21/01/2026
সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পকলা একাডেমির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস ও অধ্যাদেশ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে, তার একটি বড় অংশ আবেগপ্রবণ ও তথ্যগতভাবে অসম্পূর্ণ। এভাবে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবিশেষের প্রতি দোষারোপ করে শিল্পচর্চার কাঠামোগত সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। বরং ব্যপকভাবে আলোচিত হবার এই সময়টিকে ব্যবহার করে শিল্পকলার এই মৌলিক শাখাটির বাস্তব প্রয়োজন, সময়োপযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনাটাই বেশি জরুরি। তাই এই লেখাটি “বাদ পড়া” বা “ফিরিয়ে আনা” নয়, বরং সময়ের বাস্তবতায় আবৃত্তিকে প্রথমবারের মতো একক ও স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষা কেবল লেখ্যভাষা নয়— বাংলা ভাষা মূলত একটি শ্রুতিনির্ভর ভাষা। বাংলা সাহিত্য, লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে উঠেছে কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দ, ছন্দ ও সুরের ধারাবাহিকতায়। চর্যাপদ, পাঁচালি, পুঁথি, মঙ্গলকাব্য, কীর্তন থেকে শুরু করে আধুনিক কবিতা, গল্পপাঠ কিংবা অডিওবুক— সবখানেই কণ্ঠ, উচ্চারণ ও শ্রুতির ভূমিকা মুখ্য। এই ঐতিহ্যের আধুনিক, সচেতন ও নান্দনিক রূপই আবৃত্তি। এটি কেবল কবিতা পাঠ নয়; বরং শুদ্ধ উচ্চারণ, ছন্দবোধ, ধ্বনিগত সচেতনতা, ভাবসংযম ও কণ্ঠের শৃঙ্খলার একটি সমন্বিত শিল্পচর্চা।
আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘উচ্চারণ’ কোনো গৌণ বিষয় নয়। কারন উচ্চারণ তথা ভাষার ধ্বনিগত গঠন, স্বরাঘাত, বিরতি ও গতি মানুষের চিন্তা ও অর্থবোধের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আবৃত্তির চর্চা ভাষার সেই ধ্বনিগত কাঠামোকে সচেতনভাবে ব্যবহার করতে শেখায়। ফলে আবৃত্তি কেবলমাত্র সাহিত্যের বাকনির্ভর নান্দনিক অনুশীলনই নয়, বরং একটি মননশীল ভাষাচর্চা, যা মানুষকে সংযত ও দায়িত্বশীলভাবে কথা বলতে শেখায়।
বর্তমান সমাজবাস্তবতার অপরিহার্য দিক টেলিভিশন নাটক থেকে ইউটিউবের কনটেন্টে যেখানে আঞ্চলিক ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার কিংবা টকশোগুলোতে ভাষা ক্রমশ হিংস্র, রাজনীতিতে উচ্চারণ অশালীন, স্লোগানে কুরুচিপূর্ণ শব্দের অনুপ্রবেশ, সামাজিক মাধ্যমে লাগামহীন ভাষার অবক্ষয়— এই সবকিছুর মধ্যে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভাষাগত সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে,ঠিক এই সময়েই বড় বেশি প্রয়োজন শুদ্ধ উচ্চারণ, সংযত কণ্ঠ ও মানবিক ভাষাবোধের চর্চায় রাষ্ট্রের এগিয়ে আসা। এবং এই প্রেক্ষাপটে আবৃত্তি সেই শিল্প, যা ভাষাকে শৃঙ্খলিত, মার্জিত ও মানবিক রাখার অনুশীলন করে।
এটি সত্য যে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৩ সালের ১০ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত কখনোই শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত ছিল না। এই দিনের পর তা কেবল সঙ্গীত ও নৃত্য বিভাগের সাথে যুক্ত হয়ে সঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগ নামে একত্রে পরিচালিত হয়েছে, যা বাস্তবতায় আবৃত্তি শিল্পের স্বাতন্ত্র্য ও বিকাশকে কিছুটা হলেও গতিশীল করেছিল।
সাম্প্রতিক পুনর্গঠনে সঙ্গীতকে আলাদা করে ‘নৃত্য ও অন্যান্য পারফর্মিং আর্ট’ নামে একটি বিভাগ গঠন করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আবৃত্তির ক্ষেত্রে নতুন কোনো সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন না করে বরং তাকে আরও অনিশ্চিত অবস্থানে ফেলেছে। নৃত্য ও পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে আবৃত্তিকে গুলিয়ে ফেলা শিল্পতাত্ত্বিক দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ আবৃত্তি মূলত ভাষাভিত্তিক, ধ্বনিনির্ভর ও বাচনিক শিল্প, যার নিজস্ব তত্ত্ব, প্রশিক্ষণপদ্ধতি ও নান্দনিক মানদণ্ড রয়েছে।
বর্তমান সময়ে আবৃত্তিকে স্বতন্ত্র শিল্পশাখা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। আবৃত্তি কেবল কবিতা পাঠের অনুশীলন নয়; এটি ভাষা, ছন্দ, ধ্বনি, আবেগ, বাচনিক অভিনয় ও শ্রুতিশিল্পের সমন্বিত রূপ। বিশ্বব্যাপী পারফর্মিং আর্টের আলোচনায় ‘spoken word’, ‘oral poetry’ কিংবা ‘poetry performance’ স্বতন্ত্র শিল্পধারা হিসেবে স্বীকৃত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও সাউন্ড থেরাপি ও পোয়েট্রি থেরাপির মতো ধারণা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে কণ্ঠস্বর, শব্দের কম্পন ও কবিতার আবেগ অটিজম, শিশু কিংবা বড়দের মানসিক স্বাস্থ্য, উদ্বেগ ও ট্রমা নিরাময়ে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বাস্তবতা আবৃত্তির সামাজিক ও মানবিক গুরুত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।
এমন প্রেক্ষাপটে আবৃত্তিকে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কেবল শিল্পীদের আবেগের দাবি নয়, বরং সময়ের যুক্তিসংগত প্রয়োজন। একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হলে আবৃত্তির জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কাঠামো, গবেষণা, আর্কাইভ, পাঠ্যক্রম ও প্রযোজনা পরিকল্পনা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে ভাষাভিত্তিক শিল্পচর্চার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংকটের মুহূর্তে কবিতা ও আবৃত্তি ছিল মানুষের নৈতিক শক্তি। প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, শপথে ও আশায়—আবৃত্তি ছিল ঘৃণার বিপরীতে সৌন্দর্যের, হিংসার বিপরীতে মানবিকতার, চিৎকারের বিপরীতে সংযত কণ্ঠের অস্ত্র। এই অস্ত্রকে শান দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিল্পকলা একাডেমি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলেও এটি মূলত শিল্পীদের সৃজনশীল চর্চার ক্ষেত্র। তাই এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং শিল্পতত্ত্ব, আন্তর্জাতিক চর্চা ও দেশীয় বাস্তবতার সমন্বয় জরুরি। শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তিকে একক ও স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা বিদ্যমান অন্য কোন বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না; বরং সামগ্রিক শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। কেবল ‘অন্যান্য পারফর্মিং আর্ট-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র ও আধুনিক শিল্পশাখা হিসেবে ঘোষনার মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করে, অধিকতর গবেষণা ও প্রশিক্ষণের আওতায় এনে, নতুন প্রজন্মের জন্য একে সুসংগঠিত, স্বতন্ত্র শিক্ষা বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথভাবে ভাবার এখনই উপযুক্ত সময়।