26/04/2025
এই যে হরহামেশাই দেখা যায়— প্রেমিকা নিয়ে দুই ছাত্রের ব্যক্তিগত বাগ্বিতণ্ডার জের ধরে দুই কলেজের ছাত্রদের মধ্যে দফায়-দফায় সংঘর্ষ, বাসের ভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টরের সাথে উদ্ভূত বিবাদকে কেন্দ্র করে রাজপথে সহিংসতা, পার্শ্ববর্তী মার্কেটের কর্মচারীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে দুই-চার-পাঁচজনের প্রাণহানি, দুই কলেজের দ্বন্দ্ব তিন কলেজে ছড়িয়ে চার কলেজ বন্ধ ঘোষণা; এর মধ্যে কিন্তু নটর ডেম কলেজের নাম সাধারণত শোনা যায় না। কেন শোনা যায় না? কেননা নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা হয়। আর ঐসব কলেজে পড়াশোনা হয় না বা কম হয়। যা-ও হয়, নিয়মকানুনের বালাই নেই। পড়াশোনা কম হওয়ার কারণে ঐ কলেজগুলোর ছাত্ররা করার মতো কিছু পায় না। করার মতো কিছু না পেয়ে তারা বিনোদনের অংশ হিশেবে মারামারিতে লিপ্ত হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সেই মারামারি জিইয়ে রাখে। মারামারি শেষ করার আগেই একটা ব্যাচ পাশ করে বেরিয়ে গেলে পরের ব্যাচ সেই অসমাপ্ত মারামারি শেষ করে। কথিত আছে— অকর্মণ্য মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।
ক্লাসের প্রথম দিনই নটর ডেম কলেজের ছেলেদের হাতে ছোট্ট একটা পুস্তিকা তুলে দেওয়া হয়। কলেজের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নিয়মকানুন সন্নিবেশিত থাকে সেই পুস্তিকায়। সপ্তাহখানেক বাদে ঐ পুস্তিকার ওপর একটা পরীক্ষা হয়, যাতে ছেলেরা কলেজের অতীত ও আইন সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়। নটর ডেমে প্রতি সপ্তাহে দুটো করে 'কুইজ টেস্ট' হয়। এই কুইজ মানে লিখিত পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার নাম্বার ছাত্রদের বার্ষিক আমলনামায় যুক্ত হয়। নটর ডেমের ছাত্ররা বছরে অন্তত একশো চারটা পরীক্ষা দেয়। অর্থাৎ এখানে বারোমাস পরীক্ষা লেগেই থাকে। এইসব পরীক্ষা নামমাত্র পরীক্ষা না। প্রতিটি পরীক্ষার খাতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ছাত্রদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যাতে তারা আত্মসমালোচনার সুযোগ পায়। ধারাবাহিকভাবে কেউ কম মার্ক পেলে তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, সমস্যা থাকলে উপদেশ ও উৎসাহ দেওয়া হয়। পরীক্ষা নিজ শ্রেণিকক্ষে হয় না, অন্য শ্রেণিকক্ষে হয়; যাতে ছাত্ররা 'কমফোর্ট জোন'-এর বাইরে পরীক্ষা দিতে অভ্যস্ত হয় (যেহেতু এইচএসসি পরীক্ষা অন্য কলেজে হয়)।
নটর ডেম কলেজের প্রতিটি ক্লাস যথাসময়ে শুরু হয়। এই কলেজে আটটা মানে সাতটা ঊনষাটও না, সাতটা একষট্টিও না। এখানে আটটা মানে সাতটা ষাট। প্রত্যেক শিক্ষক একদম কাঁটায়-কাঁটায় সঠিক সময়ে ক্লাসে আসেন। নিয়মিত শিক্ষক কালেভদ্রে অনুপস্থিত থাকলে অন্য শিক্ষক আসেন, তিনিও সঠিক সময়ে আসেন। এসে গালগল্প করেন না, ঠিকঠাকভাবেই পড়ান। মধ্যাহ্নবিরতি বিশ মিনিট। বেশিও না, কমও না। দেরি করে এলে ছাত্রদেরকে ক্লাসে সাধারণত ঢুকতে দেওয়া হয় না। দেরি করে ক্লাসে আসার কথা নটর ডেমের ছাত্রদের চিন্তায়ই থাকে না। কোনো ছাত্র টানা কয়েকদিন ক্লাসে না এলে তার অভিভাবক ডাকা হয় এবং 'জেল ক্লাস' দেওয়া হয়। অনুপস্থিতির দিনগুলোয় ক্লাসে যা পড়ানো হয়েছিল, জেল ক্লাসে ঐসব ছাত্রকে ঐসব বিষয় পড়তে বাধ্য করা হয়। কলেজের লাইব্রেরির ভেতরে জেল ক্লাসের আয়োজন করা হয়, নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে জেল থেকে বেরোনোর সুযোগ নেই। কয়েদিরা জেলে ঠিকমতো পড়ল কি না, তা দেখভালের জন্য জেল সুপার আছেন। ক্লাসে অনুপস্থিতির কাফফারাস্বরূপ কাউকে-কাউকে কলেজের ঝাড়ুদারদের সাথে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়, অর্থাৎ কলেজের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হয়। ক্লাসে শতভাগ উপস্থিত থাকলে সেইসব ছাত্রকে নটর ডেম কলেজ 'পারফেক্ট অ্যাটেনডেন্স সার্টিফিকেট' দেয়।
এখন কয়টা ক্লাব আছে, জানি না। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম (২০০৪-০৬), তখন নটর ডেমে আঠারোটা ক্লাব ছিল। প্রতি বুধবার একটা ক্লাস কম হতো, সেই সময়টা ছিল 'ক্লাব আওয়ার'। ঐ সময়টুকু বরাদ্দ রাখা হতো ক্লাবকার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য। নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব, আবৃত্তিসংঘ আর লেখককুঞ্জের সদস্য ছিলাম। যত দূর মনে পড়ে— অন্তত একটা ক্লাবের সদস্য হওয়া তখন বাধ্যতামূলক ছিল। অর্থাৎ নটর ডেম কলেজ কেবল ঠেসে-ঠেসে পড়ায়ই না, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছাত্রদেরকে সম্পৃক্ত রাখে, তৈরি করে নেতৃত্বগুণ। এই ক্লাবগুলো নামমাত্র ক্লাব না; এইসব ক্লাবে বারোমাসজুড়ে প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতা, সেমিনার লেগেই থাকে। কোনো নিষ্ক্রিয় ক্লাব এখানে নেই। নটর ডেমের অভিধানে নিষ্ক্রিয়তা বলে কোনো শব্দ নেই। লেখককুঞ্জের তরফ থেকে প্রতিমাসে প্রত্যেক ছাত্রের হাতে এক কপি করে 'ঢাকঢোল' (কলেজ ম্যাগাজিন) স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যায়, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
এই কলেজের কোনো ছাত্র মাঝারি আকারের অপকর্ম করলে তাকে ইয়েলো লেটার পাঠিয়ে ক্লাস থেকে ডগের (ডিরেক্টর অব গাইডেন্স) কাছে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, বড় ধরনের অপকর্মের জন্য রেড লেটার। ডগের দপ্তরে নিয়ে তাকে 'মানসিক চিকিৎসা' দেওয়া হয়। মোটামুটি তাতেই কাজ হয়ে যায়। কোনো ছাত্র চাইলে নটর ডেম কলেজে কেরানির কাজ করতে পারে, বিনিময়ে সে বেতন পাবে এবং বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পাবে।
চাঞ্চল্যকর ব্যাপার হলো— নটর ডেম কলেজের ক্লাসে ইচ্ছেমতো বেঞ্চে বসা যায় না। বেঞ্চ নির্দিষ্ট থাকে। লোমহর্ষক ব্যাপার হলো— কেবল বেঞ্চ না; একজন ছাত্র বেঞ্চের কোন অংশে (ডানে, বামে না মাঝে) বসবে, তাও পূর্বনির্ধারিত থাকে। কোনো ছাত্র অনুপস্থিত থাকলে তার আসনে অন্য কেউ ধপাস করে বসে পড়তে পারবে— তাও না। ঐ আসন ফাঁকা থাকবে। প্রতিটি ক্লাসে রোল কল করা হয়, তবে নিঃশব্দে। শিক্ষক রোল নাম্বার উচ্চারণ করে ডাকেন না। কোন ছাত্রের কোন বেঞ্চে বসার কথা, রোল কলের খাতায় সেই মানচিত্র আঁকা থাকে। শিক্ষক শুধু অনুপস্থিত ছাত্রদেরকে চিহ্নিত করেন। এতে দেড়শো ছাত্রের রোলকল দেড় মিনিটেই হয়ে যায়। এক সপ্তাহ পরপর বেঞ্চবদল হয়। সামনের বেঞ্চের ছাত্রদেরকে পেছনের বেঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়, পেছনের বেঞ্চেরদেরকে সামনে। এটুকুই। বেঞ্চমেট কখনোই পরিবর্তিত হয় না। অর্থাৎ একই বেঞ্চমেটের সাথে দুই বছর ক্লাস করতে হয়।
মোটামুটি এই হলো নটর ডেম কলেজ, আরামবাগের মাটিতে যেন একখণ্ড সেনানিবাস। এত-এত নিয়মকানুন আর পড়াশোনার এত চাপের মধ্যে মারামারি করার মতো পর্যাপ্ত সময় নটর ডেম কলেজের ছেলেদের হাতে থাকে না। ফলে, কখনও শোনা যায় না আরামবাগের ব্যবসায়ী, ফকিরাপুলের বাস কনডাক্টর বা পার্শ্ববর্তী টিঅ্যান্ডটি কলেজের সাথে নটর ডেমের ছেলেদের সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে জড়ানোর মতো সময়ই তাদের হাতে নেই। ছাত্রসংঘর্ষ রোধ করার একটাই উপায়— ছাত্রদেরকে সারাবছর পড়াশোনা, পরীক্ষা, ক্লাবকার্যক্রম আর নানাবিধ আনন্দ-আয়োজনে ব্যস্ত রাখা। কলেজে পড়াশোনা না হলে বা আনন্দের ব্যবস্থা না থাকলে ছাত্ররা সংঘাতের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেবে— সেটাই স্বাভাবিক। সংঘাতমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার জন্য নটর ডেম মডেল আমাদের হাতের কাছেই আছে। এই মডেলের জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে হবে না। আরামবাগেই এই মডেল সহজলভ্য। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা। শিক্ষকরা ক্লাসে না পড়িয়ে, ছাত্রদের জন্য আনন্দের ব্যবস্থা না করে, সারাক্ষণ সরকারের পদলেহন আর সমিতি করে বেড়ালে ছাত্ররা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংঘর্ষে জড়াবেই।
আখতারুজ্জামান আজাদ
১০ মার্চ ২০২৩