‘কওম’ আরবি শব্দ। এর অর্থ গোষ্ঠী, গোত্র, জাতি, সম্প্রদায় ও জনগণ। ‘কওমি’ শব্দের অর্থ জাতীয়।‘মাদ্রাসা’ শব্দটিও আরবি। এর অর্থ হলো অধ্যয়নের স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যাপীঠ। বাংলা একাডেমির অভিধান মতে, মুসলমান ধর্ম ও সংস্কৃতিসংক্রান্ত উচ্চশিক্ষাকেন্দ্রকে মাদ্রাসা বলা হয়। (ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃ. ৯৭৫, ‘মাদ্রাসা’)। সুতরাং কওমি মাদ্রাসা মানে জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেহেতু কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি অনুদানের পরিবর্তে মুসলিম জাতির অর্থানুকূল্যে জনসাধারণের কল্যাণে পরিচালিত হয়, তাই এই ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কওমি মাদ্রাসা বলা হয়।শিল্প বিপ্লবোত্তর সময়ে যখন তাগুতি শক্তি কথিত উন্নয়ন, প্রগতি ও প্রযুক্তির মোহময়তার আবরণে সাম্রাজ্যবাদী দুরাকাঙ্ক্ষা পূরণে মত্ত হয়ে ওঠে, তখন তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে আসেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভি (রহ.)। তিনি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বিধিবিধান বিশ্লেষণ করে পেশ করেন ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের সার্বিক রূপরেখা। পরবর্তী সময় বস্তুবাদের ফেতনা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে পূর্বপুরুষদের যোগ্য উত্তরসূরি হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতভি (রহ.) নতুন রূপে, ভিন্ন আঙ্গিকে পথচলা শুরু করেন। তিনি মূলনীতি অনুসরণ করে শাখা-প্রশাখায় সংযোজন করে একটি সমন্বিত শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের নাম দেওবন্দ মাদ্রাসা। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওবন্দের মহান মনীষীরা লর্ড মেকলের শিক্ষানীতিকে অসার প্রমাণ করতে চেয়েছেন। পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে চেয়েছেন। তাঁরা চেয়েছেন এমন এক জাতি গঠন করতে, যারা রক্তে-বর্ণে হিন্দুস্তানি, কিন্তু চিন্তাচেতনা ও আদর্শে হেজাএটা ছিল এমন এক পরিস্থিতি, যার সঙ্গে তুলনা করা চলে হজরত আবু বকর (রা.)-এর সময়ে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধের সঙ্গে, যেখানে ৭০ জন কোরআনে হাফেজ শহীদ হলে অবশিষ্ট সাহাবার মধ্যে কোরআন সংকলন ও সংরক্ষণের জোর তাগিদ দেখা দেয়। ঠিক তেমনি বিপুলসংখ্যক আলেম শহীদ হওয়ার ফলে দ্বীনের বেসিক বিষয়াদির হেফাজত করা অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের একটি রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে, পশ্চিমা শিক্ষা ও কালচারের আগ্রাসন থেকে মুসলিমদের বাঁচাতে কয়েকজন আলেমের উদ্যোগে ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের পশ্চিমা সভ্যতার আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখা ও ইসলামের হেফাজত করা। দেওবন্দ ছিল একটি প্রতিবাদ, একটি বিপ্লব, একটি আন্দোলন। ১৮৬৬ সালের ৩০ মে তদানীন্তন অখণ্ড ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দে হজরত কাসেম নানতুভি (রহ.)-এর নেতৃত্বে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটিই সর্বপ্রথম কওমি মাদ্রাসা। এর ছয় মাস পর দারুল উলুমের আদর্শ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সাহারানপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুজাহেরুল উলুম মাদ্রাসা’। তারপর দেওবন্দের কারিকুলামে বিভিন্ন দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়তে থাকে। সে ধারাবাহিকতায় ১৯০১ সালে বাংলাদেশের প্রথম কওমি মাদ্রাসা দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৩৭ সালে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এ দেশে প্রায় ৪৪৩টি কওমি মাদ্রাসা ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫১টি ছিল দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসা। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৫ সালের সালের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসা আছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। (প্রথম আলো : ২৯-০৯-২০১৬)জি, মুহাম্মদি। প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ছাড়াও কওমি কারিকুলামে মসজিদ, মক্তব ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আরো লাখো প্রতিষ্ঠানে কওমি ধারার শিক্ষা দেওয়া হয়। দেশের প্রতিটি জনপদে, শহর-বন্দরে, গ্রামগঞ্জে হাজারো মসজিদ-মাদ্রাসা স্থাপন করে মুসলমানদের জন্য ইমানি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেছে কওমি মাদ্রাসা। এসব মসজিদ-মাদ্রাসায় এমন লাখো পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সরকারি শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা যাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ অর্থে রাষ্ট্রের অপূরণীয় শূন্যতা পূরণ করছে কওমি মাদ্রাসা।
কওমি মাদ্রাসা যত প্রত্যন্ত অঞ্চলেই অবস্থিত হোক না কেন, যত জীর্ণ, শীর্ণ ও সাদাসিধে হোক না কেন, মুসলিম সমাজে এসব মাদ্রাসার প্রভাব দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এসব মাদ্রাসার বদৌলতে এখনো পৃথিবীতে কালেমার ধ্বনি শোনা যায়। ইমানের ডাকে অদৃশ্যের আহ্বানে মানুষ সাড়া দেয়। এ মাদ্রাসাগুলোর কারণেই এখনো পৃথিবীতে আল্লাহর আওয়াজ সমুন্নত আছে। দ্বীনকে তার প্রকৃত রূপ, অবয়ব ও কাঠামোতে সংরক্ষিত রাখার দায়িত্বও কওমি মাদ্রাসা পালন করে আসছে।