30/09/2025
মেঘনা পাড়ের ছেলেটা
মেঘনা নদীর তীরে চাঁদপুর। দিগন্তজোড়া জল আর আকাশ। দূর থেকে ভেসে আসত জাহাজের আওয়াজ। একটা ছোট্ট বিন্দু আস্তে আস্তে বড় হয়ে চোখের সামনে দাঁড়াত এক বিশাল জাহাজ। সেই জাহাজ শুধু লোহা-লক্কড়ের পিণ্ড নয়, যেন এক জীবন্ত পৃথিবী, যার ভেতর লুকিয়ে আছে অজানা গল্পের সম্ভার। এক কিশোরের মন হয়ে উঠত চঞ্চল। জাহাজের মতোই তার মনও ছুটতে চাইত অজানার উদ্দেশে।
এই কিশোরটিই একদিন বাংলাদেশের ব্যবসায়িক জগতে এক নতুন ইতিহাস গড়েছিলেন। তার নাম মোঃ দেলোয়ার হোসেন খান।
শৈশব: ভালোবাসা ও বিরহের সুর
১৯৪০ সালের ২১ মার্চ, চাঁদপুরের জাফরাবাদ গ্রামে নানার বাড়িতে তাঁর জন্ম। পিতা মমতাজ উদ্দিন ও মাতা আমেনা খাতুনের আদরের ‘দেলা’। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মাতৃহারা হন তিনি। এরপরই নানীর অফুরান ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। নানীর দরাজ হাত, অন্ন-বস্ত্রে যে ঘর কখনো খালি যেতে দিতেন না, সেখানেই মানবতার প্রথম পাঠ নিলেন দেলোয়ার।
কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই হারাতে হয় প্রিয় নানীকেও। এরপর বাবা ও বড় বোন হাজেরার তত্ত্বাবধানেই এগিয়ে যায় তার জীবন।
শিকড়ের টান: শিক্ষা ও মানবতার দীক্ষা
পিতার বাসা খেরাদিয়ায় চলে আসার পর তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেই সময়ে অনেকের মাঝেই আধুনিক শিক্ষাকে ভয় কাজ করলেও, তার পিতা মমতাজ উদ্দিন ছিলেন দূরদর্শী। তিনিই দেলোয়ারকে ভর্তি করিয়ে দেন খেরাদিয়া প্রাথমিক স্কুলে।
দেলোয়ার ছিলেন মেধাবী ও খেলায় দক্ষ। কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিচয় ছিল তার মানবিক চেতনার। কারো কান্না, কারো ক্ষুধা তার হৃদয়ে নাড়া দিত। পড়ালেখার পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট পেরিয়ে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। উচ্চশিক্ষার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সংসারের দায়িত্ব তাকে এরপরই কর্মজীবনে নামতে বাধ্য করে।
স্বপ্নের জাহাজ: এক উদ্যোক্তার জন্ম
সে সময় শিক্ষিত যুবকেরা সরকারি চাকরির পিছনে ছুটত। কিন্তু দেলোয়ার হোসেন খান ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি বেছে নিলেন অনিশ্চিত পথ—ব্যবসা।
চাঁদপুর বড় স্টেশনে জাহাজের তেল বিক্রি দিয়ে শুরু। সামান্য পুঁজি, অথচ অদম্য ইচ্ছাশক্তি। লাভের প্রথম টাকাই তাকে দেখায় দিগন্ত। তিনি কিনে ফেললেন একটি পণ্যবাহী জাহাজ। ‘ঝুঁকি নেই তো সফলতাও নেই’—এই ছিল তার মন্ত্র।
একটি জাহাজ থেকে শুরু যাত্রা একদিন পৌঁছাল ৩০টি জাহাজের মালিকানায়। তার জাহাজবহর সারাদেশে পণ্য বহন করে বেড়াত। কিন্তু তিনি থামলেন না।
ব্যবসার প্রসার ঘটাতে তিনি চলে এলেন ঢাকায়। গড়ে তুললেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। সামুদ্রিক মাছের ব্যবসায় তিনি বাংলাদেশের সুনাম বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। ‘সি-ফুড’ রপ্তানিকারক হিসেবে তার প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মানের। ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণ করেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক মানচিত্রে নতুন এক উচ্চতা যোগ করেন।
মানুষের জন্য: একজন দানবীর
দেলোয়ার হোসেন খানের সাফল্য কেবল তার বাণিজ্যিক স্মার্টনেসে নয়, লুকিয়ে ছিল তার অসামান্য দানশীলতায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যবসার লক্ষ্য শুধু টাকা কামানো নয়, তা গড়ে তোলা কর্মসংস্থান ও মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।
এলাকার বেকার যুবকদের তিনি নিজেই খুঁজে চাকরি দিতেন। কারো বাড়িতে চাল নেই, কারো ডাল নেই—সবাই পেত তার সহায়তা। নিজের শিক্ষা অর্জনের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছিল শিক্ষার মূল্য। তাই এলাকার সবার জন্য শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘খেরাদিয়া দেলোয়ার হোসেন খান স্কুল এন্ড কলেজ’।
তিনি তার সন্তানদের বলতেন, “বিত্তবান হও বা না হও, মানুষের জন্য কিছু করো। টাকা একদিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী।”
তার তিন ছেলে ও তিন মেয়ে—সবাই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। তারা আজও বাবার দেখানো পথে সমাজসেবার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর এই মহান মানুষটি না ফেরার দেশে চলে যান। কিন্তু একজন স্বপ্নদর্শী উদ্যোক্তা, একজন দানবীর মানুষ হিসেবে তিনি বেঁচে আছেন লাখো মানুষের হৃদয়ে।
30/01/2023
16/06/2020