25/05/2025
সুইস টেন্টে মাথায় ভিজে তোয়ালে জড়িয়ে মাস্টার মশাই নন্দলাল বসু বসে তাঁর ছাত্র সহকর্মীর কাজ দেখছেন আর মাঝেমধ্যে ডাকছেন- ' একটু ছায়ায় বসে একটা বিড়ি খেয়ে যাও হে কিঙ্কর'৷ রামকিঙ্কর বেইজের পিতৃদেব চণ্ডীচরণ ক্ষৌরকাজ করে বেলা তিনটের সময় বাজারে যেতেন তরিতরকারি কিনতে,চাল-ডাল অবশ্য যজমানিদের বাড়ি থেকে পাওয়া যেত৷ বোঝা যায় ছোটবেলায় তাঁর বাড়ির আর্থিক অবস্থা ছিল খুব খারাপ,অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থার মধ্যে কেটেছে৷
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
রং কেনার পয়সা নেই তাতেও দমানো যায় নি,রান্নার হলুদ দিয়ে হলুদ রং,শিম পাতা দিয়ে সবুজ রং,পুঁই পেচুড়ি দিয়ে বেগুনি রং,এভাবে সহজলভ্য কম দামের জিনিস দিয়ে ছবি আঁকা অথবা পতুল গড়ার কাজ করতেন কিশোর কিঙ্কর৷ বাবা ছেলের তৈরি ওই সব জিনিস নিয়ে মেলায় যেতেন,দু'চারটে বিক্রি হত,দু'পয়সা,চার পয়সা হাতে আসত৷ ছেলে-বাবা দু'জনের মুখ ভরে উঠত হাসিতে৷ প্রথাগত শিক্ষায় মন ছিল না,বরং ছোটবেলায় যখন তাঁর বাবা বাংলা অক্ষর চেনানোর জন্য 'অ', 'আ', লেখাতেন তখন স্লেটে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো দেবদেবীর ছবির অনুকরণ করতেন৷ ছোটবলা থেকে ঝোঁক ছবি আঁকার,অনন্ত সুত্রধর একজন জাত শিল্পী,তিনি নানা রকমের প্রতিমা বানাতেন,ছোট্ট কিঙ্কর দাঁড়িয়ে সে কাজ দেখতেন৷ বালকের একাগ্রতা দেখে অনন্ত মিস্ত্রি দিলেন তাকে কাজে লাগিয়ে৷ প্রতিভাবানদের প্রতিভা সারাজীবন নিশ্চয়ই চাপা থাকবে না,কারো না কারো চোখে পড়বে,এক্ষেত্রে সহায় হয়েছিলেন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়৷ তিনি আঠারো বছরের তরুণ রামকিঙ্কর কে বলেছিলেন তুমি কি শান্তিনিকেতনে নন্দবাবুর কাছে আঁকা শিখবে? ছেলেটি এক কথায় রাজি হয়ে গেল৷ বাঁকুড়ার স্কুল পালানো কিঙ্কর আরেক স্কুল পালানো পড়ুয়া রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে এসে নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করলেন৷ হয়েছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর৷
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
কলভবনের দায়িত্বে থাকা মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু নতুন ছাত্রটির নিজের আঁকা ছবি প্রথমে দেখলেন,তারপর সেটি নিয়ে কলকাতায় এলেন তাঁর শিক্ষাগুরু অবনীন্দ্রনাথকে দেখানোর জন্য,ছবির বিষয় একটি হরিন শিশুকে আদর করছে শকুন্তলা,ছবি দেখে অবনঠাকুর নন্দলাল বসুকে বললেন একে কী শেখাবে? এ তো সব শিখেই এসছে! শান্তিনিকেতনে ফিরে 'রামকিঙ্কর' কে বলেছিলেন সিদ্ধিদাতা গনেশ ঠাকুরের মূর্তি বানাতে,রামকিঙ্কর একটা ছোট্ট মূর্তি বানালেন ওই দিয়ে শুরু কলাভবনের ভাস্কর্য বিভাগের সুত্রপাত৷ সাত বছর বাদে ১৯৩২সালে রামকিঙ্কর হয়েছিলেন কলাভবনের ভাস্কর্য বিভাগের প্রথম অধ্যাপক৷ তাঁর কাজ দেখে একদিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে ডেকে বলেছিলেন আমার সব জায়গা ভরে দে তোর কাজ দিয়ে৷
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
১৯৩৮সালে ভরা গ্রীষ্মে তাঁর বিখ্যাত 'সাঁওতাল পরিবার'-এর বিরাট কংক্রিকেটের প্যানেলটি বানাতে শুরু করেন শান্তিনিকেতনে৷ সেই সময়ে তাঁর স্মৃতিচারণায় তাঁর ছাত্র-শিল্পী প্রভাস সেন 'দেশ' পত্রিকায় বলেছেন 'গ্রীষ্মের আগুন ছড়ানো আকাশের নিচে গ্লাভসপরা ডান হাত দিয়ে কাঁকর মেশানো সিমেন্ট বালি ছুড়ে ছুড়ে মূর্তিতে গঠন আনছেন,বাঁ হাতে তরকারি জড়ানো রুটি,মাথায় বাঁশ পাতার টোকা,আর মুখে উদাত্প স্বরে গান 'রস নাই রস নাই....,..'৷ মাপ করবেন রামকিঙ্কর বেইজের শিল্পকর্ম,অথবা তাঁর মূল্যায়ন করার ধৃষ্টতা অথবা যোগ্যতা নেই,শুধু এটুকু জানি তিনি একবার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন —শুধুই তো ডাল-ভাত-তরকারি,শুক্তো খেয়ে আর সম্তান উৎপাদন করে জীবন চলে না,জীবনের সঙ্গে রক্তের সঙ্গে,ছবি-গান,মূর্তির সম্পর্ক,জলের সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের মতোই৷ শেষ জীবনে অন্নপূর্ণা সিরিজের ছবিতে তুলে ধরেছিলেন অনাহারে কষ্ট পাওয়া মানুষের কথা,অবলা পশু আর সাধারণ মানুষের বেদনার কথা৷ ১৯৭৭সালে বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ সম্মান 'দেশিকোত্তম' উপাধি পেয়েছেন, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডি-লিট দেয়৷ সারাজীবনে একশো কুড়ি-পঁচিশটির মতন ভাস্কর্য তৈরি করেছেন,আর তেলরং,জলরং মিলিয়ে দুশো সাতাশটি ছবি এঁকেছেন,সবমিলিয়ে একথা নতুন করে বলার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর,তিনি রামকিঙ্কর বেইজ৷ আজ রামকিঙ্কর বেইজের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
গ্রন্থঋণ,চিত্রঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার, স্রষ্টা ও সৃষ্টি,বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের শিল্পকর্ম ও জীবনকথা,নিখিলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়