06/07/2026
[লেখাটি হিশাম আবু ইউসুফের একটি লেকচারের আলোকে প্রস্তুতকৃত]
আমাদের অধিকাংশের জীবনে কিছু অসমাপ্ত গল্প আছে। কোনো এক রমজানে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নিয়মিত কুরআন পড়ব। কোনো এক রাতে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তাহাজ্জুদ আর ছাড়ব না। কোনো এক নতুন বছরে আমরা ভেবেছিলাম, এবার শরীরের যত্ন নেব, নতুন কিছু শিখব, নিজের জীবনকে একটু গুছিয়ে নেব। আমরা শুরু করেছিলাম। কিন্তু ধরে রাখতে পারিনি।
প্রশ্ন হলো-কেন?
আমরা সাধারণত এর উত্তর খুঁজি নিজের ভেতরে। ভাবি, আমার ইচ্ছাশক্তি কম। আমার মনোযোগ কম। আমি যথেষ্ট আন্তরিক নই। কিন্তু যদি সমস্যাটা সেখানে না হয়? যদি সমস্যাটা আমাদের চরিত্রে না থেকে আমাদের পদ্ধতিতে থাকে? যদি আমরা ব্যর্থ না হই দুর্বল হওয়ার কারণে, বরং ব্যর্থ হই কারণ আমরা নিজেদের দুর্বলতাকে মাথায় রেখে কোনো ব্যবস্থা তৈরি করি না?
উস্তাদ হিশাম আবু ইউসুফ তাঁর অভ্যাস নিয়ে আলোচনায় বলেছেন- মানুষের জীবন সাধারণত বড় সিদ্ধান্তে বদলায় না। জীবন বদলায় সেই ছোট ছোট কাজগুলোর মাধ্যমে, যেগুলো একজন মানুষ নীরবে, ধারাবাহিকভাবে, বছরের পর বছর করে যেতে থাকে।
কেন ইসলাম ধারাবাহিকতাকে এত গুরুত্ব দেয়?
রাসূল ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।"
আমরা অনেক সময় এই হাদিসটি শুনি, কিন্তু এর গভীরতা নিয়ে ভাবি না। কেন আল্লাহ অল্প আমলকে ভালোবাসবেন? কেন বেশি নয়? কারণ আল্লাহ শুধু আমলের পরিমাণ দেখেন না। তিনি দেখেন আমলটি আপনার জীবনের কতটুকু অংশ হয়ে উঠেছে। একদিনে একশ পৃষ্ঠা কুরআন পড়া কঠিন নয়। কঠিন হলো প্রতিদিন দুই পৃষ্ঠা পড়া। এক রাতে দীর্ঘ সময় ইবাদত করা কঠিন নয়। কঠিন হলো বছরের পর বছর আল্লাহর সাথে সেই সম্পর্ক ধরে রাখা। অনেক মানুষ আবেগের বশে বড় কিছু করতে পারে। কিন্তু চরিত্র গড়ে ওঠে ছোট কাজের ধারাবাহিকতায়। আর ইসলাম মূলত চরিত্র গড়ারই শিক্ষা দেয়।
রাসূল ﷺ কখনো মোটিভেশনের উপর নির্ভর করেননি
একদিন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "রাসূল ﷺ-এর আমল কেমন ছিল?" তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, "তাঁর আমল ছিল ধারাবাহিক।" এই উত্তরটি যতটা সংক্ষিপ্ত, ততটাই গভীর। কারণ এটি আমাদের এমন একটি বিষয় শেখায়, যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। রাসূল ﷺ তাঁর ইবাদতকে মনের অবস্থার উপর ছেড়ে দেননি। তিনি এমন ছিলেন না যে, যেদিন ইচ্ছা হলো সেদিন করলেন, আর যেদিন ইচ্ছা হলো না সেদিন ছেড়ে দিলেন। বরং তাঁর জীবনে কিছু আমল ছিল স্তম্ভের মতো। দিন বদলাত। পরিস্থিতি বদলাত। ব্যস্ততা আসত। কিন্তু সেই স্তম্ভগুলো জায়গামতো দাঁড়িয়ে থাকত। এমনকি কোনো কারণে কোনো আমল ছুটে গেলেও তিনি পরে তা পূরণ করতেন।
আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা দরকার- আমার জীবনে এমন কোনো আমল আছে কি, যা আমার মনের অবস্থার উপর নির্ভর করে না? যা আমি করি কারণ আমি করতে চাই না, বরং কারণ এটি আমার পরিচয়ের অংশ?
পাহাড়ও একদিনে তৈরি হয় না
আমরা এমন এক যুগে বাস করি, যেখানে সবাই দ্রুত ফলাফল চায়। দ্রুত ওজন কমাতে চায়। দ্রুত ভাষা শিখতে চায়। দ্রুত সফল হতে চায়। দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চায়। কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টি দ্রুততার উপর নয়, ধারাবাহিকতার উপর চলে। একটি বীজকে মাটির নিচে অনেকদিন কাজ করতে হয়, তারপর সে মাথা তুলে দাঁড়ায়। একটি শিশুকে বহু বছর বেড়ে উঠতে হয়, তারপর সে পরিণত মানুষ হয়। একটি পাহাড়ও এক মুঠো মাটি দিয়ে শুরু হয়। মানুষের চরিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। আজকের একটি পৃষ্ঠা কুরআন হয়তো আপনার জীবন বদলাবে না। আগামীকালের একটি পৃষ্ঠাও না। হয়তো এক মাসেও কোনো পরিবর্তন চোখে পড়বে না। কিন্তু একদিন আপনি পেছনে তাকিয়ে দেখবেন, যে মানুষটি একসময় কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারত না, সে এখন কুরআন ছাড়া দিন কল্পনা করতে পারে না। বড় পরিবর্তন সাধারণত ধীরে ধীরে ঘটে। এত ধীরে যে, পরিবর্তন হওয়ার সময় আমরা তা টেরও পাই না।
আমরা কেন শুরু করি, কিন্তু ধরে রাখতে পারি না?
যখন মানুষ কোনো ভালো কাজ শুরু করে, তখন তার সবচেয়ে বড় সমস্যা সাধারণত অলসতা নয়। বরং সমস্যা হলো, সে নিজের বর্তমান অবস্থাকে ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের নিজের জন্য পরিকল্পনা করে। আজ আমি অনুপ্রাণিত। তাই আমি ভাবি, প্রতিদিন কয়েক পারা কুরআন পড়ব। প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা আরবি শিখব। প্রতিদিন দীর্ঘ তাহাজ্জুদ পড়ব। কিন্তু আমি ভুলে যাই, আমি সবদিন সমান থাকব না। কিছুদিন ক্লান্ত হব। কিছুদিন মন খারাপ থাকবে। কিছুদিন ব্যস্ততা থাকবে। কিছুদিন কোনো কারণ ছাড়াই কিছু করতে ইচ্ছা করবে না। আর ঠিক সেই দিনগুলোর কথা চিন্তা না করেই আমরা পরিকল্পনা করি। ফলে পরিকল্পনাটা আমাদের বাস্তব জীবনের জন্য নয়, আমাদের কল্পিত জীবনের জন্য তৈরি হয়। এই কারণেই অনেক সুন্দর পরিকল্পনা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। আর এই কারণেই রাসূল ﷺ আমাদের এমন আমলের শিক্ষা দিয়েছেন, যা টিকে থাকতে পারে। এমন আমল নয়, যা কিছুদিন মানুষকে মুগ্ধ করবে। এমন আমল, যা বহু বছর পরও জীবিত থাকবে।
অভ্যাস তৈরির আসল রহস্য: জবাবদিহিতা
অনেক মানুষ মনে করে ধারাবাহিক মানুষদের ইচ্ছাশক্তি বেশি। কিন্তু বাস্তবে ধারাবাহিক মানুষদের জীবনে সাধারণত একটি জিনিস বেশি থাকে, জবাবদিহিতা। একজন মানুষ একা একা কুরআন হিফজ শুরু করল। প্রথম সপ্তাহে সে খুব উৎসাহী। দ্বিতীয় সপ্তাহে একটু কম। তৃতীয় সপ্তাহে অন্য কাজ চলে এল। চতুর্থ সপ্তাহে সে পুরোপুরি থেমে গেল। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ তার থেমে যাওয়ার বিষয়টি কেউ জানে না। কেউ খেয়াল করে না। কেউ প্রশ্নও করে না। এবার একই মানুষ একজন শিক্ষকের কাছে ভর্তি হলো। প্রতি সপ্তাহে তাকে নির্দিষ্ট অংশ শোনাতে হবে। প্রস্তুতি ছাড়া গেলে অস্বস্তি হবে। অনুপস্থিত থাকলে শিক্ষক জিজ্ঞেস করবেন। এখনও সে একই মানুষ। কিন্তু তার ধারাবাহিক হওয়ার সম্ভাবনা হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল। কেন? কারণ মানুষ শুধু লক্ষ্য দ্বারা পরিচালিত হয় না। মানুষ জবাবদিহিতা দ্বারাও পরিচালিত হয়।
ফজরের জন্য উঠতে পারি না, কিন্তু চাকরির জন্য পারি কেন?
এই প্রশ্নটি একটু অস্বস্তিকর। কিন্তু প্রয়োজনীয়। অনেক মানুষ বলে, "আমি ফজরের জন্য উঠতে পারি না।" কিন্তু একই মানুষকে যদি ভোরবেলা বিমান ধরতে হয়, অথবা একটি গুরুত্বপূর্ণ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে হয়, তাহলে সে ঠিকই উঠে যায়। তাহলে সমস্যাটা কি সত্যিই ঘুম? নাকি সমস্যাটা অন্য কোথাও? চাকরিতে দেরি করলে একটি মূল্য দিতে হয়। সুযোগ হারানোর ভয় থাকে। মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। অর্থাৎ সেখানে একটি দৃশ্যমান পরিণতি আছে। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় নিজেদেরকে এমন একটি অবস্থায় রেখে দিই, যেখানে না করারও কোনো দৃশ্যমান মূল্য নেই। তাই বিষয়টি শুধু ঈমানের নয়। এটি ব্যবস্থারও প্রশ্ন। আমরা কি নিজেদের জীবনে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করেছি, যা আমাদের ভালো কাজের দিকে ঠেলে দেবে, এমনকি যেদিন আমাদের মন চাইবে না সেদিনও?
একা মানুষ যতটা পারে, একসাথে মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি পারে।
এই কারণেই ইসলাম শুধু ইবাদতের কথা বলেনি। ইসলাম জামাআতের কথা বলেছে। সুহবতের কথা বলেছে। সৎ সঙ্গের কথা বলেছে। মানুষ একা থাকলে নিজের সাথে আপস করে ফেলে। আজ না করি, কাল করব। আজ একটু বিশ্রাম নিই। আজ বাদ থাক। কিন্তু যখন একটি দল থাকে, তখন বিষয়টি বদলে যায়। যখন কেউ আপনার অপেক্ষায় থাকে। যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, "আজকের তিলাওয়াত হয়েছে?" যখন কেউ খোঁজ নেয়, "আজকের পাঠ শেষ করেছ?" তখন ভালো কাজটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না। এটি দায়িত্বে পরিণত হয়। আর দায়িত্ব সাধারণত আবেগের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
পরিবেশ আমাদের ধারণার চেয়েও শক্তিশালী
কিছু মুসলিম সমাজে এমন পরিবার আছে, যেখানে প্রতিদিন কুরআন পড়া হয়। শিশুরা বড় হতে হতে দেখে- বাবা কুরআন পড়ছেন। মা কুরআন পড়ছেন। ভাইবোন কুরআন পড়ছে। তারা কুরআনের প্রেমে পড়ে না কোনো বক্তৃতা শুনে। তারা কুরআনের প্রেমে পড়ে কারণ তারা কুরআনের পরিবেশে বড় হয়। এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে। আমরা অনেক সময় ইচ্ছাশক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু হয়তো তার আগে আমাদের পরিবেশ বদলানো প্রয়োজন। কারণ মানুষ যা বারবার দেখে, ধীরে ধীরে সে তার মতোই হয়ে ওঠে।
কিন্তু যদি পরিবেশ আপনার নিয়ন্ত্রণে না থাকে?
এই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। যদি আমার পরিবার এমন না হয়? যদি আমার বন্ধুমহল এমন না হয়? যদি আমার কর্মক্ষেত্র বা আশেপাশের মানুষ আমাকে আল্লাহর দিকে না টানে? তাহলে কি আমি অসহায়? না। কারণ পরিবেশ শক্তিশালী হলেও, মানুষের সবকিছু পরিবেশ নির্ধারণ করে না। আমাদের জীবনে সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু কিছু বিষয় সবসময়ই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমরা কোন কথোপকথনে অংশ নেব, সেটি অনেক সময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমরা কোন ভিডিও দেখব, কোন বই পড়ব, কাদের অনুসরণ করব, কাদের কথা শুনব, সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোনো মজলিসে গীবত শুরু হলে সেখানে বসে থাকব, নাকি ভদ্রভাবে উঠে যাব, সেটিও অনেক সময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। হয়তো আপনি পুরো ঘরকে বদলাতে পারবেন না। কিন্তু আপনি নিজের আসন বদলাতে পারবেন। হয়তো পুরো পরিবেশকে পরিবর্তন করতে পারবেন না। কিন্তু নিজের চারপাশে একটি ছোট পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন। একজন ভালো বন্ধু। একজন শিক্ষক। একটি কুরআন হালাকাহ। একটি উপকারী বই। একটি উপকারী অডিও। একটি ছোট কিন্তু নেক সঙ্গ।
অনেক মানুষ জীবনের বড় অংশ ব্যয় করে এমন জিনিস পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু প্রজ্ঞা হলো, যা আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, তা নিয়ে অভিযোগে ডুবে না গিয়ে, যা আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, তা দিয়ে শুরু করা। আলো সবসময় সূর্য হয়ে আসে না। কখনো কখনো একটি ছোট প্রদীপ দিয়েও অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। আর অনেক সময় একজন মানুষ পুরো পরিবেশের আলো থেকে আলোকিত হয় না। বরং সে নিজেই এমন আলো হয়ে ওঠে, যার কারণে তার আশেপাশের মানুষ আলোকিত হতে শুরু করে।
শেষ কথা
হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো আমরা পরিবর্তনকে একটি আবেগ হিসেবে দেখি। কিন্তু পরিবর্তন আসলে একটি ব্যবস্থা। একটি সম্পর্ক। একটি পরিবেশ। একটি অভ্যাস। একটি ছোট কাজ, যা আমরা বারবার করার মাধ্যমে দৃঢ়তায় পৌছে যাই।