলেই হয়ে যায়। মুরগির বাচ্চাগুলো বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল। গত সপ্তাহে সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছি আব্বার হাতে দিয়েছি। প্রথমে ভেবেছিলাম পড়াশোনায় ক্ষ’তি হবে। কিন্তু না তেমনটা হয়নি। ঠিকমতই পড়ছি। বরং আজ-কাল মনটা বেশ উৎফুল্ল থাকে। পড়ায় মন বসে।
দু'দিন পর টিফিনের সময় দেখি- হিমেল মাঠের এক কোণায় বসে কাগজের ঠোঙা বানাচ্ছে। জিজ্ঞেস করতে বলল– ওর বাবাকে নতুন লুঙ্গি কিনে দেবে। মনটা আনন্দে নেচে উঠল। কেউ তো একজন আমার কথা শুনে একটা ভালো কাজ করতে যাচ্ছে। এভাবেই ভালো কাজগুলো ছড়িয়ে পড়ুক। সমালোচনার বেড়াজাল ভেঙে দূর-দূরান্তে পৌঁছে যাক। বাবারা খুশিতে কাঁদুক। আমরাও কাঁদি। সত্যিই সুখের কান্নায় সুখ আছে।
#সুখের_কান্না